তাঁর মৃত্যুর আকস্মিকতায় আমি বেদনাহত হয়েছি। এই গত জানুয়ারিতে মাত্র বিচ্ছিন্ন দুএকটি প্রবন্ধ পড়ে তাঁর লেখার সাথে আমার পরিচয়। যদিও মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর, কিন্তু আমার কাছে, যে আমি মাত্র পড়তে শুরু করেছি তাঁকে, এ এক অকালমৃত্যু। তাঁর বিখ্যাত স্মৃতিকথা ‘ওপারের ছেলেবেলা ১৯৩১-১৯৪৭’-এর দ্বাদশ পরিচ্ছেদ : রাজনীতি ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা, আমি এখানে তুলে দিচ্ছি—একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে, যে আমার সবসময়ে মনে হয়েছে ‘পাকিস্তান’ আমাদের ইতিহাসের এক চরম ভুল। সেই ভুল ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজে আজও সক্রিয়। জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৯৩১, বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। মৃত্যু ৫ অক্টোবর ২০০৯, কলকাতায়। অর্থনীতিতে এম.এ., আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পি.এইচ-ডি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডি.লিট। বহু ইংরেজি ও বাংলা গ্রন্থের রচয়িতা। বাংলা গ্রন্থগুলির মধ্যে মহাকাব্য ও মৌলবাদ, সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভগবদগীতা, ধর্মের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র ধর্ম ও রাজনীতি, বিকল্প নবজাগরণ, বিকল্প বিশ্বায়ন এবং ওপারের ছেলেবেলা উল্লেখযোগ্য। রাজনীতি ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা আগেই বলেছি, আমার ছেলেবেলায় বজ্রযোগিনীতে মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে ভৌগোলিক, আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দূরত্ব ছিল। কিন্তু সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্ফোরণ হবার আগে পর্যন্ত আমাদের গ্রামে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব হয়নি। ধর্মীয় ও ভৌগলিক দূরত্বের অন্তরালে এক ধরনের শ্রেণী বৈষম্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বর্তমান ছিল। ধর্মের দিক থেকে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও তারাই ছিল জমিদার-জোতদার-মহাজন শ্রেণীর বিপুল গরিষ্ঠ অংশ, আর প্রায় সমস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও চাকুরিজীবি ও পেশাজীবি। আর মুসলিমরা ধর্মের নিরিখে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশই ছিল ভূমিহীন কিংবা প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর বা অন্য ধরনের শ্রমজীবি। নানা ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক কারণে মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় এই শ্রেণী বৈষম্য আবার শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মাত্রা পেয়েছিল। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথে বিপথগামী হবার ফলে বজ্রযোগিনীর এই প্রচ্ছন্ন শ্রেণী বৈষম্যও বিশ শতকের চল্লিশের দশকে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িকতার রূপ নিতে আরম্ভ করে। ১৯৪২ এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় থেকে বজ্রযোগিনী গ্রামে হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় বিভাজন রাজনৈতিক রূপ নিতে আরম্ভ করেছিল। তার আগে থেকেই অবশ্য ঢাকা শহরে মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতো। সেসব দাঙ্গার খবর বজ্রযোগিনীতে এসে পৌঁছোত, আর বজ্রযোগিনীর মানুষেরা সে বিষয়ে সতর্ক থাকতো। কারণ এদের অনেকেই নানা কাজে প্রায়ই ঢাকা যেতে হতো। দাঙ্গার খবর পেলে ঢাকাযাত্রী হিন্দুরা ঢাকা রেল স্টেশনে…
ব্রিটেনের দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট-এ গেল মে মাসের ২৪ তারিখে ছাপা সংবাদের শিরোনাম: বাংলাদেশ ইজ সেফ হেভেন ফর ব্রিটিশ ইসলামিক টেরোরিস্টস। শিরোনামের খানিকটা উদ্ধৃতাংশের মধ্যে রাখলেও ইনডিপেনডেন্ট-এর তাগিদ যে ওই উদ্ধৃতাংশকেই মানুষজনের মনে স্থায়ী করে দেয়া, বাংলাদেশকে ব্রিটিশ-ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে প্রমাণের নানা ইঙ্গিত ও ধারণা তুলে ধরা, তা বলাই বাহুল্য। উপশিরোনামে যে-বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার মর্মার্থ আরও উদ্বেগজনক,- পাকিস্তানে প্রতিরোধের মুখে পড়ায় এখন সেখানকার মৌলবাদীরা প্রশিক্ষণের জন্যে নতুন এক আস্তানা পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ব্রিটেনে বাংলাদেশের একটি হাইকমিশন আছে, প্রতিদিনই প্রত্যাশা করেছি হয়তো সেখানে প্রকাশিত হবে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে দেয়া প্রতিবাদবিবৃতি। কিন্তু সেরকম কিছু আমার চোখে পড়েনি। এমনকি, সংবাদটি সম্পর্কে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নীরব [...]
কারও কি চোখে পড়েছে ব্রিটেনের দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট-এ গেল মে মাসের ২৪ তারিখে ছাপা হওয়া ওই সংবাদটি? প্রথম পাতায় ছাপা হয়নি বটে; তাই বলে মোটেও গুরুত্বহীন নয় ওই সংবাদ। শিরোনামেই আমরা খুঁজে পাই ওই গুরুত্বের গন্ধ : বাংলাদেশ ইজ সেফ হেভেন ফর ব্রিটিশ ইসলামিক টেরোরিস্টস। শিরোনামের খানিকটা উদ্ধৃতাংশের মধ্যে (সেফ হেভেন ফর ব্রিটিশ ইসলামিক টেরোরিস্টস) রাখলেও ইনডিপেনডেন্ট-এর তাগিদ যে ওই উদ্ধৃতাংশকেই মানুষজনের মনে স্থায়ী করে দেয়া, বাংলাদেশকে ব্রিটিশ-ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে প্রমাণের নানা ইঙ্গিত ও ধারণা তুলে ধরা, তা বলাই বাহুল্য। এরপর সংবাদটির উপশিরোনামে যে-বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার মর্মার্থ আরও উদ্বেগজনক,- পাকিস্তানে প্রতিরোধের মুখে পড়ায় এখন সেখানকার মৌলবাদীরা প্রশিক্ষণের জন্যে নতুন এক আস্তানা পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তার মানে, এখানেও আমরা ইঙ্গিত পাই সেই নতুন আস্তানা হিসেবে বাংলাদেশের দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়ে দেয়ার। ব্রিটেনে বাংলাদেশের একটি হাইকমিশন আছে, আমি পরবর্তী কয়েকদিন ইনডিপেনডেন্ট খুব মনযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, প্রতিদিনই প্রত্যাশা করেছি হয়তো সেখানে প্রকাশিত হবে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে দেয়া প্রতিবাদবিবৃতি। কিন্তু সেরকম কিছু আমার চোখে পড়েনি। সংবাদটি প্রকাশের আগে ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি লন্ডনেই ছিলেন এবং কথা বলেছেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের সঙ্গে পরদিন তিনি রওনা হয়েছেন সিরিয়ার পথে। এরকম এক সময়ে এরকম একটি সংবাদ প্রকাশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টনক নড়ার কথা ছিল। কিন্তু সংবাদটি সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নীরব রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের কোনও পত্রিকাও সংবাদটি ট্রান্সক্রিপ্ট করেনি, কোনও কলামিস্টও এ নিয়ে কোনও কলাম লিখেছেন বলে মনে হয় না। লোকে বলে, নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। এ ক্ষেত্রেও কি তা হলে তাই ঘটেছে? তথ্য ও পরিস্থিতির নিরিখে অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌলবাদী ও ইসলামী জঙ্গি সংগঠন এখন খুবই সক্রিয়। জোট সরকারের আমলে একযোগে দেশটির ৫০০ স্থানে বোমা হামলার ঘটনা তারই প্রমাণ। কিন্তু পাশাপাশি এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের জনগণের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে মৌলবাদবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের। বাংলাদেশে বার বার সামরিক শাসন এসেছে, এই সামরিক শাসনের হাত ধরে এসেছে ধর্মজ রাজনীতি। সামরিক শাসন টিকে থাকতে পারেনি বটে, কিন্তু ধর্মজ রাজনীতিকে অনুপ্রবিষ্ট করে রেখে গেছে কথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভেতর। বাংলাদেশের মানুষ যেমন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, তেমনি সংগ্রাম করে চলেছে ধর্মজ রাজনীতির বিরুদ্ধেও।…
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ফারুক চৌধুরীর এ লেখাটি আলোচনার জন্য নির্বাচন করা হল। প্রশ্ন হল, পাকিস্তানে সোয়াত উপত্যকার ঘটনাবলী বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের রাজনৈতিক আকাশে মেঘ জমার কোন আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছে কি? (more…)
স্বাগতম।