আগের সংকটগুলো ক্ষমতা বদলের লড়াই ছিল; ২০২৪ হলো রাষ্ট্র, ইতিহাস ও নাগরিক স্মৃতিকে নতুন করে লেখার চেষ্টা। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার সরকার বদলেছে, আন্দোলন হয়েছে, ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টেছে। কিন্তু ২০২৪ সাল সেই তালিকায় আরেকটি সংখ্যা নয়। এটি এমন এক সময়, যখন রাষ্ট্র শুধু শাসক বদলাতে নয়—নিজের স্মৃতি, আইন এবং নাগরিক পরিচয় বদলে পিচিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রশ্নটি আর কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নয়; প্রশ্নটি হলো— ১৯৭১ এ জনযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা তিরিশ লাখ শহীদের ত্যাগের মাধ্যমে অর্জন করেছি বাংলাদেশ। এ অর্জন ধর্মের কলকাঠি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন পর্যুদস্ত করার ১৯৪৭ এর অপ-প্রয়াসের বিরুদ্ধে, দ্বিজাতি-তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, সমানাধিকারের পথে, সাম্যের পথে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে বাংলার জনপদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, এবং বিশ্ব দরবারে মহতী জাতিরূপে স্থান করে দেয়ার কর্মযজ্ঞের পক্ষে। তাই প্রশ্ন কোন্ ধরণের রাষ্ট্র টিকে থাকবে? মুক্তিযুদ্ধের চৈতন্যবাহী জনগণের ও তাদের নেতৃত্বের ঐক্য এই প্রশ্নের সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতির সূচনা স্বাধীনতার পরপরই, ১৯৭২ সালে। তবে স্বাধীনতার প্রথম দশকে গঠিত রাজনৈতিক জোটগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। জোট রাজনীতির বাস্তব ও কার্যকর রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যায় মূলতঃ জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সময় থেকে। ১৯৮৮ সালের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮-দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট, বাম দলগুলোর নেতৃত্বে ৫-দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। একই সময়ে ছাত্রসমাজ ২২-দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই সম্মিলিত আন্দোলনের চাপে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের রূপরেখা বাস্তবায়নে তারা আগ্রহ দেখায়নি। বরং কয়েকটি উপ-নির্বাচন সরকারি ছত্রছায়ায় এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে যে ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জীবন রক্ষার্থে এলাকা ত্যাগে বাধ্য হন। এর পরিণতিতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে প্রায় সব রাজনৈতিক দল আবারও আন্দোলনে নামে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের একতরফা ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে

‘জনতার মঞ্চ’ ব্যানারে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। জাতীয় পার্টি ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ এবং জামায়াতে ইসলামী ‘কেয়ারটেকার মঞ্চ’ গঠন করে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত দেড় মাসের মাথায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সরকারের শেষের দিকে ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চার দলীয় জোট গঠিত হয় ( বিএনপি , জাতীয় পার্টি , জামায়াতে ইসলামী , এবং ইসলামী ঐক্যজোট )। তবে কিছুদিনের মধ্যে এরশাদের জাতীয় পার্টি চার দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলে নাজিউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটা অংশ চার দলীয় জোটে থেকে যায় । ঐ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বা বাম দলগুলোর নেতৃত্বে তেমন কার্যকরি কোন জোট না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। পরিণতিতে রাষ্ট্র ও সমাজ এক গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা…

নতুন কাল সমাগত। উন্নয়ন ও ইসলাম : এই কালের ফসল ঘরে উঠে গেছে। নতুন কালে নতুন দিনের যদি জন্ম না হয়, যদি উন্নয়নসাম্য ও সংস্কৃতিসভ্যতা আমাদের সৃষ্টিশীল রাজনৈতিক পরিসরে প্রবিষ্ট না হয় - তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট আরো উৎকট সংকটেই পর্যবসিত হবে।

দূর থেকে বাংলাদেশকে দেখতে গিয়ে, ২০০৯ এর শুরু থেকে ২০২৪ এর অর্ধাংশ পর্যন্ত, দুটি শব্দে যখন এক সিংহলি বন্ধুকে – যেবন্ধুটির ব্যবসায়িক সূত্রে বছরের নয় মাসই কাটত বাংলাদেশে – সেই বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে বললাম, কলকাতায় বসে সে আমাকে বলল : উন্নয়ন ও ইসলাম। আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম, কারণ ঠিক এই দুটি শব্দই আমি অন্য এক সূত্রে ২০১৯ সালের শেষে কলকাতায় আমার ঘনিষ্ঠ এক অত্যন্ত প্রভাবশালী সাংবাদিকের মুখে শুনেছিলাম, তিনি আমাকে বলেছিলেন – কলকাতায় সেবার ইডেনে গোলাপী টেস্ট উদ্বোধনে শেখ হাসিনা এসেছিলেন এবং তাদের মধ্যে কথাবার্তার এক পর্যায়ে – শেখ হাসিনা নাকি বলেছিলেন উন্নয়ন ও ইসলাম নিয়ে বাংলাদেশে তার সরকার কখনোই কোনো আপোস করবেন না। এখন এই উন্নয়ন ও ইসলাম পাশাপাশি আমি আরো অনেকের কাছে বিগত বছরগুলোতে আরো অনেক বার শুনেছি এবং আমিও এটা ধরে নিয়েছি বাংলাদেশে ২০১৯ এর শুরু থেকে ২০২৪ এর অর্ধাংশ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনে উন্নয়ন ও ইসলাম উচ্চকিত হয়েছে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই এতে আমি কোনো অর্থেই উন্নয়ন ও ইসলাম নিয়ে কোনো ধরনের বিরূপ ধারণার প্রতি

আকৃষ্ট হইনি এবং শেখ হাসিনার শাসনের মূলমন্ত্র যদি উন্নয়ন ও ইসলাম হয়ে থাকে তাতেও আমি কোনো সমস্যা না দেখে বরং এই দুই মূলমন্ত্র ধরে তিনি বাংলাদেশকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সেটাতেই আমি সতত উদগ্রীব থেকেছি। কিন্তু যেটা আমার বলার কথা, আজ এখানে, তা হল এই উন্নয়ন ও ইসলাম এখন যেভাবেই হোক তার শাসনকাল অতিক্রম করেছে, তবুও এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি – বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে যারা শাসন করতে আসতে পারে এবং বাংলাদেশকে এখন যারা শাসন করছে, তারাও একই ভাবে না হলেও অন্য ভাবে এই উন্নয়ন ও ইসলামকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতেই মশগুল আছে। আমাকে বলতেই হবে, তারা ভুল করছে, এবং শুধু তাই নয় – আজ কোনো যাদুবলে শেখ হাসিনাও যদি বাংলাদেশকে শাসন করতে শুরু করে, তাহলে তার জন্যও এটা চরম ভুল হবে আবার তার পুরনো মন্ত্র উন্নয়ন ও ইসলামে তার ক্ষমতাচক্রকে সাজিয়ে তোলা। অর্থাৎ, আমি এটাই বলতে চাইছি উন্নয়ন ও ইসলামের কাল শেষ হয়ে গেছে, নতুন কাল সমাগত, তাই আমরা যেই হই না কেন, আমরা যদি পুরোনো কালের উন্নয়ন ও ইসলামকে আঁকড়ে…

মুক্তিযুদ্ধ একটি সেকুলার ধারণা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার একটা সেকুলার ধারনা, অর্থ নৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেকুলার চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সব মানুষের সাম্য একটি সেকুলার বাস্তববাদী ভাবনা। মূলতঃ যা জুলাইতে ঘটেছে, তা দেশে গত তিরিশ বছরে ধরে গড়ে ওঠা জঙ্গী তৎপরতার এক চরম ফলাফল।শিক্ষার্থীদের আড়ালে লুকিয়ে ইসলামী স্টেট কায়েমের স্বপ্ন দেখা চরম ইসলামিক গোষ্ঠী জামাত-শিবির, তাদের গুপ্ত সশস্ত্র জঙ্গী দল এবং তাদের রাজনৈতিক সহযাত্রী দল বি এনপি, কোটা আন্দোলনটিকে পাঁচ তারিখ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। খুব সামান্য মার্জিনে ভীড়ের ভেতর লূকিয়ে থাকা জিহাদী জঙ্গীরা ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করতে পারে নি। একটি প্রশ্ন স্বতঃই মনে জাগছে, বত্রিশ নম্বর বাড়ি এদের এত ভীতির উৎস কেন? কারণ এই যে, এ বাড়ি স্বাধীন বাংলার সূতিকাগার। যেমন ১৯৭১ এ মায়ের জরায়ূতে বেয়নেট ঠুকে ঠুকে লক্ষ লক্ষ নারীকে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনি ৫ ফেব্রুয়ারীর কালরাতে ধানমণ্ডির বত্রিশে, বাংলার জন্মের ঘরে হাতুড়ির ঠকঠক আওয়াজ সারারাত শোনা গেছে। বুলডোজার গর্জে এসে তার বুকের ওপর উঠে পড়েছিল। তারপর দেখা গেলো কিছু ইট কাঠ ও পাথর থেকে বত্রিশের প্রাণ মিশে গেলো বাংলার মাটিতে, দেশ-বিদেশে, স্বাধীন বাংলাকে ভালোবাসা প্রতিটি সন্তানের হৃদপিণ্ডে। বত্রিশের মাটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে গেল বিশ্বময়। কাল এক অন্তহীন গাঢ় অমানিশা ছেয়ে ছিল বাংলাকে।

ধ্বংসপ্রাপ্ত ৩২ নম্বর

ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িটি শরিয়াবাদীদের আমরণ ভীতির উৎস । রাষ্ট্রীয় মদদে জঙ্গী হামলায় ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাদুঘরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং কালেমা লেখা সাদা পতাকা ওড়ানোর অত্যন্ত উদ্বেগজনক কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ছাত্র আন্দোলনের ছদ্মাবরণে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ও করছে। একটি প্রশ্ন স্বতঃই মনে জাগছে, বত্রিশ নম্বর বাড়ি জঙ্গীদের আমরণ ভীতির উৎস কেন? কারণ এই যে এ বাড়ি স্বাধীন বাংলার সূতিকাগার। মায়ের জরায়ূতে বেয়নেট ঠুকে ঠুকে কতো নারীকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ এ। ৫ ফেব্রুয়ারীর কালরাতে ধানমণ্ডির বত্রিশে, বাংলার জন্মের ঘরে হাতুড়ির ঠকঠক আওয়াজ সারারাত শোনা গেছে। বুলডোজার গর্জে এসে তার বুকের ওপর উঠে পড়েছিল। তারপর দেখা গেলো কিছু ইট কাঠ ও পাথর থেকে বত্রিশের প্রাণ মিশে গেলো বাংলার মাটিতে, দেশ-বিদেশে, স্বাধীন বাংলাকে ভালোবাসা প্রতিটি সন্তানের হৃদপিণ্ডে। বত্রিশের মাটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে গেল বিশ্বময়। কাল এক অন্তহীন গাঢ় অমানিশা ছেয়ে ছিল বাংলাকে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে হামলা চোরগুপ্তা শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় গত ৫ ফেব্রয়ারী ৩২ নম্বরে বুলডোজার নিয়ে হামলা, বাড়ি বাড়ি ঐ ভবনের

ইট খুলে নিয়ে যাওয়া এবং অগ্নিসংযোগ শেষে অনেক রাততক আগুন জ্বলছিল বত্রিশে, লক্ষ লক্ষ জনতার বুকে। এ আগুন জ্বলতে থাকুক। প্রধান উপদেষ্টার তরফ থেকে যমুনার টিভির ভাষ্য জানানো হয়েছে: জনগণ অত্যন্ত রেগে আছে তাই এমন ঘটেছে, আট অগাস্ট পর্যন্ত তো কিছু ঘটে নি। জনগণের ব্যক্তিগত সম্পত্তি লুট হচ্ছে, ভাঙ্গা হচ্ছে; রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনাশ করা হচ্ছে। একটা ক্ষমতাসীন সরকার থাকলে এটা হতে পারতো না। সুতরাং বাংলাদেশে বাস্তবে কোনো সরকার নেই। এই নৈরাজ্য ইউনুস সাহেবের প্রতিহিংসার নৈরাজ্য। তবে হিংসাটা আওয়ামী লীগ ও শেখ-হাসিনাকে করতে গিয়ে তিনি গোটা দেশের সেকুলার জনগনকে হিংসা দেখিয়ে চলেছেন। এবং যতদূর বোঝা যাচ্ছে, তিনি ও তার জঙ্গী অনুসারীরা চাইছে, জনগণ নেমে পড়ুক। তাহলে দেখানো সম্ভব বাংলাদেশে যা ঘটছে তা নিছক নিজেদের মধ্যে মারামারি। তখন সরকারকে বৈধ করে নিতে দেশবিদেশের তাবড় তাবড় নেতা এগিয়ে আসবে, ‘ সেভ ইউনুস’ ক্যাম্পেইন নিয়ে। এসব এখন সুদূরপরাহত! মুহাম্মাদ ইউনুসের ভাগ্য তাকে নিয়ে বড়ো হৃদয়বিদারক খেলা খেলিয়ে নিচ্ছে। তার এক সুপ্ত স্বপ্ন ছিলো হয়তো, মুজিবের মতো জাতির পিতা হবার। নোবেল পেয়েছেন না। জাতির পিতার…

গতকাল হোলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্তি হল, গত বছরের পহেলা জুলাই (ঈদের কয়েকদিন আগে) পাঁচজন জঙ্গি রেস্তোরাটির অতিথিদের জিম্মি করে এবং দেশি বিদেশি মিলিয়ে বাইশ জনকে হত্যা করে [..]

গতকাল হোলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্তি হল, গত বছরের পহেলা জুলাই (ঈদের কয়েকদিন আগে) পাঁচজন জঙ্গি রেস্তোরাটির অতিথিদের জিম্মি করে এবং দেশি বিদেশি মিলিয়ে বাইশ জনকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডটির নৃশংসতার মাত্রা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে দেয়। এই একই দলের জঙ্গিরা এর আগে প্রায় দেড় বছর ধরে নিয়মিতভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। সেসব হত্যাকাণ্ডের শিকার ছিলেন মূলত প্রগতিশীল ব্লগার, প্রকাশক, সমকামী এক্টিভিস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রমুখ। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পরপর সাধারণ লোকজন, বুদ্ধিজীবী এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর রি-একশনে একটা কমন প্যাটার্ন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সমমনা অনলাইন এক্টিভিস্টরা এসব হত্যাকাণ্ডের পরে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন ঠিকই, রাস্তাঘাটেও নেমে এসেছিলেন, কিন্তু একই সাথে ফেসবুকে এবং অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে সাধারণ লোকজনের অসংখ্য মন্তব্যের মাঝে একটা প্রছন্ন সন্তুষ্টিও লক্ষ্য করা গিয়েছিল। নাস্তিকদের ধর্মকে আঘাত করে লেখা আর প্রকাশ্যে কেউকে চাপাতি দিয়ে খুন করার মধ্যে কোনটা বড় অপরাধ এটা নিয়ে ফেসবুকে নানা আলাপও জমে উঠেছিল। মানে ব্যাপারটা এমন যে অভিজিৎ রায় এবং অন্যান্য ব্লগাররা 'নাস্তিকতা পূর্ণ লেখা অনলাইনে দিয়ে প্রথম আঘাতটা করেন, এখন এই জঙ্গিরা পাল্টা আঘাত করছে, জঙ্গিদের খুন করাটা উচিত হয়নি, কিন্তু ধর্মকে আঘাত করে লিখলে কারো কারো মাথা গরম হয়ে খুনও করে ফেলতে পারে। মুল ধারার বুদ্ধিজীবীরাও এই হত্যাকাণ্ডগুলোর নিন্দা করেছেন বটে, তবে তাঁরা 'নিরাপত্তার অভাব' নিয়েই বেশী চিন্তিত ছিলেন বলে মনে হয়েছে, মানে অভিজিৎ রায় যে খুন হয়েছেন তার চেয়েও বড় চিন্তার বিষয় হচ্ছে কি করে পুলিশের এত কাছে খুন করে খুনিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, যেন অভিজিৎ রায় নির্জনে খুন হলে তাঁরা ততটা চিন্তিত হতেন না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের চাইতে নিহত ব্লগাররা তাঁদের লেখার মাধ্যমে কতখানি 'উস্কানি' দিয়েছেন এই নিয়ে গবেষণা করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন, প্রতিটি খুনের পর পরই শোনা যাচ্ছিল তারা ব্লগারদের লেখা 'খতিয়ে দেখবেন'। এছাড়াও তখনো বেঁচে থাকা ব্লগারদের 'সীমা লঙ্ঘন' না করতে পুলিশ-কর্তা উপদেশ দিয়েছিলেন। অবশ্য নিহত ব্লগারদের লেখা খতিয়ে দেখে তারা কি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সেটা আমরা কখনো জানতে পারিনি। পুলিশ কর্তা একটা 'নাস্তিকতা পূর্ণ' লেখা সংশোধন করে অনলাইনে দিয়ে দিতে পারতেন, এতে ব্লগাররা কি করে সীমার ভেতরে থাকা যায় সে ব্যাপারে একটা নির্দেশনা পেতেন, সেটাও ঘটেনি। এই…

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি কিন্তু ধর্মের নৈতিক ব্যবহার নিয়ে আমরা কোনো কথা বলি না। [...]

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি কিন্তু ধর্মের নৈতিক ব্যবহার নিয়ে আমরা কোনো কথা বলি না। আবার দেখুন প্রায়ই বলতে শোনা যায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন কিন্তু দুনিয়ার আকাম কুকাম কোনোটা তার বাকি নেই - তার মানে কী, একথা যিনি বলছেন তিনি মনে করছেন নামাজ পড়া লোকটার আকাম কুকাম করাটা অস্বাভাবিক বা আকাম কুকাম করলে নামাজ পড়ার দরকার কি? এভাবে সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, লোভ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, হিংসা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে প্রতি প্রশ্নে আঙ্গুল তোলা হয় রোজা নামাজ করা লোক কেমনে এত অসৎ লোভী হিংসুক হয়। একথাও বলতে শোনা যায় আমি হাজি মানুষ আপনার মনে হয় আমি ওজনে কম দেব, রোজামুখে বলছি এই মাল বিক্রি করে আমার লস হবে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা কোরান ছুঁয়ে বলছি আমি ওনার সাথে সহবাস করিনি অথবা তিনি নামাজ কালাম পড়েন খুব আল্লাহওয়ালা ভাল মানুষ - এভাবে জীবনের প্রতি পদে পদে ধর্মকে সামনে দাঁড় করিয়ে নৈতিকতার ফিরিস্তি দেয়া হয় নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সাহিত্য শিল্প সৃষ্টি নিয়ে ও এসবের সাথে মাদকাসক্তির সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা বলতে শোনা যায়, কারো কারো কথা শুনলে এমনও মনে হতে পারে নিতান্ত মদই গিলতে পারে না সে আবার কবিতা লিখবে কী, গাঁজা নিয়েও এমন কথা উঠে আসে গিনসবার্গ গাঁজাসেবী তাই তিনি এত বড় কবি, আবার অন্যদিকেও কথা ওঠে কাড়ি কাড়ি মদ না গিললে বড় কথাশিল্পী হতেন তিনি, হেরোইনের নেশায় না পড়লে আপনারা কেউ কি দাঁড়াতে পারতেন ওর কবিতার সামনে। কিন্তু আমরা কখনো ভাবি না শুধু মাদক সেবন শিখলে তো কেউ কবিতা লিখতে পারে না বা শুধু কবিতা লিখতে শিখলে কেউ মাদক সেবক হতে পারে না - দুটোই আলাদা আলাদা শিখতে হয়। তাই ধর্মের অনুশাসন পালন শিখলেই আপনার নৈতিক শিক্ষা হয়ে যাবে এটা তো হতে পারে না। আপনাকে নৈতিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হবে - আপনি অসৎ লোভী হিংসুক মানেই আপনার নৈতিক শিক্ষা হয়নি বা আপনি আপনার নৈতিক শিক্ষা ভুলে গেছেন, যেরকম অনেকেই শিক্ষাকালের পর তার আরব্ধ শিক্ষা ভুলে যায়। প্রতি পদে পদে ধর্মের নৈতিক ব্যবহার থেকে সমাজকে মুক্ত হতে হবে - আপনার নামাজ কালাম আপনার, আপনার নৈতিকতাও…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.