বাংলাদেশে সদ্য জনপরিসরে উন্মোচিত “বাংলাদেশ সনদ” আন্দোলনের অঙ্গীকারনামায় “সমাজতন্ত্র” শব্দটির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতদিন বিতর্ক জারী ছিল, এখন আচমকা বিজ্ঞ জনসমাজ সমাজতন্ত্র বিষয়ে উদ্যোক্তাদের নিয়ত কি সে প্রশ্ন করছেন । কেউ এটিকে আকস্মিক বিয়োজন ধরে নিয়েছেন। কেউ আবার এটির অনুল্লেখ আদর্শিক বিচ্যুতি বলেও মনে করছেন। যা স্বাভাবিক। কিন্তু এই অনুল্লেখ একটি বড়ো কাজ করে ফেলেছে। আচমকা জনপরিসরে চলমান মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে নিয়ে ভাবছে না, তার চেয়ে বেশি ”সমাজতন্ত্র” ধারণাটি নিয়ে মানুষ নাড়াচাড়া শুরু করেছে। https://www.bangladeshcharter.org/our-journey/ এ প্রসঙ্গে বাংলার গত শতাব্দীর ইতিহাস নিয়েও একটু নাড়াচাড়া করা যাক। কি বলেন? ইতিহাস কি জানায় আমাদের? ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত জানায় যে—সমাজতন্ত্র এই বাংলায় হঠাৎ নাজেল হওয়া কোনো চেতনা নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, শ্রেণীগত বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক চেতনা, যা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম একটি মূলনীতি। ভুললে চলবে না যে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের অন্যতম কারণ।১৯৬০-এর দশকের পূর্ব-পাকিস্তান ছিল গভীরভাবে অসাম্য চর্চার এক রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সমাজ ছিল আশরাফ-আতরাফ, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ, এ জাতীয় নানা স্তরে বিভক্ত। এর মধ্যে

জনসাধারণের বিপুল অংশ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন কৃষিসমাজের জনগণ। আশরাফ মুসলমান চালিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মদদে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলা অসাম্যের ছোবলে সমাজ ক্ষত-বিক্ষত ছিল। একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পুঁজি সঞ্চিত হচ্ছিল। পুঁজি আসতো পূর্বাঞ্চল থেকে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব-বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর কাঠামোগত বঞ্চনা ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছিল। পাট, কৃষি ও শ্রমশক্তি থেকে উৎপন্ন সম্পদ চলে যেত কেন্দ্রের ( পশ্চিমাঞ্চলের) দিকে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উন্নয়ন আসতো না পূর্ব-বাংলায়। এই বাস্তবতায় “শ্রেণী” কোনো তাত্ত্বিক শব্দ ছিল না—এটি ছিল বাংলার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন যে নেতৃত্ব, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলায় যিনি স্বদেশের জনগণের ”বঙ্গবন্ধু” ডাকের ভেতর দিয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার দলীয় ৬ দফা কেবলমাত্র সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। এর ভেতরে ছিল অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের দাবি। রাজস্ব, মুদ্রানীতি, বাণিজ্য—সবকিছুর ওপর আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। অর্থাৎ, এক ধরণের অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা তিনি ভেবেছেন, যা সরাসরি…

আগের সংকটগুলো ক্ষমতা বদলের লড়াই ছিল; ২০২৪ হলো রাষ্ট্র, ইতিহাস ও নাগরিক স্মৃতিকে নতুন করে লেখার চেষ্টা। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার সরকার বদলেছে, আন্দোলন হয়েছে, ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টেছে। কিন্তু ২০২৪ সাল সেই তালিকায় আরেকটি সংখ্যা নয়। এটি এমন এক সময়, যখন রাষ্ট্র শুধু শাসক বদলাতে নয়—নিজের স্মৃতি, আইন এবং নাগরিক পরিচয় বদলে পিচিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রশ্নটি আর কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নয়; প্রশ্নটি হলো— ১৯৭১ এ জনযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা তিরিশ লাখ শহীদের ত্যাগের মাধ্যমে অর্জন করেছি বাংলাদেশ। এ অর্জন ধর্মের কলকাঠি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন পর্যুদস্ত করার ১৯৪৭ এর অপ-প্রয়াসের বিরুদ্ধে, দ্বিজাতি-তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, সমানাধিকারের পথে, সাম্যের পথে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে বাংলার জনপদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, এবং বিশ্ব দরবারে মহতী জাতিরূপে স্থান করে দেয়ার কর্মযজ্ঞের পক্ষে। তাই প্রশ্ন কোন্ ধরণের রাষ্ট্র টিকে থাকবে? মুক্তিযুদ্ধের চৈতন্যবাহী জনগণের ও তাদের নেতৃত্বের ঐক্য এই প্রশ্নের সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতির সূচনা স্বাধীনতার পরপরই, ১৯৭২ সালে। তবে স্বাধীনতার প্রথম দশকে গঠিত রাজনৈতিক জোটগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। জোট রাজনীতির বাস্তব ও কার্যকর রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যায় মূলতঃ জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সময় থেকে। ১৯৮৮ সালের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮-দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট, বাম দলগুলোর নেতৃত্বে ৫-দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। একই সময়ে ছাত্রসমাজ ২২-দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই সম্মিলিত আন্দোলনের চাপে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের রূপরেখা বাস্তবায়নে তারা আগ্রহ দেখায়নি। বরং কয়েকটি উপ-নির্বাচন সরকারি ছত্রছায়ায় এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে যে ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জীবন রক্ষার্থে এলাকা ত্যাগে বাধ্য হন। এর পরিণতিতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে প্রায় সব রাজনৈতিক দল আবারও আন্দোলনে নামে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের একতরফা ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে

‘জনতার মঞ্চ’ ব্যানারে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। জাতীয় পার্টি ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ এবং জামায়াতে ইসলামী ‘কেয়ারটেকার মঞ্চ’ গঠন করে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত দেড় মাসের মাথায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সরকারের শেষের দিকে ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চার দলীয় জোট গঠিত হয় ( বিএনপি , জাতীয় পার্টি , জামায়াতে ইসলামী , এবং ইসলামী ঐক্যজোট )। তবে কিছুদিনের মধ্যে এরশাদের জাতীয় পার্টি চার দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলে নাজিউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটা অংশ চার দলীয় জোটে থেকে যায় । ঐ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বা বাম দলগুলোর নেতৃত্বে তেমন কার্যকরি কোন জোট না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। পরিণতিতে রাষ্ট্র ও সমাজ এক গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা…

৫ আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশের তথাকথিত "গণ-অভ্যুত্থানে" ঘোষিত জুলাই ঘোষণাপত্রটি রাজনৈতিক ভাষায় যতটা নাটকীয়, বিশ্লেষণে ততটাই বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতা-বিচ্যূত। এটি ইতিহাস ও সংবিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে, যা পক্ষপাতদুষ্ট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থে রচিত। কেন? বলছেন জাহানারা নূরী।

অবৈধ জুলাই সনদ

অধ্যায় এক.  রাষ্ট্র ও জনজীবন-যাপনের ধারা উন্নয়নের নানা দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে ব্যক্তি অধিকার ও বৈপ্লবিক ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে  রাষ্ট্র, আইন ও শৃঙ্ক্ষলা প্রাধান্য পায় । একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র কাঠামোই প্রকৃত মানবাধিকার রক্ষার শর্ত। যে কোনো বিপ্লবই যদি রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়, তা সভ্যতা, জনপদের জীবন ও নিরাপত্তার পরিপন্থী।   যে কারণে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশের তথাকথিত "গণ-অভ্যুত্থানে" ঘোষিত জুলাই ঘোষণাপত্রটি রাজনৈতিক ভাষায় যতটা নাটকীয়, বিশ্লেষণে ততটাই বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতা-বিচ্যূত। এটি ইতিহাস ও সংবিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে, যা পক্ষপাতদুষ্ট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের স্বার্থে রচিত। রাষ্ট্রীয় ও আইনগত যুক্তির আলোকে এই ঘোষণাপত্রের মূল দাবিগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।   ধারা ১-২:   ঘোষণাপত্রটি স্বাধীনতার ইতিহাস পুনর্লিখনের উদ্দেশ্যে শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে, যাতে মনে হয় ১৯৭১ সালের যুদ্ধের নেতৃত্ব ও সংগঠকদের ভূমিকা ম্লান করে জনতার স্পন্টেনিয়াস লড়াইকে কেন্দ্র করে একটি রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার বয়ান বলা যায়। এটি প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণমানুষের দীর্ঘ আন্দোলন, রক্তপাত, লড়াই এবং স্বাধীনতার পথে সচেতন উত্থান,  রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও

সামরিক প্রতিরোধের সমন্বয়ের ফসল—এটি কোনো নেতা-শূন্য লুকোনো- ছাপানো গণপ্রতিরোধ নয়।  ধারা ৩-৪:   ১৯৭২ সংবিধান ও বাকশাল নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করে এতে নিন্দনীয় একটা ভূমিকা পালন করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় এমন কি বিশ্বে ও গৃহীত প্রশংসিত অন্যতম প্রগতিশীল একটি দলিল, যেখানে মৌলিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। একে "কাঠামোগতভাবে দুর্বল" বলা রাজনৈতিক অপপ্রচার ছাড়া কিছুই নয়। বাকশাল ব্যবস্থা নিয়ে একপাক্ষিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কেবলমাত্র ক্ষমতা লোভের ফলাফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই বয়ান শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার আগে থেকেই, যার পেছনে ছিল তৎকালীন দেশে নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও বারবার সামরিক ষড়যন্ত্র।  ধারা ৫-৭:   গণতন্ত্রের ইতিহাসকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঘোষণাপত্রে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান ও ১/১১-কে যথেচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক সংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। এই সনদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগনের স্বাধীনতা ও জাতির গণতান্ত্রিক চেতনাকে চূড়ান্ত অপমান করা হয়েছে। সংবিধানের পরিবর্তন জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই সম্ভব, কোনো মুখোশধারী গোষ্ঠীর বা নির্বকারত্বের চেহানার ধারী…

মুক্তিযুদ্ধ একটি সেকুলার ধারণা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার একটা সেকুলার ধারনা, অর্থ নৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেকুলার চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সব মানুষের সাম্য একটি সেকুলার বাস্তববাদী ভাবনা। মূলতঃ যা জুলাইতে ঘটেছে, তা দেশে গত তিরিশ বছরে ধরে গড়ে ওঠা জঙ্গী তৎপরতার এক চরম ফলাফল।শিক্ষার্থীদের আড়ালে লুকিয়ে ইসলামী স্টেট কায়েমের স্বপ্ন দেখা চরম ইসলামিক গোষ্ঠী জামাত-শিবির, তাদের গুপ্ত সশস্ত্র জঙ্গী দল এবং তাদের রাজনৈতিক সহযাত্রী দল বি এনপি, কোটা আন্দোলনটিকে পাঁচ তারিখ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। খুব সামান্য মার্জিনে ভীড়ের ভেতর লূকিয়ে থাকা জিহাদী জঙ্গীরা ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করতে পারে নি। একটি প্রশ্ন স্বতঃই মনে জাগছে, বত্রিশ নম্বর বাড়ি এদের এত ভীতির উৎস কেন? কারণ এই যে, এ বাড়ি স্বাধীন বাংলার সূতিকাগার। যেমন ১৯৭১ এ মায়ের জরায়ূতে বেয়নেট ঠুকে ঠুকে লক্ষ লক্ষ নারীকে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনি ৫ ফেব্রুয়ারীর কালরাতে ধানমণ্ডির বত্রিশে, বাংলার জন্মের ঘরে হাতুড়ির ঠকঠক আওয়াজ সারারাত শোনা গেছে। বুলডোজার গর্জে এসে তার বুকের ওপর উঠে পড়েছিল। তারপর দেখা গেলো কিছু ইট কাঠ ও পাথর থেকে বত্রিশের প্রাণ মিশে গেলো বাংলার মাটিতে, দেশ-বিদেশে, স্বাধীন বাংলাকে ভালোবাসা প্রতিটি সন্তানের হৃদপিণ্ডে। বত্রিশের মাটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে গেল বিশ্বময়। কাল এক অন্তহীন গাঢ় অমানিশা ছেয়ে ছিল বাংলাকে।

ধ্বংসপ্রাপ্ত ৩২ নম্বর

ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িটি শরিয়াবাদীদের আমরণ ভীতির উৎস । রাষ্ট্রীয় মদদে জঙ্গী হামলায় ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাদুঘরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং কালেমা লেখা সাদা পতাকা ওড়ানোর অত্যন্ত উদ্বেগজনক কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ছাত্র আন্দোলনের ছদ্মাবরণে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ও করছে। একটি প্রশ্ন স্বতঃই মনে জাগছে, বত্রিশ নম্বর বাড়ি জঙ্গীদের আমরণ ভীতির উৎস কেন? কারণ এই যে এ বাড়ি স্বাধীন বাংলার সূতিকাগার। মায়ের জরায়ূতে বেয়নেট ঠুকে ঠুকে কতো নারীকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ এ। ৫ ফেব্রুয়ারীর কালরাতে ধানমণ্ডির বত্রিশে, বাংলার জন্মের ঘরে হাতুড়ির ঠকঠক আওয়াজ সারারাত শোনা গেছে। বুলডোজার গর্জে এসে তার বুকের ওপর উঠে পড়েছিল। তারপর দেখা গেলো কিছু ইট কাঠ ও পাথর থেকে বত্রিশের প্রাণ মিশে গেলো বাংলার মাটিতে, দেশ-বিদেশে, স্বাধীন বাংলাকে ভালোবাসা প্রতিটি সন্তানের হৃদপিণ্ডে। বত্রিশের মাটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে গেল বিশ্বময়। কাল এক অন্তহীন গাঢ় অমানিশা ছেয়ে ছিল বাংলাকে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে হামলা চোরগুপ্তা শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় গত ৫ ফেব্রয়ারী ৩২ নম্বরে বুলডোজার নিয়ে হামলা, বাড়ি বাড়ি ঐ ভবনের

ইট খুলে নিয়ে যাওয়া এবং অগ্নিসংযোগ শেষে অনেক রাততক আগুন জ্বলছিল বত্রিশে, লক্ষ লক্ষ জনতার বুকে। এ আগুন জ্বলতে থাকুক। প্রধান উপদেষ্টার তরফ থেকে যমুনার টিভির ভাষ্য জানানো হয়েছে: জনগণ অত্যন্ত রেগে আছে তাই এমন ঘটেছে, আট অগাস্ট পর্যন্ত তো কিছু ঘটে নি। জনগণের ব্যক্তিগত সম্পত্তি লুট হচ্ছে, ভাঙ্গা হচ্ছে; রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনাশ করা হচ্ছে। একটা ক্ষমতাসীন সরকার থাকলে এটা হতে পারতো না। সুতরাং বাংলাদেশে বাস্তবে কোনো সরকার নেই। এই নৈরাজ্য ইউনুস সাহেবের প্রতিহিংসার নৈরাজ্য। তবে হিংসাটা আওয়ামী লীগ ও শেখ-হাসিনাকে করতে গিয়ে তিনি গোটা দেশের সেকুলার জনগনকে হিংসা দেখিয়ে চলেছেন। এবং যতদূর বোঝা যাচ্ছে, তিনি ও তার জঙ্গী অনুসারীরা চাইছে, জনগণ নেমে পড়ুক। তাহলে দেখানো সম্ভব বাংলাদেশে যা ঘটছে তা নিছক নিজেদের মধ্যে মারামারি। তখন সরকারকে বৈধ করে নিতে দেশবিদেশের তাবড় তাবড় নেতা এগিয়ে আসবে, ‘ সেভ ইউনুস’ ক্যাম্পেইন নিয়ে। এসব এখন সুদূরপরাহত! মুহাম্মাদ ইউনুসের ভাগ্য তাকে নিয়ে বড়ো হৃদয়বিদারক খেলা খেলিয়ে নিচ্ছে। তার এক সুপ্ত স্বপ্ন ছিলো হয়তো, মুজিবের মতো জাতির পিতা হবার। নোবেল পেয়েছেন না। জাতির পিতার…

তাঁর আর কোনো ভাস্কর্যের জন্য না হোক, অন্য কোনো কৃতির জন্য না হোক, ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামের মুক্তিযুদ্ধের এই স্মারক-ভাস্কর্যটির জন্য সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদকে বাংলাদেশ মনে রাখবে। [ . . .]

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে (অধুনা চারুকলা ইনস্টিটিউট) ভাস্কর্যকলার অধ্যাপক ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। এছাড়াও ছিলেন – এখনো আছেন – অধ্যাপক অলক রায়। এই দুজন স্বনামধন্য ভাস্করের কাছেই আমাদের ভাস্কর্য শিক্ষার হাতেখড়ি। প্রথম বর্ষের একেবারে প্রথমদিকের এক ক্লাসে খালিদ স্যার আমাদের মাটি দিয়ে গোলক তৈরি করতে দিয়েছিলেন, মনে পড়ছে। মনে পড়ছে, সম্ভবত সে-বছরই, ১৯৯৩-এর কোনো একদিন, চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে মেডিকেল কলেজের পূর্ব গেইটের বাইরের এক সাধারণ রেস্তোরাঁয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রের উপস্থিত সবাইকে নিয়ে আড্ডা আর মধ্যাহ্নভোজে শামিল হয়েছিলেন, তিনিই বিল মিটিয়ে দিয়েছিলেন। সে-সময়ে খালিদ স্যার চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের উপদেষ্টা। আরো পিছিয়ে গিয়ে আমাদের কলেজের সাইক্লোস্টাইল-পদ্ধতিতে-ছাপা হাতে-লেখা পত্রিকা ‘প্রবাহ’র কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে, যেটির একটি সংখ্যার শেষ প্রচ্ছদে একবার তাঁর ‘অঙ্কুর’ ভাস্কর্যটির ছবি আমরা ব্যবহার করেছিলাম। আর লজ্জার সঙ্গে এও মনে পড়ছে যে, ভাস্করের নামটি সেদিন সঠিক বানানে আমি লিখতে পারিনি! তাঁর ভাস্কর্য প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ তখন কারো মাধ্যমে আমাদের হাতে এসে পড়েছিল, দারুণভাবে আলোড়িতও করেছিল। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে শেষ দেখা ও কথা গত বছরের (২০১৬) ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে। ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণপর্বকে দীর্ঘ সময় জুড়ে ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন মিশুক মুনীর; সেইসব স্মরণীয় মুহূর্তের সংকলন ‘মন জানালা’র সেদিন ছিল প্রকাশনা অনুষ্ঠান, সিনেট ভবনের সেমিনার কক্ষে। খালিদ স্যার, কুলসুম ভাবী ও তাঁদের এক পুত্র এবং প্রয়াত মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলি কাজী ও একমাত্র পুত্রও সেদিন উপস্থিত ছিলেন। পরে স্যার ও ভাবীকে ঘিরে আমাদের দ্বিতীয় দফা আড্ডা জমেছিল মধুর ক্যান্টিনে। কারো কারো নিশ্চয়ই মনে পড়বে, নব্বইয়ের দশকের এক পহেলা বৈশাখে চট্টগ্রামের ডি.সি. পাহাড়ে তিনি ডাব বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলেন! অস্বাস্থ্যকর-অথচ-বিজ্ঞাপিত পানীয় কোক-পেপসি বিপণনের বিরুদ্ধে সেটা ছিল ‘শিল্পীর প্রতিবাদ’। নিছক খ্যাপামোর বশেই তিনি এ কাজ করেছিলেন – এমনটা ধরে নিলে বোধহয় ভুল করা হবে। যদিও তাঁর স্বভাবে খ্যাপামো ছিল, সহজে রেগে যেতেন কখনো কখনো; নিজের নানা কাজে, আচরণে ও অবস্থানের কারণে নানা সময়ে তিনি বিতর্কের জন্মও দিয়েছেন। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদকে ঘিরে একটি ঘটনা-পরম্পরার কথা শুনেছিলাম নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা ও দেবী শর্মার কাছ থেকে। একবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সোভিয়েত দেশীয় স্মারক-ভাস্কর্যের একটি সচিত্র বই মস্কো থেকে কিনে এনে দ্বিজেন শর্মা একজনের মাধ্যমে উপহার পাঠিয়েছিলেন…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.