একাত্তরের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার ‘একাডেমিক’ আগ্রহ

গত ২১শে ডিসেম্বর বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে ৭১ এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন ঠিক কত লাখ শহীদ হয়েছে সেই নিয়ে বিতর্ক আছে। [..]

গত ২১শে ডিসেম্বর বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন ঠিক কত লাখ শহীদ হয়েছে সেই নিয়ে বিতর্ক আছে। খালেদা জিয়া যে মতাদর্শের রাজনীতি করেন তাতে ৭১- এর শহীদের সংখ্যা তো বটেই, শহীদের ‘সংজ্ঞা’ নিয়েও তাঁর মনে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। যেমন আমাদের বড় ভাই শৈবাল চৌধূরী (চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের পরিচালক)। একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল সাত আট বছর। সে সময়ে শৈবালদার বাবা মা ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে ভারতে চলে যান। যুদ্ধ শেষে তাঁরা নিজেদের বসত বাটিতে ফেরত আসেন বটে, তবে আটজনের বদলে ফেরত আসেন তিনজন। শৈবালদার পাঁচ ভাই বোনই ভারতের শরণার্থী শিবিরে কলেরায় মারা যায়। এই ৫টি হিন্দু শিশুকে কি খালেদা জিয়া ‘শহীদ’ বলে স্বীকার করবেন? আমার তো মনে হয় না। বছর চারেক আগে এক ভারতীয় ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়েছিল (তিনি ৬৫ সালে ফরিদপুর থেকে ভারতে চলে যান)। ৭১ সালে ফরিদপুরে থেকে যাওয়া তাঁর বড় ভাই গ্রামের অন্যান্য লোকজনের সাথে পালাতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে মাটিতে পড়ে যান এবং পলায়নপর জনতার পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মারা যান। এই হিন্দু কৃষককে খালেদা জিয়া শহিদ বলে মানবেন? আমার তা মনে হয় না। আমার স্ত্রীর মেঝ মামা, ৭১-এ কিশোর বয়সী ছিলেন। এপ্রিলের শুরুতে হারিয়ে যান। সেই সাথে তাদের বাড়ির বিহারী দারোয়ানও লাপাত্তা হয়ে যায়। সেই কিশোর আর কখনোই ফিরে আসেনি। এই হারিয়ে যাওয়া কিশোরকে খালেদা জিয়া শহীদ বলে মানবেন? আমার সন্দেহ আছে।

তবে শুধু খালেদা জিয়াও নন, ৭১ এর নিহতের সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের নানা সুধী জনও বেশ ‘একাডেমিক’ আগ্রহ দেখাচ্ছেন (যেমন আফসান চৌধুরী বা অধ্যাপক আমেনা মহসীন)। ডেভিড বার্গম্যানও তাঁর ব্লগে একাত্তরের নিহতের সংখ্যা নিয়ে নানা ‘পণ্ডিতের’ বিভিন্ন লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। কেউ বলছেন ৫৮ হাজার, কেউ বলছেন ২ লাখ ৫৮ হাজার, কেউ বলছেন ৫ লাখ। এইসব বিভিন্ন সংখ্যার সবই ‘বৈজ্ঞানিক’ সত্য, শুধু ৩০ লাখ সংখ্যাটিই ‘বাড়িয়ে’ বলা। তবে সবশেষে এও বলেছেন যে, ৭১ সালে ‘বিপুল’ সংখ্যায় মানুষের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। সন্দেহ যখন নেই, তবে নিহতের ‘প্রকৃত’ সংখ্যা নিয়ে এত বিতং করার কি মানে আছে? মানে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলা। বাংলাদেশে অনেক বিষয়েই (বিশেষ করে ইসলাম) খোলামেলা আলাপ করা ট্যাবু, তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনই ট্যাবু নেই। বাজারের মেয়েমানুষের চরিত্রের মত মুক্তিযুদ্ধ একটা মনগড়া কিছু লিখলেই সেটা নিয়েই নানা ‘একাডেমিক’ আলাপ জমে উঠে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বহুল প্রচারিত ভাষণে ‘জিয়ে পাকিস্তানের’ কোন অস্তিত্ব না থাকলেও মধ্য নব্বইয়ে এসে কেউ কেউ তাঁর ভাষণে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বসিয়ে দেন। এই ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বিতর্কটি ঝিমিয়ে পড়লেও ইদানীংকালে একে খন্দকারের বইয়ের মারফত আবারো আলোচনায় উঠে আসে। জিয়াউর রহমান স্বয়ং নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবী না করলেও ৯০ এর দশকের শুরুতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাঁকে জোর করে স্বাধীনতার ঘোষক বানিয়ে দেয় এবং এই নিয়েও বিভিন্ন মহলে এখনও অহেতুক আলাপ চলে।

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এটুকু বলা যায় যে, কোন দেশের সেনাবাহিনীই ‘মহাসমারোহে গণহত্যা চলিতেছে’ এই জাতীয় ব্যানার লাগিয়ে গণহত্যা করে না। কত লোককে মেরেছে আর কাকে কাকে মেরেছে সেটারও রেজিস্ট্রি খাতায় কোন হিসাব রাখে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা চালানোর সময়েও পাকিস্তান বাহিনীও কোন হিসাব রাখেনি। তবে ৯০ হাজার সৈনিককে ইচ্ছামত হত্যা, ধর্ষণ এবং লুটের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। এদের সহযোগী হিসাবে আরও হাজার পঞ্চাশেক বেসামরিক লোকও এই হত্যা, ধর্ষণ এবং লুটের মহোৎসবে নেমে পড়েছিল। নয় মাস ধরে চলা এই মহোৎসবের ফলাফল হচ্ছে ৩০ লক্ষ নিহত, ২ লক্ষ ধর্ষিতা নারী, ১ কোটি শরণার্থী। সে একই সময়ে প্রায় তিন কোটি মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়িয়েছেন।

পৃথিবীর অন্যান্য গণহত্যার মতো ৭১ এর গণহত্যারও কোন শুমারি নেই। আর সকল গণহত্যার মত ৭১ এর গণহত্যায় নিহতের সংখ্যাও এস্টিমেটের উপরেই নির্ভরশীল। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে হাজার হাজার লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে, মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, শেয়াল কুকুরের খাবারে পরিণত হয়েছে। ভারতে চলে যাওয়া ১ কোটি শরণার্থীর মাঝেও কয়েক লাখ পথে বা শরণার্থী শিবিরে মারা গিয়েছেন। তবে গণহত্যার শুমারি না থাকলেও ৭৪ সালের আদম শুমারির ফলাফল বিশ্লেষণ করলে ৪০-৫০ লক্ষ মানুষের স্বল্পতা দেখা যায়। সেই হিসাবে ৭১ এর ৩০ লক্ষ প্রাণহানির যে এস্টিমেট করা হয়েছিল সেটা সঠিক বলেই প্রমাণ হয়।

১৯১৫ সালে আর্মেনীয় গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ১৫ লক্ষ, হলোকস্টে নিহত হয়েছে ৬০ লক্ষ, ৭১-এ নিহত হয়েছেন ৩০ লক্ষ, কম্বোডিয়ায় ৭০ এর দশকে খেমাররুজদের হাতে নিহত হয়েছেন ২০ লক্ষ, এই সবই হচ্ছে এস্টিমেট। তবে এই এস্টিমেট কোন চাল ডালের হিসাব নয়। নিহতের সংখ্যা এস্টিমেট করে নৃশংসতার একটি চেহারা দাঁড় করানো হয়। হলোকস্ট মানেই নাৎসিদের হাতে নিহত ৬০ লক্ষ মানুষ। সংখ্যাটা ৬ লক্ষ হলেও সেটাও গণহত্যাই থাকে। তবে সংখ্যাটিকে আজ ৬ লক্ষ, কাল ১০ লক্ষ, পরশু ১৫ লক্ষ, এই জাতীয় নানা হিসাব দিলে পুরো হলোকস্টের ব্যাপারটাই সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায়। আর এভাবে নাৎসিদের পাপের বোঝাও হালকা হতে থাকে।

৭০-এর দশকের শেষের দিকে জেনারেল টিক্কা খান পাকিস্তানে ৭১ সালের নিহতের সংখ্যা নিয়ে জেরার মুখে পড়েন। তিনি দাবী করেন ত্রিশ লক্ষ নয়, ‘মাত্র’ ৩৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। এই ৩৫ হাজার কিন্তু কোন এস্টিমেট নয়। তাঁর মনে হয়েছিল ৩৫ হাজার সংখ্যাটি পাকিস্তানকে সহজে গেলানো যাবে। ৭৪ সালের হামুদুর রহমান কমিশনে এই সংখ্যাটি হচ্ছে ২৬ হাজার। আবার ইদানীংকালে পাকিস্তানের পত্র পত্রিকায় বলা হচ্ছে ৩ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। এত বছরে সংখ্যাটি ২৬ হাজার থেকে ৩ লাখে উন্নীত হবার পেছনে কোন ‘একাডেমিক’ গবেষণা নেই। আছে পাকিস্তানের লোকজনের ‘হজমী শক্তির’ উন্নতি। একাত্তরের পর পর তারা ২৬ হাজারের বেশী সংখ্যা হজম করতে পারতো না, ইদানীংকালে ৩ লাখ পর্যন্ত পারে।

একাত্তরে নিহতের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক ‘একাডেমিক’ আগ্রহের মুল বিষয় হচ্ছে পাকিস্তানের হজমী শক্তি নিয়ে তাঁর ব্যাপক সহানুভূতি। এতগুলো বছর তিনি ভাসুরের নাম মুখে আনেননি, বলেছেন ‘হানাদার বাহিনী’, সাম্প্রতিক কালে সাকা মুজাহিদের ফাঁসীতে ভাসুরের দিলে বড় আঘাত লেগেছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বা আর্থিক সমর্থন সেই ভাসুরের কাছ থেকেই আসে, তিনি কিছু না বললে ভাসুরের রাগ আরও বাড়তে পারে।

মোহাম্মদ মুনিম

পেশায় প্রকৌশলী, মাঝে মাঝে নির্মাণ ব্লগে বা ফেসবুকে লেখার অভ্যাস আছে, কেউ পড়েটড়ে না, তারপরও লিখতে ভাল লাগে।

3
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
মাসুদ করিম
সদস্য

আশেপাশের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর খেলায় মেতে উঠেছে উদ্দেশ্য একটাই

আমরা সবাই খা*দা হব
মুক্তিযুদ্ধের *ন মারব

*চিহ্নিত ২টি শব্দই স্ল্যাং হিসেবে বিবেচিত হবে।

মাহতাব
অতিথি
মাহতাব

উনি ব্যাপারটাকে ওনার জন্ম দিনের মত কিছু ভেবেছেন বোধহয়।

নীড় সন্ধানী
সদস্য

আমি খালেদা জিয়ার হিসেবের সমীকরণটা বোঝার চেষ্টা করেছি। হিসেবটা খালেদা জিয়ার ১৯৭১ সালের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রসূত। পাটিগণিতের সুরে বলি- “মনে করি আমি খালেদা জিয়া। আমার স্বামী ছিলেন মেজর জিয়া। ১৯৭১ সালে তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহ অধিনায়ক। যিনি বিদ্রোহ করে অধিনায়ক কর্নেল জানজুয়াকে ‘গ্রেফতার’ করেন(গ্রেফতার করে কোথায় রেখেছিলেন সেটা কেউ জানে না, দুই দশক পরে অবশ্য তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন) এবং আমাকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে পাক বাহিনীর কাছে রেখে তার বাহিনী নিয়ে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করে শহর ছেড়ে নদী পেরিয়ে পাহাড়ের কোলে নিরাপদ অঞ্চলে পাড়ি জমান। আর দুর্ভাগা আমি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে মে মাস পর্যন্ত বন্দী কিন্তু অক্ষত থেকে একসময়… বাকিটুকু পড়ুন »

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.