বাংলাদেশে সদ্য জনপরিসরে উন্মোচিত “বাংলাদেশ সনদ” আন্দোলনের অঙ্গীকারনামায় “সমাজতন্ত্র” শব্দটির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতদিন বিতর্ক জারী ছিল, এখন আচমকা বিজ্ঞ জনসমাজ সমাজতন্ত্র বিষয়ে উদ্যোক্তাদের নিয়ত কি সে প্রশ্ন করছেন । কেউ এটিকে আকস্মিক বিয়োজন ধরে নিয়েছেন। কেউ আবার এটির অনুল্লেখ আদর্শিক বিচ্যুতি বলেও মনে করছেন। যা স্বাভাবিক। কিন্তু এই অনুল্লেখ একটি বড়ো কাজ করে ফেলেছে। আচমকা জনপরিসরে চলমান মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে নিয়ে ভাবছে না, তার চেয়ে বেশি ”সমাজতন্ত্র” ধারণাটি নিয়ে মানুষ নাড়াচাড়া শুরু করেছে। https://www.bangladeshcharter.org/our-journey/ এ প্রসঙ্গে বাংলার গত শতাব্দীর ইতিহাস নিয়েও একটু নাড়াচাড়া করা যাক। কি বলেন? ইতিহাস কি জানায় আমাদের? ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত জানায় যে—সমাজতন্ত্র এই বাংলায় হঠাৎ নাজেল হওয়া কোনো চেতনা নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, শ্রেণীগত বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক চেতনা, যা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম একটি মূলনীতি। ভুললে চলবে না যে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের অন্যতম কারণ।১৯৬০-এর দশকের পূর্ব-পাকিস্তান ছিল গভীরভাবে অসাম্য চর্চার এক রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সমাজ ছিল আশরাফ-আতরাফ, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ, এ জাতীয় নানা স্তরে বিভক্ত। এর মধ্যে

জনসাধারণের বিপুল অংশ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন কৃষিসমাজের জনগণ। আশরাফ মুসলমান চালিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মদদে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলা অসাম্যের ছোবলে সমাজ ক্ষত-বিক্ষত ছিল। একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পুঁজি সঞ্চিত হচ্ছিল। পুঁজি আসতো পূর্বাঞ্চল থেকে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব-বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর কাঠামোগত বঞ্চনা ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছিল। পাট, কৃষি ও শ্রমশক্তি থেকে উৎপন্ন সম্পদ চলে যেত কেন্দ্রের ( পশ্চিমাঞ্চলের) দিকে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উন্নয়ন আসতো না পূর্ব-বাংলায়। এই বাস্তবতায় “শ্রেণী” কোনো তাত্ত্বিক শব্দ ছিল না—এটি ছিল বাংলার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন যে নেতৃত্ব, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলায় যিনি স্বদেশের জনগণের ”বঙ্গবন্ধু” ডাকের ভেতর দিয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার দলীয় ৬ দফা কেবলমাত্র সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। এর ভেতরে ছিল অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের দাবি। রাজস্ব, মুদ্রানীতি, বাণিজ্য—সবকিছুর ওপর আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। অর্থাৎ, এক ধরণের অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা তিনি ভেবেছেন, যা সরাসরি…

আগের সংকটগুলো ক্ষমতা বদলের লড়াই ছিল; ২০২৪ হলো রাষ্ট্র, ইতিহাস ও নাগরিক স্মৃতিকে নতুন করে লেখার চেষ্টা। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার সরকার বদলেছে, আন্দোলন হয়েছে, ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টেছে। কিন্তু ২০২৪ সাল সেই তালিকায় আরেকটি সংখ্যা নয়। এটি এমন এক সময়, যখন রাষ্ট্র শুধু শাসক বদলাতে নয়—নিজের স্মৃতি, আইন এবং নাগরিক পরিচয় বদলে পিচিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রশ্নটি আর কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নয়; প্রশ্নটি হলো— ১৯৭১ এ জনযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা তিরিশ লাখ শহীদের ত্যাগের মাধ্যমে অর্জন করেছি বাংলাদেশ। এ অর্জন ধর্মের কলকাঠি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন পর্যুদস্ত করার ১৯৪৭ এর অপ-প্রয়াসের বিরুদ্ধে, দ্বিজাতি-তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, সমানাধিকারের পথে, সাম্যের পথে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে বাংলার জনপদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, এবং বিশ্ব দরবারে মহতী জাতিরূপে স্থান করে দেয়ার কর্মযজ্ঞের পক্ষে। তাই প্রশ্ন কোন্ ধরণের রাষ্ট্র টিকে থাকবে? মুক্তিযুদ্ধের চৈতন্যবাহী জনগণের ও তাদের নেতৃত্বের ঐক্য এই প্রশ্নের সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতির সূচনা স্বাধীনতার পরপরই, ১৯৭২ সালে। তবে স্বাধীনতার প্রথম দশকে গঠিত রাজনৈতিক জোটগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। জোট রাজনীতির বাস্তব ও কার্যকর রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যায় মূলতঃ জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সময় থেকে। ১৯৮৮ সালের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮-দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট, বাম দলগুলোর নেতৃত্বে ৫-দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। একই সময়ে ছাত্রসমাজ ২২-দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই সম্মিলিত আন্দোলনের চাপে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের রূপরেখা বাস্তবায়নে তারা আগ্রহ দেখায়নি। বরং কয়েকটি উপ-নির্বাচন সরকারি ছত্রছায়ায় এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে যে ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জীবন রক্ষার্থে এলাকা ত্যাগে বাধ্য হন। এর পরিণতিতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে প্রায় সব রাজনৈতিক দল আবারও আন্দোলনে নামে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের একতরফা ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে

‘জনতার মঞ্চ’ ব্যানারে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। জাতীয় পার্টি ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ এবং জামায়াতে ইসলামী ‘কেয়ারটেকার মঞ্চ’ গঠন করে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত দেড় মাসের মাথায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সরকারের শেষের দিকে ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চার দলীয় জোট গঠিত হয় ( বিএনপি , জাতীয় পার্টি , জামায়াতে ইসলামী , এবং ইসলামী ঐক্যজোট )। তবে কিছুদিনের মধ্যে এরশাদের জাতীয় পার্টি চার দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলে নাজিউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটা অংশ চার দলীয় জোটে থেকে যায় । ঐ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বা বাম দলগুলোর নেতৃত্বে তেমন কার্যকরি কোন জোট না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। পরিণতিতে রাষ্ট্র ও সমাজ এক গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা…

বলা হয়ে থাকে, স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত পথে না এগুনোর একটি অন্যতম কারণ, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ‘ভুল বোঝাবুঝি।’

বলা হয়ে থাকে, স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত পথে না এগুনোর একটি অন্যতম কারণ, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ‘ভুল বোঝাবুঝি।’ বিশেষ করে সুশীল বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে অহরহ এই ‘ভুল বোঝাবুঝি’র কথা এতভাবে বলা হয় যে, ইতিমধ্যে তা যেন প্রস্তরীভূত সত্যে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ঘটনার সমাবেশ এমনভাবে ঘটানো হয় যাতে পাঠক কিংবা শ্রোতারা নিজ দায়িত্বেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, আসলে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই শেষ অব্দি তাঁদের সম্পর্ক এমন করুণ পরিণতি পায়। ব্যাপারটি দাঁড়ায় এরকম, বঙ্গবন্ধু নিজেই এক ট্র্যাজিক হিরো, কিন্তু তাঁর সেই ট্র্যাজেডি তাজউদ্দীনকেও গ্রাস করে বঙ্গবন্ধুরই কারণে! কিন্তু সত্যিই কি তাই? সংশয় নিয়েই বলি, এ ব্যাপারে অন্তত আমার সংশয় রয়েছে। বিভিন্ন আলাপ-পঠন-অনুসন্ধানে এই সংশয় আরো জোরদার হয়েছে। জোর দিয়েই বলা যায়, বিভিন্ন মিসিং লিংক থাকলেও মুজিবের সঙ্গে তাজউদ্দীনের দূরত্ব দেখা দেয়ার বেশ কিছু ধারালো যুক্তিসংগত দিক আমাদের সামনে ঘোরাফেরা করছে। যদিও সুশীল বুদ্ধিজীবী-গবেষকগণ এগুলো দেখেও না দেখার ভান করছেন বলে মনে হয়। এরকম কিছু দিক সম্পর্কেই এ লেখায় আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করছি, এগুলো সম্পর্কে সকলে মতামত দিয়ে আমাকে সমৃদ্ধ হতে ও সংশয় কাটিয়ে উঠে নতুন কোনো সংশয় ও প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবেন। ব্লগ বলেই আমি চেষ্টা করছি, সংক্ষেপে ধারণাগুলো তুলে ধরতে, যাতে আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি না ঘটে। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি : তাজউদ্দীন আহমদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নয়, বরং একবার পিছে ফিরে দেখা যাক, পূর্ব বাংলাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে পরিণত করার স্থির লক্ষ্যে সত্যিই কারা সাংগঠনিকভাবে দীর্ঘ দিন ধৈর্য ধরে কাজ করে গেছেন। কেননা তাত্ত্বিকভাবে ঘরোয়া পরিবেশে সমমনাদের মধ্যে কিংবা পার্টিফোরামে কথা বলা, কথার পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলা, হঠাৎ করে প্রকাশ্যে ‘আচ্ছালামু আলাইকুম’ বলা কিংবা ‘স্বাধীনতা চাই’ বলে ওঠা এক ব্যাপার, আর বছরের পর বছর ধরে নিরন্তরভাবে এ লক্ষ্যে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানো আরেক ব্যাপার। এতে কোনো সংশয় নেই, অনেকেই স্বাধীনতার প্রত্যাশা করতেন; কিন্তু স্বাধীনতার লক্ষ্য স্থির করে ধৈর্য ধরে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়েছেন বোধকরি মাত্র তিনজন ব্যক্তি : শেখ মুজিবুর রহমান, সিরাজুল আলম খান এবং সিরাজ শিকদার। এদের মধ্যে একপর্বে…

পিটার কাস্টারসের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নেমে এসেছিল স্বাধীন বাংলাদেশে, যে দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য সব কিছু তিনি ছেড়ে এসেছিলেন। জেনারেল জিয়া ঢাকা কারাগারের অভ্যন্তরে গোপন মার্শাল ল ট্রাইব্যুনালে প্রহসনের বিচার শুরু করে কর্নেল তাহেরসহ অনেকের বিরুদ্ধে। পিটার কাস্টার্সকেও গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হল। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা সাজানো হল তাঁর বিরুদ্ধে।

  কাটা বেঁছে কই মাছ খাওয়া আমাদের বাঙালিদের জন্যও সহজ কাজ নয়। এই ৬৬ বছর বয়সে কই মাছের দোপেয়াজা খেতে গিয়ে তা আবার মনে হলো। মন চলে গেল ৪১ বছর আগে, যখন আমার বয়সী পিটার কাস্টারসের সাথে পরিচয় হয়েছিল। ঢাকার একেবারে সাধারণ একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খাব আমরা। পিটারই এখানে আমাকে নিয়ে এসেছেন। ভাত আর কই মাছের ঝোল তিনিই অর্ডার করেছেন। ‘কাটা বেঁছে আপনি খেতে পারবেন?’ পিটারের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হলো। ‘চিন্তা নাই, ভালই পারি।’ অবাক হয়ে লক্ষ্য করি কি নিপুণ হাতে কাটা বেঁছে পিটার বাঙালির ভাত-মাছ খেলেন গভীর পরিতৃপ্তি নিয়ে। ‘পেট ঠিক থাকবে তো?’ আবারো পিটারের মুখে হাসি। ‘বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে এত ঘুরেছি, কত রকমের খাবার খেয়েছি। এখন আর সমস্যা হয় না। আপনাদের একটা প্রবাদ আছে না, “শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহাও তাহাই সয়।” আমারও সয়ে গেছে। কই মাছ আমার খুব প্রিয়।’ সমবয়সী আমরা বন্ধুর মতই ছিলাম। তারপরও আমাকে আপনি বলতেন পিটার। যতদূর মনে আছে, সবাইকে আপনি বলতেন। গায়ে সুতির পাজাম-পাঞ্জাবি পায়ে সাধারণ চপ্পল। এমন পোশাকেই দেখা যেত পিটারকে। ফর্সা পা মশার কামড়ে লাল হয়ে আছে। ‘ঘরে মশারি টানান না?’ ‘দেখুন গ্রামের গরিব মানুষের মশারি কিনবার সামর্থ্য নেই। আর আপনাদের দেশে মশার কামড়ে এখন আর ম্যালেরিয়া হয় না। তাই মশারি ব্যবহার করি না।’ পিটারের কথা শুনে স্তম্ভিত হই। বর্ষার পানিতে ভিজে ভিজে তাঁর খোলা পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে ঘা হয়েছে। পিটার দেখেছেন ক্ষেতে-খামারে কাঁদা মাটিতে কাজ করা গ্রামের গরিবদের পায়ে এমন ঘা। ‘সস্তা কোন ওষুধ নেই এই ঘা সারাতে?’ পিটারের এ প্রশ্নের উত্তরে জানাই পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট গুলিয়ে লাগালে সারতে পারে। তুত ডলে দিলেও কাজ হয়। তবে তা তো সব সময় পাওয়া যায় না। দিনকয় পরে তাঁর সাথে দেখা। ফর্সা পা রঙিন হয়ে আছে। উজ্জ্বল হাঁসি পিটারের মুখে। ‘দারুণ কাজে লেগেছে আপনার পরামর্শ। পারমাঙ্গানেটের রং লেগে থাকলেও ঘা ভাল হয়ে গেছে। ঠিক করেছি, এবার গ্রামে যাবার সময় পটাশিয়াম পারমাঙ্গানেট কিনে নিয়ে যাব। গরীবদের খুব কাজে লাগবে।’ গত ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০১৫ তারিখে নিজ দেশ হল্যান্ডের লেইডেনে তার বাড়িতে পিটার কাস্টারস ইহধাম ত্যাগ করেছেন। তারপর থেকে কতবার বসেছি তাঁর উপর কিছু লিখবো বলে।…

সব মিলিয়ে জেগে উঠুন বিস্মৃতির কৃষ্ণচক্র থেকে তাজউদ্দীন, তাঁর প্রবাসে বসেও বাংলাদেশের সময়মাখা হাতঘড়ি নিয়ে, তাঁর পরিবারের কাছ থেকে দূরে দেশের জন্যে আত্মনিয়োগের চিরকুট নিয়ে, তাঁর সুপ্রিম লিডারের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান ও আনুগত্য নিয়ে, তাঁর লক্ষ্যাভিমুখিন দৃঢ়কঠিন সংকল্প নিয়ে, তাঁর ষড়যন্ত্র ছিন্ন করার ক্ষুরধার বুদ্ধি ও মেধা নিয়ে, তাঁর ট্র্যাজিক ভবিষ্যদ্বাণীর অমোঘ ক্ষমতা নিয়ে, তাঁর নিঃস্বার্থ দানের ও অবদানের উদারতম হৃদয় নিয়ে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের প্রজন্মের যে তাঁর কাছ থেকে এখনো অনেক কিছু শেখার আছে এখনো, চিরযুগজন্ম ধরে। [. . .]

অনাগত সন্তানের বা গর্ভজাত শিশু নিয়ে আশা বা শঙ্কাময় ভবিষ্যদ্বাণীর কথা পৌরাণিক, তবে অনাগত শিল্পকর্ম সম্পর্কে পূর্বাহ্ণে জ্ঞাত হলে দুচারটে কথা বলাই যেতে পারে। অনুভূতিটা এক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ অনন্য ও অদ্ভুত। তবে, দেয়ার ইজ অলোয়েজ আ ফর্স্ট টাইম ইন লাইফ। ঠিক মনে নেই আমি সুহানের লেখা আগে পড়ি নাকি দেখি ছেলেটাকে। পাপিষ্ঠ বোলগার হওয়ার সূত্রে তার লেখালেখি পড়া হয়েছে অনেক, এমনকি তার ব্যক্তিগত ব্লগস্পটেও এসেছি ঘুরে। তার সহপাঠীদের ভেতর কেউ কেউ আমার ছাত্র হওয়ায় ছেলেটা কখনো কখনো আমায় ডাকে স্যার, কখনো দাদা। এই দ্বিবাচিক সম্বোধনে ঘুরপাক খেতে খেতে একদিন জেনে যাই, সে একটি ফেসবুক গ্রুপেরও জন্মদাতা, যৌথখামারি হিসেবে। বইপড়ুয়া নামের এই দলটার সাথে আমারও জড়িয়ে আছে অনেক তিক্তমধুর সম্পর্ক, অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা, অনেক স্মৃতিবর্ণিলতা। কিন্তু, সুহানের সাথে সম্পর্কটা বরাবরই মাধুর্য বা সৌহার্দ্যের সীমারেখায় আটকেছে, বাইরে আসে নি বিশেষ। নিজস্ব মতামতে অকুণ্ঠ অথচ বিনয়ী, কৌতূহলী, মেধাবী (আবশ্যিকভাবে দরিদ্র নয়) ও প্রেমিক যুবাটি অনেকেরই প্রিয়মুখ, ধারণা করি। সুহান গল্প লেখে, সুহান ক্রীড়াপ্রেমিক বিধায় খেলা নিয়ে লেখে, একাত্তর টিভিতে ক্রীড়াযোগে সে যোগও দিয়ে তার সহাস্য চেহারা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপনের ঈর্ষাঙ্কিত সুযোগ পায়, সুহান বই নিয়ে লেখে। তবে এতোকিছুর ভেতর উজ্জ্বল উপস্থিতি উঠে আসে একাত্তর নিয়ে তার ছোটোগল্পগুলোয়। মুনতাসীর মামুন নাকি ভাবতেন, হুমায়ূনের এক মিসির আলী নিয়ে লেখালেখিগুলোই টিকে যাবে। আমিও ভাবি, সুহান ভবিষ্যতে কী করে বসবে জানি না, তবে তার লেখনিসঞ্চয় হিসেবে এসব ছোটোগল্পগুলো টিকে যাবে এবং অনেকের হৃদয়ে জ্বালিয়ে রাখবে শিখা অনির্বাণ বা নামাবে নায়াগ্রার চাইতেও বেশি দেশপ্রেমের প্রপাত। সুহানকে আমি একাধিকবার অনুরোধ করেছি তার এসব গল্প নিয়ে এবং আরো কিছু বেশি লিখে একটা বই বের করার জন্যে, দেশের বড় কাজ হবে সেটাও। কিন্তু, সে বরাবরই হাসিমুখে এড়িয়ে গেছে তার মুকুটময় ম্যাগনাম ওপুসের কথা তুলে, আমারো কথা গেছে আটকে। এবার এই সুবাদে তাকে আবারো মনে করিয়ে দিলাম সেই গল্পগ্রন্থের প্রস্তাবটি। দীর্ঘদিন ধরে সুহান কাঁধে ব্যাকপ্যাক চাপিয়ে ও হৃদয়ের দাঁতে দাঁত চেপে পথ ও পাথেয় খুঁজে বেড়িয়েছে তার সাহিত্যজগতে অভ্যুদয়ের ও অভ্যুত্থানের গুরুভার ও গুরুত্বপূর্ণ ফসলটি তৈরির কাজে। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে শাহবাগের গণগ্রন্থাগার, মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর থেকে তাজউদ্দীন আহমেদ পাঠচক্র, ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ব্যক্তিগত স্মৃতি, সবখানে…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.