বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূল স্তম্ভের একটি হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতা। এই “নিরপেক্ষতা” নিয়ে কয়েকটি ভুল ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে গত ৫৪ বছরে। এগুলো মোটা দাগে পাঁচ প্রকার: ১) ধর্ম নিরপেক্ষতা বলতে ধর্ম নিয়ে ব্যবসায় করা একটি পক্ষ সবসময় এটাকে ধর্মহীনতা বলতে চেয়েছে, এবং আওয়ামী লীগকে নাস্তিকদের দল হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ২) ধর্মের গুরুত্ব বুঝতে সচরাচর বাংলাদেশকে ৯০ কিংবা ৯৫% মুসলমানের দেশ বলে অন্য ধর্মের লোক বিশেষ করে হিন্দুদের উপর একটা মানসিক চাপ তৈরি করা হয়েছে। এর পিছনে রয়েছে সেই একই পাকিস্তান-পন্থী উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী। ৩) ধর্মকে ব্যবহার করে মসজিদ মাদ্রাসার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, হজ্জের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সহ তুর্কি এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে “আদম” ব্যবসার রাস্তা তৈরি, যাকাত-সদকার টাকা নিজেদের মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে ভাগ করা এবং বিদেশে পাচার করা, এবং ইসলামিক ব্যাঙ্কিং এর মাধ্যমে নিজেদের মতাদর্শের লোকদের ব্যবসায় কার্যক্রম প্রসারিত করেছে জামাতে ইসলামি এবং সমমনা ধর্ম-ভিত্তিক দল। ৪) ইসলাম ধর্ম থেকে আলাদা করার জন্যই হিন্দু-প্রধান দেশ ভারত বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। ৫) নারীর কাজ ঘরের মধ্যে। সামাজিক কাজে নারীর অংশগ্রহণের

কোনো সুযোগ নেই। নারী নেতৃত্ব ততক্ষণই ভালো যতক্ষণ এটাকে ব্যবহার করে (রাজনৈতিক) ফায়দা আদায় করা যায়। ধর্মের ব্যবহার করেই ৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশের সংবিধানে সংযোজন এবং ধর্ম-ভিত্তিক দলগুলোকে “রাষ্ট্রদ্রোহিতা” সত্ত্বেও বাংলাদেশে রাজনীতির অনুমতি দেয়া হয়। সাথে সাথে আওয়ামী লীগকে শুধু ইসলাম ধর্মবিরোধীই না, বরং সকল ধর্মের বিপক্ষে একটা নাস্তিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ এই আওয়ামী লীগ ধর্মীয় নিপরপেক্ষতা পুরোপুরি ধরে রাখতে না পারলেও, বাংলাদেশী মুসলমানদের উপকারে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। নারীর ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করা শেখ হাসিনাকে জুলাইয়ের রেজিম পরিবর্তনে নারী বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসুন কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করি। (সব ভুল আমার। কোনো তথ্য সংযোজন করা দরকার মনে করলে আমাকে পাঠাবেন। ইচ্ছা করেই ৫০০ এর অধিক মসজিদ প্রকল্পের তথ্য সংযোজন করা হয়নি।) আওয়ামী লীগ নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নীতি নির্ধারণে তারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান দেওয়া এবং নারীর অধিকার ও শিক্ষায় প্রগতিশীল সংস্কার – এই দুয়ের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্য বজায় রাখে। ১. বঙ্গবন্ধু…

আগের সংকটগুলো ক্ষমতা বদলের লড়াই ছিল; ২০২৪ হলো রাষ্ট্র, ইতিহাস ও নাগরিক স্মৃতিকে নতুন করে লেখার চেষ্টা। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার সরকার বদলেছে, আন্দোলন হয়েছে, ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টেছে। কিন্তু ২০২৪ সাল সেই তালিকায় আরেকটি সংখ্যা নয়। এটি এমন এক সময়, যখন রাষ্ট্র শুধু শাসক বদলাতে নয়—নিজের স্মৃতি, আইন এবং নাগরিক পরিচয় বদলে পিচিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রশ্নটি আর কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নয়; প্রশ্নটি হলো— ১৯৭১ এ জনযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা তিরিশ লাখ শহীদের ত্যাগের মাধ্যমে অর্জন করেছি বাংলাদেশ। এ অর্জন ধর্মের কলকাঠি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন পর্যুদস্ত করার ১৯৪৭ এর অপ-প্রয়াসের বিরুদ্ধে, দ্বিজাতি-তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, সমানাধিকারের পথে, সাম্যের পথে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে বাংলার জনপদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, এবং বিশ্ব দরবারে মহতী জাতিরূপে স্থান করে দেয়ার কর্মযজ্ঞের পক্ষে। তাই প্রশ্ন কোন্ ধরণের রাষ্ট্র টিকে থাকবে? মুক্তিযুদ্ধের চৈতন্যবাহী জনগণের ও তাদের নেতৃত্বের ঐক্য এই প্রশ্নের সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতির সূচনা স্বাধীনতার পরপরই, ১৯৭২ সালে। তবে স্বাধীনতার প্রথম দশকে গঠিত রাজনৈতিক জোটগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। জোট রাজনীতির বাস্তব ও কার্যকর রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যায় মূলতঃ জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সময় থেকে। ১৯৮৮ সালের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮-দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট, বাম দলগুলোর নেতৃত্বে ৫-দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। একই সময়ে ছাত্রসমাজ ২২-দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই সম্মিলিত আন্দোলনের চাপে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের রূপরেখা বাস্তবায়নে তারা আগ্রহ দেখায়নি। বরং কয়েকটি উপ-নির্বাচন সরকারি ছত্রছায়ায় এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে যে ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জীবন রক্ষার্থে এলাকা ত্যাগে বাধ্য হন। এর পরিণতিতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে প্রায় সব রাজনৈতিক দল আবারও আন্দোলনে নামে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের একতরফা ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে

‘জনতার মঞ্চ’ ব্যানারে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। জাতীয় পার্টি ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ এবং জামায়াতে ইসলামী ‘কেয়ারটেকার মঞ্চ’ গঠন করে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত দেড় মাসের মাথায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সরকারের শেষের দিকে ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চার দলীয় জোট গঠিত হয় ( বিএনপি , জাতীয় পার্টি , জামায়াতে ইসলামী , এবং ইসলামী ঐক্যজোট )। তবে কিছুদিনের মধ্যে এরশাদের জাতীয় পার্টি চার দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলে নাজিউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটা অংশ চার দলীয় জোটে থেকে যায় । ঐ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বা বাম দলগুলোর নেতৃত্বে তেমন কার্যকরি কোন জোট না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। পরিণতিতে রাষ্ট্র ও সমাজ এক গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.