মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। এই আঘাত ছিল পরিকল্পিত। একাত্তরকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র — এবং তা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়-এখনও চলছে। প্রতিরোধ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। প্রতিরোধ চেতনা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, ও এই ধারাবাহিকতায় "বাংলাদেশ সনদ" একটি বৌদ্ধিক আন্দোলন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতীয়তাবাদ বিষয়ে সনদের অঙ্গীকার এই যে - "বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদ, যা এই ভূখণ্ডের সকল মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদায় ধারণ করে — যা আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তি — যা গণহত্যাসহ অতীতের সকল বঞ্চনা ও অবিচারের অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে জাতীয় সংহতি ও জাতি গঠনে পথ দেখাবে।"

বাঙালির ইতিহাস যেমন পুরোনো, তেমনি গৌরবোজ্জ্বল।

বাংলায় মানব বসতির সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে কমপক্ষে দশ হাজার বছর পূর্বে। বাঙালি জাতির দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাঙালির উৎস নিয়ে নানাবিধ মতবাদ থাকলেও অনেকের মতে, বাঙালির আদি জনগোষ্ঠী অস্ট্রোএশিয়াটিক বা অস্ট্রিক জাতিভুক্ত।

আর্যপূর্ব যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আসতে বাঙালিকে অসংখ্য চড়াইউতরাই পার হতে হয়েছে। আর্যদের ভারতবর্ষে আগমন ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছরের কাছাকাছি। নানাবিধ কারণে বাংলার অধিবাসীদের সাথে আর্যদের কোন নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। 

গ্রীক বীর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে (খ্রি. পূ. ৩২৭ অব্দে) ভারতবর্ষে এসে উত্তর ভারতের বিপাশা নদ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা দখল করতে সাহস দেখাননি। প্রসঙ্গত, পন্ডিত ডিওডোরাস প্রাচীন বাংলার শক্তিশালী রাজ্যের পরিচয় দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন:
ভারতবর্ষে বহুজাতির বাস। তন্মধ্যে গঙ্গারিড্ডির জাতি সর্বশ্রেষ্ঠ। ইহাদের চারি সহস্র বৃহত্কায় সুসজ্জিত রণহস্তী আছে। এই জন্য অপর কোন রাজা এই দেশ জয় করিতে পারে নাই। স্বয়ং আলেকজান্ডারও এই সমুদয় হস্তীর বিবরণ শুনিয়া এই জাতিকে পরাস্ত করিবার দুরাশা ত্যাগ করেন।

আলেকজান্ডারের প্রস্থানের পর থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত দুই হাজার বছরের ইতিহাসে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, পাঠান, মোগল, ইংরেজ প্রভৃতি জাতি বাংলা শাসন করেছে। মজার ব্যাপার হল, এই সময়ে বাঙালিরাও বাংলাকে শাসন করেছে। কিংবদন্তি অনুসারে বা কিছু মতবাদ অনুযায়ী, রাজা নন্দ বাঙালি ছিলেন।অনেকের ধারণা, গুপ্তগণও বাঙালি ছিলেন। শশাঙ্ক এবং পালগণ নিশ্চিতভাবেই বাঙালি ছিলেন। কিন্তু কেউই বাঙালিকে স্বাধীন বা সার্বভৌম রাখার চিন্তা করেননি — বা করার সুযোগ পাননি। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত না হওয়াও অন্যতম প্রধান কারণ।

বাঙালির সেই জাতীয়তাবোধ কিন্তু একদিনে জাগ্রত হয়নি। বাঙালির আদি থেকে আজতক সাহিত্য মানুষের যে দুঃখ ও সুখ চিত্রায়ণ ঘটেছে তার একটা ব্যাপক পরিমণ্ডলে এই যুক্তি অহরহ দেখা যায় যে, তার স্থানিক ও এথনিক দুই পরিচয় মিলে এই জনপদ নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। তার ভাষা যেমন আদৃত হয়েছে তেমনি তার এথনিক বৈচিত্র্য ও মিলিত বৈশিষ্ট্য বহিরাগতদের কাছে অপমানেরও শিকার হয়েছে।

আঠারোউনিশ শতকের সাহিত্য ও দলিলাদি, উদাহরণস্বরূপ, বঙ্কিমের আনন্দমঠথেকে রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা‘ — যাবতীয় সাহিত্য ও সাহিত্য নয় এমন দলিলদস্তাবেজ পড়লে এ উপলব্দি হয় ।
১৯০৫ সালের আগে ইংরেজী খেদাও আন্দোলন ও পরে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে হিন্দুমুসলিম মিলে বাংলার ভূখণ্ডকে প্রাধান্য দিয়েছিল। কিন্তু এসব সংগ্রাম, ও পশ্চাত চেতনা ছিল বিক্ষিপ্ত, আংশিক ও স্থানিক বিস্ফোরণমাত্র। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতপাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পূর্ব বাংলায় ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যে আন্দোলন একটি বৃক্ষরূপে বিকশিত হয়ে ওঠে এবং ১৯৫২ মধ্য দিয়ে, তা পূর্ণ, ব্যাপক ও গভীরতর বোধ ও সংগ্রামের রূপ ধারণ করে পরিপক্ক ষাট ও সত্তরের দশকে।

জামায়াতে ইসলামসহ আরও কিছু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আজও প্রচারণা চালায় যে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। কিন্তু এই প্রচারণা সত্য নয়। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশ হয়েছে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে — যা মূলত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বা রিলিজন বেজড ন্যাশনালিজম)

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ শুরু থেকেই পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু ঘোষণা করা হলে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ভাষা সংস্কৃতি ও রাজনীতির পথ পরিক্রমায় জাতীয়তাবোধে একত্র হওয়ার সচেতনতা বিকশিত হতে থাকে।

ইতিহাসের দীর্ঘ ক্যানভাসে এবার বাঙালি তার আত্মপরিচয়ের সম্পূর্ণ চিত্র দেখতে পায়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকবর্গ পূর্ব বাংলার ভাষা ও হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস করতে তৎপর হয়। ফলে শুরু হয় স্বাধিকার থেকে স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম।

এই সংগ্রাম কঠিন ও দীর্ঘায়িত হয়েছে বাংলাভাষী কিছু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দালালির কারণে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই আন্দোলনে অনেকে সহযোগিতা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে এটি অনস্বীকার্য যে দীর্ঘ এই কঠিন আন্দোলনে সকল বাধা, লোভলালসা, ঝড়জাপাতা উপেক্ষা করে বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বকীয়তা ও জাতীয়তাবোধের আকাঙ্ক্ষাকে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন যে মানুষটি — তিনিই আমাদের জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় সত্ত্বাকে সমুন্নত রাখতে ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশের সংবিধানের মূলস্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর আজ পর্যন্ত বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূল নীতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর। এই আঘাতের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানের জান্তা সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য পাকিস্তানআনুগত্যকারী দলগুলো নিয়ে একটি বেসামরিক প্রাদেশিক সরকার গঠন করেছিল। জামায়াতে ইসলামীর দুই সদস্য (শিক্ষা মন্ত্রী আব্বাস আলী খান ও রাজস্ব মন্ত্রী মাওলানা এ কে এম ইউসুফ) মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। এ উপলক্ষে ১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের তৎকালীন আমির গোলাম আজম অভিযোগকারীদের মতে বলেছিলেন:জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মেনে নিতে রাজি নন। জামায়াতের কর্মীরা শাহাদত বরণ করে পাকিস্তানের দুশমনদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা মরতে রাজি, তবুও পাকিস্তানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করতে রাজি নয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, গোলাম আজম আরও বলেছিলেন,
যে উদ্দেশ্য নিয়ে জামায়াত রাজাকার বাহিনীতে লোক পাঠিয়েছে, শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছে — একই উদ্দেশে মন্ত্রিসভায় লোক পাঠিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর তাদের সেই মিশন শুরু হয়।

প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ছাত্রজনতা অনেক শ্লোগান দিয়েছিল। একটি শ্লোগানের কথা আজও মনে পড়ে:
জাগো জাগো বাঙালি জাগো।
সেদিন কেউ বলেনি
জাগো জাগো মুসলমান জাগোবা হিন্দু জাগো“, কিংবা জাগো জাগো বাংলাদেশ জাগো। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই স্লোগানের ভাষা ছিল — জাগো জাগো বাঙালি জাগো।

তবে আলোচনার এই পর্বে বাহাত্তরের সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে এ পর্যন্ত কী কাটাছেঁড়া হয়েছে — আজ কী অবস্থায় আছে — সে দিকটার ওপর আলোকপাত করা দরকার।
সংবিধানের নাগরিকত্ব ও জাতীয়তাবাদ: ধারাবাহিক পরিবর্তন
বাহাত্তরের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ (নাগরিকত্ব) এর () দফায় বলা হয়েছিল:”বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।
অনুচ্ছেদ ৯ (জাতীয়তাবাদ) –এ বলা হয়েছিল:
ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন — সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।
লক্ষণীয়: বাহাত্তরের সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশের মানুষ নাগরিকত্বের পরিচয়ে বাঙালি, জাতীয়তাবাদের পরিচয়েও বাঙালি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, ১৯৭৬ সালের ২৩ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম কর্তৃক দ্বিতীয় ফরমান (চতুর্থ সংশোধনী) জারির মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬এরবাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া বিবেচিত হইবেনবিধান অবলুপ্ত হয়। বিচারপতি সায়েম অনুচ্ছেদ ৯ (জাতীয়তাবাদ)-এ হাত দেননি। ফলে জাতীয়তাবাদ বাঙালিই রইল, কিন্তু নাগরিকত্বের পরিচয়টি সংবিধানিকভাবে আর বাঙালি রইল না — তবে বাংলাদেশীও হয়ে যায়নি (বিধান অবলুপ্ত হলেও অন্য কিছু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি)

১৯৭৭ সালের ২৩ এপ্রিল তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান এক ফরমান জারি করেন। এই আদেশে:
অনুচ্ছেদ ৬এর নাগরিকত্বের বিধানটি হয়:”বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।
অনুচ্ছেদ ৯ (জাতীয়তাবাদ) সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়।
এর ফলে নাগরিকত্বের পরিচয় বাঙালির স্থলে বাংলাদেশীহয়ে যায়। আর জাতীয়তাবাদের বিধান অবলুপ্ত হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ সংবিধানিকভাবে জাতিপরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হয়।

১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল বিএনপি সরকার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৭ সালের ২৩ এপ্রিলের ফরমানটির আইনগত বৈধতা দেয়। কিন্তু ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময়েই হাইকোর্টের এক রায়ে পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হলে নাগরিকত্ব ও জাতীয়তাবাদের দুই বিধানই বাহাত্তরের সংবিধানের অবিকল রূপ ফেরত পায়।
তবে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ অনুচ্ছেদ ৬ মার্জনা করায় নাগরিকত্বের পরিচয় বাঙালির স্থলে বাংলাদেশীহয়ে যায়, কিন্তু জাতীয়তা বাঙালিবলবৎ থাকে।
২০০৯ সালে মহাজোটের ব্যানারে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬এর বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেনঅংশটির সংশোধন করে বলা হয়:
বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া বিবেচিত হইবেন।
সংবিধানিকভাবে এ ব্যাপারে আর কোন পরিবর্তন আসে কি ধরনের পরিবর্তন আসে — তা সময়ই বলে দেবে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাস্তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। এই আঘাত ছিল পরিকল্পিত — একাত্তরকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র — এবং তা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। বরং এই আঘাত ভিন্নভাবে এখনও চলছে।

অতীতের ন্যায় এবারও এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। ইতিমধ্যেই দেশবিদেশে বাঙালিরা এ ব্যাপারে সোচ্চার ও জোরালো ভূমিকা রাখছে। এই আন্দোলন দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মেলাঘরের পক্ষ থেকে বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধানের আলোকে বাংলাদেশ সনদনামে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই প্রস্তাবনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় প্রণিধানযোগ্য। তাদের ভাষায়:
বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদ, যা এই ভূখণ্ডের সকল মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদায় ধারণ করে — যা আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তি — যা গণহত্যাসহ অতীতের সকল বঞ্চনা ও অবিচারের অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে জাতীয় সংহতি ও জাতি গঠনে পথ দেখাবে।

উপসংহার
১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন:
 “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালাতিলকটিকিতে কিংবা টুপিলুঙ্গিদাড়িতে ঢাকবার জো নেই।
এরপর আর কথা চলে না তাই এ লেখা এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র :
. ”বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ : একটি নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা”, : সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী ,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
২ “জাতীয়তা নয় , নাগরিকত্ব লিখুন”, : সাখাওয়াত আনসারী , অধ্যাপক , ভাষা বিজ্ঞান বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব করুন
অবগত করুন
guest

0 মন্তব্যসমূহ
সবচেয়ে পুরোনো
সাম্প্রতিকতম সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
Inline Feedbacks
View all comments
  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.
0
আপনার ভাবনাগুলোও শেয়ার করুনx