ষড়যন্ত্রের শুরু সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই । মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাত করার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক যে গভীর ষড়যন্ত্র দানা বেধেছিল তা সফল হতে পারেনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (প্রবাসী সরকার) এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তায়। বিজয়ের ঠিক দ্বারপ্রান্তে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় সেনা সদস্য “সেনা পরিষদ” গঠন করে গোপনে মিলিত হয়ে শপথ গ্রহণ করে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগ সরকারের দক্ষ পরিচালনায় এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেশ স্বাধীন হলেও এই সেনা পরিষদ তা মেনে নেবে না; বরং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করে প্রো-পাকিস্তানপন্থী একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তার আলামত শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পর থেকেই। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠানোর প্রাক্কালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ৭ জানুয়ারি ,১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ডিনারের আয়োজন করেন । খাওয়ার টেবিলে যাওয়ার সময় এক ফাঁকে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বললেন , “পাকিস্তান তো আপনারাই বানিয়েছেন । আমি তখন ছাত্র

ছিলাম । যা হয়েছে দু:খজনক । কনফেডারেশনের মাধ্যমে কিছু একটা লিংক রাখা যায় কিনা! “ বঙ্গবন্ধু প্রতি উত্তরে বললেন , “আমি তোমার প্রশ্ন শুনলাম , এর উত্তর আমি ঢাকায় নেমে সঙ্গে সঙ্গে জানাব।“ ভুট্টো বললেন , “আজ না পাঠিয়ে কালকে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাই । কারণ কালকে ইরানের শাহ আসবেন এবং আপনার সাথে দেখা করবেন।“ বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন ,ইরানের শাহকে দিয়ে একটা সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছেন ভুট্টো । সেই জন্যই তেহরান হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন । এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বঙ্গবন্ধু উত্তেজিত কন্ঠে বললেন , “আমার এই সব ভালো লাগছে না । আমরা ডিনার করব না । আজকে রাতের মধ্যে যদি পাঠানোর ব্যবস্থা কর তাহলে যেতে পরি । তা না হলে তুমি আমাকে কারাগারে পাঠাও।“ অবস্থা বেগতিক দেখে ভুট্টো সঙ্গে সঙ্গে সেক্রেটারিকে ডেকে বললেন , “প্লেন আনার ব্যবস্থা কর।“ করাচি থেকে প্লেন আসতে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে । এই কথা শোনার পর বঙ্গবন্ধু ডিনার খেতে রাজি হলেন । অবশেষে ভুট্টো নিজে বিমানবন্দরে এসে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানান । কিন্তু ষড়যন্ত্র…

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। এই আঘাত ছিল পরিকল্পিত। একাত্তরকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র — এবং তা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়-এখনও চলছে। প্রতিরোধ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। প্রতিরোধ চেতনা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, ও এই ধারাবাহিকতায় "বাংলাদেশ সনদ" একটি বৌদ্ধিক আন্দোলন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতীয়তাবাদ বিষয়ে সনদের অঙ্গীকার এই যে - "বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদ, যা এই ভূখণ্ডের সকল মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদায় ধারণ করে — যা আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তি — যা গণহত্যাসহ অতীতের সকল বঞ্চনা ও অবিচারের অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে জাতীয় সংহতি ও জাতি গঠনে পথ দেখাবে।"

বাঙালির ইতিহাস যেমন পুরোনো, তেমনি গৌরবোজ্জ্বল। বাংলায় মানব বসতির সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে কমপক্ষে দশ হাজার বছর পূর্বে। বাঙালি জাতির দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাঙালির উৎস নিয়ে নানাবিধ মতবাদ থাকলেও অনেকের মতে, বাঙালির আদি জনগোষ্ঠী অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক জাতিভুক্ত। আর্যপূর্ব যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আসতে বাঙালিকে অসংখ্য চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। আর্যদের ভারতবর্ষে আগমন ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছরের কাছাকাছি। নানাবিধ কারণে বাংলার অধিবাসীদের সাথে আর্যদের কোন নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।  গ্রীক বীর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে (খ্রি. পূ. ৩২৭ অব্দে) ভারতবর্ষে এসে উত্তর ভারতের বিপাশা নদ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা দখল করতে সাহস দেখাননি। প্রসঙ্গত, পন্ডিত ডিওডোরাস প্রাচীন বাংলার শক্তিশালী রাজ্যের পরিচয় দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন: "ভারতবর্ষে বহুজাতির বাস। তন্মধ্যে গঙ্গারিড্ডির জাতি সর্বশ্রেষ্ঠ। ইহাদের চারি সহস্র বৃহত্কায় সুসজ্জিত রণহস্তী আছে। এই জন্য অপর কোন রাজা এই দেশ জয় করিতে পারে নাই। স্বয়ং আলেকজান্ডারও এই সমুদয় হস্তীর বিবরণ শুনিয়া এই জাতিকে পরাস্ত করিবার দুরাশা ত্যাগ করেন।" আলেকজান্ডারের প্রস্থানের পর থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত

দুই হাজার বছরের ইতিহাসে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, পাঠান, মোগল, ইংরেজ প্রভৃতি জাতি বাংলা শাসন করেছে। মজার ব্যাপার হল, এই সময়ে বাঙালিরাও বাংলাকে শাসন করেছে। কিংবদন্তি অনুসারে বা কিছু মতবাদ অনুযায়ী, রাজা নন্দ বাঙালি ছিলেন।অনেকের ধারণা, গুপ্তগণও বাঙালি ছিলেন। শশাঙ্ক এবং পালগণ নিশ্চিতভাবেই বাঙালি ছিলেন। কিন্তু কেউই বাঙালিকে স্বাধীন বা সার্বভৌম রাখার চিন্তা করেননি — বা করার সুযোগ পাননি। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত না হওয়াও অন্যতম প্রধান কারণ। বাঙালির সেই জাতীয়তাবোধ কিন্তু একদিনে জাগ্রত হয়নি। বাঙালির আদি থেকে আজতক সাহিত্য মানুষের যে দুঃখ ও সুখ চিত্রায়ণ ঘটেছে - তার একটা ব্যাপক পরিমণ্ডলে এই যুক্তি অহরহ দেখা যায় যে, তার স্থানিক ও এথনিক দুই পরিচয় মিলে এই জনপদ নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। তার ভাষা যেমন আদৃত হয়েছে তেমনি তার এথনিক বৈচিত্র্য ও মিলিত বৈশিষ্ট্য বহিরাগতদের কাছে অপমানেরও শিকার হয়েছে। আঠারো-উনিশ শতকের সাহিত্য ও দলিলাদি, উদাহরণস্বরূপ, বঙ্কিমের 'আনন্দমঠ' থেকে রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' — যাবতীয় সাহিত্য ও সাহিত্য নয় এমন দলিল-দস্তাবেজ পড়লে এ উপলব্দি হয় । ১৯০৫ সালের আগে ইংরেজী…

পুরো অনুষ্ঠানটি চলাকালীন সভা কক্ষের আবেগ, উদ্দীপনা, আর উপস্থিত সবার প্রত্যয় নিয়ে লিখতে গিয়ে নিজের প্রকাশ-ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রবলভাবে অনুভব করলাম। তাই মনে হল, পুরো ছয়শো মানুষ যেখানে একই আবেগ আর প্রত্যয়ে এক সূত্রে গাঁথা ছিল গোটা সন্ধ্যা জুড়ে, সেখানে নিজের অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়ার কথা আলাদাভাবে বলার কিছু তো নেই আসলে! তাই হিলটনের সেই সভাকক্ষে উপস্থিত দর্শক শ্রোতারা বক্তৃতা চলাকালীন টুইটারে তাৎক্ষণিকভাবে যে প্রতিক্রিয়াগুলো ব্যক্ত করছিলেন সেখান থেকে কিছু স্ক্রিনশট তুলে ধরছি

গত ২ জুলাই লন্ডনে ব্রিটিশ হিউম্যানিস্ট এসোসিয়েশন আয়োজিত এ বছরের ‘ভলতেয়ার বক্তৃতা’ শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। হাই-প্রোফাইল এ বক্তৃতানুষ্ঠানের এ বছরের নির্ধারিত বক্তা রাফিদা (বন্যা) আহমেদ। অত্যন্ত তথ্যবহুল এবং উদ্দীপনাময় সে বক্তৃতা স্পর্শ করেছে উপস্থিত ছয় শতাধিক মানুষকে। তারা সবাই যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে হাজির হয়েছিলেন এই সন্ধ্যায় বন্যা আহমেদের বক্তব্য শোনার জন্য। এদের বেশীরভাগই সেক্যুলার-মানবতাবাদী, যার যার ক্ষেত্রে আন্দোলনের সংগঠক, কর্মী। আরও উপস্থিত ছিলেন ইউরোপের মূলধারার মিডিয়ার সাথে যুক্ত সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক, সম্পাদকরা। অভিজ্ঞতাটা নিয়ে লেখার কথা ভাবছিলাম আমিও। কিন্তু পুরো অনুষ্ঠানটি চলাকালীন সভা কক্ষের আবেগ, উদ্দীপনা, আর উপস্থিত সবার প্রত্যয় নিয়ে লিখতে গিয়ে নিজের প্রকাশ-ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রবলভাবে অনুভব করলাম। তাই মনে হল, পুরো ছয়শো মানুষ যেখানে একই আবেগ আর প্রত্যয়ে এক সূত্রে গাঁথা ছিল গোটা সন্ধ্যা জুড়ে, সেখানে নিজের অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়ার কথা আলাদাভাবে বলার কিছু তো নেই আসলে! তাই হিলটনের সেই সভাকক্ষে উপস্থিত দর্শক শ্রোতারা বক্তৃতা চলাকালীন টুইটারে তাৎক্ষণিকভাবে যে প্রতিক্রিয়াগুলো ব্যক্ত করছিলেন সেখান থেকে কিছু স্ক্রিনশট তুলে ধরছি এই এ্যালবামে। এই অনুষ্ঠান সম্বন্ধে, কিংবা উপস্থিত সবার প্রতিক্রিয়া জানতে টুইটারে হ্যাশটা্যাগ #BHAVoltaire খোঁজ করলে আরও জানতে পারবেন। [এই লিন্কে বন্যা আহমেদের পুরো বক্তৃতাটিই পাবেন] যদিও অত্যন্ত তাৎপর্যহীন, তবুও একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, যার কিছুটা প্রাসঙ্গিকতা থাকায় এখানে উল্লেখ করছি। বন্যা আহমেদের ‘ভলতেয়ার বক্তৃতা’ নিয়ে লেখক তসলিমা নাসরিন কিছু অদ্ভুত মন্তব্য করেছেন (এই এ্যালবামের শেষে দেখুন)। ‘অদ্ভুত’ বললাম এ কারণে যে – তার এই মন্তব্যগুলোর হেতু বা উদ্দেশ্য আমার কাছে একেবারেই স্পষ্ট নয়। সত্যি বলতে কি সেটা উদঘাটনেরও তেমন আগ্রহ বোধ করছি না। বন্যা আহমেদ তার বক্তৃতায় হেসেছেন কেন তা নিয়ে তসলিমা নাসরিন অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আরও অসন্তুষ্ট হয়েছেন যে বক্তৃতায় বন্যা আহমেদ যথেষ্ট ‘রাগ’ এবং ‘ফুঁসে ওঠা’ প্রকাশ করেননি! অভিজিৎ বিষয়ে বন্যা আহমেদের প্রকাশভঙ্গী মনঃপূত না হওয়ায় তা নিয়েও তসলিমা নাসরিনের ‘একটুখানি অস্বস্তি’ হয়েছে বলে তিনি লিখেছেন! তসলিমা নাসরিন সেদিন হিলটনের সভাকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। আমি ছিলাম, আরও ছিলো ছয় শতাধিক মানুষ, যারা তাদের প্রতিক্রিয়া/অনুভুতি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যক্ত করেছেন। এই এ্যালবামের টুইটগুলো পড়লে তসলিমা নাসরিন নিশ্চয়ই তার ভুল উপলদ্ধি করবেন। সভাকক্ষে উপস্থিত কারোই মনে হয়নি যে অভিজিৎ রায়কে কিংবা বাংলাদেশের তাবত…

আমাদের সমাজে এই নারী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি কি রকম? "ভালো" মেয়ে প্রশ্ন করে না, জোরে হাসে না, জোরে কথা বলে না, তর্ক করে না, প্রতিবাদ করে না, নিজের চাহিদার কথা মুখ ফুটে বলে না। সে জটিলতা বোঝে না, রাজনীতি তো নয়ই। তার শরীর তার লজ্জার বস্তু তাই নিজেকে আবৃত রাখে সে। পা ঢাকে, মাথা ঢাকে, তাতেও যখন হয় না তখন মুখ ঢাকে। একসময় নিজের মনুষ্যত্বটুকুও ঢাকে প্রাণপণে। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এণ্ডারসনের "লিটল মারমেইড" গল্পটির কথা মনে আছে কারো? সেই যে ছোট্ট জলপরী, রাজপুত্রের কাছে এবং তার সমাজের কাছে গ্রহনীয় হওয়ার জন্য ধীরে ধীরে একটি একটি করে স্বকীয়তা হারায় সে? সবশেষে হারায় তার কণ্ঠস্বর।

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.