ষড়যন্ত্রের শুরু সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ।
মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাত করার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক যে গভীর ষড়যন্ত্র দানা বেধেছিল তা সফল হতে পারেনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (প্রবাসী সরকার) এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তায়।
বিজয়ের ঠিক দ্বারপ্রান্তে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় সেনা সদস্য “সেনা পরিষদ” গঠন করে গোপনে মিলিত হয়ে শপথ গ্রহণ করে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগ সরকারের দক্ষ পরিচালনায় এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেশ স্বাধীন হলেও এই সেনা পরিষদ তা মেনে নেবে না; বরং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করে প্রো-পাকিস্তানপন্থী একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
তার আলামত শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পর থেকেই। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠানোর প্রাক্কালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ৭ জানুয়ারি ,১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ডিনারের আয়োজন করেন । খাওয়ার টেবিলে যাওয়ার সময় এক ফাঁকে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বললেন , “পাকিস্তান তো আপনারাই বানিয়েছেন । আমি তখন ছাত্র ছিলাম । যা হয়েছে দু:খজনক । কনফেডারেশনের মাধ্যমে কিছু একটা লিংক রাখা যায় কিনা! “
বঙ্গবন্ধু প্রতি উত্তরে বললেন , “আমি তোমার প্রশ্ন শুনলাম , এর উত্তর আমি ঢাকায় নেমে সঙ্গে সঙ্গে জানাব।“
ভুট্টো বললেন , “আজ না পাঠিয়ে কালকে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাই । কারণ কালকে ইরানের শাহ আসবেন এবং আপনার সাথে দেখা করবেন।“
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন ,ইরানের শাহকে দিয়ে একটা সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছেন ভুট্টো । সেই জন্যই তেহরান হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ।
এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বঙ্গবন্ধু উত্তেজিত কন্ঠে বললেন , “আমার এই সব ভালো লাগছে না । আমরা ডিনার করব না । আজকে রাতের মধ্যে যদি পাঠানোর ব্যবস্থা কর তাহলে যেতে পরি । তা না হলে তুমি আমাকে কারাগারে পাঠাও।“
অবস্থা বেগতিক দেখে ভুট্টো সঙ্গে সঙ্গে সেক্রেটারিকে ডেকে বললেন , “প্লেন আনার ব্যবস্থা কর।“
করাচি থেকে প্লেন আসতে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে । এই কথা শোনার পর বঙ্গবন্ধু ডিনার খেতে রাজি হলেন । অবশেষে ভুট্টো নিজে বিমানবন্দরে এসে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানান ।
কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকে নি। এর তিন মাস পর ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ কমনওয়েলথ সদস্য লাভ করার সাথে সাথেই পাকিস্তান সরকার এর প্রতিবাদে কমনওয়েলথ সংস্থা থেকে তার দেশের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয় এবং ঘোষণা দেয় যে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের অংশ।
এর চার মাস পর বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে অস্ত্রোপচারের পর আরোগ্য লাভ ও বিশ্রামের জন্য ১৯৭২ সালের ২১ আগস্ট সুইজারল্যান্ডে আসেন। অনেক রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধুর খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। একদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোও বঙ্গবন্ধুর খোঁজ নিতে ফোন করেন এবং আলাপের এক পর্যায়ে আবারও বাংলাদেশকে কনফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
বঙ্গবন্ধু প্রতি উত্তরে বললেন, “আমি তোমাকে যা বলেছি সেটাই শেষ কথা। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান দুটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং এটাই হবে আমাদের আগামীর সম্পর্ক।”
কিন্তু পাকিস্তান থেমে থাকে নি।
১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো পাকিস্তানের যে সংবিধান তৈরি করেন সেই সংবিধানের অবিচ্ছেদ ২(৩) এ বলা হয়েছে যে , “পূর্বপাকিস্তানের জনগণ যখন বিদেশি আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারবে এবং তার প্রভাব পতিপত্তির বাইরে আসতে পারবে তখন সেটি ফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করবে।“
অন্যদিকে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর পাকিস্তান চলে যান এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর “পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি” গঠন করে ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে লন্ডন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে এবং অর্থ বা অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা না দিতে জোর তৎপরতা চালাতে থাকেন।
এত কিছু করার পরও স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তা এবং অনমনীয় মনোভাব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করার কারণে এক পর্যায়ে পাকিস্তানের আইএসআই এদেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তৎপর হয়।
এই চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দুপুর দুইটায় এক বার্তায় বাংলাদেশের অবৈধ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোস্তাককে স্বীকৃতি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বার্তা প্রেরণ করেন । সেই বার্তার শেষ অংশে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো লিখেন , “আমরা ইসলামী সম্মেলনের সদস্যদের প্রতি “ ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশের “ নতুন সরকারকে স্বীকৃতিদানের জন্য বিনীতভাবে আহবান জানাচ্ছি এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের প্রতি একই অনুরোধ জানাই । আমাদের এই আবেদন বেদনামথিত অনুভূতিতে সিক্ত । যে অনুভূতি আমাদের অনুভবে সারাক্ষণ জাগরূক তা হল , কিভাবে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশকে বিভক্ত করা হয়েছিল “।
পাকিস্তানের এই বার্তার খবর জানতে পেরে ভারতের হাই কমিশনার মি. সমর সেন ১৮ আগস্ট , ১৯৭৫ বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট মোস্তাকের সাথে সাক্ষাৎ করেন । এরপর সমর সেন তার হাতে থাকা একখন্ড কাগজে যা লেখা ছিল তা পড়ে শোনানোর পর খন্দকার মোস্তাক বিমর্ষ চেহারায় ধপ করে চেয়ারে হেলে পড়েন । এতে লেখা ছিল , “ যদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং কোন দেশের সাথে কনফেডারেশন করা হয় তাহলে ভারতের সাথে থাকা বৈধ চুক্তির আওতায় ভারতের সেনা বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ নিবে “। এই কঠিন বার্তার পরই খন্দকার মোস্তাক তার মূল পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।
এ প্রসঙ্গে ১৯৯৩ সালে মার্কিন শিক্ষাবিদ ও লেখক স্টানলি অলপার্ট তার “ জুলফি ভুট্টো অফ পাকিস্তান “ বইয়ে লিখেছেন , “ মুজিব হত্যার তিন সপ্তাহ পর ভুট্টো দুই দেশকে একত্র করে কনফেডারেশন গঠনে তার বিশেষ দূত হিসেবে মাহমুদ আলীকে ( পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙ্গালি রাজাকার) লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন ।
ভারতের এই কঠিন বার্তার পর পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলো তাদের পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনে। অর্থাৎ কনফেডারেশন সম্ভব না হলেও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান এবং প্রো-পাকিস্তানপন্থী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে নতুন মিশন শুরু করে।
এরই ধারাবাহিকতায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার ১৯৭৬ সালের ৩ মে একটি অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উপর অর্পিত নিষেধ তুলে দেয়। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধী দলগুলো — যেমন জামায়াতে ইসলামী, নেজামী ইসলাম, মুসলিম লীগ, পিডিপি সহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো — পুনরায় সাংবিধানিকভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে যায়। অবশ্য এর আগেই ১৯৭৬ সালের ১৭ জানুয়ারি জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার ৩৯ জন বাঙালি দালাল — যারা পাকিস্তান বাহিনীকে সরাসরি সমর্থন দেওয়া এবং বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য অস্বীকার করার ফলে নাগরিকত্ব হারিয়েছিল — তাদেরকে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করার আহ্বান জানায়।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আজম নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করেন এবং ১৯৭৮ সালের ১২ জানুয়ারি পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে তিন মাসের ভিসায় বাংলাদেশে আসেন অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৩ সালের ২২ এপ্রিল হাইকোর্টের রায়ে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আগ পর্যন্ত গোলাম আজম ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি না করেই বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন — জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং পরবর্তীতে বিএনপির বদান্যতায়।
এটি পরিষ্কার যে গোলাম আজম বাংলাদেশকে অস্বীকার করেও একটি বিশেষ মিশন নিয়ে — অর্থাৎ বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তান বানানোর লক্ষ্যে — এ দেশে ফিরে আসেন।এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পরও তার দল বিএনপি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানকে তরান্বিত করেছে এবং এখনও করছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবার জামায়াতে ইসলামী দাড়িপাল্লা মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১০টি আসনে জয়লাভ করে। ঐ নির্বাচনে বিএনপি প্রথমে অংশগ্রহণের কথা বললেও পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এর সুফল পায় জামায়াতে ইসলামী। এই সুফল আরও বৃদ্ধি পায় ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় অনেকটা নিশ্চিত থাকার পরও বিএনপি জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কয়েকটি স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির সাথে গোপনে আঁতাতের মাধ্যমে জয়ী হয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে।
জামায়াত ঐ নির্বাচনে ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছিল।পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৬ মার্চ প্রথম আলোর অনলাইন ডেস্কে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী জানা যায় যে পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই ) সাবেক প্রধান আসাদ দুররানি ১৪ মার্চ ২০১২ পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে স্বীকার করেন যে ১৯৯১ সালে বিএনপিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোর জন্য ৫০ কোটি রুপি দেওয়া হয়েছিল ।
১৫ মার্চ ২০১২ যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইলেও খবরটি প্রকাশিত হয় । পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মো: চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের একটি বেঞ্চে এক শুনানিতে আসাদ দুররানি আরও বলেন ,” ভারতের উত্তর -পূর্ব রাজ্যগুলোতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং বাংলাদেশে বিএনপিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোর জন্য এ সকল অর্থ বরাদ্ধ দেওয়া হয় । “
বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকা কালে ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান আটক করার পর প্রমাণ হয় যে পাকিস্তানের আইএসআই পার্শ্ববর্তী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছিল।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয় — পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশাররফ ২০০৫ সালে ঢাকায় এসে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফা নেতা অনুপ চেটিয়ার সাথে অতি গোপনে মিটিং করেন। এই খবর আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এটিও সত্যি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা ইস্যুতে বিএনপির সাথে জামায়াতের সাময়িক দূরত্ব সৃষ্টি হলে ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে নির্বাচন করে মাত্র তিনটি আসনে জয় লাভ করে। ফলে মান-অভিমান ভুলে ১৯৯৯ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আদর্শিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয় আরও দুটি দলকে নিয়ে — যার একটি ছিল নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির একটি অংশ এবং আরেকটি ইসলামী ঐক্যজোট।
বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ঐ সময়ে অর্থাৎ ২০০০ সালের ২০ মার্চ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একদিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন । বাংলাদেশে কোন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের এটাই ছিল প্রথম সফর । সংক্ষিপ্ত এই সফরে বাংলাদেশ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করে আমেরিকা । তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ রেখে তারপর রপ্তানির কথা বলেন ।
অন্যদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া কোন শর্ত ছাড়াই গ্যাস রপ্তানি করতে রাজি ছিলেন বলে খবরে প্রকাশ । ২০০০ সালের ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকা সফরে গেলে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আবারও গ্যাস রপ্তানির বিষয়টি আসে । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টই বলেছিলেন , “it is our natural resources and it is our priority how we utilize them.”অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী বুঝাতে চেয়েছিলেন যে অন্তত ৫০ বছরের গ্যাস মজুত রেখে পরে রপ্তানির কথা ভাবা হবে। আর তার এই বক্তব্য আমেরিকার মোটেই পছন্দ হয়নি। সেই দিনই আমেরিকার সরকার বুঝে যায় পিতার ন্যায় তার কন্যা শেখ হাসিনাও দেশের স্বার্থের ব্যাপারে অনেক অনড় এবং দৃঢ়চেতা। সেটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট।
তখন থেকেই আমেরিকা বিকল্প চিন্তা করতে থাকে। অনেক বিশ্লেষকগণও মনে করেন আমেরিকার ইচ্ছা অনুযায়ী গ্যাস রপ্তানিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলে আগ্রহ না দেখানোতে পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়েছিল। ফলে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি–জামায়াতের নেতৃত্বে চার-দলীয় জোট ক্ষমতায় এসেই সারা দেশে তাণ্ডব চালায়। ঐ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৭টি আসনে জয়ী হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল — ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগী আলবদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী এবং ডেপুটি কমান্ডার আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রী নিয়োগ করে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মার প্রতি সরাসরি অবজ্ঞার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
ঐ সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ব্যাপক উত্থান ঘটে। রাজশাহীর রানীনগর থানার বিটি মাদ্রাসায় প্রধান ক্যাম্প স্থাপন করে সাত উপজেলায় জাগ্রত মুসলিম জনতা তথা বাংলা ভাই বাহিনীর অপারেশনে গ্রামের পর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছিল।
সারা দেশে সশস্ত্র ইসলামী বিপ্লব কায়েমের লক্ষ্যে ৫৪টি জঙ্গি সংগঠন গোপন আস্তানা তৈরি করে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল।এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামী উগ্র সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন এবং হরকাতুল জিহাদের পক্ষ থেকে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশের ৬৩ জেলাতেই (মুন্সিগঞ্জ বাদে) আনুমানিক ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে দুজন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়।
হামলা এখানেই থেমে থাকেনি — পরবর্তীতে আরও কয়েকটি ধারাবাহিক জঙ্গি হামলায় বিচারক ও আইনজীবীসহ প্রায় ৩০ জন নিহত হন এবং আহত হন প্রায় চার শতাধিক মানুষ। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নির্মূল করার লক্ষ্যে প্রকাশ্য জনসভায় এক ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে বঙ্গবন্ধু কন্যা সহ বেশিরভাগ নেতৃবৃন্দ অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী মারাত্মকভাবে আহত হন।
দেশের এই রকম নাজুক অবস্থায় বিএনপি–জামায়াত জোট নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে নিজেদের লোক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে বসানোর লক্ষ্যে বিনা কারণে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর নির্ধারণ করে। জনগণের তীব্র আন্দোলনে কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়ে তাদেরই মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমদকে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করেই প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দিয়ে নীল নকশার নির্বাচনের আয়োজন করে।
দেশের এহেন ক্রান্তিলগ্নে দেশি–বিদেশি প্রভাবশালী শক্তিগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সহযোগিতা না করে সেনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বসিয়ে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে মূলত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
তখনই আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে নোবেল বিজয়ী মোহাম্মদ ইউনুসের নামটি সামনে আসে। এটি বহুল প্রচারিত যে ২০০৬-৭ সালে বাংলাদেশে থাকা জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর বিকল্প একটি শক্তিকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র । এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জানানো হয় যে বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন সঠিকভাবে এগুচ্ছে না । তাই বিকল্প হিসেবে গ্রামীণ ফোন প্রধান নোবেল বিজয়ী ড: মুহাম্মদ ইউনুসকে সরাসরি অথবা কেয়ারটেকার সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনতে ছেয়েছিল । অনেক এও মনে করেন যে এই লক্ষ্য নিয়েই মুহাম্মদ ইউনুসকে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়েছিল , যদিও পৃথিবীর কোথাও শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ ইউনুসের কোন অবদান নেই । মোহাম্মদ ইউনুস পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে “নাগরিক শক্তি” নামে একটি ভিন্নধর্মী দল গঠন করার ঘোষণা দেন ।
অনেক চেষ্টা তদবির করেও কোনো সাড়া না পেয়ে অবশেষে মুহাম্মদ ইউনুস নিজেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দল বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। তারপর চেষ্টা করা হয় সংস্কারের নামে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেঙে একটি তাবেদার দল গঠনের জন্য। জনরোষে সবকিছুতে বিফল হয়ে শেষ পর্যন্ত সেনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাধ্য হয়ে বিএনপি–জামায়েত সরকারের করা এক কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার তালিকা সংশোধন করে ছবিযুক্ত একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে একটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিয়ে বিদায় নেয়।
২০০১-২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি–জামায়েত জোট সরকারের ষড়যন্ত্র এবং দেশব্যাপী তাণ্ডবের ফলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে। বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী মাত্র দুইটি আসনে জয়লাভ করেছিল। ষড়যন্ত্রকারীরা মহাজোটের এই বিজয় মেনে নিতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনের দুই মাসের মধ্যেই সরাসরি শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে বিডিআর বিদ্রোহের নামে মিউটিনি ঘটানো হয়। বিডিআর-এর জামায়াতে ইসলামী ক্যাডার এবং পাকিস্তানের আইএসআই-এর সহযোগিতায় এই রিভোল্ট যে সূক্ষ্ম ভাবে মনিটর করা হচ্ছিল সেটা এখন স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যার দূরদর্শিতায় ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন সফল হতে পারেনি।
এদিকে নির্বাচনে বিপুল রায় এবং জনগণের এই ভালোবাসাকে স্মরণ রেখে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মহাজোটের ঐ সরকার। জি-৭ এবং জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বিশেষ আমন্ত্রণ দিয়ে বিশ্ব নেতারা নিয়ে যেতেন বাংলাদেশের এরকম অভাবনীয় উন্নয়নের রহস্য জানার জন্য।ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে যেভাবে সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রশংসা করছিলেন — এমন দৃশ্য সমসাময়িক কালে একেবারেই বিরল।
তারেক ফাতাহ পাকিস্তানি বংশভূদ কানাডায় বসবাসরত একজন নন্দিত সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক কয়েক বছর আগে দর্শক শ্রোতাদের উপস্থিতিতে কানাডার একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যে ,”উন্নয়ন কিভাবে করতে হয় তা বংলাদেশের শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন । এই মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বে একজনই নেতা আছেন , আর তিনি শেখ হাসিনা । তার সাহস আছে বলেই তিনি মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে পেরেছেন “।
এমনকি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ২০২৩ সালের ২১ অক্টোবর লাহোরের এক জনসভায় বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন । তার ছোট ভাই পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সেদেশের ব্যবসায়ীদের উদ্যেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে বলেন , “ বাংলাদেশের অর্থনীনীতির প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে এখন আমদের লজ্জা হয়। সে সময় পূর্বপাকিস্তানকে দেশের বোঝা মনে করা হত । তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম । আমাদেরকে বলা হত যে, এটা আমাদের কাঁধে একটা বোঝা। আজ আপনার সবাই জানেন সেই বোঝা এখন কোথায় পৌঁচেছে । এখন আমরা যখন তাদের দিকে তাকাই, তখন আমরা লজ্জিত হই ।“
শুধু উন্নয়ন নয়, সব সূচকেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। উন্নয়ন ছাড়াও জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য চলমান রেখেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনার সরকার।
আলবদর কমান্ডার নিজামী এবং ডেপুটি কমান্ডার মুজাহিদকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাসি কার্যকর করা হলে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব পাশ করা হয় এবং তুরস্কও অফিসিয়ালি নিন্দা জানায় । ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করে সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতায় জঙ্গি তৎপরতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে — যা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়।
তবে দিনে দিনে এটা পরিষ্কার হতে থাকে যে আমেরিকা প্রচণ্ডভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছিল বাংলাদেশকে মোহাম্মদ ইউনুসের মাধ্যমে তাদের অজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর এই সুযোগে পাকিস্তান চেষ্টা করে যাচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মুছে ফেলে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীনতা বিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করে প্রো-পাকিস্তানপন্থী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।এ লক্ষ্য নিয়েই একটার পর একটা ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। ২০১৮ সালে আমেরিকার পাচ বিলিয়ন বাংলাদেশ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের তৎপরতা আবার পুনরুজ্জীবিত হয়।
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন,কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরো কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দেওয়ার পরও কেন পুরো কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হল এ অজুহাতে আন্দোলন দীর্ঘায়িত করে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপচেষ্টা , ২০১৮ সালের আগস্টের নিরাপদ সড়কের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা — পর্দার আড়ালে এসবই ছিল সরকার উৎখাতের দিকে আন্দোলনকে নিয়ে যাওয়া।
একটু বিরতি দিয়ে ২০২২ সাল থেকে আবার শুরু। ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর বিএনপি ঢাকায় জনসভা অনুষ্ঠানের নাম করে সারা দেশ থেকে লোক জড়ো করেছিল সরকারকে ফেলে দেওয়ার লক্ষ্যে। সেদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তা সফল হতে পারেনি।
এরপর ২০২৪-এর ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও সফল হয়নি ষড়যন্ত্রকারীরা। বিশ্লেষকগণ মনে করেন যে ২০২৪ সালের ২৩ জুন লে. জে. ওয়াকারুজ্জামান সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরই দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রটি তাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত বাস্তবায়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা এবং হাইকোর্ট কর্তৃক রায়ে পুরোনো কোটা পদ্ধতি পুনরায় হুবহু বহাল রাখার ব্যাপারটি নিয়েও জনমনে সন্দেহ আছে — এইগুলোও ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা। কারণ পরবর্তীতে জানা যায় যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘ মেয়াদী এক বেসামরিক–সামরিক (সিভিল–মিলিটারি) ছক।
বিভিন্ন নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭–২০০৮ সালের অসমাপ্ত মাইনাস টু ফর্মুলার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘ মেয়াদী ও অনুগত আরাজনৈতিক সরকার গঠনের পরিকল্পনা করা হয় যার নেতৃত্বে থাকবেন মুহাম্মদ ইউনুস।
২০২৩ সালে ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন কূটনৈতিক হেলেন লা-ফেইভের বাসভবনে এবং নেপালে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মণিকা চৌধুরীর মালিকাধীন একটি রিসোর্টে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলোতে হেলেন লা-ফেইভ ও তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ছাড়াও অনেক বাংলাদেশী নাগরিক উপস্থিত ছিলেন, যারা পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান।
পিটার হাস ও ডোনাল্ড লু মূলত বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক নেটওয়ার্কের সাথে মিলে এই সরকার পরিবর্তনের সমন্বয় করেন। সাথে পাকিস্তানের আইএসআই, তুরস্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের দু’একটি দেশ।
মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গা সংকটের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একটি খ্রিস্টান–ইহুদি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করতে থাকে।ভারত, মিয়ানমারের রাখাইন ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে মুক্তিযোদ্ধা তকমা দিয়ে আন্তর্জাতিক একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়, যার সঙ্গে সাবেক কয়েকজন বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এই তথ্য আগেই দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন, এবং এও বলেছিলেন যে বিনিময়ে আজীবন ক্ষমতা থাকার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধু কন্যাকে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে সেদিন আপোষ করেননি। কিন্তু সেদিন অনেকেই এসব তথ্য বিশ্বাস করেননি। মুহাম্মদ ইউনুসকে সামনে রেখেই ষড়যন্ত্রকারীরা এগুতে থাকে. মুহাম্মদ ইউনুসসহ আজকে যারা ক্ষমতায়, তারা পরিকল্পনা মাফিক আপোষ করেই এখানে এসেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র ২৯ মিলিয়ন ডলারের কথা বলেছেন, যে অর্থ গেছে বাংলাদেশে এমন এক সংস্থার কাছে, যার নাম আগে কেউ শোনেনি। তবে সত্যিটা আরও ভয়াবহ।
২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল আমেরিকার সি এস বি নিউজে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় কিভাবে একটি বিদেশি রাষ্ট্র (ইউ এস) ৩২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে ভেঙে দিল। এর সাথে যুক্তরাজ্য সরকার ডিএফআইডির মাধ্যমে বাংলাদেশে ১৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছে একই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে।
এছাড়াও মাদ্রাসার মাধ্যমে হুণ্ডি নেটওয়ার্কে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়ন, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন, ইউ এন ফাউন্ডেশন সম্পৃক্ত সংস্থাগুলো, বিভিন্ন ইউরোপীয় দূতাবাসের রোহিঙ্গা সহায়তার নামে বিতরণকৃত অর্থ এবং ইউনুস স্পোর্টস হাব — সবই একই উদ্দেশ্যে ব্যয়িত হয়েছে অর্থাৎ শেখ হাসিনা এবং তার নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য।
বাংলাদেশের ৪০টি সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন, বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ডে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষিত জঙ্গি ইউনিটও এই তথাকথিত সহিংস আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল।
এটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্য যে সেই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর থেকেই ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় রিক্রুটমেন্ট পলিসিতে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান–সন্ততির এমবারগো না থাকায় স্বাধীনতা বিরোধীরা বানের জলের মতো লোক ঢুকিয়েছে সব জায়গায়। তাই দেশ আজ স্বাধীনতা বিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত।
এই সহিংস আন্দোলনের ব্যাপারে ঢাকার একজন বাসিন্দা বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তার বাসার কাছে অনেক রোহিঙ্গার আনাগোনা দেখেছেন, ৫ আগস্টের পরে আর তাদের দেখা যায়নি। ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদেরও এ সহিংস আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ।
অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত এবং অন্যান্যদের বক্তব্য থেকে এটা আজ পরিষ্কার কিভাবে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে মানুষ হত্যা করে পুলিশের ওপর দোষ চাপানো হয়েছে। এভাবে ভিন্ন উপায়ে পরিকল্পিতভাবে লাশ ফেলে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করা হয়। পরিকল্পনাটা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে সরকার ক্ষমতায় থাকতে হলে আরও অনেক রক্ত ঝরাতে হতো। বঙ্গবন্ধু কন্যা সেটা চাননি।
জঙ্গিদের টার্গেট ছিল এই সুযোগে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনাকে মব ভায়োলেন্স করে হত্যা করে প্রচার করে দেওয়া — জনতার রুদ্র রোষে এমনটা ঘটেছে।শেষ মুহূর্তে ভারতের হস্তক্ষেপে সেটা তারা সফল করতে পারেনি।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে যেতে চাননি। তাঁকে সামরিক বিমানে করে অনেকটা জোর করেই ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এছাড়া সহিংস এই আন্দোলনে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রচণ্ড মিথ্যাচার করা হয়েছে।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে মৃত্যু (রোগশোক ও অপমৃত্যু সহ) ৮৩৪ জন।অন্যদিকে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের হিসেবে মৃত্যু ৬৫৭ জন, যার মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ৩২৯ জন এবং ৫ আগস্টের পর ৩২৮ জন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের ছাত্র লীগের সবুজ আলী দুপুরে নিহত হলেও বিকেলে আবু সাঈদের মৃত্যুকে সারা বিশ্বে এমন ভাবে হাইলাইট করা হয়েছে যে পুলিশ বিনা উস্কানিতে বুকে গুলি করেছে । অথচ ময়না তদন্তের রিপোর্ট এবং আবু সাঈদের পিতার ভাষ্য অনুযায়ী মাথার পিছনে গভীর ক্ষতের চিহ্ন ছিল । এই গুলো সবই মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ । .
অনেকের মতে মৃত্যুর সংখ্যা এবং কারণ কখনই ঠিকভাবে নির্ণয়ই হয়নি। অথচ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ডিজি ভলকার তুর্ক ১৪০০ মৃত্যুর সংখ্যা কোথায় পেলেন? উল্লেখ্য যে, তিন হাজারের উপর পুলিশ হত্যা ও নির্যাতনের ব্যাপারে জাতিসংঘের রিপোর্টে কিছুই উল্লেখ নেই। কারণ ভলকার তুর্কও এই মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। ফলে স্বয়ং জাতিসংঘ দপ্তর এই রিপোর্ট অনুমোদন করেনি।
এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম প্রকাশ্যেই বলেছেন, মেট্রোরেলে আগুন এবং পুলিশকে হত্যা না করা হলে এত সহজে বিপ্লব অর্জন করা যেতো না। আরেক সমন্বয়ক বর্তমান সাংসদ আবদুল হান্নান মাসউদ বলেছেন যে এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে সবার মুখোশ খুলে দিবেন। সেই মুখোশটা কি — তা জাতি জানতে চায়।
একটি সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মুহাম্মদ ইউনুস মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধের সব চিহ্নগুলো ধ্বংস করে দেয়; ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘর কয়েক দফা ভাঙচুর করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়; মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী এবং সমর্থকদের জন্য নরকের দরজা খুলে দেয়; মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে মুহাম্মদ ইউনুস নিজের আখেরটা প্রথমে গুছিয়ে পরে দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে বিদায় নেন।দেশের অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিক্ষাঙ্গন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা — সবকিছু ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রেখে গেছেন মুহাম্মদ ইউনুস । মুহাম্মদ ইউনুসের একগুয়েমী সিদ্ধান্তের জন্য টিকার অভাবে হাজারের উপর নিষ্পাপ শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে — যা এখনও অব্যাহত আছে। শিক্ষাঙ্গনে হাজার হাজার শিক্ষক–শিক্ষার্থীর জীবন বিপন্ন। অবৈধভাবে আইসিটি আইন সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ অনেককে নিয়ম বহির্ভূতভাবে শাস্তি দিচ্ছে।
এছাড়াও মুহাম্মদ ইউনুস আমেরিকার সাথে এমন অসম চুক্তি করে গেছেন যেখানে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা একেবারে খর্ব করা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও এই চুক্তির আওতায় শূকরের মাংস এবং শূকরের মাংসের তৈরি বিভিন্ন খাবার আমেরিকা থেকে আমদানি করতে বাংলাদেশ বাধ্য। অথচ বিএনপি–জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর টুঁ শব্দটি নেই।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে বিএনপি–জামায়েত কতই না গলাবাজি করেছে। কিন্তু নিজেরা ক্ষমতায় গিয়ে একটি চুক্তিও বের করতে পারেনি যেটা দেশের স্বার্থবিরোধী।
মুহাম্মদ ইউনুসের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যে বলেছিলেন — “২৬ লক্ষ ভারতীয় বাংলাদেশে কাজ করছে” — তার কোনো হিসাব তিনি দিয়ে যাননি। তবে জনগণ কিন্তু একদিন এর হিসেব নেবেই।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে মুহাম্মদ ইউনুসের লন্ডন গমন এবং ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়ে একটি প্রহসন ও ভাগবাটোয়ারার নির্বাচন শেষে বিএনপি ক্ষমতা নিয়ে দেশকে ইউনুসের পথেই পরিচালিত করছে। ফলে দেশে সব ক্ষেত্রেই স্থবিরতা বিরাজ করছে ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এবং জঙ্গিবাদের উত্থান ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ সাংবাদিক Blitz এডিটর জনাব সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, “বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ২০০৪ সালে রাজশাহী জেলার বাগমারা থেকে শায়েখ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইয়ের নেতৃত্বে প্রথম জাগ্রত মুসলিম জনতা আবির্ভূত হয়, যা পরবর্তীতে জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ নাম ধারণ করে। দেশব্যাপী গত কয়েকদিন যাবত আল কায়েদা, আইসিস এবং হামাসের হাজার হাজার পতাকা ছড়িয়ে পড়েছে। এবার রাজশাহীর মালোপাড়া এলাকায় অবস্থিত দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দেখা গেল এই উদ্বেগজনক দৃশ্য, যেখানে জঙ্গি সংগঠনের পতাকার পাশে রাইফেল উঁচিয়ে ছবি তোলা হচ্ছে। এমনকি শিশুদেরও এসব কাজে উৎসাহিত করা হচ্ছে।”
বাংলাদেশে এসব আলামত দেখার আগেই যুক্তরাষ্ট্রেরই এক সাংবাদিক মাইকেল রবিন ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ফার্স্টপোস্টে বাংলাদেশ নিয়ে লেখা প্রবন্ধের উপসংহারে বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বাংলাদেশকে ধর্মীয় পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা। যুক্তরাষ্ট্রের আরও উচিত আসন্ন নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে প্রকৃত নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনাকে পুনরায় স্বীকৃতি দেওয়া, যেখানে আওয়ামী লীগের সমান অধিকার ও আইনি মর্যাদা থাকবে। অন্য কিছু করা মানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়া এবং আগামী কয়েক দশক ধরে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করা।”
এটি আজ পরিষ্কার, ২০২৪ সালে জুলাইয়ে যে তথাকথিত আন্দোলন হয়েছে এটা ছিল একটা সহিংস আন্দোলন, এটা ছিল মুখোশের আড়ালে জঙ্গি আন্দোলন, এটা ছিল একটা গুজবের আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মুহাম্মদ ইউনুস নিজেই।
তিনি রিসেট বাটন টিপে মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে কিছু নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন যেমন জুলাই যোদ্ধা, জুলাই গণহত্যা, জুলাই জাদুঘর, জুলাই ফাউন্ডেশন, জুলাই ঘোষণাপত্র, জুলাই কোটা ইত্যাদি।জুলাইতে তো কোনো যুদ্ধ হয়নি, তাহলে কেন এই ন্যারেটিভ? মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে এত গাত্রদাহ, তারাই আবার জুলাই কোটা নিয়ে এত সরব! অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে কথিত জুলাইকে দাঁড় করানোর একটা ঘৃণ্য অপচেষ্টা।যারা জুলাইয়ের তথাকথিত সহিংস আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তারা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী। একদিন এই অপরাধীদের বিচার বাংলাদেশেই হবে — শুধু সময়ের ব্যাপার।
তবে ষড়যন্ত্র এবং মিথ্যা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ষড়যন্ত্রকারীদের দিন শেষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশের জনগণ আজ বুঝতে পারছেন যে তারা ষড়যন্ত্রের শিকার। জনগণ আজ জেগে উঠেছে।তারা বুঝতে পারছেন যারা জুলাইপন্থী তারা শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী নয়, তারা এ দেশের অর্থনীতি ধ্বংসকারীও। তারা সাম্প্রদায়িক প্রো-পাকিস্তানপন্থী।
জনগণ নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাস করছে তথাকথিত চব্বিশের জুলাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী অধ্যায়, এই অধ্যায় শোচনীয়ভাবে এবং নির্মমভাবে পরাজিত হবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আগমনের মধ্য দিয়ে।দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে দিন গুনছে শেখ হাসিনার আগমনের অপেক্ষায়। এবার তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নয়, আঠারো কোটি মানুষের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেশে ফিরবেন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশটাকে পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ এবং ২০০৭ সালেও দেশে ফিরে এসেছিলেন সকল প্রতিকূলতাকে জয় করেই। তবে এবারের প্রত্যাবর্তন হবে স্মরণকালের সবচেয়ে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক।
জয় বাংলা , জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক
Former Vice-Chancellor
Sylhet Agricultural University, Bangladesh. Former Visiting Professor, University of Toronto
