চলচ্চিত্র সমাজের কথা বলে। আসলে কোন চলচ্চিত্রই সমাজ ও সময়ের বাস্তবতাকে সচেতন বা অবচেতনভাবে উপেক্ষা করতে পারে না। বলা যায়, চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্প মাধ্যম যার সৃজনশীল বা বিনোদন নির্মাণ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সময়ের ভাবনা, সংকট, দর্শন, ধর্ম, সীমাবদ্ধতা, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট যেন অন্তর্নিহিত থাকে। আর তাই, এই আলোচনার প্রয়োজনীয়তা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপধ্যায় এর কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ এর সার্থক চলচ্চিত্রায়ন করেন সত্যজিৎ রায় ১৯৫৫ সালে। জানা মতে, উপন্যাসের সময়কাল ১৯৩০ এর দিকে এবং বিভূতি বাবু সেই সময়ের বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবন-সংগ্রামের এক অনন্য চিত্রায়ন তুলে ধরেন তার উপন্যাসে; যা অনুধাবন পূর্বক সত্যজিৎ রায় সেই মানুষদের বিশ্ব দর্শক এর কাছে নিয়ে এলেন। ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা এই মুহূর্তে’র উদ্দেশ্য নয়। এমনকি বিভূতি বাবু’র উপন্যাস ও সত্যজিৎ বাবু’র চলচ্চিত্রায়নের কোনো তুলনামূলক উপস্থাপনা করাও লক্ষ্য নয়। এই চলচ্চিত্র আমাদের অনেকের দেখা এবং না’দেখা কারো প্রতি অনুরোধ - সত্বর বাংলা চলচ্চিত্রের এই অতি আবশ্যক শিল্পকর্মটি যেন দেখে নেবার সুযোগ হয়। আমি সরাসরি চলে আসি চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে, যিনি আপাত অর্থে (যে সময়ের কথা সত্যজিৎ রায় তুলে এনেছেন সেই সময়ে) সমাজে অবহেলিত, মনোযোগহীন একজন মানুষ। ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের এই চরিত্রটি হলেন ‘ইন্দিরা ঠাকুরণ’। সম্পর্কে তিনি দুর্গা-অপু’র পিসী, অর্থাৎ হরিহরের বোন। সিনেমায় আমরা স্পষ্ট পাই না, তিনি কি হরিহরের আপন বোন নাকি দূর সম্পর্কীয়। তবে যে উদ্দেশ্যে তিনি শেষ সময়ে নিজের ভিটে’তে মরতে এসেছেন তাতে আমরা ধরে নিতে পারি, তিনি হরিহরের নিকট বোন-ই। উপন্যাসে বিষয়টি কিভাবে আছে তা ভাবতে চাইছিনা। আমরা মূল চলচ্চিত্রের সাথে ভাবনায় সম্পৃক্ত থাকতে চাই। ইন্দিরা ঠাকুরণ ও দুর্গা ‘ইন্দিরা ঠাকুরণে'র অবস্থানটি একটু বুঝে নেই - অতিশয় বৃদ্ধা এই মহিলা বিধবা - স্বামী,সন্তানহীন। পিতৃপ্রদত্ত ভিটেতে একটি ঘরে ভাই-এর ইচ্ছায় তাঁর একমাত্র আশ্রয়। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক কয়েকদিন থাকার ব্যবস্থা থাকলে এই ভাইয়ের আশ্রয় ব্যতীত তাঁর খুব বেশী কোথাও যাবার উপায় নেই। ভাইয়ের সন্তানরা তাঁর কাছে নিজের সন্তানের তুল্য। তাঁর এই ভালবাসা থেকেই আমরা দেখি, বৃদ্ধা পিসীর জন্য ছোটবেলা থেকে দুর্গার দারুন দুর্বলতা। বাগানে কুড়িয়ে পাওয়া ফল-ফলাদি এনে জমা করে পিসীর ভাঁড়ারে। একারণে পিসীও ভাইঝি’র কোনো দোষ মেনে…
মুক্তাঙ্গন-এ উপরোক্ত শিরোনামের নিয়মিত এই সিরিজটিতে থাকছে দেশী বিদেশী পত্রপত্রিকা, ব্লগ ও গবেষণাপত্র থেকে পাঠক সুপারিশকৃত ওয়েবলিন্কের তালিকা। কী ধরণের বিষয়বস্তুর উপর লিন্ক সুপারিশ করা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম, মানদণ্ড বা সময়কাল নেই। পুরো ইন্টারনেট থেকে যা কিছু গুরত্বপূর্ণ, জরুরি, মজার বা আগ্রহোদ্দীপক মনে করবেন পাঠকরা, তা-ই তাঁরা মন্তব্য আকারে উল্লেখ করতে পারেন এখানে। ধন্যবাদ।
‘বীরাঙ্গনা’ একটা শব্দ, একটা সংকেত, এই শব্দটার সাথে কত যে ফিসফাস জড়িত, শুনলেই আমরা নির্যাতিত নারী দেখতে পাই, বিবস্ত্র নারী, চুল দিয়ে উর্ধ্বফাঁস দিয়ে রাখা নারী, পরিখা থেকে পচনশীল হিউমাসের মতন উদ্ধারকৃত মিউটিলেটেড নারী, শিখ সৈন্যদের পাগড়ি দিয়ে লজ্জা নিবারণ করা নারী, মুখ লুকানো আশিরপদনখ বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া নারী। (‘অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’র) এই সব দৃশ্যই আসলে বীরাঙ্গনাদের মৌলিক গুণনীয়ক। যাদের অবিশ্বাস্য নির্যাতনের বিবরণ একনিশ্বাসে আজো পড়া যায় না, যাদের ফিরে আসাকে কেউ স্বাগত জানায়নি, যাদের বেঁচে থাকাকে কেউ সৌভাগ্য মনে করেনি, তাদের জন্যে আমরা একটা শব্দ নিয়োগ করেছি ‘বীরাঙ্গনা’, এর সাথে ব্র্যাকেটবন্দী কিছু ফিসফাস এবং দৃষ্টিভঙ্গী (গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক)। যে মৃত তার জন্যে মিনার আছে, সৌধ আছে, ‘শহীদ’ খেতাব আছে, বীরত্ব তার শ্রেষ্ঠত্বের মালা, তার প্রতীক। যে অঙ্গহানি হওয়ার কারণে অর্ধমৃত, তার জন্যেও কোথাও না কোথাও একটু সহানুভূ্তির-আদরের ‘আহা’ শব্দ আছে, পিঠের ’পরে আত্মীয়তাকামী হাত আছে। যে ‘সম্ভ্রম’ হারালো (একজনের ধর্ষণের কারণে কেমন করে আরেকজন মানুষের সম্ভ্রহামহানি হতে পারে? সম্ভ্রম তো নিজের জিনিস, অত্যুচ্চ এবং সার্বভৌম শব্দ)- তার জন্যে আছে পুনঃসম্ভ্রমহানি, এইবার আত্মীয়তাকামী হাতে, ‘আহা’ শব্দসমেত। ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দের ব্যঞ্জনা এইই, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি সেই শ্রদ্ধা সেই অসমাপ্ত শ্রদ্ধাকে শ্রদ্ধা বলতে রাজি নই, যা এই নারীদের মানুষ-অস্তিত্ব, নারী-অস্তিত্বকে পুনরায় সসম্মানে-সস্নেহে গ্রহণ করতে নারাজ। আমি সেই শব্দে কেবল কৌমার্যপূজারী পুরুষতান্ত্রিক পূঁজ দেখতে পাই, আর কিছু নয়। ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দের বদলে অনেকে এখন ‘বীরজননী’ আখ্যা দেয়া শুরু করেছেন, আসল কথা হচ্ছে, আপনি যাঁকে স্ত্রী হিসাবে, সঙ্গিনী হিসাবে স্থান দিতে অক্ষম হয়েছেন, সেই অক্ষমতা ঢাকতে আপনার এখন তাঁর জন্যে মাতৃত্বের পতিতপাবনী ঢাল দরকার হয়েছে, আরো বড় আড়াল, আরো সক্ষম আরো মহিমময়ী ঢাল। শব্দান্তর করলে কি মনান্তর ঘটে? নাকি নারীর প্রতি মনোভাব বদলায়? আহা যদি তাই হতো! রমা চৌধুরীর ক্রন্দনবিকৃত মুখ দেখে আমাদের চোখে আজ পানি আসে, আমাদের বুক মুচড়ে ওঠে যখন দেখি তিয়াত্তর বছর বয়স্ক এই মহিলা পায়ে জুতা পরেন না, এই মাটিতে কত লাশ, তাঁর সন্তানদেরও লাশ, সে লাশ জুতায় মাড়াবেন কি করে! (আমাদের কি মনে পড়ে শহীদ আজাদের মাকে, ছেলে ভাত খেতে চেয়ে মরে গেছে বলে আর কোনোদিন ভাত খেতে পারলেন না যিনি?)…
আলোক-সম্পাতের জায়গায়ও বোধ করি খামতি দেখা যায় | Mood কে ফুটিয়ে তলার জন্য যে ধরনের আলোর প্রয়োজন, তা যেন ছবিটি দেখাতে পারেনা | এই ক্ষেত্রে বেশির ভাগই outdoor shooting — তাই সময় এবং নিসর্গের বৈচিত্র আছে. ভোর, সন্ধ্যেবেলা, বর্ষা, ইত্যাদি বিভিন্ন পটভূমি আসলেও সেই পটভূমি জীবন্ত হয়ে ওঠে না | অথচ যে গল্পটি বলা হচ্ছে, তা প্রায় সম্পূর্ণই প্রকৃতিনির্ভর এবং অবশ্যই বিশেষ ভাবে নদীকেন্দ্রিক | [...]
প্রায়-অসাধারণ স্ক্রিপ্ট, কিছু কিছু জায়গায় ঝকমকে পরিচালনা, কিছু কঠিণ ও অত্যন্ত তীব্র মুহূর্ত সৃষ্টি করা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি ছবি নদীর নাম মধুমতী | পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল| বাংলাদেশ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি যতই আর্দ্র ও আশাবাদী হোক না কেন, চলচ্চিত্রে আমরা যে পিছিয়ে আছি, এই দুঃখ আমি কোনো সহজ আপ্ত-বাক্যে ভুলতে পারিনা | পিছিয়ে থাকার কারণ বহুবিধ থাকতে পারে, তবে কিছু আবশ্যক কারণ সম্ভবত শব্দ-কারিগরী ও সঙ্গীত পরিচালনার জায়গায় খামতি, অন্তত, এই ছবি দেখে সেই কথাই মনে হয় | সত্যজিত রায়র পথের পাঁচালি-র সঙ্গে কোনো ছবির তুলনা করা উচিত হয়ত হবে না, কারণ সম্ভবত তা এক ধরণের বাড়াবাড়ি বলেই গণ্য হবে | কিন্তু তা না করলেও, আমরা মনে রাখতে চাইব, পথের পাঁচালিকেই আমরা আমাদের মানদন্ড মনে করি | কারিগরী শৈলীর অপ্রতুলতার মধ্যেই সেই ছবি আত্ম-প্রকাশ করেছিল প্রায় আধা-শতাব্দী আগে | কারিগরী যে চলচ্চিত্রের মান নির্ধারণ করেনা, এটি বোধহয় সে কথারই প্রমাণ | Charlie Chaplin এর ছবি গুলিও সেই মতন -- আজকের দিনে ব্যবহার হয় না এমন অনেক কারিগরী ব্যবহার করে, যে মানের ছবি নির্মণ করেছেন তিনি, তা অনুকরণ করাও কঠিন | পৃথিবীতে যে চলচ্চিত্র তৈরী হয়, তার মধ্যে সেরা ছবিগুলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মত ছবি তৈরী হয়েছে বাংলা ভাষায় | যে শিল্পময়তা এসব ছবিতে আমরা লক্ষ্য করি, সেই স্তরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকেও দেখতে চাইব আমরা | তাই সহজে সন্তুষ্ট না হতে পারা, এক অর্থে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও শ্রদ্ধারই নামান্তর | Material বা কাহিনীর বিষয়বস্তুর দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধ যে কত শক্তিশালী, তা বলাই বাহুল্য | কথক বা narrator হিসেবে পরিচালক বেশ পরিচ্ছন্ন ভাবে, সুনির্দিষ্ট ভাবে, বাড়তি ভাবাবেগ বর্জন করে সংক্ষিপ্ত ও সহজ সংলাপ ব্যবহার করেছেন | এই গুণ সত্যজিত রায়র ছবিতে আমরা বারবার দেখি | বাংলাদেশের নাট্য-জগতে এহেন ভালো সংলাপের কোনো অভাব দেখা যায় না | অথচ, বাংলাদেশের সিনেমায় যার অভাব বলে আমরা জানি | গল্পের শুরু শেখ মুজিবের ৭ মার্চএর ভাষণের দিকে | শেষ অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে | এক মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের হাতে তার সত-পিতা (মুসলিম লীগ করেন এবং পারে এক হিন্দু শিক্ষাবিদকে খুন করার পর তাঁর কন্যাকে অপহরণ করেন)-র মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে |…
আমি সাতে পাঁচে থাকার মানুষ নই, আমার দৃষ্টি সবসময় আমার মতো করে বাঁধানো -- সাতে পাঁচের প্যাঁচে বাঁধা [...]
ছোটবেলা থেকে আমার প্রধান কাজ উদ্দেশ্যমূলক মাখামাখি, ওই যে কোনো খেলাই খেলতে পারতাম না সেখানেও আমার মাখামাখি থেকে প্রভাবশালী কারোরই রেহাই ছিল না – খেলার মাঠের ছেলেগুলো কেমন যেন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, পরে জেনেছিলাম আমি মাঠে গেলেই নাকি ওরা বলত, মাখন এসেছে। আর আমি আরেকটি কাজ করতাম, একাজটা আমি বিভিন্ন পরিস্থতিতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করতে পারতাম, এবং সত্যিকার অর্থে বলতে কি – আমার চেয়ে একাজ বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত আর কাউকে আমার চেয়ে ভালভাবে করতে দেখিনি – আমি ভুল লোক দিয়ে ঠিক কাজটি করাতে ঈর্ষণীয়ভাবে দক্ষ। আমি সাতে পাঁচে থাকার মানুষ নই, আমার দৃষ্টি সবসময় আমার মতো করে বাঁধানো -- সাতে পাঁচের প্যাঁচে বাঁধা – এবং এজন্যই আমার সাথে তাল রাখতে আমার গুণগ্রাহী তালবিদরাও সদাসতর্ক থাকেন, আমিও এমনই দৃষ্টিবিদ এমনই সতর্কতা জারি রাখি নিজের উপরও – কাউকে কখনো পরীক্ষামূলক প্যাঁচে ফেলার লোভে পড়ি না, সাতে পাঁচের প্যাঁচে কেউ পড়লে একবারই পড়ে – আর সেখান থেকে বের হতে পারে না। গোপনে এত কথা লেখাটা ঠিক হচ্ছে না, অবশ্য লেখার কারণও আছে, কিন্তু সেকারণটা কোথাও উন্মুক্ত করা যাবে না – কারণ জীবনে এই প্রথম মালেকা আমাকে না জানিয়ে কয়েকটি আমার জন্য প্রাণঘাতী পদক্ষেপ দিয়েছে – যার অভিঘাত আমার মতো গভীর জলের আত্মস্বীকৃত রাজাকারের আসনটাই তছনছ করে দেয় কিনা এই ভয় আমাকে স্নায়বিক তাড়নায় চুরমার করে দিতে চাইছে। চর্মকার মালাকার স্বর্ণকার তো বোঝেন, কাজেই রাজাকারও নিশ্চয়ই বোঝেন – গর্বের সাথে দুদশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে এই রাজা বানানোর কাজ করছি বলে দুনিয়াজোড়া ফুলানো ফাঁফানো আমার যে হাঁকডাক তা কি এবার ধুলিসাৎ হয়ে যাবে? আরো গোপন ডায়েরি : হন্যতে : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোপন ডায়েরি আসব আগের দিন আজ যাই : মনমোহন সিংয়ের গোপন ডায়েরি পুতুল প্রতিভা : মওদুদ আহমেদের গোপন ডায়েরি চাণক্য নই : প্রণব মুখার্জির গোপন ডায়েরি কই মাছের প্রাণ : এরশাদের গোপন ডায়েরি এক বিয়োগ এক : খালেদা জিয়ার গোপন ডায়েরি আমার জলবায়ু : শেখ হাসিনার গোপন ডায়েরি টিপাইমুখ বাঁধ : দীপু মনির গোপন ডায়েরি
