ফেব্রুয়ারী ২০২৬ এর গণভোট অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থা তৈরী করেছে এবং এ আয়োজনের পেছনে রয়েছে জুলাই সনদ ও ১৯৭১-এর মহতী জনযুদ্ধ থেকে জাত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র বিরোধী গোষ্ঠীসমূহের আগামী পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলানো, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক দিক নির্ধারণ করা বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া সাধারণত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না। গণভোটের মাধ্যমে এ জাতীয় বড় ধরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার নিতে যাচ্ছে জামায়াত ও তার নিয়োগপ্রাপ্ত মুহাম্মদ ইউনুস। এ ধরণের পদক্ষেপ গৃহীত হবে সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে। বিশ্বের উদাহরণ থেকে বলা যায়, এ ধরণের আয়োজন সরকারের ও রাষ্ট্রের জন্য এক বা একাধিক ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে যখন সংসদ অনুপস্থিত বা দূর্বল থাকে (বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭ ও ১১)। ঠিক এই সীমাটিই অতিক্রম করেছে মুহাম্মদ ইউনুস ও তার পাপেট সরকার। গণভোটে হাঁ দেয়ার অর্থ সাংবিধানিক সীমা অতিক্রমে তার অনৈতিক ও বেআইনী পদক্ষেপগুলোকে দায়মুক্তি দেয়ার সুযোগ। তা এক কূ-দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এ সরকারকে এসব পদক্ষেপগ্রহণে ছাড় দেয়ার মানে, এরপর যে কেউ তার একক সিদ্ধান্তে সংবিধান, রাষ্ট্র ও দেশ নিয়ে ’যা খুশী, তাই’ করতে পারবে। রাষ্ট্রবিরোধী চক্র দেশের সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দিতে পারবে, গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধান ধ্বংসের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-কাঠামোর মৌলিক চরিত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ কি এ ঝুঁকি নিতে চায়?  

বাংলাদেশ পর্ব এক. বাংলাদেশে এখন “গণভোট” শব্দটি শুনতে কারু কারু কাছে আকর্ষণীয় বোধ হতে পারে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা, চরম অবিশ্বাস, মাসের পর মাস ক্রমাবনতির দিকে যেতে থাকা অর্থনৈতিক অচলাবস্থা এবং কষ্ট-ক্লান্তির মধ্যে গণভোটকে কেউ কেউ হয়তো এক ধরণের শর্টকাট সমাধান হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এ ভাবনাটি ভুল। এই মুহূর্তে গণভোট সমস্যার সমাধান নয়, সমস্যাকে আরো জটিল ও ঘণীভূত করার পায়তাড়া। এ কথা গণ্য—গণভোট গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু সব গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সব পরিস্থিতিতে কার্যকর হয় না। ইতিহাস বলছে, বিভক্ত সমাজে, দুর্বল প্রতিষ্ঠানে, আর অনির্বাচিত শাসনের অধীনে গণভোট প্রায়ই নতুন সংকট তৈরি করে (IDEA, 2022)। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারীতে যে “গণভোট“ সংঘটনের তোড়জোড় চলছে, তা ভালো না খারাপ সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় গণভোট একটি Worst case Scenario. গণভোটের প্রয়োজনীয়তা ও গণভোটের কার্যকারিতা, যে বিষয়েই কথা বলুন না কেন, প্রেক্ষাপটই সবকিছু নির্ধারণ করে। দুই. কীভাবে এটি Worst case Scenario? পাঁচটি দিক থেকে বিচার করা যায় যে আগামী গণভোট গোটা দুনিয়ার গণভোটের ইতিহাস বিচারে একটি মন্দতম পদক্ষেপ। শুরু করা যাক এই মৌলিক প্রশ্ন

দিয়ে—কে গণভোট আয়োজন করছে , কোন ক্ষমতাবলে এবং জনগণের সাথে তার কি সম্পর্ক? গণভোট আয়োজন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার এক ধরণের ট্রানজিশনাল বা ক্ষমতার পালাবদলকালের সহায়ক সরকার। এ সরকারের মূল দায়িত্ব হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরী করা যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করে নির্বাচন সুসম্পন্ন করতে পারে। অন্য কথায়, এ সরকার মাঠ তৈরী করবে, সব খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নিরপেক্ষ থাকবে। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলানো, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক দিক নির্ধারণ করা বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না। গণভোটের মাধ্যমে বড় ধরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে। এটা সরকারের ও রাষ্ট্রের জন্য এক বা একাধিক ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে যখন সংসদ অনুপস্থিত বা দূর্বল থাকে (বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭ ও ১১)। ঠিক এই সীমাটিই অতিক্রম করেছেন মুহাম্মদ ইউনুস ও তার পাপেট সরকার। গণভোটে হাঁ দেয়ার অর্থ সাংবিধানিক সীমা অতিক্রমে তার অনৈতিক ও বেআইনী পদক্ষেপগুলোকে দায়মুক্তি দেয়া।…

যুক্তিবাদী বিশ্বদৃষ্টির সাথে অন্ধ বিশ্বাসপ্রবণদের দ্বন্দ্বের সর্বশেষ শহিদ অভিজিৎ রায়। অভিজিৎদের মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর হয়ে চলেছে কয়েক দশক ধরে। অথচ বাংলাদেশের কথা ছিল তার সবটুকু শক্তি দিয়ে সেক্যুলার মুক্তচিন্তার পরিবেশ গড়ে তোলার [. . .]

এক. আমেরিকা-প্রবাসী ড. অভিজিৎ রায় (জন্ম ১৯৭১) এবার বাংলাদেশে এসেছিলেন অমর একুশের বইমেলায় যোগ দিতে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামপন্থী আততায়ীরা তাঁকে বইমেলা সংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। আততায়ীদের আক্রমণে অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যিনি নিজেও একজন ব্লগার এবং লেখিকা; ‘বিবর্তনের পথ ধরে’ (২০০৭) গ্রন্থটি তাঁরই। কাছাকাছি স্থানেই এই ফেব্রুয়ারি মাসেই এক দশক আগে (২০০৪) মুক্তচিন্তার আরেক পথিকৃৎ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপরও ঠিক এভাবেই আক্রমণ করেছিল ইসলামপন্থী জঙ্গিরা। ছোটবেলা থেকে অভিজিতের বেড়ে ওঠা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই। বিদেশে ডক্টরেট করতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ তাঁর পড়াশোনা। সে বুয়েট ক্যাম্পাসও অদূরেই। আমেরিকায় একটি কোম্পানিতে কর্মরত প্রকৌশলী অভিজিৎ। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি অভিজিৎ শুধু লিখেছেন। প্রচুর লিখেছেন। ব্লগ থেকে শুরু করে গবেষণা নিবন্ধ, মতামত কলাম থেকে শুরু করে বই। একক এবং দ্বৈত প্রকাশনা মিলিয়ে ড. অভিজিৎ রায়ের প্রকাশিত বইগুলো হলো: ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ (২০০৫), ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ (২০০৭), ‘স্বতন্ত্র ভাবনা: মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি’ (২০০৮), ‘সমকামিতা: বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ (২০১০), ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ (২০১১), ‘ভালোবাসা কারে কয়’ (২০১২), ‘বিশ্বাস ও দর্শন’ (২০১২), ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ (২০১৪) এবং ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো: এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে’(২০১৫)। অভিজিৎ রায়ের পিতা পদার্থবিজ্ঞানের পণ্ডিত অধ্যাপক অজয় রায়, বর্তমানে অবসরে। তরুণ বয়সে অজয় রায় নিজে সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এর পর সারা জীবন জ্ঞান সাধনা, এবং শিক্ষকতার মহান ব্রত নিয়ে মানুষ গড়ার পাশাপাশি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেছেন প্রগতিশীল-সেক্যুলার-বৈষম্যহীন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার কাজে। তাই, সন্তানহারা পিতার কাছেও এই দেশটির জবাবদিহিতার মুহূর্ত এটা। দুই. অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ এখনও স্তম্ভিত। সামাজিক মিডিয়াসহ পুরো বাংলা ব্লগমণ্ডল প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে, অভিজিৎ রায়ের লেখাগুলো সর্বশক্তিতে পুনঃপ্রচারে নেমেছে অনেকগুলো প্ল্যাটফর্ম। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে, আর দেশের বাইরে লন্ডন, টরন্টো, নিউইয়র্ক, বার্লিন, সিডনি-তে মানব-বন্ধন থেকে শুরু করে অসংখ্য প্রতিবাদ সমাবেশ হয়ে গেছে গত কয়েক দিনে। অনলাইন আর অফলাইন এর প্রতিবাদে বারবার হ্যাশট্যাগে উঠে এসেছে: 'JeSuisAvijit', 'আমিই অভিজিৎ', 'আমরা অভিজিৎ'। সুষ্ঠু তদন্ত আর বিচারের পাশাপশি মুক্তচিন্তার অনুসারীদের নিরাপত্তার দাবিই এ মুহূর্তে মুখ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই অভিজিৎ রায়ের স্মৃতিস্তম্ভ দাবি নিয়েও এগিয়ে এসেছে সেক্টর কমান্ডার'স ফোরাম। ইতিমধ্যে হত্যার উস্কানিদাতা এক জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। তদন্ত চলছে। আমেরিকা থেকে এফবিআই-এর একটি তদন্ত…

“এখন আমাদের দাবি, যে করেই হোক খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকার তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করুক। আমি মনে করি না যে, শুধুমাত্র খুনিদের ধরাটাই যথেষ্ট। আমি সরকারের প্রতি সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য আবেদন জানাই, সেই সাথে লেখক-হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না আনার যে আইনি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বন্ধ করার দাবি জানাই।” — রাফিদা আহমেদ বন্যা

সেন্টার ফর ইন্‌কোয়াইরি-র ওয়েবসাইটে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ড. অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজ্ঞান-লেখক রাফিদা আহমেদ বন্যার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। বাংলা কমিউনিটি ব্লগ এলায়েন্স-এর পক্ষ থেকে তাঁর এই বিবৃতির বাংলা অনুবাদ এখানে সংকলিত হলো ফরিদ আহমেদের অনুবাদে, মুক্তমনা-র সৌজন্যে। . . . রাফিদা আহমেদ বন্যার বিবৃতি : আমার স্বামী অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নিয়ে লেখালেখি করতেন, তিনি ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনামুখর ছিলেন। শুধুমাত্র এই কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। গত ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনাকীর্ণ ক্যাম্পাসে আমরা দুজনে হামলার শিকার হই। অভিজিৎকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আমি কোনোক্রমে বেঁচে যাই। তাঁর স্ত্রী, একই ধারার লেখক এবং একজন মুক্তচিন্তক হিসাবে, আমি এই পৈশাচিক সন্ত্রাসের তীব্র নিন্দা করি। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হচ্ছে সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। অভিজিৎ নিজেও এই ক্যাম্পাসেই বেড়ে উঠেছেন। মৃত্যুর হুমকি থাকা সত্ত্বেও আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারি নি যে, এরকম একটা জঘন্য অপরাধ এখানে সংঘটিত হতে পারে। এই অপরাধ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিলো না, ছিলো বাক স্বাধীনতা এবং মানবতার বিরুদ্ধে। আমি আর অভিজিৎ যখন নৃশংসভাবে আক্রান্ত হচ্ছি, স্থানীয় পুলিশ খুব কাছেই নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন আমাদের দাবি, যে করেই হোক খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকার তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করুক। আমি মনে করি না যে, শুধুমাত্র খুনিদের ধরাটাই যথেষ্ট। আমি সরকারের প্রতি সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য আবেদন জানাই, সেই সাথে লেখক-হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না আনার যে আইনি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বন্ধ করার দাবি জানাই। আমি যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে তার প্রতি সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং আমাদের সাথে এক হয়ে সুবিচার দাবি করার আহ্বান জানাচ্ছি। আরো পড়ুন/শুনুন : বিবিসিকে দেয়া বন্যার ইংরেজি সাক্ষাৎকার : এখানে। বিবিসি বাংলাকে দেয়া বন্যার বাংলা সাক্ষাৎকার : এখানে।  

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.