বাংলাদেশ পর্ব
এক.
বাংলাদেশে এখন “গণভোট” শব্দটি শুনতে কারু কারু কাছে আকর্ষণীয় বোধ হতে পারে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা, চরম অবিশ্বাস, মাসের পর মাস ক্রমাবনতির দিকে যেতে থাকা অর্থনৈতিক অচলাবস্থা এবং কষ্ট–ক্লান্তির মধ্যে গণভোটকে কেউ কেউ হয়তো এক ধরণের শর্টকাট সমাধান হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এ ভাবনাটি ভুল।
এই মুহূর্তে গণভোট সমস্যার সমাধান নয়, সমস্যাকে আরো জটিল ও ঘণীভূত করার পায়তাড়া।
এ কথা গণ্য—গণভোট গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু সব গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সব পরিস্থিতিতে কার্যকর হয় না। ইতিহাস বলছে, বিভক্ত সমাজে, দুর্বল প্রতিষ্ঠানে, আর অনির্বাচিত শাসনের অধীনে গণভোট প্রায়ই নতুন সংকট তৈরি করে (IDEA, 2022)।
বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারীতে যে “গণভোট“ সংঘটনের তোড়জোড় চলছে, তা ভালো না খারাপ সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় গণভোট একটি Worst case Scenario. গণভোটের প্রয়োজনীয়তা ও গণভোটের কার্যকারিতা, যে বিষয়েই কথা বলুন না কেন, প্রেক্ষাপটই সবকিছু নির্ধারণ করে।
দুই.
কীভাবে এটি Worst case Scenario?
পাঁচটি দিক থেকে বিচার করা যায় যে আগামী গণভোট গোটা দুনিয়ার গণভোটের ইতিহাস বিচারে একটি মন্দতম পদক্ষেপ। শুরু করা যাক এই মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে—কে গণভোট আয়োজন করছে , কোন ক্ষমতাবলে এবং জনগণের সাথে তার কি সম্পর্ক?
গণভোট আয়োজন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার এক ধরণের ট্রানজিশনাল বা ক্ষমতার পালাবদলকালের সহায়ক সরকার। এ সরকারের মূল দায়িত্ব হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরী করা যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করে নির্বাচন সুসম্পন্ন করতে পারে। অন্য কথায়, এ সরকার মাঠ তৈরী করবে, সব খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নিরপেক্ষ থাকবে।
রাষ্ট্রের কাঠামো বদলানো, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক দিক নির্ধারণ করা বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না। গণভোটের মাধ্যমে বড় ধরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে। এটা সরকারের ও রাষ্ট্রের জন্য এক বা একাধিক ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে যখন সংসদ অনুপস্থিত বা দূর্বল থাকে (বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭ ও ১১)। ঠিক এই সীমাটিই অতিক্রম করেছেন মুহাম্মদ ইউনুস ও তার পাপেট সরকার। গণভোটে হাঁ দেয়ার অর্থ সাংবিধানিক সীমা অতিক্রমে তার অনৈতিক ও বেআইনী পদক্ষেপগুলোকে দায়মুক্তি দেয়া। তা দেয়া মানে এক কূ-দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এটা করতে দেয়ার মানে, এরপর যে কেউ তার একক সিদ্ধান্তে সংবিধান নিয়ে যা খুশী করতে পারবে। রাষ্ট্রবিরোধী চক্র দেশের সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দিতে পারবে, গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধান ধ্বংসের মাধ্যমে রাষ্ট্রের চরিত্র বিনষ্ট করতে সক্ষম হবে।
তিন.
ফেব্রুয়ারীর গণভোটকে জনগণের সিদ্ধান্তরূপে বাধ্যতামূলক দেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণ এ পদক্ষেপের প্রতিবাদ করতে পারছে না। দেশের আইন ও জনসুরক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করার মাধ্যমে মব-সন্ত্রাসের নিয়ন্ত্রণে দেশ চালাচ্ছে বর্তমান সরকার। এই মবগোষ্ঠীর হাতে প্রতিদিন সাধারণ মানুষ লুণ্ঠিত ও নিহত হচ্ছে। তাদের সয়–সম্পত্তি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অওয়ামী ট্যাগ দিয়ে পথে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা এ্যারেষ্ট করে জেলে পাঠানো হচ্ছে। জামাতে ই ইসলামী দলটি তাদের জোটভূক্ত ইসলামীদলগুলোর নারীরা এবং কতিপয় এলিট নারী যারা এদের সাথে থেকে ক্ষমতাবানদের সাহচর্যের জীবন চায় তাদের সহ্য করা ব্যতিত বাকি গোটাদেশের নারী সমাজকে ক্ষমতার যাওয়ার আগেই, এখনই ইসলামি শরিয়া মানতে বাধ্য করছে নানাভাবে। নগরে–বন্দরে, পথে–ঘাটে ও গ্রামে –গঞ্জে নারী সমাজ চরম হেনস্তার শিকার হচ্ছে পর্দা না করার কারণে। স্বয়ং জামাতের আমীরের ফেসবুক পোস্ট এ বাইরে কর্মরত নারীদের নৈতিকতাচ্যূত প্রস্টিটিউশনের নারী বলা হয়েছে লিখিতভাবে।বাংলাদেশ একটি চৈতন্য ও নৈতিক ভাবনায় অগ্রসরমান মুক্ত সমাজের দেশ; এখানে বহুভাষী, বহুসংস্কৃতি ও বহুধর্মের মানুষ তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেঁচে ছিলেন এতদিন। এখন তাদের সেই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাদের মানতে বাধ্য করার পদক্ষেপ হিসেবে শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ওদিকে জামায়াত দেশের বাইরের পশ্চিমা শক্তির কাছে আমীর ধারণা দিচ্ছে তারা অত্যন্ত দুধে ধোয়া চরিত্রের, তারা শরিয়া রাষ্ট্র করবে না। একটি ইসলামী জোট এই ধরণের দু’মুখো আচরণ করছে শুধুমাত্র পশ্চিমা শক্তির সাহায্যে দেশের ক্ষমতায় বসতে। এই মিথ্যের অন্যতম উদাহরণ “গণভোট” আয়োজন।
গণভোটের প্রক্রিয়াটি জনসাধারণের মুখ দিয়ে ‘হাঁ; উত্তর বের করে এ সরকারের সব বেআইনী অবৈধ সংস্কার–কার্যক্রম বৈধ করিয়ে নেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গণভোটের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নগুলো অস্পষ্ট, বহুস্তরীয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যতাড়িত। গণভোটের মাধ্যমে জনগণকে আবোল তাবোল বুঝিয়ে এসব সংস্কারকার্য পাশ করিয়ে নিতে পারলে দেশের বাইরের ও ভেতরের নানা শক্তির প্রভাবে রাষ্ট্রের মৌলিক চেহারা ও খোল নলচে বদলে দেয়া যাবে। এমন মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটানো বে–আইনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসা এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধিকারের বাইরে। কিন্তু ইউনুসের নেতৃত্বে এই সরকার সেদিকেই হাঁটছে। তারা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে এই গণভোট। জনগণ এটা মানতে বাধ্য নয়।
চার.
গণভোটের প্রশাসন নিরপেক্ষ নয়, এমন কি বর্তমানে নিরাপত্তা বাহিনীও পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। এমন সময় এই গণভোট পরিকল্পনা করা হচ্ছে যখন প্রধান বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলো, যারা রাষ্ট্রের জন্ম ও বিকাশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাদেরই অন্যায়ভাবে আইন সংশোধনের মাধ্যমে বলপূর্বকভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।
এই গণভোট এমন সময় সংঘটিত করার চক্রান্ত চলছে যখন বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্রে রূপান্তরের ষড়যন্ত্রে নিয়োজিত জামাত–ই–ইসলামী এবং তার সহযোগী দলসমূহের জোটকে ক্ষমতায় আনতে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার পূর্ণোদ্যমে মদদ দিচ্ছে। সে লক্ষ্যে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানসহ গণমাধ্যমও অধিকার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে এসব গণমাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি, মিথ্যে তথ্য ও ষড়যন্ত্রমূলক সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
পাঁচ.
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গণভোটের ঝুঁকি ও সমস্যাবলি জনগণের বোঝা অত্যন্ত জরুরী। সে আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে আসুন গণভোটের উদ্দেশ্য কী এবং কখন তা কার্যকর হয় এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক।
সাধারণত গণভোট তখনই যৌক্তিক হয়, যখন একটি স্থিতিশীল সাংবিধানিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে, তা পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকে, সব রাজনৈতিক পক্ষ “গণভোট“খেলাটির নিয়ম মোটামুটি মেনে নেয় এবং গণভোটের প্রশ্ন স্পষ্ট ও সীমিত থাকে। এর কোনোটিই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান নয়।
গণভোট সবচেয়ে কার্যকর হয় সেই সমাজে যেখানে এক ধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমঝোতা বিরাজমান এবং দেশে রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা রয়েছে অথচ কোনো একটি সুস্পষ্ট ও সীমাবদ্ধ সাংবিধানিক প্রশ্নে গণভোট জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ এসব শর্ত স্পষ্টভাবে পূরণ করার অবস্থানে নেই, কেননা দেশে চরম অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সংবিধান লংঘনের ধারাবাহিক ঘটনা ঘটে চলেছে এবং জনগণের ও দেশের নিরাপত্তাহীনতা ঝুঁকিতে রয়েছে।
ছয়. বলা অমূলক হবে না যে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে প্রতিদিন।
বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে, সমাজকে বলপূর্বক মেরুকরণ করে রূপান্তরের প্রয়াসের যে কোনও প্রেক্ষাপটে গণভোট আয়োজিত হলে প্রথমত সেই গণভোট গণ–বিভাজনকে প্রকটতর করে তোলে, ব্রেক্সিট এর একটি উদাহরণ। এ ধরণের গণভোট চরমকর্তৃত্ববাদীদের সংহতিকে বৈধতা দেয়। এ সময়ে জনগণের সাময়িক আবেগকে পুঁজি করে কিছু এলিট জনগণের নামে অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দেখা গেছে, খুব কমক্ষেত্রেই এসব সিদ্ধান্ত ভঙ্গুর কিম্বা আহত গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয়েছে।
সাত.
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারীর বারো তারিখের গণভোট জনগণের সরল বিশ্বাসকে ভ্রান্তপথে পরিচালনার এক প্রয়াস।
এখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। পশ্চাদকারণও স্পষ্ট, তাদের বিশ্বে দেখানো দরকার যে জনগণ তাদের বৈধতা দিয়েছে। ‘এ সরকারের জনপ্রিয়তা বৈধ‘ এ মিথ্যে দাবী তাদের সঠিক, এ কথাটা প্রমাণ করা তাদের জন্য জররী হয়ে পড়েছে। এ সরকার ও মুহাম্মদ ইউনুস আকাঙ্ক্ষা করছেন এই গণভোট দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়গুলো সম্পূর্ণ বদলে ফেলার এখতিয়ার তাদের দেবে।
কিন্তু বাস্তবে এ গণভোট দেশ বিষয়ক জটিল প্রশ্নগুলোকে দ্ব্যর্থবোধক চারটে প্রশ্নে নামিয়ে এনেছে। জনগণের বিপুল ত্যাগে ও শ্রমে এবং রক্তপাতে ১৯৭১ সালে যেসব মূল্যবোধ থেকে বাংলাদেশের জন্ম সে সব মূল্যবোধ ও প্রতিশ্রুতিকে পদদলিত করে চলেছে এ সরকার। সংখ্যালঘুর মতামতকে নগণ্য করে তুলেছে। যে জনগণ সকল মানুষের অধিকারে বিশ্বাসী, যারা স্বাধীনতার রক্ষক তাদেরই বিরোধী দলে ঠেলে দিয়ে বৃহত্তর জনসংখ্যাকে ১৯৭১ এর বয়ান বিষয়ে মুখ বন্ধ করে রাখতে বাধ্য করছে। এ সরকার রাজনীতিকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তারপর বিগত সতের মাসে রাজনীতির পুণর্গঠনের বদলে নিপীড়ন, হত্যা ও বিনাবিচারে আটকের মাধ্যমে দেশের জনগণকে ভয় ও পীড়নে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ফলে গণভোট থেকে উদ্ভূত সমস্যা আগামীতে বহুমাত্রিক হবে। বাংলাদেশ নিয়ে জামায়াতের রাজনৈতিক সমস্যা কাঠামোগত—দ্বিমাত্রিক নয়।
আট.
আসুন দেখি এসব চরম পথ গ্রহণ না করে এ সরকার কি করতে পারতো। ২০২৪ এর ষড়যন্ত্রমূলক সহিংস অভ্যূত্থানের পর ইসলামীদলগুলো ও কোটা প্রতিবাদকারীদের দ্বারা গঠিত সরকার মবতন্ত্র দ্বারা দেশ পরিচালনা করছে। আঠারো মাস পর ফেব্রুয়ারীতে একতরফাভাবে ইসলামিক দলগুলো ও তাদের জোটের একটি সাজানো নির্বাচন জনগণের ওপর বলপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছে। এ পথে না গিয়ে বরং সরকার বাংলাদেশের জনগণকে দিতে পারতো সেই সহায়তা যা এক ধ্বংসাত্মক সময়ে এ দেশের প্রয়োজন ছিল: যেমন,
১. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে সে সব পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারতো;
২. একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পথে যেতে পারতো;
৩. সংসদীয় বিতর্ক ও আলোচনার পরিবেশ রক্ষায় ব্রতী হতে পারতো;
৪. ব্যাপক সম্মতির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে সংস্কার প্রয়োজন হলে সংস্কারের পথ উন্মুক্ত করতে পারতো।
সুস্পষ্টভাবে বলতে হয়, এখন বাংলাদেশের গণভোট দরকার নেই।
নয়.
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে—মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গণভোট আয়োজনের ঝুঁকি নানাবিধ: তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পশ্চিমাবিশ্বে নোবেল পুরষ্কার পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে পূজনীয় হতে পারেন, দেশের অভ্যন্তরে তিনি অনির্বাচিত। সে কারণেই গণভোট আয়োজন তার গণতান্ত্রিক সীমার বাইরে পড়ে। কিন্তু সে সীমা অতিক্রম করেই মুহাম্মদ ইউনুস নিজের ও তার ধামাধরা কিছু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত তথাকথিত এলিটের নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি একের পর এক অদক্ষতা দেখিয়েছেন। তিনি জনগণের বিপন্নতা উপলব্ধি করার মতো মানসিকতা রাখেনা দেখিয়েছেন। অপরদিকে সুস্পষ্টভাবেই প্রকাশ করেছেন যে পিপলস্ রিপাবলিকের পিপলের মতামতকে তিনি উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একদিকে জনপ্রতিনিধিত্বের ভূমিকাকে পদদলিত করেছেন, অপরদিকে অভিজাত কিছু দেশী ও বিদেশীয় ব্যক্তির ‘যা খুশী তাই করি‘র ইচ্ছে দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করছেন বাংলাদেশ। সাথে আছে তার অনুগামী অযৌক্তিক বিকৃত বয়ান বলে যাওয়া একটি নব্য গোষ্ঠী যারা নয়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
দেশে প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতা চলমান থাকা অবস্থায় জনগণকে জোর করে ভয় দেখিয়ে বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে গণভোট দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে সরকার নিজের ফ্যাসিস্ট পরিচয় উন্মুক্ত করেছে। এসব কারণেই ভোট–পরবর্তী বৈধতার সংকট এ সরকারের কাটবে না বরং আরো বাড়বে।
ভঙ্গুর রাজনৈতিক এই সময়ে দ্রুতগতিতে যা ইচ্ছে তাই করা যথোপযুক্ত ও প্রফেশনাল আচরণ নয়, বরং অর্বাচীনতার পরিচায়ক। প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব নয় গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠান সক্ষম হওয়া ও সেসব কার্যকর রাখাই অতীব জরুরী।
দশ.
কিভাবে সরকার দায়িত্বশীল ও দায়বদ্ধ একটি অবস্থান তৈরী করতে পারতো?
গণভোট শক্তিশালী গণতান্ত্রিক উপকরণ বটে। তবে তা গভীরভাবে মেরুকৃত ও বলপূর্বক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে কখন, কি ধরণের কর্তৃত্ব, কোন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির কারণে, কি করছে সে সব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ছাড়া গণভোট বিদ্যমান সংকট সমাধানের বদলে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল সমস্যা গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট (নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ), কর্তৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকাবস্থায় ভয়, ভ্রান্ত তথ্য ও ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন জনপরিসরের ওপর চেপে বসেছে ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েমে যুদ্ধরত এক গোষ্ঠী, যারা প্রতারণার মাধ্যমে সরকার পতন ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সর্বমানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মানবতাহীন নৈরাজ্যের দিকে সাধারণ জনতাকে ঠেলে দেয়ার অবস্থান রাষ্ট্রের কাছে কখনোই স্বীকৃত ও আদৃত ছিল না। এ সরকার রাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তন তো করছে উপরন্তু ১৯৭১ সালে যাদের পরাজিত করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থান সেই শত্রু দেশের সাথে ধর্মের কারণে তারা দেশের ক্ষতি করে হলেও সম্পর্ক রিকনসিলিয়েশন চা। এ কাজটি করার আগে সরকার বৃহত্তর জনগণকে জিজ্ঞেস করার ধার ধারে নি। সে জাতীয় আরো নানা পদক্ষেপ যা জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ আছে সেসব সংবিধানের অন্তর্গত করার উদ্দেশ্যেই এই ‘গণভোট’ এর আয়োজন।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণভোট গণতন্ত্র পুনর্গঠনের কোনো বিকল্প নয়, বরং এমন এক ঝুঁকি যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেই বিপন্ন করার সম্ভাবনার দুয়ার খূলে দিচ্ছে।
এগার.
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে দেশের সব উন্নয়ন ধ্বংসকারী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক প্যারাডক্সে বাস করছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত, অস্থায়ী এবং সে কারণেই এ সরকারের কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা প্রক্রিয়াভিত্তিক, রূপান্তরমুখী নয়।
আগেই বলেছি, এ সরকারের বৈধতা আসতে পারতো তিন পথে: এক. রাজনৈতিক রূপান্তর পরিচালনার এমন এক বাতাবরণ তৈরীর পথে গিয়ে যেখানে সকলেই এগিয়ে আসতে পারছে। দুই. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা এবং সেগুলো কর্মক্ষম ও স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে। তিন. নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং নিরপেক্ষভাবে সব দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে।
প্যারাডক্সটি হলো—
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়েও মুহাম্মদ ইউনুস তার নেতৃত্বকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করছে। এ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি তার সীমিত ম্যান্ডেট অতিক্রম করেছেন। তিনি ভেবেছেন দেশের জনগণের মুখ বন্ধ আছে, তারা কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। অতীতে একাধিকবার জনগণকে তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করে বলেওছেন, জনগণের ভোট নাকি (মতামত) দশটাকায় কেনা যায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে সাংঘর্ষিক অবস্থাটা কিভাবে সৃষ্টি হচ্ছে?
বিষয়টি বোঝা কঠিন নয়। মূল কথা হলো, একটি অনির্বাচিত সরকার জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের কাঠামোগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুমোদন চাইছেন যাতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সে প্রক্রিয়ার এতকাল ধরে গড়ো তোলা বৈধতা শক্তিশালী না হয়ে আরও দূর্বল হয়। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন তিনি চাইছেন কিভাবে? মাত্র চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে যে প্রশ্ন জনসাধারণের জন্য সহজ নয়,সেগুলো আলোচনার সুযোগ নেই, সেসব নিয়ে ভাববার ও মতামতের সুযোগ নেই, তিনি জনগণকে শুধু ‘হাঁ‘ বলতে চাপ দিচ্ছেন। সরকারের সকল কর্মীকে ‘হাঁ’ ভোটকে বিজয় িকরার লক্ষ্যে কাজে লাগানো হয়েছে।
তার চেহারা দেখে তার সরকারের গত আঠারো মাসের ধ্বংস, হত্যা, বিপন্নতা, জনগণকে অরক্ষণীয় করে ফেলার যাবতীয় অপকর্ম এবং আগত বিপজ্জনক কালে তিনি আরও যা যা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করবেন, সে সবকে জনগণ ‘হাঁ’ বলবে। একজন নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি এই উন্নাসিক দাবীটাই করছেন।
দেশ কিছু নয়, দেশের মানুষ কিছু নয়, মানুষের প্রাণ, সহায় সম্পত্তির বিনষ্টি, মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার উন্নয়নে তার কোনও পদক্ষেপ না থাকা কোনো ব্যাপার না। মানুষ শুধু তাকে দেখে, তার নোবেলের কথা শুনে তাকে আওর রেখে দেবার জন্য ভোট দেবে। বাংলাদেশ এই অচিন্ত্যনীয় ফ্যাসিস্ট, তথাকথিত পুঁজিবাদের মেশিন এলিটের কালে এখন বাস করছে।
বারো.
ইউনুস–নেতৃত্বাধীন গণভোটের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতাটা সংক্ষেপে কি?
আন্তর্জাতিকভাবে ইউনুসের একধরণের উপযোগিতা এবং এনজিওভিত্তিক নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে তার কর্তৃত্ব থাকলেও সে সবকে রাজনৈতিক সমর্থন বলা যায় না। যতোই জামায়াত ও এনসিপি ধরণের দল তাকে সমর্থন দিক না কেন তার রাজনীতির কোনো দলীয় কাঠামো নেই।
তাকে উপলব্ধি করতে হবে তার পদের তিনটি কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে:
ঝুঁকি ১: ক্ষমতাকাঠামোতে তার প্রবেশ বলপূর্বক, তার নেতৃত্বের আসনে আসীন হওয়ার পেছনে ও শত শত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের এবং জুলাই মাস ও ৫ অগাস্ট পরবর্তী হত্যাগুলোর অপরাধ। যে কারণে এসবের তদন্তে তাকে কখনও আগ্রহী মনে হয় নি। কিন্তু আজ হোক কি কাল, জনগণ সে সব মুত্যুর তদন্ত করবে। জুলাইয়ের সহিংসতার পথে ধরে এসে এখন তিনি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট পেতে নিজের নোবেল পরিচয়ের কর্তৃত্ব আরোপ করছেন দেশের জনগণের ওপর। এভাবেই তিনি ক্ষমতার মুরুব্বীর পদ দখল করতে চাইছেন। আগামী গণভোট রাষ্ট্রের কোনো মূলনীতির ওপর নয় বরং মুহাম্মদ ইউনুস তার নিজের ওপর গণভোট সংঘটন করছেন। নীতিগত স্পষ্ট অবস্থানের বদলে তিনি নিজের নোবেলের ওপর আস্থাভিত্তিক ভোট চাইছেন। গত আঠারো মাসে কি এটা স্পষ্ট হয়নি যে জনগণ তার ওপর আস্থা রাখার কোনো কারণ নেই?
তার এই গণভোটের পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক।নৈতিক বৈধতা আর সাংবিধানিক বৈধতা এক জিনিস নয়। তিনি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। যদি জনগণ তাকে গণভোটে ‘হাঁ‘ ভোট দেয়, তাহলে তারা একটি বিপজ্জনক ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে। ধারণাটি কি? ভবিষ্যতে জনগণের কাছে না গিয়ে, তাদের মতামত না চেয়ে, শর্টকাটে যে কোনও এলিট, অর্থবান, খ্যতিমান এসেই রাষ্ট্র পরিচালনার পদে বসে যাবে এবং যা খুশী তাই করতে পারবে। এই নজির মুহাম্মদ ইউনুস তৈরি করছেন। এই কারণে তিনি নিজে গণভোটের পক্ষে ‘হাঁ ভোট দিতে জনগণকে আহ্বান করেছেন।
খুব অদ্ভূত নয় কি? কিছুটা আয়রণি তো বটেই। এই আহ্বান তিনি সেই জনগণের কাছে রাখছেন যারা কেমন আছে, তাদের কি সমস্যা হচ্ছে সে সব বিষয়ে তিনি কখনো জানার চেষ্টা করেন নি। জনগণের রিপাবলিককে দেয় ট্যাক্স ও তিনি দিতে অস্বীকার করছেন।
ঝুঁকি ২: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও মুহাম্মদ ইউনুস সংঘাত ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবে গণভোটকে ব্যবহার করছেন। তিনি কয়েকটি লক্ষ্য হাসিল করতে চান:
১. রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটাতে চান;
২.বিরোধী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করতে চান;
৩. ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে “জনগণের ইচ্ছা” হিসেবে উপস্থাপন করতে চান;
৪. তিনি গণভোটকে জনপ্রতিনিধিত্বের সাথে এলিট ব্যক্তির দ্বন্দ্বের হাতিয়ারে পরিণত করতে চান। এই দ্বন্দ্বের অন্যতম এলিট তিনি নিজে।
দেখা যাচ্ছে সংকট সমাধানের চেয়ে সংকটকে আরো জটিল করে তুলতে তিনি আগ্রহী। এবং সঙ্কটকে জিইয়ে রেখে ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে সুযোগসন্ধানীদের ছেড়ে দিয়ে রেখেছেন। ওদিকে ব্যক্তিগত আখেরও গুছিয়ে নিচ্ছেন বেশ। তার ধারণা তিনি সব আইনের বাইরে চলে যেতে পারবেন। পারবেন কি?
ঝুঁকি ৩: ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার অধিকারী ব্যক্তির ও গোষ্ঠীর হাতে গণভোট এক ধরণের অস্ত্র। এ অস্ত্র দিয়ে মুহাম্মদ ইউনুস ও তার সরকার গত আঠারো মাস কি করেছেন তা নানা মাধ্যমে প্রকাশিত। তিনি জনগণের রক্তের দামে অর্জিত স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের বয়ানকে উল্টে দিতে পুরণো ধর্মীয় রাষ্ট্রের বয়ান পূনঃর্নির্মাণের কারখানা খুলেছেন, সে বয়ান নিয়ন্ত্রণ করছেন, এবং হাতের মুঠোয় রেখেছেন গণমাধ্যম ও প্রশাসন। নিয়ন্ত্রণ চলছে একদিকে ভয় অপরদিকে লোভ দেখিয়ে।
বাংলাদেশে বর্তমানে গণমাধ্যম ব্যবস্থা চূড়ান্ত অসম ও নিয়ন্ত্রিত। গ্রামীণ এলাকা ক্ষমতা কাঠামোতে জামায়াত–ই ইসলাম ও ইসলামিক দলগুলোর বর্বর নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা চলছে। একদিকে ধর্মের ভয়, হত্যাকাণ্ড ও আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার ভয়, অপরদিকে জামায়াতকে সমর্থন দিলে ইহকাল ও পরকালে আরামে থাকার পৃষ্ঠপোষকতার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনযুদ্ধের ও জনঅংশগ্রহণে দেশ গঠনের গোটা বয়ানকে বদলে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এসব দিনেদুপুরে সবার সামনেই ঘটছে। ধরুন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগে, বয়ান দখলের মাধ্যমে, জনগণের ইচ্ছাকে অস্বীকার করে গণভোট আয়োজন হলো। তারপরও জনগণ ছাড়া কিন্তু পাচ্ছে না। জনগণকে হুমকী দেয়া হচ্ছে ভোটের ফলাফল দেখে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট দিয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা হবে। এ হুমকী কে দিচ্ছে? জামায়াত ই ইসলাম। যেহেতু জামায়াত–শিবির মুহাম্মাদ ইউনুস ও তার সরকারের নিয়োজক ও সমর্থক, ধরে নেয়া যায় এই পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় মুহাম্মাদ ইউনুসের সম্পূর্ণ অনুমোদন রয়েছে।
তের.
সাংবিধানিক ও আইনি সমস্যার কয়েকটি দিক দেখা যাক।
বাংলাদেশের সংবিধান অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা বলে না বরং প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচিত সংসদ ছাড়া গণভোটের মাধ্যমে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যদি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক রূপ বদল ঘটে এবং ক্ষমতার পুনর্বণ্টন ঘটে, তবে তা ট্রানজিশনাল জাস্টিসের পথে সাংবিধানিক অস্পষ্টতা সৃষ্টি করবে অথবা সংবিধানকে মূল্যহীন করে দেবে।
রাষ্ট্রকে এ প্রক্রিয়া বড়োধরণের সঙ্কটে ফেলে দেবে। ইতিমিধ্যেই তা আইনি চ্যালেঞ্জ ডেকে আনছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও দেশের অভ্যন্তরে গণবিভ্রান্তি তৈরী করছে, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চাপ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখছে, এবং রাষ্ট্রীয় যে দু’ একটি প্রতিষ্ঠান এখনও কোনওক্রমে টিকে আছে সেগুলোকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ফেলেছে।
২০২৪ সালের জুলাইতে কোটার ছলছুতায় সহিংস পরিস্থিতি তৈরী করে ৫ অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে যে সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন থেকে দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অচলাবস্থা বিরাজমান। আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বোঝা এবং দৃশ্যমান আস্থার সংকটের পাশাপাশি বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। একই সাথে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে হলেও প্রবল ভারতবিরোধীতা তৈরী করা হয়েছে ও তা জিইয়ে রাখা হচ্ছে ব্যার্থ-রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে গড়ে তোলা নবপ্রেমে উজ্জীবিত বন্ধুত্বের স্বার্থে। যার সর্বশেষ ফলাফল দেখা গেলো ক্রিকেটদলকে খেলা থেকে সরিয়ে পথে বসিয়ে দেয়ার আয়োজনে।
চৌদ্দ.
মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের দীর্ঘমেয়াদকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতার সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে প্রায় প্রতি পদক্ষেপে। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হয়েছে যেখানে আমরা পরবর্তি সরকারের একটি কাঠামো সহজেই অনুমান করতে পারি। অনির্বাচিত সরকার গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে উদ্যোগী হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় এ সরকার গণতন্ত্র নয়, বরং স্থায়ী অস্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী।
এই পরিস্থিতিতে আগামী বারো ফেব্রুয়ারীর গণভোট দেশের জন্য, জনগণের জন্য এক বিপুল সংকট, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেছে।
স্বদেশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কর্তব্য এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পরিকল্পনাকে নস্যাত করা। গণভোটকে বর্জন করা।

সাংবাদিক, সেকুলার যুক্তিবাদী লেখক, মানবাধিকার এ্যাক্টিভিস্ট। চরমপন্থী ইসলমিক মৌলবাদী দল ও জিহাদী জঙ্গীরা লাগাতার জবাই, ধর্ষন, ও বিচারে ফাঁসীর হুমকী দিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে দেশহীন মানুষ। বর্তমানে ইউরোপ ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় লিখে থাকেন। তার লেখার কেন্দ্রে রয়েছে নর্ডিক দেশগুলো এবং দক্ষিণ এশীয় জাতিরাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার বিষয়ক প্রশ্নগুলো। বিদ্যালয় জীবন থেকে সৃষ্টিশীল লেখালেখিতে নিয়োজিত। গ্রন্থ সংখ্যা: বারো (সাহিত্য), পাঁচ ( সাহিত্য ও উন্নয়ন গবেষণা বিষয়ে)
