অপরাধের সাথে সামমঞ্জস্যহীন লঘু দণ্ড প্রদানের এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতে বিচারাধীন অন্যান্য মামলাগুলোর রায়ে শাস্তি প্রদানের মানদন্ডের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আইসিএসএফ এর পক্ষ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আইসিএসএফ আশা প্রকাশ করে যে, নিন্ম আদালতে অপরাধীর অপরাধের মাত্রা প্রমাণে কোন দূর্বলতা থেকে থাকলে উচ্চতর আদালতে আপিল শুনানিতে সেটি সংশোধিত হবে এবং উচ্চ আদালতে যথার্থ সর্বোচ্চ দণ্ড প্রদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে সাধারণ মানুষ এবং ১৯৭১ এর অগণিত ভিকটিমদের ন্যায়বিচারের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে। [...]

গত ৫ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়ে অপরাধীর লঘু শাস্তিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত এবং নির্যাতিত মানুষ এবং তাঁদের স্বজনদের আশার প্রতিফলন হয়নি বলে মনে করে বিচারের পক্ষের নাগরিকদের দ্বারা সংগঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ)। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল যিনি ১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, হত্যা, হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা, ধর্ষন ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ এ তার বিরুদ্ধে আনা ৬ টি অভিযোগের ৫ টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করায় বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে আইসিএসএফ এর পক্ষ থেকে। আইসিএসএফ বিশ্বব্যাপী ১৩টি ভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন ব্যক্তির সমন্বয়ে ২০০৯ সালে গঠিত একটি ফোরাম, যারা ১৯৭১ সালে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান, আইনের শাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭১ সালে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়। একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, এবং তাদের দ্বারা সৃষ্ট রাজাকার আলবদর এবং আল-শামস বাহিনী কর্তৃক সংঘঠিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসমূহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারের এখতিয়াভুক্ত, যা একটি স্বাধীন আদালত। তবে আইসিএসএফ মনে করে যে ট্রাইবুনালে তথ্য-প্রমাণসহ কাদের মোল্লার প্রমাণীত অপরাধসমূহের ভয়াবহতা, নৃশংসতা এবং ব্যাপ্তির সাথে তাকে প্রদত্ত যাবজ্জীবন কারাদন্ড সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। ফলে উক্ত রায়ে প্রদত্ত এই লঘু দণ্ডে সাধারণ মানুষ এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ ও নির্যাতিত মানুষ এবং তাঁদের স্বজনদের আশার প্রতিফলন ঘটেনি। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারকে এগিয়ে নিতে যত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সংগঠন সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন তাঁদেরকেও এই রায় হতাশ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পূর্বে অপর পলাতক অপরাধী আবুল কালাম আযাদের বিচারে ঘোষিত মৃত্যুদন্ড এবং সেখানে এই একই ট্রাইবুনাল কর্তৃক অনুসৃত শাস্তি প্রদানের মানদন্ডের সাথে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায়ে ঘোষিত শাস্তি সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে আইসিএসএফ মনে করে। অপরাধের সাথে সামমঞ্জস্যহীন লঘু দণ্ড প্রদানের এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতে বিচারাধীন অন্যান্য মামলাগুলোর রায়ে শাস্তি প্রদানের মানদন্ডের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আইসিএসএফ এর পক্ষ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আইসিএসএফ আশা প্রকাশ করে যে, নিন্ম আদালতে অপরাধীর অপরাধের মাত্রা…

চাকমা রাজার মৃতদেহ বাংলাদেেশ সমাহিত করার পক্ষে অনেকেই কিছু যুক্তি তুলে ধরছেন। সবিনয়ে সেখানকার অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করছি। কারণ, এ জাতীয় যুক্তি বিভ্রান্তিজনক [..]

[অণুব্লগ] যারা মনে করবেন রাজাকার ত্রিদিব রায়ের লাশ সমাহিত করার ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই সুযোগে পাহাড়ী-আদিবাসীদের ওপর ঢালাওভাবে এক হাত নেবেন, সুযোগ বুঝে তাদের অধিকারকে খাটো করার চেষ্টা করবেন - তারা এই পোস্ট থেকে দূরে থাকুন। আবার যারা মনে করেন রাজা ত্রিদিব রায়ের ইস্যুকে উপলক্ষ্য করে এই সুযোগে ১৯৭১ এর চিহ্নিত এক অপরাধীর কৃতকর্মকে 'আদিবাসী অধিকার' ইত্যাদি ইস্যুর সাথে মিলিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুযোগ নেবেন, এবং পক্ষান্তরে এই অপরাধীর কৃতকর্মকে জায়েজ করিয়ে নেবেন, তারাও দূরে থাকুন। এখানে কথা হচ্ছে একজন চিহ্নিত অপরাধীকে নিয়ে। অপরাধীর কোনো জাত নেই, বর্ণ নেই, সম্প্রদায় নেই। তার শেষ ঠিকানা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়। ১৯৭১ এর সকল অপরাধীর বিচারের দাবীতে আমরা সোচ্চার, ঠিক যেভাবে সবসময় সোচ্চার ছিলাম এবং আছি সকল পাহাড়ী এবং আদিবাসীদের অধিকার এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ইস্যুতে। পাশে আছি, পাশে থাকবো, কিন্তু ১৯৭১ এর চিহ্নিত অপরাধীর ইস্যুতে কোনো আপস নেই, তা সে যে ধর্মের, বর্ণের, সম্প্রদায়েরই হোক না কেন। -------------------------- লেখক কুলদা রায় লিখেছেন 'রাজা ত্রিদিব আর রাজাকার ত্রিদিব : ত্রিবিধ কথা' শিরোনামে। সেখানে তিনি চাকমা রাজার মৃতদেহ বাংলাদেেশ সমাহিত করার পক্ষে যে যুক্তিগুলো তুলে ধরলেন, সবিনয়ে সেখানকার অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি। কারণ, এ জাতীয় যুক্তি বিভ্রান্তিজনক। #১: লেখক প্রশ্ন করেছেন - 'ত্রিদিব রায়ের বিরুদ্ধে কি এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র কোনো যুদ্ধাপরাধের মামলা করেছে?' এর পর লেখক নিজেই উত্তর দিচ্ছেন - 'করেনি'। এটুকু লিখেই তিনি প্রসঙ্গটি ছেড়ে দিয়েছেন। (অন্তর্নিহিত সাব-টেক্সট: সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন - ত্রিদিবকে অপরাধী বলা ঠিক হচ্ছে না!) -- লেখকের এই প্রশ্নের এবং তার নিজেরই দেয়া উত্তরের শাণে নজুল বোঝা কঠিন। বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী চৌধুরী মুঈনউদ্দিন, আশরাফুজ্জামানদের বিরুদ্ধেও এর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধ বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি। সুতরাং, প্রশ্নটা কি এভাবে আদৌ উত্থাপন করা যায়, নাকি উত্থাপন করাটা সঙ্গত? তাহলে কি তাদের নিরপরাধ ধরে নিয়ে আমাদের সবার এতদিন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা উচিত ছিল? আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না দায়ের হওয়ার মতো এমন সংকীর্ণ যুক্তিই মুঈনুদ্দিন-আশরাফুজ্জামানদের দেশী-বিদেশী বন্ধুরা ফলাও করে তুলে ধরতেন এতদিন, আমাদের সেটাও দেখা আছে। এখন আমার প্রশ্ন হল - রাষ্্্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের অনুপস্থিতিতে '৯০ এর দশকে শহীদ…

...সামাজিক আন্তর্জালগুলো ব্যবহার করে সংগঠিত এই তরুণ-তরুণীরা তখনো জানতেন না, নতুন এক ইতিহাস লিখতে যাচ্ছেন তারা। তারা জানতেন না, নতুন এই ইতিহাস পাল্টে দিতে চলেছে গণতন্ত্রের ধারণা, বদলে দিতে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের প্রক্রিয়া। তারা জানতেন না, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা আর কার্যক্রমও নতুন করে খতিয়ে দেখার পরিসর তৈরি করবে তাদের এই আপাতদৃষ্টিতে অসংগঠিত ও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।...

শীত ছুঁই ছুঁই সেপ্টেম্বরের ১৭-তে নিউইয়র্কের জুকোট্টি পার্কে মাত্র শ দুয়ের মতো তরুণ-তরুণী অবস্থান নিয়েছিল তাঁবু, টর্চলাইট ইত্যাদি নিয়ে। তার আগে তারা সারাদিন পদযাত্রা করেছে বিভিন্ন রাস্তায়। তখন তাদের সঙ্গে ছিল আরো অনেক সঙ্গী। তাদের সবার লক্ষ্য, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ওয়াল স্ট্রিট দখল করা। ওয়াল স্ট্রিটের কাছে জুকোট্টি পার্কে অবস্থান নেয় তারা সবাই- কেননা অন্য কোনো পার্কে অবস্থান নেয়া সম্ভব ছিল না, ব্যক্তিমালিকানাধীন এ পার্কটিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা, যেখানে অবস্থান নিলে রাষ্ট্রশক্তি জোর খাটিয়ে তাড়িয়ে দিতে পারবে না রাতের বেলা। কিন্তু সন্ধ্যার পর যতই সময় গড়াতে শুরু করল, বিক্ষোভকারীর সংখ্যাও ক্রমেই কমতে শুরু করল, হাজারখানেক থেকে তা কমে এসে দাঁড়াল শ'দুয়েকে। কেননা অবস্থান নেয়ার অনুমতি থাকলেও পার্কে তাঁবু টাঙানোর অনুমতি ছিল না। কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নেয়ার পর এমন হলে হতোদ্যমই হওয়ার কথা কিন্তু হতাশ হননি তারা। যদিও সামাজিক আন্তর্জালগুলো ব্যবহার করে সংগঠিত এই তরুণ-তরুণীরা তখনো জানতেন না, নতুন এক ইতিহাস লিখতে যাচ্ছেন তারা। তারা জানতেন না, নতুন এই ইতিহাস পাল্টে দিতে চলেছে গণতন্ত্রের ধারণা, বদলে দিতে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের প্রক্রিয়া। তারা জানতেন না, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা আর কার্যক্রমও নতুন করে খতিয়ে দেখার পরিসর তৈরি করবে তাদের এই আপাতদৃষ্টিতে অসংগঠিত ও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। তারা এ-ও জানতেন না, যে যে মতাদর্শেরই হোন না কেন, এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে তারা আবারো জীবন্ত করে তুলছেন পুরনো এক মুক্তিকামী চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক নেতাকে - কার্ল মার্কসকে। ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল কর’ আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের কাউকে কাউকে প্রেরণা জুগিয়েছে আরব বসন্ত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে এ রকম একটি বিক্ষোভের পরিস্থিতি দানা বাঁধতে শুরু করে প্রকৃতপক্ষে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাবের পর থেকেই-যা ২০০৯ সালে আমেরিকায়, পরে যুক্তরাজ্যেও তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করে। ১৯৩০-এর দশকের বিশ্ব অর্থনীতির মহামন্দার পর যেমন বিশ্বের দেশে দেশে মুক্তির আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, ২০০৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়েও তেমনি মানুষের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে নতুন করে। করপোরেট মিডিয়াগুলো ‘আরব বসন্ত’কে বড় করে তুললেও বিক্ষোভের সূচনা ঘটে মূলত ইউরোপেই, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, গ্রিস ও স্পেনে। আরব দেশগুলোতে বিক্ষোভ দেখা দেওয়ায় করপোরেট মিডিয়াগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, ইউরোপের বিক্ষোভকে…

ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজের বর্তমান ছাত্রীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত। [...]

অনেকেই আমাদের বলেন আমরা নাকি ‘প্রিভিলেজড গ্রুপ’। সমাজের 'ফরচুনেট' অংশের প্রতিনিধি। বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সন্তানই আমাদের অধিকাংশ। বিত্তবান না হলেও সচ্ছল বলা চলে আমাদের অনেককেই। খাওয়া-পরা-পড়াশোনা-টিভি দেখা-ঘুরে বেড়ানো এসব খাতে হিসেবের মধ্যে থেকেও আমাদের জন্য কিছুটা বিলাসি খরচ মাঝে-মাঝেই হয়তো করেন আমাদের অভিভাবকেরা। আবদার-আহ্লাদ করে খেলনা-জামাকাপড়-গল্পের বই দশবার চাইলে পাঁচবার তো নিদেনপক্ষে মিলেই যায়! কিন্তু সচ্ছলতার নির্ভরতার চেয়েও বড় ‘প্রিভিলেজ’ হল আমাদের জীবনের এক পুঁজি যা থেকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েশিশু বঞ্চিত -- সেই পুঁজির নাম ‘স্বপ্ন’। আমাদের মা কিংবা বাবা যেদিন প্রথম আমাদের নির্ভরতার-আঙুল-পেলেই-মুঠি-মুড়ে-ধরে-ফেলার ছোট্ট হাত ধরে এই বিশাল চত্বরের মাঝে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেদিন প্রথম নিজেদের স্বপ্ন আমাদের মাঝে সংক্রমিত করেছেন তাঁরা। তাঁদের মেয়েদের রয়েছে স্বপ্ন দেখার অধিকার, ব্যক্তিত্ববিকাশের অধিকার, বড় হয়ে সমাজ-গড়ায় নিজ নিজ হাতের ছাপ রাখার অধিকার -- তাঁরা জানতেন এবং বিশ্বাস করতেন! বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, প্রায়-নিষ্ঠুর পরীক্ষা—প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ভয়-ভীতি-বাধার তীব্রতা অতিক্রম করে অবলীলায় মা’কে স্কুলগেটের বাইরে পিছে ফেলে এসে নতুন বন্ধুর পাশে এসে বসতে পেরেছি আমরা শুধু ওই স্বপ্ন-সংক্রমণের কারণে। ওই সংক্রমণ আমাদের পুতুলের মত ঠুনকো শিশুশরীরে সঞ্চার করেছে অপার শক্তি। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে মায়ের শ্রমে শিখে আসা বাংলা বর্ণমালা আর ইংরেজি এলফাবেট দিয়ে দুনিয়াটাকে দেখতে শিখেছি; পড়তে শিখেছি ক্লাসের আপার দেওয়া পাঠ; কাঁড়ি-কাঁড়ি হোমওয়ার্কের বোঝা বহন করেছি; সমাধান করেছি বীজগণিতের খটোমটো ফরমুলা; চোখ গোল করে গল্প শুনেছি ইতিহাসের; পাবলিক পরীক্ষার ভুতুড়ে সকালে চুলে তেল দিয়ে টান-টান করে বেণি বেঁধে কলমের খস-খসানিতে পৃষ্ঠা ভরিয়েছি; কেমিস্ট্রি ল্যাবের বীকারে সবজে-নীল অধঃক্ষেপ দেখে পৃথিবীকে রঙিন ভেবেছি; বিতর্কের মঞ্চে প্রতিপক্ষের তার্কিক আর বিচারক প্যানেলকে চমৎকৃত করেছি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরাডুবির খতিয়ান দেখিয়ে; বিশাল কাঠের বোর্ডে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে মেধাবী সিনিয়ার আপুদের নাম, সেই ১৯৬১ সাল থেকে; ঘাড় কাত করে সেই নামগুলো দেখেছি আর ভেবেছি ওদের মত হতে পারব কিনা। আর বাড়ি এসে মাকে দিয়েছি তাচ্ছিল্যের ভর্ৎসনা -- “ধ্যুত, আমাদের আপা বলেছেন এটাই ঠিক। মা, তুমি কিচ্ছু জানো না!” মা নিশ্চয়ই খুশি হয়ে ভাবতেন, “ছোট্ট মেয়েটা কত বড় হয়ে যাচ্ছে!” বাবাকে বলতেন, “জানো তোমার মেয়ে স্কুলে কী কী করে? কী কী শেখে?” বাবা আত্মপ্রসাদের হাসি হাসতেন। মুখে বলতেন না, কিন্তু মনে…

সুফিয়া কামালের জন্ম হয়েছিল আলোর জন্যে প্রতীক্ষারত অন্ধকারাচ্ছন্ন উপনিবেশে। ঔপনিবেশিকতার ওই অন্ধকার ঘিরে রেখেছিল কেবল নারীকে নয়, পুরুষকেও। অন্ধকার ঘিরতে চেয়েছিল সুফিয়াকেও। [...]

সুফিয়া কামালের জন্ম হয়েছিল আলোর জন্যে প্রতীক্ষারত অন্ধকারাচ্ছন্ন উপনিবেশে। ঔপনিবেশিকতার ওই অন্ধকার ঘিরে রেখেছিল কেবল নারীকে নয়, পুরুষকেও। অন্ধকার ঘিরতে চেয়েছিল সুফিয়াকেও। যদিও অভিজাত পরিবারের কন্যা ছিলেন, আর সাত বছর বয়সে উকিল বাবাকে হারানোর পর বারো বছর বয়সে যাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সেই সৈয়দ নেহাল হোসেন ছিলেন উদার মানুষ। সাহিত্যচর্চা আর সমাজসেবায় সুফিয়াকে তিনি প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। সুফিয়া বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন আভিজাত্যের অন্ধকার থেকে, তিনি তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষার সহযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা তাঁকে যত অনুপ্রাণিতই করুক না কেন, সমাজ ও রাজনীতিতে রাজত্ব করছিল অন্ধকারই -- সে রাজত্বে গড়পড়তা সব মেয়েরই বিয়ে হত বাল্যকালেই, ব্যতিক্রম ছিলেন না সুফিয়াও। তবে তিনি সৌভাগ্যবতী, বাল্যবিয়ে হলেও শিক্ষার সংস্পর্শে থাকতে পেরেছিলেন, বাড়িতে উর্দুর চল থাকলেও বাংলা শিখেছিলেন, স্বামী তাঁকে বাংলা ভাষা আর সাহিত্যের প্রতি উৎসাহী করে তুলেছিলেন, সাহিত্য ও সাময়িক পত্রপত্রিকার সঙ্গে তাঁকে পরিচিত করে তুলেছিলেন, তিনি এই সহমর্মিতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন এবং নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের জন্যে, যে-সংগ্রাম নারীকে শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেবে। সুফিয়া কামাল যে অন্যরকম একজন মানুষ হয়ে উঠলেন, তার একটি অন্যতর কারণ এই -- পারিপার্শ্বিক সহমর্মিতাকে তিনি তাঁর মহৎ কর্মযোগে কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি জানতেন সবার জীবন তাঁর মতো নয়, এরকম সহমর্মিতা কোনও নারীর জীবনে বিরল, তাদের জীবন ও ভাগ্য বাঁধা গড়পড়তা অন্ধকারে, সেই অন্ধকারে দু’-একজনের চারপাশ থেকে যত দ্যুতিই বিচ্ছুরিত হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাই সবাই মিলে আলোর দিকে যাত্রা করা, আলোর অভিযাত্রী হওয়া। তিনি যত বড় হয়েছেন, নিজেকে ততই নিয়োজিত করেছেন আলোর অভিযাত্রায়, অন্যান্যদেরও আহ্বান করেছেন আলোর অভিযাত্রী হতে। নিজের জীবনে পাওয়া সহমর্মিতার ওই মাধুর্যকে তিনি সর্বজনীন করে তোলার অভিপ্রায়ে কাজ করে গেছেন। প্রায় উপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসনামল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধউত্তর কি সামরিক কি বেসামরিক অগণতান্ত্রিকতার যে-নগ্ন শাসনে সবখানেই তিনি উচ্চকিত হয়েছেন আর তাঁকে কেন্দ্রভূমিতে রেখে উচ্চকিত হয়েছে বাংলার নারীরাও। এইভাবে সুফিয়া কামাল পথিকৃৎ হয়েছেন, হয়েছেন প্রেরণাদায়ী, এমনকি তিনি যখন আর সক্রিয়ভাবে রাজপথে নামতে পারেন না, তখনও আন্দোলনকারীরা জানতেন, ধানমন্ডির একটি বাড়িতে একজন মানুষ আছেন, তিনিও তাঁদের সঙ্গে আছেন, তাঁর সেই বাড়ি ছিল আন্দোলনকারীদের খোলা প্রান্তর। বাঙালি…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.