ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজের বর্তমান ছাত্রীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত। [...]

অনেকেই আমাদের বলেন আমরা নাকি ‘প্রিভিলেজড গ্রুপ’। সমাজের 'ফরচুনেট' অংশের প্রতিনিধি। বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সন্তানই আমাদের অধিকাংশ। বিত্তবান না হলেও সচ্ছল বলা চলে আমাদের অনেককেই। খাওয়া-পরা-পড়াশোনা-টিভি দেখা-ঘুরে বেড়ানো এসব খাতে হিসেবের মধ্যে থেকেও আমাদের জন্য কিছুটা বিলাসি খরচ মাঝে-মাঝেই হয়তো করেন আমাদের অভিভাবকেরা। আবদার-আহ্লাদ করে খেলনা-জামাকাপড়-গল্পের বই দশবার চাইলে পাঁচবার তো নিদেনপক্ষে মিলেই যায়! কিন্তু সচ্ছলতার নির্ভরতার চেয়েও বড় ‘প্রিভিলেজ’ হল আমাদের জীবনের এক পুঁজি যা থেকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েশিশু বঞ্চিত -- সেই পুঁজির নাম ‘স্বপ্ন’। আমাদের মা কিংবা বাবা যেদিন প্রথম আমাদের নির্ভরতার-আঙুল-পেলেই-মুঠি-মুড়ে-ধরে-ফেলার ছোট্ট হাত ধরে এই বিশাল চত্বরের মাঝে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেদিন প্রথম নিজেদের স্বপ্ন আমাদের মাঝে সংক্রমিত করেছেন তাঁরা। তাঁদের মেয়েদের রয়েছে স্বপ্ন দেখার অধিকার, ব্যক্তিত্ববিকাশের অধিকার, বড় হয়ে সমাজ-গড়ায় নিজ নিজ হাতের ছাপ রাখার অধিকার -- তাঁরা জানতেন এবং বিশ্বাস করতেন! বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, প্রায়-নিষ্ঠুর পরীক্ষা—প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ভয়-ভীতি-বাধার তীব্রতা অতিক্রম করে অবলীলায় মা’কে স্কুলগেটের বাইরে পিছে ফেলে এসে নতুন বন্ধুর পাশে এসে বসতে পেরেছি আমরা শুধু ওই স্বপ্ন-সংক্রমণের কারণে। ওই সংক্রমণ আমাদের পুতুলের মত ঠুনকো শিশুশরীরে সঞ্চার করেছে অপার শক্তি। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে মায়ের শ্রমে শিখে আসা বাংলা বর্ণমালা আর ইংরেজি এলফাবেট দিয়ে দুনিয়াটাকে দেখতে শিখেছি; পড়তে শিখেছি ক্লাসের আপার দেওয়া পাঠ; কাঁড়ি-কাঁড়ি হোমওয়ার্কের বোঝা বহন করেছি; সমাধান করেছি বীজগণিতের খটোমটো ফরমুলা; চোখ গোল করে গল্প শুনেছি ইতিহাসের; পাবলিক পরীক্ষার ভুতুড়ে সকালে চুলে তেল দিয়ে টান-টান করে বেণি বেঁধে কলমের খস-খসানিতে পৃষ্ঠা ভরিয়েছি; কেমিস্ট্রি ল্যাবের বীকারে সবজে-নীল অধঃক্ষেপ দেখে পৃথিবীকে রঙিন ভেবেছি; বিতর্কের মঞ্চে প্রতিপক্ষের তার্কিক আর বিচারক প্যানেলকে চমৎকৃত করেছি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরাডুবির খতিয়ান দেখিয়ে; বিশাল কাঠের বোর্ডে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে মেধাবী সিনিয়ার আপুদের নাম, সেই ১৯৬১ সাল থেকে; ঘাড় কাত করে সেই নামগুলো দেখেছি আর ভেবেছি ওদের মত হতে পারব কিনা। আর বাড়ি এসে মাকে দিয়েছি তাচ্ছিল্যের ভর্ৎসনা -- “ধ্যুত, আমাদের আপা বলেছেন এটাই ঠিক। মা, তুমি কিচ্ছু জানো না!” মা নিশ্চয়ই খুশি হয়ে ভাবতেন, “ছোট্ট মেয়েটা কত বড় হয়ে যাচ্ছে!” বাবাকে বলতেন, “জানো তোমার মেয়ে স্কুলে কী কী করে? কী কী শেখে?” বাবা আত্মপ্রসাদের হাসি হাসতেন। মুখে বলতেন না, কিন্তু মনে…

একজন মন্ত্রী ছাড়া এই বৃত্ত অসম্পূর্ণই থাকে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বৃত্ত অসম্পূর্ণ[...]

একজন মন্ত্রী ছাড়া এই বৃত্ত অসম্পূর্ণই থাকে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বৃত্ত অসম্পূর্ণ এবং এই অসম্পূর্ণতা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত সচলতা দেয় না – নাগরিকদের নিয়ত আলোচনার গণ্ডী থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে অনতিক্রম্য দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখে – তাই জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বৃত্তের পরিবর্তে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী হয়ে ওঠে সেনা, নৌ, বিমান ঘাঁটি আর সম্মিলিত সামরিক গোয়েন্দা ঘাঁটি। কিন্তু এরকম কথার ভিত্তি কী? বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মন্ত্রীহীন কখন ছিল? বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়কে যদি চারটি পর্বে ভাগ করি – মুক্তিযুদ্ধকালীন পর্ব, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও এর পরবর্তী বাকশাল সরকারের পর্ব, স্বৈরশাসকদের সরকারের পর্ব ও স্বৈরশাসন পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের পর্ব (যার ভেতরে কয়েকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ও একটি সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুপর্ব আছে)। আমরা দেখি, স্বৈরশাসকদের সরকারের পর্বটি ছাড়া অন্য তিন পর্বেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশে ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদই ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও বাকশাল সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবের হাতে থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। স্বৈরশাসকদের সরকারের পর্বে অবিকল্পভাবেই জিয়া ও এরশাদের হাতেই ছিল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ১৯৯১-এর পরে দুবারের খালেদা সরকার ও একবারের হাসিনা সরকারের দুই প্রধানমন্ত্রীই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের হাতেই পূর্ণ মেয়াদে রেখে দিয়েছিলেন। ২০০৭-০৮এর সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান উপদেষ্টার হাতেই ছিল এবং ২০০৮এর নির্বাচনে নির্বাচিত হাসিনা সরকারও এখনো পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এককভাবে তার নিজের হাতেই রেখে দিয়েছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে ও জরুরী অবস্থায় সরকার প্রধানের হাতেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বাভাবিকভাবে ন্যাস্ত থাকে – কারণ সেসময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী আসলে যুদ্ধমন্ত্রী ও জরুরী অবস্থার সর্বোচ্চ প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। তো আমরা দেখতে পাচ্ছি একমাত্র শেখ মুজিবের সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রী ছাড়া আর কেউই আমাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আজো ঠাঁই নিতে পারেননি। এই ভিত্তিতেই আমি বলছি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মন্ত্রীহীন এবং তাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বৃত্ত অসম্পূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হল : অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা। এই চারটি মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি ও ধরন এমন যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে এই চারটি মন্ত্রণালয়ের কোনো একটির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা অসম্ভব। তাহলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা কী অসীম…

গল্পগুচ্ছের সাথে আমার পরিচয় বাল্যকালে, নীল কাপড়ে বাঁধাই একখানা মোটা বই, গোড়ার দিকে অরুণদা বলে কে একজন আমার বাবার অগ্রজপ্রতিম ভদ্রলোক বাবার বৌভাতে বইখানা উপহার দিয়েছেন -- সেটা বাঁকা বাঁকা হরফে লেখা। অতএব, গল্পগুচ্ছ প্রথমত আমার কাছে ছিল সেই সময়ের চিহ্ন [...]

গল্পগুচ্ছের সাথে আমার পরিচয় বাল্যকালে, নীল কাপড়ে বাঁধাই একখানা মোটা বই, গোড়ার দিকে অরুণদা বলে কে একজন আমার বাবার অগ্রজপ্রতিম ভদ্রলোক বাবার বৌভাতে বইখানা উপহার দিয়েছেন -- সেটা বাঁকা বাঁকা হরফে লেখা। অতএব, গল্পগুচ্ছ প্রথমত আমার কাছে ছিল সেই সময়ের চিহ্ন -- যখন লোকে বিয়েতে বই উপহার দিত। আর সবকিছুকে যেমন মা চিনিয়ে দেন -- ‘ন’ চেনান, ন-এ নদী চেনান… সেইরকম করে আমাদের মা আমাদের গল্পগুচ্ছ চিনিয়েছিলেন। বাইরে ঝুপঝুপ বৃষ্টি, ঘরের কোণে কোণে অন্ধকার আর এই দেয়াল থেকে ঐ দেয়াল অব্দি দড়ি খাটিয়ে ভেজা শাড়ি-কাপড় মেলে দেয়া, কাপড়ের মাড়-আর্দ্রতা-নীল-গুঁড়োসাবানের গন্ধ ঠাসা সেই ঘরে আমাদের দু’পাশে রেখে আম্মা পড়ে শুনিয়েছিলেন -- ‘কাবুলিওয়ালা’ আর ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’। ‘হামি সসুরকে মারিবে’ শুনে কত হেসেছিলাম। আর পদ্মাতীরে সেই কদমফুললোলুপ শিশুর করুণ মৃত্যু আমাকে কত যে কাঁদিয়েছিল। সে তো কেবল শুরু, এই পরিজ্ঞানের শুরু যে আমাদের সাহিত্য শিশুর মৃত্যুতে আকীর্ণ (বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’, ‘পুঁইমাচা’ কিংবা ‘কিন্নরদল’, রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’, শরৎচন্দ্রের ‘পণ্ডিতমশাই’), তারপরে আরেকদিন, আম্মার কাছে বসেই পড়া -- ‘বলাই’। মনে মনে বলাই যে আমার কী আপন, ঘাসিয়াড়া যেদিন আসে, সেদিন তার ‘শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর’, আর আমার বেলায় -- যেদিন কাগজওয়ালা আসে, পুরাতন কাগজ-বই-খাতা ওজন করে কিনে নিয়ে যায় -- এই বৈশ্য আচার আমার দারুণ অপছন্দ। ঘাসফুলের জন্যে -- কন্টিকারির জন্যে বলাইয়ের অপার ভালবাসা আমাকে স্পর্শ করে। তারপরে ক্রমেই ‘ইচ্ছাপূরণ’, ‘অতিথি’ আর ‘ফেল’। আস্তে আস্তে আমার দাঁত সবল হতে শুরু করেছে তখন, আমি নেড়েচেড়ে দেখছি তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ -- “বউ হাসিয়া বলিল -- কার আমার? -- বলিয়া শিবনাথের গায়ে হাসিয়া ঢলিয়া পড়িল। শিবনাথ চট করিয়া তাহার মুখে চুম্বন করিয়া বসিল। নান্তি মুখ মুছতে মুছতে বলল -- কি রকম ভাত-ভাত গন্ধ তোমার মুখে!...”। এর পরে তারাশঙ্করের ছোটগল্পগুলি, বাংলা সাহিত্যের যা চিরকালীন সম্পদ, ‘অগ্রদানি’, ‘না’, ‘তারিনী মাঝি’ এইসব। কিন্তু গল্পগুচ্ছ সেই রাঙামাটির এবড়োখেবড়ো পথের বাইরে, এ যেন ধ্রুপদ, তার তাল-লয় -- তার অবারিত বাক্যপ্রবাহ -- তার ঈষৎ শ্লেষ -- তার ব্যাজস্তুতি এইসব আমাকে ফেলে কখন সামনে চলে যায়, তার নাগাল মেলে না। এত শব্দ আছে বাংলায়, তাদের এমন রঙিন পরিচ্ছদ, তারা এমনি এসে ভেসে যায়? “মাল্যদান পড়, একটু সহজ ভাষায়…

কিবরিয়ার অবয়বী ছবির মধ্যে আমাকে বিশেষভাবে টানে ‘গোরস্তান’ নামের একটি ছবি, যার উল্লেখ ইদানীংকার আলোচনায় চোখে পড়ে না। [...]

মোহাম্মদ কিবরিয়ার ছাত্রজীবনের ছবির কথা জানা যায় তাঁর নিজেরই মৌখিক স্মৃতিচারণ থেকে। ১৯৪৫ থেকে ’৫০-এর মধ্যে আঁকা ছবিতে নব্য-বঙ্গীয় শৈলী ও অণুচিত্রের অনুপ্রেরণার কথা তিনি বলেছেন। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে বেরোনোর পর তাঁকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছিল যামিনী রায় -- কেবল তাঁর লোকচিত্র-অনুপ্রাণিত স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ছবি নয়, পশ্চিমের উত্তর-অন্তর্মুদ্রাবাদী ধারায় আঁকা কিছু নিসর্গচিত্রও। কিবরিয়ার সঙ্গে আলাপচারিতার সূত্রে ঘনিষ্ঠজনেরা এসব কথা জেনেছেন; কিন্তু সেই আদিপর্বের কোনো ছবির প্রতিলিপি কোথাও পুনর্মুদ্রিত হতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ১৯৫৯ সালে চিত্রকলা ও ছাপচিত্রে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য জাপানে যাবার আগে পর্যন্ত যে আট-নয় বছর কিবরিয়া ঢাকায় কাটিয়েছেন, প্রথমে নওয়াবপুর স্কুলে এবং পরে জয়নুল আবেদিনের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ীভাবে ও ১৯৫৪ থেকে পাকাপাকিভাবে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে, সেই কালপর্বটিকেই অগত্যা তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়। এই পর্বের বহুল-আলোচিত ‘জলকেলি’, ‘পূর্ণিমা’, ‘চন্দ্রাহত ঘোড়া’ ইত্যাদি তৈলচিত্রে ঘনবাদী চিত্রশৈলীকে নিজের মতো করে, তাঁর ভাষায় ‘খুব হালকাভাবে’, ব্যবহার করেছেন কিবরিয়া। ১৯৬২-তে উচ্চশিক্ষা সমাপন শেষে দেশে ফেরার আগেই তাঁর ছবিতে পর্বান্তর ঘটে গেছে। বিখ্যাত জাপানি শিল্পী হিদেয়ো হাগিওয়ারা-র (১৯১৩--২০০৭) কাছে ছাপচিত্রে নিবিড় ও নতুনতর পাঠ গ্রহণ, সে-দেশের প্রকৃতি ও বিশেষত উদ্যানসজ্জা এবং সেইসঙ্গে অন্যান্য দৃশ্য-ও-মননগত অভিজ্ঞতার অভিঘাত তাঁর শিল্পভাবনায় গভীরভাবে পড়েছে। এ সময়ে আঁকা তাঁর বিমূর্ত শৈলীর ছবিগুলো তার সাক্ষ্যবহ। পরবর্তী পাঁচ দশক জুড়ে তাঁর খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশে বিমূর্ত ছবির অন্যতম পথিকৃৎ এবং এ-ধারার সবচেয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ ও সফল শিল্পী হিসেবে। পরিণত পর্বে (বলা ভালো, পর্বসমূহে) কিবরিয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা তাঁর পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের শিল্পীদের অনেককে বিমূর্ত শৈলীতে কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, এবং তারই সূত্রে এমনটাও বলা হয়েছে যে, তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র শিল্পী যাঁর বেশ ক’জন অনুসারী আছেন। অনুসারীই কেবল নয়, নিঃসন্দেহে অনুকারকও তৈরি হয়েছে তাঁর। কিন্তু তাঁর কাজের সত্যিকার উত্তরাধিকার দু-একজন বাদে অন্যরা ধারণ করতে পেরেছেন বলে মনে করা যায় না, বিশেষত যখন দেখি আমাদের বিমূর্ত ধারার অধিকাংশ শিল্পীই মনোনিবেশ করেছেন ছবির বহিরঙ্গে, এর অন্তর্কাঠামো তাঁদের তত ভাবায়নি। কখনো-সখনো ‘কিবরিয়া স্কুল’-এর চকিত উল্লেখ পাওয়া গেলেও এ সম্পর্কে কোনো বিশ্লেষণী আলোচনা আমরা এখনো বোধহয় পাইনি। কিবরিয়ার অবয়বী ছবির মধ্যে আমাকে বিশেষভাবে টানে ‘গোরস্তান’ নামের একটি ছবি, যার উল্লেখ ইদানীংকার…

সুফিয়া কামালের জন্ম হয়েছিল আলোর জন্যে প্রতীক্ষারত অন্ধকারাচ্ছন্ন উপনিবেশে। ঔপনিবেশিকতার ওই অন্ধকার ঘিরে রেখেছিল কেবল নারীকে নয়, পুরুষকেও। অন্ধকার ঘিরতে চেয়েছিল সুফিয়াকেও। [...]

সুফিয়া কামালের জন্ম হয়েছিল আলোর জন্যে প্রতীক্ষারত অন্ধকারাচ্ছন্ন উপনিবেশে। ঔপনিবেশিকতার ওই অন্ধকার ঘিরে রেখেছিল কেবল নারীকে নয়, পুরুষকেও। অন্ধকার ঘিরতে চেয়েছিল সুফিয়াকেও। যদিও অভিজাত পরিবারের কন্যা ছিলেন, আর সাত বছর বয়সে উকিল বাবাকে হারানোর পর বারো বছর বয়সে যাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সেই সৈয়দ নেহাল হোসেন ছিলেন উদার মানুষ। সাহিত্যচর্চা আর সমাজসেবায় সুফিয়াকে তিনি প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। সুফিয়া বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন আভিজাত্যের অন্ধকার থেকে, তিনি তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষার সহযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা তাঁকে যত অনুপ্রাণিতই করুক না কেন, সমাজ ও রাজনীতিতে রাজত্ব করছিল অন্ধকারই -- সে রাজত্বে গড়পড়তা সব মেয়েরই বিয়ে হত বাল্যকালেই, ব্যতিক্রম ছিলেন না সুফিয়াও। তবে তিনি সৌভাগ্যবতী, বাল্যবিয়ে হলেও শিক্ষার সংস্পর্শে থাকতে পেরেছিলেন, বাড়িতে উর্দুর চল থাকলেও বাংলা শিখেছিলেন, স্বামী তাঁকে বাংলা ভাষা আর সাহিত্যের প্রতি উৎসাহী করে তুলেছিলেন, সাহিত্য ও সাময়িক পত্রপত্রিকার সঙ্গে তাঁকে পরিচিত করে তুলেছিলেন, তিনি এই সহমর্মিতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন এবং নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের জন্যে, যে-সংগ্রাম নারীকে শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেবে। সুফিয়া কামাল যে অন্যরকম একজন মানুষ হয়ে উঠলেন, তার একটি অন্যতর কারণ এই -- পারিপার্শ্বিক সহমর্মিতাকে তিনি তাঁর মহৎ কর্মযোগে কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি জানতেন সবার জীবন তাঁর মতো নয়, এরকম সহমর্মিতা কোনও নারীর জীবনে বিরল, তাদের জীবন ও ভাগ্য বাঁধা গড়পড়তা অন্ধকারে, সেই অন্ধকারে দু’-একজনের চারপাশ থেকে যত দ্যুতিই বিচ্ছুরিত হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাই সবাই মিলে আলোর দিকে যাত্রা করা, আলোর অভিযাত্রী হওয়া। তিনি যত বড় হয়েছেন, নিজেকে ততই নিয়োজিত করেছেন আলোর অভিযাত্রায়, অন্যান্যদেরও আহ্বান করেছেন আলোর অভিযাত্রী হতে। নিজের জীবনে পাওয়া সহমর্মিতার ওই মাধুর্যকে তিনি সর্বজনীন করে তোলার অভিপ্রায়ে কাজ করে গেছেন। প্রায় উপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসনামল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধউত্তর কি সামরিক কি বেসামরিক অগণতান্ত্রিকতার যে-নগ্ন শাসনে সবখানেই তিনি উচ্চকিত হয়েছেন আর তাঁকে কেন্দ্রভূমিতে রেখে উচ্চকিত হয়েছে বাংলার নারীরাও। এইভাবে সুফিয়া কামাল পথিকৃৎ হয়েছেন, হয়েছেন প্রেরণাদায়ী, এমনকি তিনি যখন আর সক্রিয়ভাবে রাজপথে নামতে পারেন না, তখনও আন্দোলনকারীরা জানতেন, ধানমন্ডির একটি বাড়িতে একজন মানুষ আছেন, তিনিও তাঁদের সঙ্গে আছেন, তাঁর সেই বাড়ি ছিল আন্দোলনকারীদের খোলা প্রান্তর। বাঙালি…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.