মনে আছে আমাদের নাজমা নানী ছিলেন খুব ফর্সা। প্রায় নীরক্ত রকমের ফর্সা। সেই ফর্সা মুখে পানের রসে লাল ঠোঁট একেবারে জলজ ফুলের মতন ভেসে থাকতো। নাজমা নানী যেখানে যেতেন সঙ্গে যেত চমনবাহারের মেঘ, তাঁর চারদিক সুবাসিত করে রাখতো। নাজমা নানীকে ‘নাজমা নানী’ ডাকলে খুব ক্ষিপ্ত হয়ে বলতেন- খবরদার, আমাকে মন্টি আপা ডাকবি।” তো মন্টি আপা ‘ছায়াছন্দ’ শুরু হলেই সবাইকে চুপ করিয়ে দিতেন, চোখ রাঙিয়ে বলতেন- একটা শব্দ না।’ আর প্রায় উপাসনার মতন আগ্রহে শুনতেন ‘জীবন আঁধারে পেয়েছি তোমারে চিরদিন পাশে থেক বন্ধু’ (রাজ্জাক আর শাবানা একে অন্যের ঘাড়ে-পিঠে অদৃশ্য তেলমালিশের ভঙ্গী করেই চলেছেন, শাবানা কলাগাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে আঁচল মেলে নাচছেন), মন্টি আপার চোখ চুম্বকের মতন টেনে রেখেছে বিটিভি, লিপসিং করছেন তিনিও, একবার গেয়েও ফেলছেন। গান শেষ হলে চোখের পাতা বন্ধ করে রেখেছেন একটুখানি। ধবধবে চোখের পাতায় শিরাগুলি বেগুনি আভাময়। সেই ছায়াছায়া শোবার ঘরের খাটে বসে দেখা ‘ছায়াছন্দ’, আহা ঘরের ভিতর হাত অর্ধবৃত্তাকারে মেলে ঘুরছেন ববিতা, ববিতা-টাইপ কলার তোলা সিল্ক ব্লাউজ-শিফন শাড়ি-পরচুলার খোঁপা-অসহ্য দাঁতে নখ খোঁটার সলজ্জভাব আর কি আবদার ‘ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকো না’, ঘরের ভিতর এক লাফ মেরে ঢুকে গেলেন জাম্বু, টেকো কপালে স্কচটেপ দিয়ে লাল প্লাস্টিকের চকচকে ‘সাপের মনি’ সাঁটা, নেচে গেলেন পদ্মাবতী বেদেনি, নাও বেয়ে ইভটিজিং করে চলে গেলেন ফারুক, ‘আলোমতি’ ছাগলছানা কোলে একা ঘরে থাকার বেদনায় কাতর, এইবার টেলি সামাদের ‘ডেগের ভিতরে’ অনবদ্য ডাইল আর চাউল মিশে যাচ্ছে। একঝলক খান আতা, তাঁর দর্পিত মুখ আর গ্রীবা আর খাঁচা ভাঙবার আকুলতা। রওশন জামিলের ‘আমার গুষ্টি আমার খাও/ আমারে কও ম্যাও’… মন্টি আপা পৌত্তলিকের মনোযোগে দেখে চলেছেন- যার নাম সিনেমা। সঙ্গে কোললগ্ন আমি এবং আমরা, মেঝেয় সারিবদ্ধ মহামাতৃকূল বুয়ারা এবং দুপুরের খাওয়ার পর আইঢাই গড়ানো খালারা। আমাদের বাড়িটার নিচতলায় কারা যেন প্রতিদিন তিনচারটা গান বাজাতো বারবার, ‘একটা গান লিখো আমার জন্য’, ‘আমার বলার কিছু ছিল না’, ‘বড় সাধ জাগে’, ‘আশা ছিল ভালবাসা ছিল’ আর ঝাঁঝাঁ রৌদ্রের দুপুর জুড়ে- ‘এই রাত তোমার আমার’, বাজতেই থাকতো। আগেই একটা লেখায় বলেছি, আমাদের নানাবাড়িতে ভিসিপি চলবার সময়ে প্রতিবেশীরা দঙ্গল বেঁধে ভেঙে পড়তেন, যেমন সবাই পড়তো (তখন আমরা জরিদার হেয়ারক্লিপ দেই চুলে। তখন…
আমি মকর। শুরু করছি মকর অভিধান।[...]
আমি মকর। শুরু করছি মকর অভিধান। এই অভিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য, প্রচলিত অভিধানের মতো এখানে শব্দের অর্থ নির্ণয় করা হয়নি – অর্থ নির্ণয় ও শব্দ বাস্তবসময়ে বিধৃত হয়েছে। নিয়মিত বা অনিয়মিত ভাবে এই অভিধানের সম্পাদনা ও সংযোজনের কাজ চলতেই থাকবে। সং হয়েছে ক্ষিপ্ত – সংক্ষিপ্ত ইতি প্রিয় পৃথিবীর বৃত্ত – ইতিবৃত্ত বারবার ভাবের থাবা – বাবা প্যাঁচের প্রতিকৃতি – জিলাপি সম্পদে বিরক্তি – ব্যক্তি বিনিদ্র বন্দিত শুধু আদিরস – ব্যাধিরস একজন পরি বাকি সবাই বিশ্রি – পরিস্থিতি সতীর ব্যর্থতা – সততা বিস্ময় বালকবালিকাহীন বিদ্যালয় – বিশ্ববিদ্যালয় ধর্ম নিয়েই নিরপেক্ষতা – ধর্মনিরপেক্ষতা ভূতের ভয় তাড়াতে বলতে হয় ভবিষ্যৎ – ভূত ভবিষ্যৎ চীনের শক্তির ঝিনুক – চীনাংশুক কোনো কিছুকে কদর্য কদাকার করে তোলার বোধ – পেত্নিমিতিবোধ অভিহিত মূল্য সূচক – অভিষেক আত্মঘাতী হামলা সমগ্র – আফগানিস্তান তালিবান পোষ মানায় যে – তালিবানুড়ে প্রযুক্তিবিদের চোখে কালের প্রবাহের সংকট – যান্ত্রিক গোলযোগ চতুর বিভক্তি – চুক্তি তালগোল পাকানো রাজনীতির পঙ্গপাল – হরতাল বৃহত্তর মানুষের সংকুচিত আকাশ – বিকাশ আকণ্ঠ বিরক্তির আসন – আবাসন ধর্মের উষ্ণতা
নিরোধক বটিকা – ধর্মসহিষ্ণুতা সরকার হাসাবে এই উদ্দেশে পরিশোধিত কর – হাস্যকর দেশভাগের সময় হারমোনিয়ামের ধ্বনি – কমিউনাল হারমনি রাজা তার কর্তব্যকাজে বিরক্তিকর ও মূঢ় – কিংকর্তব্যবিমূঢ় শিশ্ন দাঙ্গাবাজ – ধর্ষক যোনি দাঙ্গাবাজ – মর্ষক আজীবন গাছভোলা – আগাছা চোখ খুলে গেলে আর শান্তিতে ঘুমানো যায় না – নির্বাণ সমরে দলিত পদাতিক – সমর্থক বগল যৌনাঙ্গের স্নান – কাকস্নান খাদ্যোন্মাদনার ইশতেহার – ইফতার যে ধান হাজার সংঘর্ষেও দেবার নয় -- সংবিধান প্রসঙ্গের বাইরের সব যুক্তি -- প্রযুক্তি অহিংস সিভিল অনাস্থার যোগাসন -- অনশন ধর্ম অর্থ সমাজ নিয়ে রীতিতাড়িত চাঞ্চল্য -- কর্মচাঞ্চল্য নিয়তির অবিরত উৎপাত -- অভিসম্পাত বিরক্ত ধরিত্রীর বয়োবৃদ্ধ ত্রাতা -- বিধাতা কোনো একটি মহলের মূল নারী প্রতিনিধি -- মহিলা উভয় সংকট -- দুই পায়ে নৌকা অজস্র সংকট -- হাতে পায়ে নৌকা কান মণ্ড করা জ্ঞান -- কাণ্ডজ্ঞান কাজে কর্মে দক্ষ ও একনিষ্ঠ -- কর্মঠ ধর্মে নীতিতে সমর্পিত ও একনিষ্ঠ -- ধর্মঠ অভিজ্ঞ প্রেত -- অভিপ্রেত অনভিজ্ঞ প্রেত -- অনভিপ্রেত যে পদ্ধতিতে করা যায় নির্জলা সিদ্ধ -- নিষিদ্ধ ছয় ইন্দ্রিয়ের…
ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজের বর্তমান ছাত্রীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত। [...]
অনেকেই আমাদের বলেন আমরা নাকি ‘প্রিভিলেজড গ্রুপ’। সমাজের 'ফরচুনেট' অংশের প্রতিনিধি। বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সন্তানই আমাদের অধিকাংশ। বিত্তবান না হলেও সচ্ছল বলা চলে আমাদের অনেককেই। খাওয়া-পরা-পড়াশোনা-টিভি দেখা-ঘুরে বেড়ানো এসব খাতে হিসেবের মধ্যে থেকেও আমাদের জন্য কিছুটা বিলাসি খরচ মাঝে-মাঝেই হয়তো করেন আমাদের অভিভাবকেরা। আবদার-আহ্লাদ করে খেলনা-জামাকাপড়-গল্পের বই দশবার চাইলে পাঁচবার তো নিদেনপক্ষে মিলেই যায়! কিন্তু সচ্ছলতার নির্ভরতার চেয়েও বড় ‘প্রিভিলেজ’ হল আমাদের জীবনের এক পুঁজি যা থেকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েশিশু বঞ্চিত -- সেই পুঁজির নাম ‘স্বপ্ন’। আমাদের মা কিংবা বাবা যেদিন প্রথম আমাদের নির্ভরতার-আঙুল-পেলেই-মুঠি-মুড়ে-ধরে-ফেলার ছোট্ট হাত ধরে এই বিশাল চত্বরের মাঝে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেদিন প্রথম নিজেদের স্বপ্ন আমাদের মাঝে সংক্রমিত করেছেন তাঁরা। তাঁদের মেয়েদের রয়েছে স্বপ্ন দেখার অধিকার, ব্যক্তিত্ববিকাশের অধিকার, বড় হয়ে সমাজ-গড়ায় নিজ নিজ হাতের ছাপ রাখার অধিকার -- তাঁরা জানতেন এবং বিশ্বাস করতেন! বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, প্রায়-নিষ্ঠুর পরীক্ষা—প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ভয়-ভীতি-বাধার তীব্রতা অতিক্রম করে অবলীলায় মা’কে স্কুলগেটের বাইরে পিছে ফেলে এসে নতুন বন্ধুর পাশে এসে বসতে পেরেছি আমরা শুধু ওই স্বপ্ন-সংক্রমণের কারণে। ওই সংক্রমণ আমাদের পুতুলের মত ঠুনকো শিশুশরীরে সঞ্চার করেছে অপার শক্তি। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে মায়ের শ্রমে শিখে আসা বাংলা বর্ণমালা আর ইংরেজি এলফাবেট দিয়ে দুনিয়াটাকে দেখতে শিখেছি; পড়তে শিখেছি ক্লাসের আপার দেওয়া পাঠ; কাঁড়ি-কাঁড়ি হোমওয়ার্কের বোঝা বহন করেছি; সমাধান করেছি বীজগণিতের খটোমটো ফরমুলা; চোখ গোল করে গল্প শুনেছি ইতিহাসের; পাবলিক পরীক্ষার ভুতুড়ে সকালে চুলে তেল দিয়ে টান-টান করে বেণি বেঁধে কলমের খস-খসানিতে পৃষ্ঠা ভরিয়েছি; কেমিস্ট্রি ল্যাবের বীকারে সবজে-নীল অধঃক্ষেপ দেখে পৃথিবীকে রঙিন ভেবেছি; বিতর্কের মঞ্চে প্রতিপক্ষের তার্কিক আর বিচারক প্যানেলকে চমৎকৃত করেছি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরাডুবির খতিয়ান দেখিয়ে; বিশাল কাঠের বোর্ডে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে মেধাবী সিনিয়ার আপুদের নাম, সেই ১৯৬১ সাল থেকে; ঘাড় কাত করে সেই নামগুলো দেখেছি আর ভেবেছি ওদের মত হতে পারব কিনা। আর বাড়ি এসে মাকে দিয়েছি তাচ্ছিল্যের ভর্ৎসনা -- “ধ্যুত, আমাদের আপা বলেছেন এটাই ঠিক। মা, তুমি কিচ্ছু জানো না!” মা নিশ্চয়ই খুশি হয়ে ভাবতেন, “ছোট্ট মেয়েটা কত বড় হয়ে যাচ্ছে!” বাবাকে বলতেন, “জানো তোমার মেয়ে স্কুলে কী কী করে? কী কী শেখে?” বাবা আত্মপ্রসাদের হাসি হাসতেন। মুখে বলতেন না, কিন্তু মনে…
একজন মন্ত্রী ছাড়া এই বৃত্ত অসম্পূর্ণই থাকে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বৃত্ত অসম্পূর্ণ[...]
একজন মন্ত্রী ছাড়া এই বৃত্ত অসম্পূর্ণই থাকে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বৃত্ত অসম্পূর্ণ এবং এই অসম্পূর্ণতা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত সচলতা দেয় না – নাগরিকদের নিয়ত আলোচনার গণ্ডী থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে অনতিক্রম্য দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখে – তাই জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বৃত্তের পরিবর্তে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী হয়ে ওঠে সেনা, নৌ, বিমান ঘাঁটি আর সম্মিলিত সামরিক গোয়েন্দা ঘাঁটি। কিন্তু এরকম কথার ভিত্তি কী? বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মন্ত্রীহীন কখন ছিল? বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়কে যদি চারটি পর্বে ভাগ করি – মুক্তিযুদ্ধকালীন পর্ব, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও এর পরবর্তী বাকশাল সরকারের পর্ব, স্বৈরশাসকদের সরকারের পর্ব ও স্বৈরশাসন পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের পর্ব (যার ভেতরে কয়েকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ও একটি সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুপর্ব আছে)। আমরা দেখি, স্বৈরশাসকদের সরকারের পর্বটি ছাড়া অন্য তিন পর্বেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশে ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদই ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও বাকশাল সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবের হাতে থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। স্বৈরশাসকদের সরকারের পর্বে অবিকল্পভাবেই জিয়া ও এরশাদের হাতেই ছিল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ১৯৯১-এর পরে দুবারের খালেদা সরকার ও একবারের হাসিনা সরকারের দুই প্রধানমন্ত্রীই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের হাতেই পূর্ণ মেয়াদে রেখে দিয়েছিলেন। ২০০৭-০৮এর সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান উপদেষ্টার হাতেই ছিল এবং ২০০৮এর নির্বাচনে নির্বাচিত হাসিনা সরকারও এখনো পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এককভাবে তার নিজের হাতেই রেখে দিয়েছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে ও জরুরী অবস্থায় সরকার প্রধানের হাতেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বাভাবিকভাবে ন্যাস্ত থাকে – কারণ সেসময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী আসলে যুদ্ধমন্ত্রী ও জরুরী অবস্থার সর্বোচ্চ প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। তো আমরা দেখতে পাচ্ছি একমাত্র শেখ মুজিবের সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রী ছাড়া আর কেউই আমাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আজো ঠাঁই নিতে পারেননি। এই ভিত্তিতেই আমি বলছি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মন্ত্রীহীন এবং তাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বৃত্ত অসম্পূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হল : অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা। এই চারটি মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি ও ধরন এমন যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে এই চারটি মন্ত্রণালয়ের কোনো একটির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা অসম্ভব। তাহলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা কী অসীম…
গল্পগুচ্ছের সাথে আমার পরিচয় বাল্যকালে, নীল কাপড়ে বাঁধাই একখানা মোটা বই, গোড়ার দিকে অরুণদা বলে কে একজন আমার বাবার অগ্রজপ্রতিম ভদ্রলোক বাবার বৌভাতে বইখানা উপহার দিয়েছেন -- সেটা বাঁকা বাঁকা হরফে লেখা। অতএব, গল্পগুচ্ছ প্রথমত আমার কাছে ছিল সেই সময়ের চিহ্ন [...]
গল্পগুচ্ছের সাথে আমার পরিচয় বাল্যকালে, নীল কাপড়ে বাঁধাই একখানা মোটা বই, গোড়ার দিকে অরুণদা বলে কে একজন আমার বাবার অগ্রজপ্রতিম ভদ্রলোক বাবার বৌভাতে বইখানা উপহার দিয়েছেন -- সেটা বাঁকা বাঁকা হরফে লেখা। অতএব, গল্পগুচ্ছ প্রথমত আমার কাছে ছিল সেই সময়ের চিহ্ন -- যখন লোকে বিয়েতে বই উপহার দিত। আর সবকিছুকে যেমন মা চিনিয়ে দেন -- ‘ন’ চেনান, ন-এ নদী চেনান… সেইরকম করে আমাদের মা আমাদের গল্পগুচ্ছ চিনিয়েছিলেন। বাইরে ঝুপঝুপ বৃষ্টি, ঘরের কোণে কোণে অন্ধকার আর এই দেয়াল থেকে ঐ দেয়াল অব্দি দড়ি খাটিয়ে ভেজা শাড়ি-কাপড় মেলে দেয়া, কাপড়ের মাড়-আর্দ্রতা-নীল-গুঁড়োসাবানের গন্ধ ঠাসা সেই ঘরে আমাদের দু’পাশে রেখে আম্মা পড়ে শুনিয়েছিলেন -- ‘কাবুলিওয়ালা’ আর ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’। ‘হামি সসুরকে মারিবে’ শুনে কত হেসেছিলাম। আর পদ্মাতীরে সেই কদমফুললোলুপ শিশুর করুণ মৃত্যু আমাকে কত যে কাঁদিয়েছিল। সে তো কেবল শুরু, এই পরিজ্ঞানের শুরু যে আমাদের সাহিত্য শিশুর মৃত্যুতে আকীর্ণ (বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’, ‘পুঁইমাচা’ কিংবা ‘কিন্নরদল’, রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’, শরৎচন্দ্রের ‘পণ্ডিতমশাই’), তারপরে আরেকদিন, আম্মার কাছে বসেই পড়া -- ‘বলাই’। মনে মনে বলাই যে আমার কী আপন, ঘাসিয়াড়া যেদিন আসে, সেদিন তার ‘শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর’, আর আমার বেলায় -- যেদিন কাগজওয়ালা আসে, পুরাতন কাগজ-বই-খাতা ওজন করে কিনে নিয়ে যায় -- এই বৈশ্য আচার আমার দারুণ অপছন্দ। ঘাসফুলের জন্যে -- কন্টিকারির জন্যে বলাইয়ের অপার ভালবাসা আমাকে স্পর্শ করে। তারপরে ক্রমেই ‘ইচ্ছাপূরণ’, ‘অতিথি’ আর ‘ফেল’। আস্তে আস্তে আমার দাঁত সবল হতে শুরু করেছে তখন, আমি নেড়েচেড়ে দেখছি তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ -- “বউ হাসিয়া বলিল -- কার আমার? -- বলিয়া শিবনাথের গায়ে হাসিয়া ঢলিয়া পড়িল। শিবনাথ চট করিয়া তাহার মুখে চুম্বন করিয়া বসিল। নান্তি মুখ মুছতে মুছতে বলল -- কি রকম ভাত-ভাত গন্ধ তোমার মুখে!...”। এর পরে তারাশঙ্করের ছোটগল্পগুলি, বাংলা সাহিত্যের যা চিরকালীন সম্পদ, ‘অগ্রদানি’, ‘না’, ‘তারিনী মাঝি’ এইসব। কিন্তু গল্পগুচ্ছ সেই রাঙামাটির এবড়োখেবড়ো পথের বাইরে, এ যেন ধ্রুপদ, তার তাল-লয় -- তার অবারিত বাক্যপ্রবাহ -- তার ঈষৎ শ্লেষ -- তার ব্যাজস্তুতি এইসব আমাকে ফেলে কখন সামনে চলে যায়, তার নাগাল মেলে না। এত শব্দ আছে বাংলায়, তাদের এমন রঙিন পরিচ্ছদ, তারা এমনি এসে ভেসে যায়? “মাল্যদান পড়, একটু সহজ ভাষায়…
