সম্ভবত নয়-দশ বছর আগের কথা। কোন সাল এখন আর নিশ্চিত করে মনে নেই; তবে দিনটা ছিল অক্টোবর মাসের তেইশ তারিখ। [...] ... শেষ যে-বার সে-বাড়িতে যাই, ড্রইংরুম অব্দি আর যেতে হয়নি। বারান্দাতেই দুটো চেয়ার পাতা ছিল, সেখানে বসেই কথা চলল খানিকক্ষণ। [...] ... অধুনালুপ্ত 'নতুন সাহিত্য' পত্রিকার একেবারে প্রথম দিকের কয়েকটি সংখ্যার পাতা উল্টাতে গিয়ে একবার চোখ আটকে গিয়েছিল একটি কবিতায় [...]

১ সম্ভবত নয়-দশ বছর আগের কথা। কোন সাল এখন আর নিশ্চিত করে মনে নেই; তবে দিনটা ছিল অক্টোবর মাসের তেইশ তারিখ। বাসা থেকে বেরিয়ে ফোনের দোকানে পৌঁছতে প্রায় পৌনে ন'টা। ও-পাশ থেকে নারীকণ্ঠ শুনে বুঝে নিই, দেরি করে ফেলেছি। 'একটু লাইনে থাকুন।' খানিকক্ষণ পর পরিচিত সেই চপ্পলের আওয়াজ। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে নিজের রুমে পৌঁছলেন তিনি। তিন-চার মিনিট কথা হলো। জানালেন খুব খুশি হয়েছেন ফোন পেয়ে। আমারও খুব খুশি লাগছিল সকালেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পেরে। আর বিব্রতও লাগছিল। আধঘণ্টা আগে ফোন করলেই তাঁকে কষ্ট করে সিঁড়ি ভাঙতে হতো না। কথা শেষে আবার নিশ্চয়ই ফিরে গেলেন নীচে, চপ্পলে ফট্‌ফট্‌ আওয়াজ তুলে। বই-দিয়ে-ঘেরা সুপরিসর ড্রইংরুমে এরই মধ্যে জড়ো হয়েছেন অনেকে। তাঁরা এসেছেন তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে। আজ তাঁর জন্মদিন। ২ শেষ যে-বার সে-বাড়িতে যাই, ড্রইংরুম অব্দি আর যেতে হয়নি। বারান্দাতেই দুটো চেয়ার পাতা ছিল, সেখানে বসেই কথা চলল খানিকক্ষণ। চা-ও চলে এল অল্পক্ষণের মধ্যে। আগে বাইরে থেকেই চোখে পড়ত দেয়ালে ঝোলানো মুর্তজা বশীরের 'এপিটাফ' সিরিজের একটা ছবি, কয়েক বছর আগে সেটাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। জানা ছিল না যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে অল্পকাল আগে তাঁর একটা বই বেরিয়েছে -- পাণ্ডুলিপি সংস্করণ। দেখলাম। আর জানলাম ছায়ানট ভবনে তাঁর নামে একটা কক্ষ করা হয়েছে। তাঁর সংগ্রহের সবগুলো বই সে-কক্ষে সংরক্ষণ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ছায়ানট। তাহলে কি সব বই দিয়ে দেয়া হবে? না, এখনো মত দেয়া হয়নি তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে। দেখা যাক। আগের মতোই কি আছে তাঁর বইগুলো, বিছানা-ঘেরা শেল্‌ফে পরিপাটি সাজানো আর লেখার টেবিলের উপর এলামেলো হয়ে? কিছুই পালটায়নি। যেভাবে রেখে গেছেন ঠিক সেভাবেই রাখা আছে সবকিছু তাঁর ঘরে। 'দোতলায় গিয়ে দেখে আসবে নিজের চোখে?' না, থাক। আবার আসব, হ্যাঁ, ফোন করেই আসব। বিদায় নিই তাঁর পুত্রবধূর কাছ থেকে। ৩ অধুনালুপ্ত নতুন সাহিত্য পত্রিকার একেবারে প্রথম দিকের কয়েকটি সংখ্যার পাতা উলটাতে গিয়ে একবার চোখ আটকে গিয়েছিল একটি কবিতায় -- 'কয়েকটি দিন : ওয়াগনে'। কবিতাটির নীচে সম্পাদক অনিলকুমার সিংহ একটি টীকা জুড়ে দিয়েছিলেন : বহু মুসলমান শরণার্থী আজ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের দাক্ষিণ্যে পরিত্যক্ত ও অকেজো রেলওয়ে ওয়াগনে দিন যাপন করছে। উপরোক্ত কবিতাটি…

তাঁর মৃত্যুর আকস্মিকতায় আমি বেদনাহত হয়েছি। এই গত জানুয়ারিতে মাত্র বিচ্ছিন্ন দুএকটি প্রবন্ধ পড়ে তাঁর লেখার সাথে আমার পরিচয়। যদিও মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর, কিন্তু আমার কাছে, যে আমি মাত্র পড়তে শুরু করেছি তাঁকে, এ এক অকালমৃত্যু। তাঁর বিখ্যাত স্মৃতিকথা ‘ওপারের ছেলেবেলা ১৯৩১-১৯৪৭’-এর দ্বাদশ পরিচ্ছেদ : রাজনীতি ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা, আমি এখানে তুলে দিচ্ছি—একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে, যে আমার সবসময়ে মনে হয়েছে ‘পাকিস্তান’ আমাদের ইতিহাসের এক চরম ভুল। সেই ভুল ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজে আজও সক্রিয়। জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৯৩১, বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। মৃত্যু ৫ অক্টোবর ২০০৯, কলকাতায়। অর্থনীতিতে এম.এ., আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পি.এইচ-ডি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডি.লিট। বহু ইংরেজি ও বাংলা গ্রন্থের রচয়িতা। বাংলা গ্রন্থগুলির মধ্যে মহাকাব্য ও মৌলবাদ, সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভগবদগীতা, ধর্মের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র ধর্ম ও রাজনীতি, বিকল্প নবজাগরণ, বিকল্প বিশ্বায়ন এবং ওপারের ছেলেবেলা উল্লেখযোগ্য। রাজনীতি ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা আগেই বলেছি, আমার ছেলেবেলায় বজ্রযোগিনীতে মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে ভৌগোলিক, আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দূরত্ব ছিল। কিন্তু সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্ফোরণ হবার আগে পর্যন্ত আমাদের গ্রামে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব হয়নি। ধর্মীয় ও ভৌগলিক দূরত্বের অন্তরালে এক ধরনের শ্রেণী বৈষম্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বর্তমান ছিল। ধর্মের দিক থেকে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও তারাই ছিল জমিদার-জোতদার-মহাজন শ্রেণীর বিপুল গরিষ্ঠ অংশ, আর প্রায় সমস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও চাকুরিজীবি ও পেশাজীবি। আর মুসলিমরা ধর্মের নিরিখে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশই ছিল ভূমিহীন কিংবা প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর বা অন্য ধরনের শ্রমজীবি। নানা ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক কারণে মুসলিমরা ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় এই শ্রেণী বৈষম্য আবার শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মাত্রা পেয়েছিল। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথে বিপথগামী হবার ফলে বজ্রযোগিনীর এই প্রচ্ছন্ন শ্রেণী বৈষম্যও বিশ শতকের চল্লিশের দশকে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িকতার রূপ নিতে আরম্ভ করে। ১৯৪২ এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় থেকে বজ্রযোগিনী গ্রামে হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় বিভাজন রাজনৈতিক রূপ নিতে আরম্ভ করেছিল। তার আগে থেকেই অবশ্য ঢাকা শহরে মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতো। সেসব দাঙ্গার খবর বজ্রযোগিনীতে এসে পৌঁছোত, আর বজ্রযোগিনীর মানুষেরা সে বিষয়ে সতর্ক থাকতো। কারণ এদের অনেকেই নানা কাজে প্রায়ই ঢাকা যেতে হতো। দাঙ্গার খবর পেলে ঢাকাযাত্রী হিন্দুরা ঢাকা রেল স্টেশনে…

আজকের বিশ্বে ধর্মবিশ্বাস আর আইডেন্টিটি আবার একাকার হওয়া শুরু করেছে মনে হয়। সনাতন সব নীতি ও মূল্যবোধ যখন বিশ্বায়িত পুঁজি, প্রযুক্তি আর জীবিকার সংগ্রামের কাছে পরাজিত হয়ে ভেসে যাচ্ছে, তখন ধর্মকেও এর আদলে বদলে যেতে হয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় খ্রীস্টধর্ম অনেক আগেই এই চাপে বদলে গেছে। রিফর্মেশন-এনলাইটেনমেন্ট-এর যুগে। ট্রিনিটি-তে ঈমান থাক বা না থাক, শ্বেতবরণ নীলচক্ষু যীশু এবং তার পিতা ঈশ্বরকে তারা ছাড়ে নাই আত্মপরিচয়ের ঠেকা আছে বলে। ধর্মবোধ এখানে আত্মপরিচয়ের মধ্যে দ্বান্দিকভাবে মিলে গেছে। [...]

১. আজকের বিশ্বে ধর্মবিশ্বাস আর আইডেন্টিটি আবার একাকার হওয়া শুরু করেছে মনে হয়। সনাতন সব নীতি ও মূল্যবোধ যখন বিশ্বায়িত পুঁজি, প্রযুক্তি আর জীবিকার সংগ্রামের কাছে পরাজিত হয়ে ভেসে যাচ্ছে, তখন ধর্মকেও এর আদলে বদলে যেতে হয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় খ্রীস্টধর্ম অনেক আগেই এই চাপে বদলে গেছে। রিফর্মেশন-এনলাইটেনমেন্ট-এর যুগে। ট্রিনিটি-তে ঈমান থাক বা না থাক, শ্বেতবরণ নীলচক্ষু যীশু এবং তার পিতা ঈশ্বরকে তারা ছাড়ে নাই আত্মপরিচয়ের ঠেকা আছে বলে। ধর্মবোধ এখানে আত্মপরিচয়ের মধ্যে দ্বান্দিকভাবে মিলে গেছে। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে বিকশিত হওয়া ভারতীয় জাতীয়তাবাদগুলোর সমস্যাও ছিল এটা। এখনো কম্যুনিটি বা জাত আর জাতীয়তা আমাদর চোখে একাকার। ২. ভারতে বিজেপি বা জার্মান নাৎসিরাও কিন্তু ক্যাথলিসিজম ও আর্যবাদের মিশ্রণে ফ্যাসিবাদের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণ করছিল। শিল্পায়ন ও তার ভিতের ওপর দাঁড়ানো সামরিক সক্ষমতা তাদের অভিলাষী করেছিল। আমেরিকায় বা ইউরোপের বাকি অংশে এটা এখনো কঠিন। তিনশ বছরের মানবতাবাদী সংগ্রাম, শ্রেণী সংগ্রাম ও পুরুষতন্ত্র ও বর্ণবাদবিরোধী ঐতিহ্য। ভারতেও একইসঙ্গে উপমহাদেশের সবচে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক চেতনা আছে, আবার এই ভারতই এখন ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণার শক্ত আশ্রয়। ইসলাম বাংলাদেশে মেইনস্ট্রিমে নাই, ভারত-পাকিস্তানে আছে। ৩. পশ্চিমা এলিট এমনকি গরিবদেরও আত্মপরিচয় নিয়ে সংকট এখনো জাগে নাই। সেখানকার গরিব ও কালো মানুষটিও সভ্য দুনিয়ার অহংকার আর ক্রাইস্টের ছত্রছায়া অনুভব করে জাতগর্ব উপভোগ করে। এই মনের জোর বাদবাকি বিশ্বে নাই তাদের মাজার জোর কম থাকার জন্য। । ফলে তাদের হয় জাতি বা ধর্মের কাছে ফিরতে হয় অথবা এসব ছেড়ে কাল্পনিক বিশ্বজনীনতার নামে সাদা-জুডিও-খ্রিস্টান-সাম্রাজ্যের মাস্তুলে লটকে থাকার নিয়তি নিতে হয়। তারা ইতিহাস-ভূগোল ও সংস্কৃতি থেকে বিতারিত বা পরিত্যক্ত হয়। আমাদের সুশীল সেকুলারদের বড় অংশই এই পথ ধরেছেন। মধ্যবিত্তের 'আধুনিক' অংশ কর্পোরেট পুঁজি ও তার বাজারের মধ্যে এতই আত্তীকৃত হয়ে গেছে যে, এদের কোনো প্রতিবাদ করার মতাই নাই। এরা বরং দেশ ছেড়ে যাবে অথবা দেশে মার্কিন বাহিনীকে স্বাগত জানাবে। এ অংশটির সুবিধাবাদীতাই তাদের ধর্মীয় বা সেকুলার পথে সংগ্রামী হতে বাধা দেবে। ৪. অন্যদিকে জামাতি ইসলাম বা ব্রাদারহুডের মতো যারা তারাও এক প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া ইসলামকে বিকশিত করছে। এদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ভিশন এটা প্রমাণ করে। এরা মোটাদাগে পরাশক্তি ও দেশীয় শাসকদের সঙ্গে কোলাবরেশন করে…

সাংসদ হুইপদের দুর্নীতি নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড়। জনৈক প্রাক্তন হুইপের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে – তিনি তাঁর ক্ষমতাবলে সংসদের ক্যান্টিন থেকে বিস্তর তেল ঘি হজম করেছেন! তিনি যে খুব ভোজন-রসিক তা তার তালিকা দেখেই অনুমান করা যায় – ঘি, পোলাওয়ের চাল, ডানো গুঁড়ো দুধ, তাজা লিপটন চায়ের পাতা, দাদখানি চাল ইত্যাদি। হুইপ সাহেবের বাসায় যে বিস্তর পোলাও-মাংসের আয়োজন হয় সে-ব্যাপারেও নিশ্চয় কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না। [...]

১. সাংসদ হুইপদের খাদ্যবিলাস এবং জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা অথবা ভ্যান গগের ‘দ্য পটেটো ইটার্স’। সাংসদ হুইপদের দুর্নীতি নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড়। জনৈক প্রাক্তন হুইপের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে – তিনি তাঁর ক্ষমতাবলে সংসদের ক্যান্টিন থেকে বিস্তর তেল ঘি হজম করেছেন! তিনি যে খুব ভোজন-রসিক তা তার তালিকা দেখেই অনুমান করা যায় – ঘি, পোলাওয়ের চাল, ডানো গুঁড়ো দুধ, তাজা লিপটন চায়ের পাতা, দাদখানি চাল ইত্যাদি। হুইপ সাহেবের বাসায় যে বিস্তর পোলাও-মাংসের আয়োজন হয় সে-ব্যাপারেও নিশ্চয় কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না। সাম্প্রতিক বিশ্ব খাদ্য সংস্থার জরিপে দেখা গেছে : পৃথিবীতে একশো কোটি লোক অভুক্ত থাকে। কী পরিমাণ লোক ভালো-মন্দ খাবার খেয়ে থাকে তার একটা তালিকা তৈরি করা গেলে তাতে আমাদের মতো গরিব দেশের বড়লোকরাই চ্যাম্পিয়ন হবে। এত পোলাও-মাংস হজম করার পরিণতি কী, তা আপনারা সবাই জানেন – শেষ গন্তব্য সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল। যেটা হুইপ সাহেবের ক্ষেত্রে ঘটেছে। সরকারি টাকায় প্রচুর ঘি-পোলাও খেয়ে হার্টের ব্লক, আবার তা সারানোর জন্য সরকারি অর্থেই মাউন্ট এলিজাবেথে ভর্তি। সত্যিকার প্রহসনই বটে। আমাদের দেশের গরীব মানুষের খাদ্যতালিকা কী? তাদের কপালে কি জোটে পোলাও-মাংস? গ্রামে বসবাসরত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তো নুন আনতে পান্তা ফুরায়। শুধুমাত্র কাঁচামরিচ আর লবণ দিয়ে থালার পর থালা ভাত হজম করতে হয় তাদের। মাছ-মাংসের কোনো বালাই নেই, তাই প্রোটিনের ঘাটতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে গরীবের পোলাও-মাংস খাওয়ার বিষয়টি একবার নিজের চোখে দেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। কাওরান বাজারের পেছন দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বস্তির সামনে দেখেছিলাম, বিভিন্ন বিয়েবাড়ি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া উচ্ছিষ্ট পোলাও-মাংস রাস্তার পাশে ভাগ দিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। আর কেউ কেউ কিনে নিয়ে দিব্যি পরমানন্দে খাচ্ছে সেই খরখরে পচা খাবার! এত বৈষম্যপীড়িত দেশ পৃথিবীর কোথাও আছে কিনা কে জানে। মাঝে-মাঝে বিদেশীরা আমাদের দেশের দারিদ্র্য নিয়ে আমাকে নানা প্রশ্ন করে; আমি তাদের বলি, আমাদের বড়লোকদের তো দেখোনি, দেখলে নিশ্চয় অবাক হবে। গুলশান, বনানী, বারিধারাতে এক চক্কর ঘুরিয়ে আনলে তোমাদের বিশ্বাসই হতে চাইবে না বাংলাদেশের গরিবিয়ানা হাল। আমাদের মন্ত্রী মিনিস্টার সাংসদ আর আমলাদের যে ঠাট-বাট তা দেখে হয়তো মূর্ছা যাওয়ার দশা হবে তোমাদের। যে-ধরনের গাড়িতে তারা চড়ে, তা হয়তো জন্ম দেবে আরেকটি রেকর্ডের – পৃথিবীর…

“‌‌‌ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে এথেন্সবাসী করেছেন, বর্বর করেননি, তাঁকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে মুক্তপুরুষ তৈরি করেছেন, স্ত্রীলোক বা ক্রীতদাস করে তৈরি করেন নি।” [...]

“‌‌‌ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে এথেন্সবাসী করেছেন, বর্বর করেননি, তাঁকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে মুক্তপুরুষ তৈরি করেছেন, স্ত্রীলোক বা ক্রীতদাস করে তৈরি করেন নি।”' উক্তিটি যেন-তেন কারো নয়; বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো-র। কারো কারো মতে যিনি নারীমুক্তি আন্দোলনের পথপ্রদর্শক এবং বিশ্বাসী। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নাকি ব্যক্তিগত মানসিকতা, মনস্তাত্ত্বিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী প্লেটো উক্তিটি করেছেন তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। সে বিতর্কে যাবার জায়গা এটা নয়। তবে উক্তিটিতে স্পষ্টভাবেই তিনি নারীকে ক্রীতদাসদের সমতূল্য বিবেচনা করেছেন। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে করা প্লেটোর এ উক্তির বাস্তবতা যে আজও বহাল তবিয়তে রয়েছে তা জানতে আমাদের বেশি দূর যেতে হয় না। এর জন্য পাবলিক বাসগুলোর দিকে তাকানোই যথেষ্ট; যেখানে কিছু আসন সংরক্ষিতকরণের চিহ্নস্বরূপ লেখা থাকে- মহিলা/শিশু/প্রতিবন্ধি। ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। নারীকে বিবেচনা করা হচ্ছে শিশু ও প্রতিবন্ধিদের মতো দুর্বল হিসেবে; যাদের বাড়তি সুবিধার প্রয়োজন। বাসওয়ালারা যে অবচেতন মনেই এ কাজটি করেছেন তা ধরে নেয়া যায়। আমাদের শক্তিশালী সামজিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিলিকৃত মতাদর্শ আমাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে শুধু এই অর্ধশিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর বাসওয়ালারাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীরাও নারীকে এরকম দুর্বল, অধস্তন, পুরুষের প্রতি নির্ভরশীল, সৌন্দর্য ও যৌনপ্রতীক হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রচলিত গালি, প্রবাদ, সঙ্গীত কিংবা কৌতুকেও এর প্রকাশ ঘটে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় আমাদের প্রচলিত গালিগুলো যাকে উদ্দেশ্য করেই নিক্ষিপ্ত হোক না কেন, গালির মাধ্যমে যাকে আক্রমণ করা হয় সে হলো কোন নারী, মা বা বোন বা স্ত্রী। কোন পুরুষকে অপদস্ত করবার সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে তার মা, বোন, কন্যা বা স্ত্রীর ‘সতীত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন বা তাদের কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ইঙ্গিত। এছাড়া প্রতিটি ভাষায় বিশেষ্য-বিশেষণ পদগুলো খেয়াল করলে দেখা যায় তার অধিকাংশই পুরুষবাচক; আকার-ইকারযোগে শব্দের রূপান্তর ঘটিয়ে নারীবাচক শব্দ তৈরি করা হয়েছে। এতেই বোঝা যায় আমাদের সংস্কৃতি-সভ্যতা নির্মাণ ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে পুরুষ কতটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই শক্তিশালী যে খোদ নারীরাও নিজেদেরকে এরকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করে। সিমঁ দ্য ব্যুভুয়া যেমনটা বলেছেন, “নারীর কোনো পৃথক জগৎ নেই। জগতের তাবৎ বিষয় সে বিচার করে পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। নারীর বাস্তবতা আসলে পুরুষেরই বাস্তবতা।” এ বাস্তবতা তৈরিকরণ ও শক্তিশালীকরণে যেসব…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.