আজকাল অনেক বাংলাদেশীকেই ছুটি কাটাতে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে যেতে দেখা যায় (একটু আগেই ঢাকা বিমানবন্দরের ফ্লাইট-সূচিতে দেখলাম আজ সিঙ্গাপুর গামী ফ্লাইটের সংখ্যা ছয়।) এরা বিদেশে গিয়ে হোটেলে থাকা [..]

আজকাল অনেক বাংলাদেশীকেই ছুটি কাটাতে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে যেতে দেখা যায় (একটু আগেই ঢাকা বিমানবন্দরের ফ্লাইট-সূচিতে দেখলাম আজ সিঙ্গাপুর গামী ফ্লাইটের সংখ্যা ছয়।) এরা বিদেশে গিয়ে হোটেলে থাকা, ঘোরাঘুরি আর কেনাকাটাতে সব মিলিয়ে কত টাকা খরচ করেন সেটার হিসাব কোথাও পেলাম না। তবে এর পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকার কম নয় সেটা বোঝাই যাচ্ছে। তাঁরা এসব প্লেজার ট্রিপ কাটছাঁট করে সহজেই প্রায় হাজার কোটি টাকা দান খায়রাত করতে পারেন এবং তাতে দেশের অনেক দরিদ্রেরই নানা চাহিদা মিটে যায়। তাঁরা সেটা করেন না এবং এই নিয়ে ফেসবুকে কেউকে অভিযোগও করতে দেখিনি। তবে বাংলাদেশ সরকার আজ বিভিন্ন কর্পোরেশন থেকে ৫০ কোটি চাঁদা নিয়ে যে সমবেত জাতীয় সঙ্গীতের আয়োজন করলো তাতে গত কয়েকদিনে ফেসবুকে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে। এই ৫০ কোটি টাকায় কতজন গরীবকে দু বেলা খাওয়ানো যেতো, কতটা স্কুল দেওয়া যেতো এই জাতীয় হিসাব অনেকেই দিচ্ছেন। এত যজ্ঞ করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার কি আছে, দেশপ্রেম ভেতর থেকে আসতে হবে, জাতীয় সঙ্গীত যার গাওয়ার সে মনে থেকেই গাইবে, এমন সব কথা বলা হচ্ছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে যারা এই ঘটা করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া পছন্দ করছেন না তাঁরা জাতীয় সঙ্গীত মনে মনেও গাইতে পছন্দ করেন না। আর যারা জাতীয় সঙ্গীত মনে মনে বা গুন গুনিয়ে গাইতে ভালবাসেন, তারা ৫০ কোটি টাকা 'অপচয়ের' এই মহাযজ্ঞে খুশিই হয়েছেন। কিশোর বয়সে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ৫ বছর কাটিয়েছি, এর মধ্যে খুব বেশী হলে ৫ দিন জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছি। পরে জেনেছি স্কুলের জামাতি শিক্ষকেরা নানা ছুতায় এসেম্বলি এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া আটকে দিতেন। যে স্কুলে নিয়মিত জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় সেখানে কি শিবির-কর্মী রিক্রুটমেন্ট কঠিন হয়ে পড়ে? আমার ধারণা কঠিন হয়ে পড়ে। 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি', এই গান প্রতিদিন সকালে গেয়ে শিবির কর্মী হয়ে যাওয়া এবং হয়ে থাকা খুব সহজ নয়। কোন স্কুল পড়ুয়া কিশোরের পক্ষে সকাল বিকাল এই কালচারাল শিফট সহ্য করা বেশ কঠিন। জামাত শিবিরের জাতীয় সঙ্গীতে এলার্জির ব্যাপারটা বোধগম্য, বামপন্থীরাও কিন্তু এই গান নিয়ে খুব স্বচ্ছন্দ নন। একে তো রবীন্দ্রনাথ এসেছেন 'শোষক জমিদার শ্রেণী' থেকে, তিনি নিজের গানে নিজের শ্রেণী চরিত্রই প্রকাশ করবেন,…

[...] ব্যথার সীমা দিয়ে এইভাবে দেশও চেনা যায়, বাংলা নামের দেশ, বাংলাদেশ। এই এত্তটুকুন নাম, অর্ধশতকও হয়নি তার স্বাধীনতালাভের, এত্তটুকুন দেশ (ফুলবাতাসা-পালের নাও-তেঁতুলতলা-শাপলাপুকুরের দেশ), কিন্তু হাজার মাইল দূরের কত ছেলেমেয়েদের মনে চুপচাপ বসে থাকে এই দেশ। আওয়াজ করে না, নড়াচড়াও না, শুধু মাঝে মাঝে ভিতরে মুচড়ে দেয় ব্যথার সীমানা, আমরা বুঝতে পারি ঐ যে আমার দেশ, ঐ যে আমার দেশের ইতিহাস, ভয়াল গণহত্যার আর গণধর্ষণের এবং তারপর আবার উঠে দাঁড়ানোর। [...]

আমার ছোট্ট ছেলে জন্মাবার পর জীবনের একপর্যায় থেকে নিজের শরীরের নানান অংশ নিজেই টেনে ব্যথা পেয়ে চিৎকার দিত, এমন করে সে চিনেছিল নিজের শরীরের সীমা। কোথায় লাগলে নিজের শরীরে বাজে এমন করে। এইভাবে মানবশিশু হাতড়ে হাতড়ে ব্যথার সীমানা দিয়ে নিজের আকার আবিষ্কার করে সেটা দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম আমি। ব্যথার সীমা দিয়ে এইভাবে দেশও চেনা যায়, বাংলা নামের দেশ, বাংলাদেশ। এই এত্তটুকুন নাম, অর্ধশতকও হয়নি তার স্বাধীনতালাভের, এত্তটুকুন দেশ (ফুলবাতাসা-পালের নাও-তেঁতুলতলা-শাপলাপুকুরের দেশ), কিন্তু হাজার মাইল দূরের কত ছেলেমেয়েদের মনে চুপচাপ বসে থাকে এই দেশ। আওয়াজ করে না, নড়াচড়াও না, শুধু মাঝে মাঝে ভিতরে মুচড়ে দেয় ব্যথার সীমানা, আমরা বুঝতে পারি ঐ যে আমার দেশ, ঐ যে আমার দেশের ইতিহাস, ভয়াল গণহত্যার আর গণধর্ষণের এবং তারপর আবার উঠে দাঁড়ানোর। কমলা কালেকটিভের ‘বীরাঙ্গনা’ দেখতে গিয়েছিলাম, মরিয়মের গল্প, পরে খুশি-মায়া-মেহেরের গল্প, আরো পরে কালো পর্দা জুড়ে এক এক করে ফুটে ওঠা টকটকে লাল হরফে বীরাঙ্গনাদের নাম, বাহাতুন-জয়গুন-শামসুন্নাহার-রাজুবালা-গুরুদাসীদের নাম... সেই নামগুলোই বিধুর গল্প। আহা, পানির নিচে জোঁকের—জলজ ফুলের মৃণালের—মাছের ভাই ভাই হয়ে নাক ভাসিয়ে থাকা গর্ভিণী নারীর গল্প। শুকনো পুকুরে লুকাবার চেষ্টা করা নারীর গল্প। মায়ের গায়ে আগরবাতির মিষ্টি গন্ধ শোঁকা মেয়েশিশুর গল্প। তেঁতুলগাছে উঠে দুরন্তপনা করতে গিয়ে প্রেম আবিষ্কার করা কিশোরীর গল্প, মাথায় চালের বস্তা আর কাঁখে শিশুসন্তান নিয়ে ভারতে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করা নারীর গল্প। লোককাহিনীর রাজকন্যা কমলার শুষ্ক সরোবরে জল আনতে গিয়ে আত্মাহুতি দেবার গল্প। শো’র উদ্বোধন করতে গিয়ে স্বনামধন্য বৃটিশ-বাংলাদেশী নৃত্যশিল্পী আকরাম খান স্মরণ করেন মার্টিন লুথার কিং-এর অমোঘ বাণী — “দেয়ার কামস আ টাইম হোয়েন সাইলেন্স ইজ বিট্রেয়াল”, এর চেয়ে সংক্ষেপে বাঙালি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতাকে বোধহয় তুলে ধরা যায় না। বীরাঙ্গনারা ফিরে এসেছিলেন পাকবাহিনী ও তার দোসরদের পরিখা থেকে — ক্যাম্প থেকে, যেমন করে ফিরে এসেছিলেন যুদ্ধজয়ী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। বীরাঙ্গনাদের কাউকে কাউকে তাঁদের পরিবার ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছিলেন — তাঁরা চলে গেছেন অজানার পথে—অচেনা গ্রামে—পতিতালয়ে, আর কাউকে কাউকে তাঁদের পরিবার গ্রহণ করেছিলেন একটিমাত্র শর্তে, সে শর্তের নাম নৈঃশব্দ্য। জন্মান্ধ যেমন আমৃত্যু অন্ধকার এক পৃথিবীতে সাঁতরে ফেরে, বীরাঙ্গনাদের অনেকে তেমনি এক অন্ধকার নৈঃশব্দ্যে সাঁতরে ফিরেছেন, তাঁদের মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁদের…

ফারাবী নামধারী অনলাইনের এক ইতর শ্রেণির জঙ্গি সম্প্রতি "রকমারি.কম" নামের একটি বই বিক্রির ওয়েবসাইটের ওপর ফতোয়া জারি করেছে। সেই সাইটের তালিকায় অভিজিৎ রায়, রায়হান আবীরের মতো লেখকদের বই থাকায় সাইটের মালিকদের হুমকিসহ তাঁদের কার্যালয় আক্রমণের উস্কানি দিয়েছে এই জঙ্গি। [...]

৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট। রে ব্রাডবারি-র এই নামের উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে এক বন্ধুর কাছ থেকে জেনেছিলাম — এই তাপমাত্রায় নাকি বই পোড়ে। পৃথিবীতে বই পোড়ানোর মচ্ছব নতুন না। সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু। ব্যাবিলনীয়রা পুড়িয়েছে, এথেনীয়রা পুড়িয়েছে, রোমানরা পুড়িয়েছে। এমনকি গত শতকে নাজি জার্মানিতে রীতিমতো বনফায়ার করে বই পোড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীও পিছিয়ে ছিল না। তাদের বোমারু বিমানগুলো টার্গেট হিসেবে প্রায়ই খুঁজে নিতো জার্মানির লাইব্রেরিগুলোকে। পঞ্চাশের অন্ধকার দশকে ম্যাকার্থিজমের বিশুদ্ধি অভিযানে আমেরিকান মননকে কমিউনিজমের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যও বই পোড়ানো হয়েছে। বই পোড়ানো ছাড়াও সেনসরশিপের আরও বহু রকম চেহারা দেখেছি আমরা। সেখানে যোগ হয়েছে আরও নতুন কয়েকটি পন্থা। ফারাবী নামধারী অনলাইনের এক ইতর শ্রেণির জঙ্গি সম্প্রতি 'রকমারি ডট কম' নামের একটি বই বিক্রির ওয়েবসাইটের ওপর ফতোয়া জারি করেছে। সেই সাইটের তালিকায় অভিজিৎ রায়, রায়হান আবীরের মতো লেখকদের বই থাকায় সাইটের মালিকদের হুমকিসহ তাঁদের কার্যালয় আক্রমণের উস্কানি দিয়েছে এই জঙ্গি। এই লেখকদের অপরাধ — তাঁরা নাস্তিক্যবাদী, তাঁরা বিজ্ঞান এবং প্রান্তিক দর্শনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিরিয়াস লেখালিখি করেন। হুমকি দেয়া হয়েছে — অচিরেই এইসব নাস্তিক্যবাদী চিন্তার প্রচার বন্ধ না করা হলে সাইটের সাথে যুক্তদেরও ব্লগার রাজীব হায়দারের মতোই ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হবে। হুমকি শুনে সাইটটির মালিক পক্ষ নতজানু তোষণ নীতির পথ ধরেছেন; তাঁদের পক্ষ থেকে হুমকি প্রদানকারীকে একরকম ক্ষমাপ্রার্থনা করেই আশ্বাস দেয়া হয়েছে — এমনটি আর কখনো হবে না। এ নিয়ে গত কয়েক ঘণ্টা ধরেই অনলাইনের ফোরামগুলো উত্তপ্ত। আহত প্রগতিশীলরা কেউ কেউ সাইটটির মালিক পক্ষের কাপুরুষতার সমালোচনা করছেন, কেউ হুমকি দিচ্ছেন সাইটটিতে নিজের একাউন্ট বাতিল করবার, কেউ সাইটটি বর্জনের ডাক দিচ্ছেন, চরম উদাস এবং রণদীপম বসুর মতো কেউ কেউ আবার প্রতিবাদ হিসেবে নিজেদের বইও সে সাইটের তালিকা থেকে প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। 'রকমারি ডট কম' দেখা হল। প্রবল ক্ষমতাধর রথী-মহারথীদেরও একসময় দেখা হয়ে গেছে। কখনো জঙ্গি অপশক্তি কখনো সরকারের সাথে 'মত প্রকাশ' ইস্যুতে আপোস করতে কেউ তাঁরা কারো চেয়ে কম ছিলেন না। জলপাই শাসনামলে সুশীল চিন্তার কাণ্ডারী মহান ডেইলি স্টার পত্রিকা তার নির্যাতিত সাংবাদিক তাসনীম খলিলের পাশে দ্বিধাহীনভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে আমার মনে হয়েছে। বরং পত্রিকাটিকে দেখেছি উল্টো একের…

দীর্ঘায়ুর সেই দুর্দৈবের ক্রমিক পুনরাবৃত্তি — কনিষ্ঠজন ও বন্ধুদের মৃত্যুশোক ভোগ। তারা ঝরে যায় গাছের পাতার মতো, ফুলের মতো নিঃশব্দে, প্রায়শ কোনো সংকেত ছাড়াই। গাছে আবার পাতা গজায়, ফুল ফোটে, কিন্তু মৃতেরা আর ফেরে না কোনো দিন। আনোয়ার চলে গেল ‘ফাল্গুনের অঙ্গন শূন্য করি’ ৩ মার্চ (২০১৪) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায়। অথচ আমরা তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। [...]

দীর্ঘায়ুর সেই দুর্দৈবের ক্রমিক পুনরাবৃত্তি — কনিষ্ঠজন ও বন্ধুদের মৃত্যুশোক ভোগ। তারা ঝরে যায় গাছের পাতার মতো, ফুলের মতো নিঃশব্দে, প্রায়শ কোনো সংকেত ছাড়াই। গাছে আবার পাতা গজায়, ফুল ফোটে, কিন্তু মৃতেরা আর ফেরে না কোনো দিন। আনোয়ার চলে গেল ‘ফাল্গুনের অঙ্গন শূন্য করি’ ৩ মার্চ (২০১৪) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায়। অথচ আমরা তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। ভাবি, আনন্দহীন এই শূন্য ভুবনে এখন আমার দিন কাটবে কীভাবে! আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী ছিলাম, থাকতাম ঢাকা হলে (১৯৫৬-৫৮)। করিডর দিয়ে তাকে হেঁটে যেতে দেখতাম, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গম্ভীর মুখ, কোনো কথা হতো না। আমার বন্ধুরা তাকে আড়ালে ‘মনীষী’ বলত; উপাধিটি সে জুটিয়েছিল কলকাতার এক বামপন্থী মাসিকপত্রে দর্শনবিষয়ক একটি প্রবন্ধ লেখার সুবাদে। ছাত্র ইউনিয়নের সভা-সমিতিতে তাকে কোনো দিন দেখিনি, বরং সে আমাদের এড়িয়েই চলত। তাই বরিশালের বিএম কলেজে তাকে দেখে এবং স্থানীয় কমিউনিস্ট নেতা অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের জন্যই সে বরিশাল এসেছে শুনে অবাকই হয়েছি। যা হোক বরিশালেই তার সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুত্ব! ওখানে সে বেশিদিন থাকেনি, চলে যায় ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজে, সম্ভবত ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের অসুবিধায়। কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক বছরের বৃত্তি নিয়ে সে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায় এবং রিডিং ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করে। ভেবেছি অন্যদের মতো সেও পিএইচডি ডিগ্রি না নিয়ে ফিরবে না। কিন্তু বৃথা। এক বছরের মাথায় সে ফিরে এল। খবর শুনে সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় দেখা করতে গেলাম এবং ফিরে আসার কারণ শুনলাম। বলল, ও দেশে লেখকদের খুব সমাদর, তাই একটি বই লিখে আবার ফিরবে। সে বই আর কোনো দিন লেখা হয়নি, বিদেশে শিক্ষালাভও নয়। কিছুদিন কবি ইয়েটস ছিলেন তার প্রধান আলোচ্য, যেন তাঁকে নিয়েই বইটি লিখবে। একসময় স্থলবর্তী হলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে নিয়ে যা-কিছু লিখেছিল তার প্রায় সবই পড়ে আছে দুষ্পাঠ্য পাণ্ডুলিপির খসড়ায়। আমি ১৯৬২ সালে বরিশাল ছেড়ে নটের ডেম কলেজে চলে আসি, আনোয়ার তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকতাম তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ায়। ঢাকা এলে বাড়িতে ব্যাগ ফেলে সে ছুটে আসত এখানে, তারপর আমাকে টেনে নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী ফেরা। আমিও থেকে যেতাম কয়েক দিন। সেসব দিনে আমরা প্রায় প্রতিদিন রমনা পার্কে কিছুক্ষণ কাটিয়ে এলিফ্যান্ট রোড দিয়ে পৌঁছতাম নিউমার্কেটে, ঢুঁ মারতাম বইয়ের দোকানগুলোতে। শেষে নীলক্ষেত ও মতিঝিল হয়ে…

নিজের আত্মীয়, বিশেষ করে পিতৃ বা মাতৃতুল্য মানুষদের নিয়ে লেখা খুব কঠিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একই পরিবেশে বেড়ে উঠেছি আমরা, আমি আর কুসুম, অধ্যাপক আলী আনোয়ারের ছোট মেয়ে, আমার আশৈশব, আকৈশোর, আযৌবন, আজীবন বন্ধু। তাই আলী আনোয়ার চাচাকে, এবং লাবণ্য চাচীকে আমরা মাথার ওপর বটগাছের মত ছায়াময়, শান্তিময় আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের জায়গা হিসেবে পেয়েছি, কখনো মনে হয়নি, এমন তো নাও হতে পারত! […]

নিজের আত্মীয়, বিশেষ করে পিতৃ বা মাতৃতুল্য মানুষদের নিয়ে লেখা খুব কঠিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একই পরিবেশে বেড়ে উঠেছি আমরা, আমি আর কুসুম, অধ্যাপক আলী আনোয়ারের ছোট মেয়ে, আমার আশৈশব, আকৈশোর, আযৌবন, আজীবন বন্ধু। তাই আলী আনোয়ার চাচাকে, এবং লাবণ্য চাচীকে আমরা মাথার ওপর বটগাছের মত ছায়াময়, শান্তিময় আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের জায়গা হিসেবে পেয়েছি, কখনো মনে হয়নি, এমন তো নাও হতে পারত! আমাদের সারা জীবনের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা শোক-মৃত্যুর টানাপোড়েনের মধ্যে ওঁদের পেয়েছি, আত্মীয়র মতন। এই তো। এত সহজ পাওয়াগুলি কি আর বিশ্লেষণ করা যায়, নাকি মানুষগুলোকে দূর থেকে নিরীক্ষণ করা যায়। অন্য অনেকের মত চাচার দৈহিক জীবনাবসান এখনো আমি গ্রহণ করতে পারছি না, কিছুতেই তো মেনে নিতে পারছি না আমার একজন বাবা চলে গেলেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক, বিদগ্ধ, সংবেদনশীল একজন মানুষ আর নেই। যদিও জানি, শেষ পর্যন্ত রোগ-ভোগে অনেক কষ্ট পেয়ে অনেক দিন যুদ্ধ করে যেতে হলো তাঁকে। অনেক ভালবাসা নিয়ে গেলেন তিনি -- এই কথা বলছিলেন তাঁর পাশে দিনরাত সেবা-রত, আমৃত্যু-সঙ্গী, আমাদের লাবণ্য চাচী। কুসুম আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। অবিচ্ছেদ্য বন্ধু টুম্পা-কুসুম, এই দুই বন্ধুর সঙ্গে ক্লাস সেভেন-এর পর আনন্দ নামটাও সব সময়ের জন্য সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল, আমার কপাল-গুণে, আমি তখন সদ্য ইউগান্ডায় ৪ বছর কাটিয়ে দেশে ফিরেছি বাবা-মার সঙ্গে। সৌম্যদর্শন, আপাত-গম্ভীর চাচা, দেখা হলেই একটা হালকা হাসির রেখা দেখা দিত সেই মুখে, কী যে অসাধারণ! বিশাল লাইব্রেরি ছিল ওঁদের -- চাচাকে দেখতাম একটা খাটে বসে পড়ছেন, ওখানেই খাবার পাঠিয়ে দিতেন কখনো কখনো, লাবণ্য চাচী। চাচার পড়াশুনো বোধহয় প্রায় সারাদিনই চলত। যুক্তরাষ্ট্র, ঢাকা অথবা কলকাতায় গেলে ফিরে আসতেন বিশাল বই-এর স্তূপ নিয়ে। অধ্যাপনার ফাঁকে ওঁদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক বাড়িতে বিদগ্ধ ও আড্ডাবাজ বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আলোচনাও দেখতাম, কত মানুষকে যে দেখেছি সেই আড্ডায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা তো আছেনই, আরো আছেন ঢাকা থেকে, দেশের প্রত্যন্ত সীমানা থেকে, কলকাতা থেকে, বিভিন্ন মানুষ, বেশির ভাগই তাঁরা অধ্যাপনা করেন, মুক্ত-চিন্তা করেন, বই লেখেন, পত্রিকা বের করেন, সংগীতের চর্চা করেন, সঙ্গীত সাধনা করেন। এই আড্ডা চলত নানাবিধ বিষয় নিয়ে, কখনো সাহিত্য, সঙ্গীত, কখনো সমসাময়িক পরিস্থিতি, দেশ, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি -- এত গভীর পাণ্ডিত্য আর…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.