দৃশ্যত আলী আনোয়ার-এর মৃত্যু ঘটেছে। ৩ মার্চ বাংলাদেশ সময় রাত দশটায় তিনি তার পৃথিবীকে আলাদা করে নিয়েছেন আমাদের থেকে। কিন্তু ১৯৭০ সালে বিদ্যাসাগরের সার্ধশতবার্ষিকীর সময় থেকে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে তিনি যে নিভৃত অথচ গভীর ভূমিকা রাখতে শুরু করেন, যার প্রকাশ ঘটে 'বিদ্যাসাগর' সংকলনটির মধ্যে দিয়ে, অথবা যে একাগ্র ভূমিকা তিনি রাখেন ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' বিষয়ক সিম্পোজিয়ামে যুক্ত থেকে এবং ১৯৭৩ সালে সংশ্লিষ্ট সংকলন প্রকাশের মধ্যে দিয়ে, সামরিক শাসনবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, সেসব অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে আমাদের সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসে। 'ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যও সাহসের প্রয়োজন।' — বলেছিলেন তিনি। আমরা তাঁর এ কথার সত্য উপলব্ধি করছি এখন মৌলবাদীদের হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন-নিপীড়ন ও বোমাবাজির শিকার হয়ে।

বিদ্যাসাগরের গভীর কোনো ইচ্ছা বা অবকাশ ছিল না সমাজ প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে বুঝে নেওয়ার, এরকমই মনে করেন আলী আনোয়ার; মনে করেন তিনি, বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্বও ছিল এর প্রতিবন্ধক। বিদ্যাসাগরের সাহস ছিল, ছিল আত্মবিশ্বাস, বিবেকবুদ্ধি, সহানুভূতি আর চিন্তার ক্ষমতাও; আরো ছিল রাজনৈতিক আত্ম-অপসারণ বা সমষ্টির রাজনৈতিক ভূমিকার উপলব্ধির সংকট। সব মিলিয়ে আত্মনির্ভরতা ও নেতৃত্বের ক্ষমতায় আস্থা হয়ে উঠেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের উপকরণ মাত্র। এভাবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মধ্যে দিয়ে আসলে ব্যক্তির সীমানা উপলব্ধির প্রয়াস চালান আলী আনোয়ার। সে-প্রয়াসের কারণে আমরা পৌঁছাই এই সত্যে যে, ‘তাঁর আন্দোলনের সাফল্য যেমন শুধুমাত্র ব্যক্তি নেতৃত্বের ফলাফল নয়, তাঁর ব্যর্থতাও শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার্য নয়...।’ ধর্মাশ্রয়ী আন্দোলনে সামাজিক মুক্তি আসবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় ছিল তাঁর, শিক্ষাকে তিনি করে তুলতে চেয়েছিলেন ‘যুক্তি-আশ্রয়ী, বিজ্ঞানমুখিন ও ধর্মনিরপেক্ষ’। রক্ষণশীল বিপ্লবাতঙ্ক থেকে তিনি সংস্কার আন্দোলন শুরু করেননি, যদিও বাঙালি সমাজে তাঁর প্রতীকী উদাহরণ হয়ে ওঠার কারণ ছিল তাঁর চরিত্রশক্তি। ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর শানানো রাজনৈতিক চিন্তার তুলনায় পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত তিনি এগিয়ে থাকেন ওই কারণেই। আলী আনোয়ার তাঁর সদ্যপ্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ সাহিত্য-সংস্কৃতি নানা ভাবনা অবশ্য এই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরবিষয়ক প্রবন্ধ দিয়ে শুরু করেননি। শুরু করেছেন শিল্পের সংজ্ঞা নির্ণয়-সংক্রান্ত সমস্যা নামের প্রবন্ধটি দিয়ে। কিন্তু শিল্পের সংজ্ঞা নির্ণয় থেকে শুরু করে সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান যেটির কথাই বলা হোক না কেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, পাবলো নেরুদা, ওয়াহিদুল হক, ওরখান পামুক কিংবা শিরিন এবাদি যাঁর কথাই বলা হোক না কেন, সমাজ-প্রক্রিয়াকে বোঝার বিষয়টি কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে থাকেই। আর সমাজটি যদি হয় বাঙালি সমাজ, তাহলে অনিবার্যভাবেই এসে পড়ে এ-সমাজে পরিবর্তনের প্রেরণা নিয়ে সংঘটিত সামাজিক সংস্কারের প্রসঙ্গ, আসে তেমন সংস্কারের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই পথিকৃৎকে বিংশ শতাব্দীর অনেক চিন্তক-শিক্ষাবিদই নানাভাবে উদ্ঘাটন করেছেন; আলী আনোয়ার করেছেন বিষাদে ছোঁয়া নিঃসঙ্গ বিদ্যাসাগরকে, ব্যক্তির সীমানা উদ্ঘাটন করতে থাকা বিদ্যাসাগরকে। আলী আনোয়ারের দুটি লেখা আছে এ-গ্রন্থে বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে (বিক্ষত বিদ্যাসাগরের নির্বেদ ও নৈরাশ্য, বিদ্যাসাগর ও ব্যক্তির সীমানা)। নানা প্রশ্ন জাগান তিনি, চেষ্টা করেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার এবং এরকম প্রশ্ন ও প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে দিয়ে স্থাপিত হয় আরো প্রশ্নের। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক এই তিন আপাতবিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রকে স্পর্শ করে বিস্তৃত…

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও দেশের সার্বভৌমত্বকে পদদলিত হতে দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এ ছাগুপনা প্রতিরোধের এখনই সময়। এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বাংলা কমিউনিটি ব্লগ অ্যালায়েন্স-এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। [...]

আমরা চেয়েছিলাম এই বাংলার আকাশে চাঁদতারা নয়; বরং লাল-সবুজের একটি পতাকা মাথা উঁচু করে উড়বে। এই পতাকাটির জন্য আমরা বছরের পর বছর ধরে সংগ্রাম করেছি। অবশেষে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ৪ লাখ মা-বোনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে লাল-সবুজের এই পতাকাটি আমাদের হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি পতাকার জন্য এমন চরম মূল্য দেয়ার নজির দ্বিতীয়টি নেই। আমাদের মুক্তির যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি। কিন্তু আমাদের পতাকা, আমাদের জাতীয় পরিচয়, আমাদের অস্তিত্বের বিপরীতে অবস্থান নেয়া একাত্তরের পরাজিত শক্তি বসে নেই, তারা এখনো সক্রিয়। এই ২০১০-এও মুক্তিযোদ্ধার নামে ঢাকার রাস্তার নামকরণ করা হলে পাকিস্তান তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় (১)। এই ২০১৩তেও বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দিলে সেটার বিরুদ্ধে নিন্দাপ্রস্তাব ওঠে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে! (২) তাদের এদেশীয় এজেন্টরা এখনো কুষ্টিয়া-পাবনায় শহীদ মিনার ভাঙে, তারা এখনো চাঁদপুরে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় আগুন দেয়। চাঁদতারা মার্কা যে-পতাকাটিকে আমরা ৩০ লাখ জীবনের বিনিময়ে প্রতিস্থাপন করেছি লাল-সবুজের পরিচয় দিয়ে, এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বসে এখনো তারা সেই পরাজিত পাকিস্তানের পতাকা উঁচিয়ে উল্লাস প্রকাশের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে না। চাইলেই কি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা পোড়ানো যায়? চাইলেই কি ভিনদেশের, বিশেষ করে যে-পতাকার বিরুদ্ধে আমাদের রক্ত ঝরেছে, সে-পতাকা নিয়ে উল্লাস করা যায়? বাংলাদেশের পতাকা আইন (৩) অনুসারে এটা করা অপরাধ। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা কীভাবে, কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে বলা আছে পতাকা আইনে। এই ক্ষেত্রগুলো ছাড়া পতাকা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা যাবে না। আর অন্যান্য সব দেশের মতোই বাংলাদেশের মাটিতেও খুবই সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া বিদেশের পতাকা ব্যবহার করা যাবে না। বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশের পতাকা ওড়ানোর এই ক্ষেত্রগুলো সেসব দেশের দূতাবাস ভবন, তাদের রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীদের গাড়িতে বাংলাদেশে সফরকালে ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে কোথাও বিদেশি জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে হলে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুমতির দরকার হবে। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আইন অনুসারে, "Except as stated in the above Rules, the flag of a Foreign State shall not be flown on any car or building in Bangladesh without the specific permission of the Government of the People’s Republic of Bangladesh." (People's Republic of Bangladesh Flag Rules, article 9.IV) সুতরাং কারো ইচ্ছা হলেই বিদেশি…

১৯৮৩ থেকে ২০১৪ -- মাত্র তিনটি দশক। কথিত ভ্যালেন্টাইনের আগ্রাসনে বিভ্রান্ত, বিস্মৃত নিজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস! ক্ষমা করো শহীদেরা। ১৯৮৩ থেকে ২০১৪ -- মাত্র তিনটি দশক। এরই মধ্যে আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম গণতন্ত্র-স্বৈরাচার! সামরিক স্বৈরাচার অনেক আগে থেকেই আবার গণতন্ত্রের ভোটবন্ধু হয়ে বসে আছে। এ থেকে মুক্তি নেই আমাদের? [...]

১৯৮৩ থেকে ২০১৪ -- মাত্র তিনটি দশক। কথিত ভ্যালেন্টাইনের আগ্রাসনে বিভ্রান্ত, বিস্মৃত নিজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস! ক্ষমা করো শহীদেরা। ১৯৮৩ থেকে ২০১৪ -- মাত্র তিনটি দশক। এরই মধ্যে আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম গণতন্ত্র-স্বৈরাচার! সামরিক স্বৈরাচার অনেক আগে থেকেই আবার গণতন্ত্রের ভোটবন্ধু হয়ে বসে আছে। এ থেকে মুক্তি নেই আমাদের? ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল আমাদের ভাই-সহযোদ্ধা জাফর-জয়নাল-দীপালী-কাঞ্চন। আমার স্মৃতি যদি আমাকে বিভ্রান্ত না করে থাকে তাহলে বলতে পারি এর পরদিন তারই প্রতিবাদে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাছে কে.সি. দে রোডে সেই স্বৈরাচারীর নির্দেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে কথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছোঁড়া বুলেটে মোজাম্মেলের বুকের তাজা রক্তে চট্টগ্রামের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। আরো অনেক সহযোদ্ধা আহত হয়েছিলেন সেদিন। (যদি আমার তথ্যে ঘাটতি বা অসংগতি থাকে কেউ শুধরে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।) তারপর থেকেই এদেশের তরুণ ছাত্র-জনতা এই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‌স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবেই পালন করেছে, যতটুকু জানি। কিন্তু দ্রোহ-প্রতিরোধ-আন্দোলন-বিপ্লব এসবকে সবসময়েই কায়েমি স্বার্থবাদী চক্র ভয় পেয়েছে, এখনো পায়। আর তাই সেই প্রতিরোধের ১৪ ফেব্রুয়ারিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য অত্যন্ত সুচতুরভাবে অনুপ্রবেশ ঘটালো ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবসের। আর এতে যোগ দিল কর্পোরেট বাণিজ্যের মেধা-কূটকৌশল। সুতরাং কেল্লা ফতে। নো চিন্তা, ডু ফুর্তি। যার যা উদ্দেশ্য ছিল তা সফল হলো, কিন্তু আমরা যেন ভুলে যেতে বসেছি আমাদের গৌরবোজ্জ্বল আত্মত্যাগের ইতিহাস। এ লজ্জা কার? তারুণ্যের দোষ কী? স্বাভাবিকভাবেই ওরা ভালোবাসবে। এটাই তো নিয়ম। জাফর-জয়নাল-দীপালী-কাঞ্চন-মোজাম্মেল নিজেদের রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র আর আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ভালোবেসেছিল। ছাত্রসমাজের প্রাণের দাবি আদায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমরা যারা তাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আজ গণতন্ত্রের ঢোল বাজাচ্ছি, কর্পোরেট বাণিজ্যের আগ্রাসনের কথিত ভালোবাসা দিবসের গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছি, আমাদের বিবেক এতটাই প্রতিবন্ধী হয়ে গেল? ভাবতেই অবাক লাগে। নারী-পুরুষের ভালোবাসা, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা -- এ সবকিছুই চিরন্তন। কিন্তু আমাদের গৌরবোজ্জ্বল গণতান্ত্রিক ইতিহাসকে ভুলবো কেমন করে? মিডিয়াগুলো নেমেছে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় -- কে কত বেশি করে এই ভ্যালেন্টাইন দিবসকে প্রচার করবে। ভালোবাসা যে শুধু নারী-পুরুয়ের ভালোবাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে যে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, মায়ের নাড়ি-ছেঁড়া ধনের আত্মত্যাগ, রক্তে-ভেজা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তীব্র ভালোবাসা রয়েছে তা কি…

"আপনাদের বাচ্চারা থাকবে মাটির কাছাকাছি, তারা মাটির গন্ধ নিয়ে বড় হবে।" বেশ কয়েক বছর আগে, একটি আধুনিক ইংরেজি কেজি স্কুলের উদ্বোধনীতে আমাদের বিখ্যাত এক কবি ও সাংবাদিক বলেছিলেন কথাগুলো, শিশুদের দেশের মাটি ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে। আমি ঠাট্টাচ্ছলে প্রতিবাদ করলাম, "এটা কি বললেন, স্যার! আমাদের বাচ্চারা কি চাষা হবে নাকি, তারা কেন মাটি কাদা নিয়ে পড়ে থাকবে? দোয়া করেন, তারা যেন আপনার সন্তানদের মতো নু'ইয়র্ক, টরোনটো-তে থাকতে পারে।" আমার লুম্পেন মধ্যবিত্ত টাইপ কথা শুনে তিনি কিছু না বলে হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। [...]

"আপনাদের বাচ্চারা থাকবে মাটির কাছাকাছি, তারা মাটির গন্ধ নিয়ে বড় হবে।" বেশ কয়েক বছর আগে, একটি আধুনিক ইংরেজি কেজি স্কুলের উদ্বোধনীতে আমাদের বিখ্যাত এক কবি ও সাংবাদিক বলেছিলেন কথাগুলো, শিশুদের দেশের মাটি ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে। আমি ঠাট্টাচ্ছলে প্রতিবাদ করলাম, "এটা কি বললেন, স্যার! আমাদের বাচ্চারা কি চাষা হবে নাকি, তারা কেন মাটি কাদা নিয়ে পড়ে থাকবে? দোয়া করেন, তারা যেন আপনার সন্তানদের মতো নু'ইয়র্ক, টরোনটো-তে থাকতে পারে।" আমার লুম্পেন মধ্যবিত্ত টাইপ কথা শুনে তিনি কিছু না বলে হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। http://www.flickr.com/photos/27671489@N04/12463928315/ দেশ জাতি মাতা ভাষা নিয়ে যারা বেশী সোচ্চার, যারা এই ভাষা সংস্কৃতির ধারক বাহক, তারা এবং তাদের ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত এবং সমস্ত সুবিধা নিয়ে তারা দেশ বা দেশের বাইরে থাকেন। আর আমরা তাদের মন ভুলানো কথায় দেশ-মাটি-ভাষা নিয়ে পড়ে থাকি। আবার দিন শেষে দেখা যায়, আমরা যখন কষ্ট করে মাঠে হাল চাষ করে ফসল তুলে ঘরে তুলবো, তখন তারা জমিদারের মতো বিদেশ থেকে এসে আমাদের অবস্থান বা অবদানগুলো কেড়ে নিয়ে দেশ ও দশের নেতৃত্ব দেয় । কারন, তারা বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত, তারা দশের মাথা ও অতুলনীয়! তাদের সাথে থাকে বিদেশী যোগাযোগ, যা তাদের আমাদের উপর রাজত্ব বিস্তারে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। আমরা সারা বছর এই দেশের হাটে মাঠে ধুলোয় কাদায় চড়ে ক্লান্ত এবং দিন শেষে তাদের দার্শনিক শেকলে অতঃপর বন্দি হই। আমাদের সন্তানেরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেই মাঠে পড়ে থাকে, রাস্তায় গুলি-বোমা খায় - খেয়ে চলে। রাষ্ট্র আমদের সন্তানদের নিশ্চয়তা বিষয়ে উদাসীন। খুব বেশি শোনা যায় না, রাস্তায় বুদ্ধিজীবীদের, রাজনীতিবিদদের, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা গুলি খেল, ককটেল খেল। তারা এসব থেকে অনেক দূরে, শুধু ফসল তোলার সময় হাজির হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক - বুদ্ধিজীবীরা ঠিকই জানেন উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি জানা কেমন দরকারি । তারা নিজ সন্তানদের ঠিকই তা বুঝিয়ে দেন, কিন্তু চাষা,মজুর, খেটে খাওয়া লোকদের সন্তানদের তারা উপেক্ষা করেন। অনেকক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ গুলো নিতে দেন না। পরামর্শ তো দেন না, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালনা করেন। এদের ছেলেমেয়েরাও বিদেশের মাটিতে নিজেদের বাচ্চাদের টুংটাং বাংলা ছড়া আর দেশাত্মবোধক…

শীতের সন্ধ্যা। হিম-হিম হাওয়া। টিএসসি পেরিয়ে হাঁটছি বইমেলার পথ ধরে। ফেব্রুয়ারি এলে সব পথ যে পথে গিয়ে মেলে, তা হলো বইমেলা প্রাঙ্গণ। হাঁটছি আর ভাবছি। আমাদের বইমেলার মতো এতো প্রাণময় বইমেলা পৃথিবীর আর কোথাও কি আছে? [...]

শীতের সন্ধ্যা। হিম-হিম হাওয়া। টিএসসি পেরিয়ে হাঁটছি বইমেলার পথ ধরে। ফেব্রুয়ারি এলে সব পথ যে পথে গিয়ে মেলে, তা হলো বইমেলা প্রাঙ্গণ। হাঁটছি আর ভাবছি। আমাদের বইমেলার মতো এতো প্রাণময় বইমেলা পৃথিবীর আর কোথাও কি আছে? পৃথিবীর আর কেউ কি আমাদের মতো এতো আবেগ নিয়ে বইমেলায় আসে! এতো ভালবাসা বুকে নিয়ে পৃথিবীতে আর কেউ কি নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেয়? এইসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাচ্ছি বইমেলার প্রবেশ তোরণের কাছে। একা। চারপাশে প্রচুর মানুষের ভিড়। কেউ প্রিয় মানুষটির হাত ধরে, কেউ দল বেঁধে এগুচ্ছে বইমেলার দিকে। এদের কাউকেই আমি চিনি না। কিন্তু কেন জানি তাদের সাথে এক ধরনের নৈকট্য অনুভব করছি। কেন? কারণ এই মুহূর্তে আমাদের সবার প্রাণে বাজছে বইমেলার সুর। আমরা সবাই একই নিমন্ত্রণে যাচ্ছি। বইয়ের নিমন্ত্রণে। একা হাঁটছি। তবু একাকিত্ব অনুভূত হচ্ছে না এক ফোঁটাও! বাংলা একাডেমির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই কয়েক ফুলশিশু এগিয়ে আসে। তাদের হাতে নানা রঙের ফুল। মন ভরে যায়! এক তাড়া ফুল এগিয়ে দিয়ে একটি শিশু বলে, ফুল কিনবেন? আমি বললাম, ফুল তো লাগবে না। — কিনলেই লাগবে। — কীভাবে লাগবে? — কিনেন আফা, কিনেন। পাশের শিশুটি বলে ওঠে। আমি ফুলগুলোর দিকে না তাকিয়ে শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাবি, ফাল্গুন আসতে আর কয়দিন বাকি? কেন জানি, ফাল্গুনের জন্য অপেক্ষাটা হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে! মিষ্টি এই শিশুরা সবাই রঙিন পোশাক পরেছে আজ। তাদের চোখেমুখে আমি ফাগুনের ছোঁয়া দেখি। এতো সুন্দর! ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করি। ক্লিক করতেই মহা খুশি ওরা। আনন্দে বিভিন্ন পোজ দেয়। আমিও একের পর এক ক্লিক করতে থাকি। ওরাও বুঝে গেছে, ওরা মডেল। ছবি তোলা শেষে সপ্রতিভ আবদার, এইবার টাকা দেন, নাইলে ফুল কিনেন। ফুল বেইচে ভাত খামু। ব্যাগ থেকে দশ টাকার একটি নোট বের করে দিলাম। বললাম, এটা নাও, ফুল লাগবে না। শিশুটি মলিন মুখে আমার হাতে ফুলের একটি তোড়া দিল। আমি বললাম, এই ফুলের দাম কি দশ টাকা? সে বললো, না, আরো বেশি, তবু দিলাম। আমি এবার আরো দুটি দশ টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে বললাম, এবার হয়েছে? ফিক করে হেসে দিয়ে বললো, খুব হইসে! দশ টাকার তিনটি নোট হাতে নিয়ে এমনভাবে ছুট…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.