শিক্ষক হিসেবে নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মো. আনোয়ার হোসেন যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের সর্বপ্রধান নির্বাহী হিসেবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০১২ সালে ভয়াবহ সংকটে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল অতল খাদের কিনারে; তখন ওই ভয়ানক সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই উদ্যোগী হয়েছিল তাকে সেখানে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের ব্যাপারে। কিন্তু মনোনীত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আনোয়ার হোসেনের ধারণা ছিল। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই তার উদ্যোগে উপাচার্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যে-প্রক্রিয়ার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।...

শিক্ষক হিসেবে নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মো. আনোয়ার হোসেন যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের সর্বপ্রধান নির্বাহী হিসেবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০১২ সালে ভয়াবহ সংকটে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল অতল খাদের কিনারে; তখন ওই ভয়ানক সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই উদ্যোগী হয়েছিল তাকে সেখানে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের ব্যাপারে। কিন্তু মনোনীত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আনোয়ার হোসেনের ধারণা ছিল। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই তার উদ্যোগে উপাচার্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যে-প্রক্রিয়ার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অদ্ভূত ব্যাপার হলো, শিক্ষকরাও অনীহ ছিলেন নির্বাচিত উপাচার্যের ব্যাপারে। কিন্তু রিটের প্রেক্ষিতে রুলনিশি দিয়ে হাইকোর্ট এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ওই নির্বাচনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না হওয়ার পরও ভোট পাওয়ার দিক থেকে তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন, তারপর নিয়োগ পেয়েছিলেন উপাচার্য হিসেবে। কিন্তু খুব বেশি দিন দায়িত্বে থাকতে পারেননি- আমাদের কথিত শিক্ষিত শিক্ষকরা ১৯৭৩ সালের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশের অপব্যবহার করে তার বিদায়ের ঘন্টা বাজিয়েছেন। ২০১৩ সালেই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে তার আগের কর্মস্থলে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গেল ফাল্গুনে মো. আনোয়ার হোসেন ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : অবাঞ্ছিত একজন’ নামে যে-বই লিখেছেন, সে-বইয়ের উপজীব্য এই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অর্জিত তার অভিজ্ঞান, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা। এই অর্জনের পরিপ্রেক্ষিত-ভাবনা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক অতীত, পারিবারিক আবহ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামের বিভিন্ন ঘটনাপঞ্জী, ব্যক্তিগত অনুভূতি ইত্যাদি বিষয়গুলো এলেও বইয়ের নামই বলে দেয়, এ বই আসলে অন্তর্গত রক্তক্ষরণের দলিল, যে-দর্শন তিনি অর্জন করেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াতে সেই দর্শনের ওপর আঘাত আসায় তার জ্বলে ওঠার দলিল। ২. আমি জানি না, আর কারও কাছে এরকম মনে হয় কি না- তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার আনোয়ার হোসেনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই যোগদান ও প্রস্থানের প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে স্পেনের পোর্ট সিটি বিলবাওয়ের মিগুয়েল ডি উনামুনোর কথা। ১৯৩৬ সালের শেষ দিনটিতে মৃত্যু ঘটেছে তার। চোখের সামনে আনোয়ার হোসেনের এই আসা-যাওয়ার ঘটনা না ঘটলে হয়তো আমার মনেও হতো না, এতদিন পরেও মিগুয়েল ডি উনামুনো প্রাসঙ্গিক কোনও কোনও পরিস্থিতিতে। মিগুয়েল ডি উনামুনো-ও, আপনারা জানেন, শিক্ষক ছিলেন। তা ছাড়াও ছিলেন প্রাবন্ধিক, কবি, নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক। এ নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে যে…

মেইল বক্স থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ছেলেবেলার ভেতর হামাগুঁড়ি দিয়ে সোজা খাটের নীচে। অন্ধকার হাতড়ে টেনে বের করি টিনের বাক্সে রাখা পুতুলের সংসার, এলোমেলো করে দিতে দিতে ভাবি বাবা বুঝি 'ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী' হাতে নিয়ে পড়তে ডাকবে। বাবার দিকে ছুটে যেতে যেতে দেখি বুড়ো জেলের মুখটা বাবার। [. . .]

আমাদের পুরোনো বাড়ির উঠোনের লম্বা ঢ্যাঙা একমাথা ঝাঁকড়া সবুজ চুলের কামিনী গাছটা, আমার প্রথম প্রেমিক। প্রতিবারের বর্ষায় মাথায় সাদা টুপি পরে সে যখন প্রলুব্ধ করতে আসত, চারপাশে তখন সুগন্ধে ম'ম'। রানী সমেত মৌমাছির দল সারাদিন গুনগুন গানে ওর চারপাশটা ভরে তুলতো। একটু জোরে হাওয়া দিলে পালকের মতো ঝরে পড়ত সাদা পাপড়ি। পড়ার টেবিল থেকে মুখ তুলে ওর হাতছানির ভেতর হেঁটে হেঁটে কলঘরে গিয়ে অপেক্ষা করতাম আর একটা ঝড়ো হাওয়ার, অথবা ঝুমবৃষ্টির। স্কুলের জন্যে তাড়া দিতে থাকা বন্ধুদের শত্রু মনে হত। ‘আসছি... যাই’ করে করে আরও খানিকটা সময় গাছটার নীচের ছাদখোলা কলঘরে দাঁড়িয়ে থাকতো বালিকা। বর্ষাশেষে নরম সবুজ নতুন পাতার ভেতর থেকে কয়েকটা সাদা পাপড়ি কুড়িয়ে বইয়ের ভাঁজে গুঁজে দিতে দিতে ভাবত, বারোমাস — সে কত দীর্ঘ! আঙুলের করে গুনে শেষ হয় না। অপেক্ষা মৃত মীনের চোখ, উল্টে পড়ে থাকে পড়ার টেবিলে কিছুদিন। তারপর বাসার সামনের ছাতিম গাছটা বুনো গন্ধের ফুল ফোটাতে শুরু করলে ছাতিম গাছটাকে মনে হত সবচাইতে প্রিয়। জানালার বাইরে মুগ্ধ চোখজোড়া ফেলে এসে অঙ্কের খাতা ভরে যেত ভুলে। আর সন্ধ্যায় স্যারের কাছে শাস্তি নিতে নিতে মনে হত আমি অবুঝের মতো এ কী করেছি। এই এই করে কখনো দোলনচাঁপা কখনো শিউলি কখনো চন্দ্রমল্লিকার চারপাশে ঘুরঘুর। ভূগোল বইয়ের পাতা থেকে উঠে গিয়ে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসতে আসতে আমার কামিনী গাছে বর্ষা নামে। ‘বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’ শুনতে শুনতে বালিকা তার কলঘরের সময়কে প্রলম্বিত করে। কামিনীর সেই সুগন্ধি সাদা টুপির জন্যে, ঝড়-জল-কাদায় মোড়া বর্ষাকে মনে হত প্রিয় ঋতু। তারও অনেক পরে কোনো এক এপ্রিলের রাতে পৃথিবী কেমন বন্ বন্ করে ঘুরতে থাকে, বাতাসের গায়ে চাবুক পেটাতে থাকে নারকেলের পাতা। রাতভর শিব তার প্রলয়নাচন নেচে সব কেমন গুঁড়িয়ে দিতে থাকে! একসময় সব চুপকথা হয়ে গেলে ঘষা কাচের ভেতর দিয়ে আলো আসার মতো করেই ভোর আসে। ঘর থেকে বাইরে আসে কেবল বড়রা। ছোটদের কাজ কেবল জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা। একটু পর বাসার বারান্দায় আসার অনুমতি পেলে ছোটরা সব অবাক চোখে দেখতে এল বাসার উঠোনে মস্ত একটা আকাশ! এতকাল আকাশটা কেবল গাছেদের ছিল; আজ সকাল থেকে সেটা বাসার সবার হয়ে গেল।…

ঘুরে দাঁড়াতে কি লাগে?সম্মেলনের তৃতীয় দিন, ১২ জুন ২০১৪। সময় বিকেল ৫টা। ডেলিগেটদের সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসবার মুহূর্ত। আজকে ছিল শতাধিক দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের আলোচনায় বসবার দিন। তাই এই মুহূর্তটাকেই যৌথভাবে আইসিএসএফ (International Crimes Strategy Forum) এবং Komola Collective-এর পক্ষ থেকে আমরা নির্ধারণ করেছিলাম প্রতিবাদ সমাবেশের 'জিরো আওয়ার' হিসেবে [. . .]

ঘুরে দাঁড়াতে কি লাগে? সম্মেলনের তৃতীয় দিন, ১২ জুন ২০১৪। সময় বিকেল ৫টা। ডেলিগেটদের সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসবার মুহূর্ত। আজকে ছিল শতাধিক দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের আলোচনায় বসবার দিন। তাই এই মুহূর্তটাকেই যৌথভাবে আইসিএসএফ (International Crimes Strategy Forum) এবং Komola Collective-এর পক্ষ থেকে আমরা নির্ধারণ করেছিলাম প্রতিবাদ সমাবেশের 'জিরো আওয়ার' হিসেবে (বিস্তারিত ইভেন্ট: http://bit.ly/1oRjCD3)। যাতে করে ডেলিগেটরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় একাংশের হলেও নজরে আসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এই নাগরিক প্রতিবাদটুকু। কারণ, এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি সম্মেলনের ক্লোজড সেশনগুলোতেও বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হালে এতোটুকু পানি পায়নি গত দুই দিন। প্রচণ্ড ট্রাফিকের সাথে ধস্তাধস্তি করে অক্সফোর্ড থেকে লন্ডন পর্যন্ত ড্রাইভে আজকেও প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে গেল। কাছাকাছি এসে লক্ষ করলাম সম্মেলনের কেন্দ্রস্থল আজকে অনেকটাই যেন আলাদা। গত দু'দিনও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেশ কড়াকড়ি ছিল, কিন্তু আজকের সমাপনী মুহূর্তের নিরাপত্তা বেষ্টনী গত দু'দিনকেও ছাড়িয়ে গেছে। রীতিমতো এয়ারপোর্টের মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুই দফার মেটাল ডিটেক্টর আর বডি সার্চ। ট্রে-র ওপর ব্যাগ মোবাইল ঘড়ি ওয়ালেট রাখো রে, বেল্ট খোলো রে, জুতোর সোল পরীক্ষা করো রে ইত্যাদি ইত্যাদি। চারপাশে দুটি ভিন্ন সংস্থার কঠোর-দর্শন সিকিউরিটির লোকজন, তার উপর যেদিকেই তাকাই দেখি শুধু পুলিশ আর পুলিশ! মন্ত্রী-ডেলিগেটদের ঘরে ফেরার মুহূর্তটাকে নির্বিঘ্ন করার কতোই না আয়োজন! সত্যিই চিন্তায় পড়ার মতো সমস্যা আমাদের সামনে। সমাবেশ করবো কিভাবে তাহলে? কিন্তু এর মধ্যেই দেখি সাহসী মুখে একে একে জড়ো হচ্ছেন সবাই। একদিন আগেই ফোন করেছিল হৈমন্তী। নিজের পরিচয়টুকু দিয়ে জানতে চেয়েছিল কিভাবে যুক্ত হতে পারে? আমি দিনক্ষণ জানিয়েছিলাম। সবার আগে কালো শাড়ি পরে নির্ধারিত সমাবেশস্থলে ও হাজির। ওকে দেশ থেকে এই সমাবেশের কথা জানিয়েছেন মেঘনাদি (মেঘনা গুহঠাকুরতা); আর মেঘনাদিকে জরুরি আবেদন পাঠিয়েছিলেন শিপ্রাদি (শিপ্রা বসু)। উল্লেখ না করলেই নয় -- গত চার দিন ধরে শিপ্রাদির সাথে প্রায় সার্বক্ষণিকভাবেই ফেসবুকে যোগাযোগ হচ্ছিল। পরিচিত সব মানবাধিকার কর্মী আর নারীবাদী সহযোদ্ধাদের কারও সাথে যোগাযোগ করতে বাকি রাখেননি তিনি এই বৈশ্বিক সম্মেলনের হালচাল শুনে। (শিপ্রাদির মতো আরও একজন হাজির না থেকেও হাজির ছিলেন আমাদের সাথে, সেটা না উল্লেখ করলেই নয়। গত কয়েক দিন বেলজিয়াম থেকে জিয়া ভাই সকাল-বিকাল উৎকণ্ঠিতভাবে স্ট্যাটাস রিপোর্ট গ্রহণ করে গেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন।)…

পদ্য আছে যার গদ্য আছে যার তার আর কী আছে যে তার গদ্যপদ্য আছে? [...]

পুরনো বইপ্রস্থ বইপ্রস্থ ২৫ আগস্ট ২০০৯ বইপ্রস্থ ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ বইপ্রস্থ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১০ বইপ্রস্থ ২৬ জুন ২০১২ বইপ্রস্থ ২৩ এপ্রিল ২০১৩ বইপ্রস্থ ১৮ নভেম্বর ২০১৩ গদ্যপদ্য পরিসর গদ্য ও পদ্যের দ্বন্দ্ব ।। শিশিরকুমার দাশ ।। ২১-২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ১৯৮৩ সালের শরৎ-স্মৃতি বক্তৃতা ।। প্রকাশক : দে’জ পাবলিশিং ।। মূল্য : ৫০ ভারতীয় টাকা মানুষ কথা বলে তাই তার বাচন আছে। কিন্তু তাতে কী? মানুষ দাগ কাটতে চায় তাই তার লিপি আছে। কিন্তু তাতে কী? মানুষের মন আছে স্মৃতি আছে মস্তিষ্ক আছে তাই প্রতীকের অরণ্য ধরে রাখার তার ক্ষমতা আছে। কিন্তু তাতে কী? পদ্য আছে যার গদ্য আছে যার তার আর কী আছে যে তার গদ্যপদ্য আছে? সৃষ্টিশীলতা মানুষকে পদ্যে ও গদ্যে আসক্ত করেছে। তাই লিপির আর বাচনের কোড হয়ে ওঠেনি কোনোদিন কারো পদ্য অথবা আজ পর্যন্ত কারো গদ্য। চিঠি কড়চা থেকে দর্শন বিজ্ঞান পদ্যেগদ্যে শুধু সৃষ্টিমুখরতাই মানুষের অস্তিত্বকে মর্মরিত রেখেছে। মানুষ বলেছে এক আর লিখেছে আরেক। কখনো বিপর্যস্ত হয়েছে পদ্যে তো কখনো বিপর্যস্ত হয়েছে গদ্যে। কোনো

সন্দেহ নেই দুটোই সমান উচ্চতার দুটোই সমান সৃষ্টিশীলতার। এবং মহত্তম, স্বীকার করে কোনো ক্ষতি নেই আদ্যন্ত কোনো লাভও নেই, প্রকাশের কত কঠিন পথ পেরিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আজকের গদ্য আজকের পদ্য। আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে মহত্তম গদ্যপদ্যের পরিসরে প্রস্তুত থাকা বা হতে থাকাই সব লেখকের প্রতি মুহূর্তের মুক্তিযুদ্ধ। বক্তৃতাটি যিনি দিয়েছেন তিনি বাংলা পদ্য ও গদ্যের সুপরিসর পরিক্রমাকে বিশ্লেষণ করেছেন, পদ্যের ও গদ্যের নানান উদাহরণ উঠে এসেছে। বক্তৃতাটি শুনতে কেমন উপভোগ্য ছিল তা আমার দ্বারা জানানো সম্ভব হচ্ছে না, কিন্তু বক্তৃতাটি পড়তে আমার ভাল লেগেছে – শরীর খারাপের সুযোগে হালকা কিছু পড়ার উদ্দেশে এবই আমার হাতে উঠেছিল, সেটা পূর্ণ মাত্রায় রক্ষা করে আমার শরীর ও তার প্রেক্ষিত মনকে বইটি ভারী করে তোলেনি একেবারেই। পদ্য ও গদ্যের আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতার জন্মের কথা উঠেছে, কথা উঠেছে বঙ্কিমের গদ্যপদ্য প্রবন্ধের কথা – কিন্তু গদ্যকবিতার কোনো নিদর্শন যেহেতু আমি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখি না এবং বঙ্কিমের এবিষয়ক প্রচেষ্টাকে আমরা যেহেতু চিন্তার একটুখানি উসকানি ছাড়া কিছুই ভাবি না – আমি বলতে কোনো দ্বিধা…

সেই কোন্ ছেলেবেলায় সকাল হতো ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’ শুনতে শুনতে। একই গানের ভিতর রোজ সকাল গড়িয়ে ইস্কুলের মাঠে। সেখানেও আসতেন তিনি [. . .]

সেই কোন্ ছেলেবেলায় সকাল হতো ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’ শুনতে শুনতে। একই গানের ভিতর রোজ সকাল গড়িয়ে ইস্কুলের মাঠে। সেখানেও আসতেন তিনি — ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি’। রোজ সকাল থেকে রাত অবধি মাকে নানা ভাবে জ্বালিয়ে, কাঁদিয়ে, নির্বিঘ্নে যখন ঘুমিয়েছি, জানিনি মলিন মুখের মায়ের জন্যে ব্যথা হয়। জানিনি আমার চেনা মায়ের বাইরে আর যাকে মাতৃ রূপেন সংস্থিতা জেনে ভালবাসতে গিয়ে এই দূরের দেশে চোখ ভেসে যাবে জলে। রোজ এমন করেই জীবনের নানান অনুভবকে রাঙিয়ে দিয়ে, বাজিয়ে দিয়ে তিনি যখন আমার নিত্যদিনের ভিতর জুড়ে বসেন তখন বুঝি আর কেউ নয়, গানের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নন, তিনি নিজেই। সমস্ত দিন বৃষ্টিতে ভিজে এই শহরটা যখন একটা মনখারাপের চাদর জড়িয়ে ঘুরছে, তখন সন্ধ্যা নামার মুখে দূরের আকাশে মেঘ সরে গিয়ে একটুকরো সাদা মেঘে জড়িয়ে সূর্যটা উঁকি দিলে, আমি তাঁকেই যেন হাসতে দেখলাম আমার এই মেঘলা দিনের ভিতর। আর মনের ভিতর থেকে তিনিই গাইলেন ‘নূতন আলোয় নূতন অন্ধকারে/ লও যদি বা নূতন সিন্ধুপারে/ তবু তুমি সেই তো আমার তুমি,/ আবার তোমায় চিনব নূতন করে।’ এমন নিত্যজানার ভিতর দিয়ে আমার চিরকালের ভিতর যখন তিনি সত্যি হয়ে ওঠেন, আর সব কিছুকে ছাপিয়ে তাঁর উপস্থিতিই জীবন উপভোগের ইচ্ছেকে জাগায়। মনের ভিতর যে অসম্পূর্ণতা সারাক্ষণ অস্থির তাকে স্থিতি দিতেই গীতবিতানের পাতা উল্টে দেন। স্বরবিতানের সাথে পরিচয় ঘটেনি তখনও, গীতবিতানই কেবল উল্টেপাল্টে দেখতাম। সেইসব দিনগুলোতে মা কেমন উদাস গলায় গাইত ‘ভালোবেসে যদি সুখ নাহি’। কিসের অসুখ মায়ের সেটা জানবার অবকাশ ছিল না ওই বয়েসে। কেবল মায়ের রিনরিনে গলার ভিতর গানটাকে পেতে চাইতাম সে সময়ে। আরো কত পরে নিজের উপলব্ধিকে শাণিয়ে নিয়ে বুঝেছি ভালবেসেও অসুখী হবার ব্যথার ভিতর আমার মা আর রবি ঠাকুর মিলতেন। কিংবা তিনি হয়তো এমনি করেই নানান বয়েসের ভিতর নানান জনের নানান রূপের ঈশ্বর হয়ে ওঠেন। কোনো কোনো রুক্ষ রোদের দিনে উঠোনে কাপড় নাড়তে গিয়ে মায়ের সাথে গলা মিলিয়ে গেয়েছি ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে’। সমস্ত সংসারের চারদিকে রুক্ষ তাপ দুঃখ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যখন, সেই রকমের একটা সময়ে এই গান গাইবার মন মাকে রবি ঠাকুর পাইয়ে দিয়েছিলেন।…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.