ফারাবী নামধারী অনলাইনের এক ইতর শ্রেণির জঙ্গি সম্প্রতি "রকমারি.কম" নামের একটি বই বিক্রির ওয়েবসাইটের ওপর ফতোয়া জারি করেছে। সেই সাইটের তালিকায় অভিজিৎ রায়, রায়হান আবীরের মতো লেখকদের বই থাকায় সাইটের মালিকদের হুমকিসহ তাঁদের কার্যালয় আক্রমণের উস্কানি দিয়েছে এই জঙ্গি। [...]

৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইটরে ব্রাডবারি-র এই নামের উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে এক বন্ধুর কাছ থেকে জেনেছিলাম — এই তাপমাত্রায় নাকি বই পোড়ে। পৃথিবীতে বই পোড়ানোর মচ্ছব নতুন না। সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু। ব্যাবিলনীয়রা পুড়িয়েছে, এথেনীয়রা পুড়িয়েছে, রোমানরা পুড়িয়েছে। এমনকি গত শতকে নাজি জার্মানিতে রীতিমতো বনফায়ার করে বই পোড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীও পিছিয়ে ছিল না। তাদের বোমারু বিমানগুলো টার্গেট হিসেবে প্রায়ই খুঁজে নিতো জার্মানির লাইব্রেরিগুলোকে। পঞ্চাশের অন্ধকার দশকে ম্যাকার্থিজমের বিশুদ্ধি অভিযানে আমেরিকান মননকে কমিউনিজমের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যও বই পোড়ানো হয়েছে। বই পোড়ানো ছাড়াও সেনসরশিপের আরও বহু রকম চেহারা দেখেছি আমরা। সেখানে যোগ হয়েছে আরও নতুন কয়েকটি পন্থা।

ফারাবী নামধারী অনলাইনের এক ইতর শ্রেণির জঙ্গি সম্প্রতি ‘রকমারি ডট কম’ নামের একটি বই বিক্রির ওয়েবসাইটের ওপর ফতোয়া জারি করেছে। সেই সাইটের তালিকায় অভিজিৎ রায়, রায়হান আবীরের মতো লেখকদের বই থাকায় সাইটের মালিকদের হুমকিসহ তাঁদের কার্যালয় আক্রমণের উস্কানি দিয়েছে এই জঙ্গি। এই লেখকদের অপরাধ — তাঁরা নাস্তিক্যবাদী, তাঁরা বিজ্ঞান এবং প্রান্তিক দর্শনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিরিয়াস লেখালিখি করেন। হুমকি দেয়া হয়েছে — অচিরেই এইসব নাস্তিক্যবাদী চিন্তার প্রচার বন্ধ না করা হলে সাইটের সাথে যুক্তদেরও ব্লগার রাজীব হায়দারের মতোই ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হবে।

হুমকি শুনে সাইটটির মালিক পক্ষ নতজানু তোষণ নীতির পথ ধরেছেন; তাঁদের পক্ষ থেকে হুমকি প্রদানকারীকে একরকম ক্ষমাপ্রার্থনা করেই আশ্বাস দেয়া হয়েছে — এমনটি আর কখনো হবে না। এ নিয়ে গত কয়েক ঘণ্টা ধরেই অনলাইনের ফোরামগুলো উত্তপ্ত। আহত প্রগতিশীলরা কেউ কেউ সাইটটির মালিক পক্ষের কাপুরুষতার সমালোচনা করছেন, কেউ হুমকি দিচ্ছেন সাইটটিতে নিজের একাউন্ট বাতিল করবার, কেউ সাইটটি বর্জনের ডাক দিচ্ছেন, চরম উদাস এবং রণদীপম বসুর মতো কেউ কেউ আবার প্রতিবাদ হিসেবে নিজেদের বইও সে সাইটের তালিকা থেকে প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন।

‘রকমারি ডট কম’ দেখা হল। প্রবল ক্ষমতাধর রথী-মহারথীদেরও একসময় দেখা হয়ে গেছে। কখনো জঙ্গি অপশক্তি কখনো সরকারের সাথে ‘মত প্রকাশ’ ইস্যুতে আপোস করতে কেউ তাঁরা কারো চেয়ে কম ছিলেন না। জলপাই শাসনামলে সুশীল চিন্তার কাণ্ডারী মহান ডেইলি স্টার পত্রিকা তার নির্যাতিত সাংবাদিক তাসনীম খলিলের পাশে দ্বিধাহীনভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে আমার মনে হয়েছে। বরং পত্রিকাটিকে দেখেছি উল্টো একের পর এক উপসম্পাদকীয় ছাপিয়ে যেতে — দেশে আসলে কেমন মানবাধিকারের ছড়াছড়ি সেই কথাই নানা ভণিতায় বলে যেতে! কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর পরিবর্তে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান দৌড়ে গিয়ে পা ধরে ফেলেছিলেন জনৈক জঙ্গি মাওলানার। আবার এই ক্ষমতাধর সম্পাদকদের কলমই আমরা প্রবল বিক্রমে গর্জে উঠতে দেখেছি আমার দেশ-এর মাহমুদুর রহমানদের মতো মানুষদের অধিকারের দাবিতে। এই হল সেই মাহমুদুর যে কিনা তখন সারা দেশময় জঙ্গি সহিংসতা আর তাদের উত্থানের উস্কানি দিয়ে বেড়াচ্ছিল সফলভাবে। এই হল সেই মাহমুদুর যে কিনা মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছিল নাস্তিকদের বিরুদ্ধে, ব্লগারদের বিরুদ্ধে, শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে, ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে, বিচারকদের বিরুদ্ধে, ট্রাইব্যুনালের সমর্থক অ্যাকটিভিস্ট এবং গবেষকদের বিরুদ্ধে। এই সব রথী-মহারথীদের তুলনায় ‘রকমারি ডট কম’ তো স্রেফ চুনোপুঁটি!

আমি জানি — এখন রকমারি.কম-এর তালিকা থেকে বাদ-পড়া লেখকদের পাশে বহু মানুষ এসে দাঁড়াবেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই দাঁড়াবেন খুব সাবধানে, সন্তর্পণে। তাঁরা বিবৃতি দেবেন, আমার মতো ফেসবুকে স্টেটাসও দেবেন। মোটা দাগে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলবেন। কিন্তু তাঁরা সবাই সাবধান থাকবেন যাতে নাস্তিকদের কোনো দর্শনের প্রতি, কিংবা সে দর্শনের প্রচারের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন প্রকাশ না পেয়ে যায়; পাছে এইসব ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী’ এই ‘ক্ষতিকর চিন্তা’ বৈধতা পেয়ে যায়!

সংখ্যাগুরু মুসলমানের এই দেশে ঘটনাচক্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর যদিও-বা টেনেটুনে ঠাঁই হয়, অধর্মী আর নাস্তিকদের কোনো ঠাঁই হতে নেই। পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম সেক্যুলার গণজাগরণ যখন তুঙ্গে সেই শাহবাগের উত্থান-দিনেও অনেকে নাস্তিক ব্লগারদের পাশে দ্বিধাহীনভাবে এসে দাঁড়ানোর স্পর্ধা দেখাতে পারেননি, এমনকি স্রেফ নীতিগত অবস্থানের প্রশ্নেও না। মঞ্চ-কাঁপানো নেতাদের মধ্যে তখন তোড়জোড় পড়ে গিয়েছিল কে কত ‘ভালো (কিন্তু শান্তিপ্রিয়) মুসলমান’ তা তুলে ধরবার। কে কত বেশি শাহবাগ আন্দোলন ‘করেন’, কিন্তু তারও অধিক নিয়মিত কোরানও পড়েন, নামাজ-রোজাও করেন — সে-সব আমাদের তখন বিস্তারিত জানবার সুযোগ হয়েছিল। ‘রকমারি.কম’ তো সে তুলনায় স্রেফ চুনোপুঁটি!

আমরা কি শুধু বই আর বিপণনের অধিকারের পাশেই দাঁড়াবো? যে-সব চিন্তাকে বিকশিত করবার নিমিত্তে এতো এতো অধিকারের জন্ম — সেই চিন্তার পাশে দাঁড়াবো না? এমনকি নিজে সে চিন্তার অনুসারী না হলেও? কবে দাঁড়াবো? যে দেশের বইয়ের দোকানে সযত্নে মোকছেদুল মোমেনীন-এর মতো অশ্লীল বই বিক্রি হয়, যে দেশে গোলাম-নিজামীদের বইও সদম্ভে প্রচারিত হয় — সে দেশে শুধু নাস্তিক্যবাদ আর প্রান্তিক চিন্তাকেই শুধু এতো মানুষের অনুমতি নিয়ে প্রচারিত হতে হবে কেন?

একটা যেন-তেন ধরণের ওয়েবসাইট আমরা বর্জন করতেই পারি। ইতরের কথায় মাথা ঝাঁকানো আরেক ইতরকে ইতর বলে গাল দিতেই পারি। কিন্তু তাতেও মূল জায়গাগুলো কি স্পর্শ করা হয়? হয় না। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়ানোটাও জরুরি। রাজীবের নামধাম ধরে যখন তালিকা প্রচার করা হচ্ছিল, আমরা কি তখন সোচ্চার ছিলাম তাঁর বা তাঁদের নিরাপত্তার জন্য? নাকি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম? সত্যিকারের প্রগতিশীল এবং সাহসী, কিন্তু একইসাথে বাণিজ্যিকভাবে সফল কোনো প্লাটফর্ম নেই এই বইগুলো প্রচারের জন্য — এই ব্যর্থতা কার? মুক্তচিন্তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে অতীতেও ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে যখন উদ্যোগগুলো নেয়া হয়, গবেষণা এবং বিশ্লেষণকে এগিয়ে নিতে আর্কাইভ-সাইটগুলো যখন ছেলেমেয়েরা তৈরি করে — আমরা কি তখন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলাম? তাদের উদ্যোগগুলোকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলাম কি? এমনকি সামান্য প্রচারটুকুও কি করেছি নিজের উদ্যোগে? আসুন বরং নিজেকে সে-সব প্রশ্ন করি আজকে।

নেকড়ের পাল শিকারকে প্রথমে একা করে নিয়ে তারপর আক্রমণ করে। আমাদের সহযোদ্ধা এবং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের যখন ঠিক একইভাবে নেকড়ের পাল ঘিরে ধরে আলাদা করে আড়ালে নিয়ে যেতে চায় — তখন কি আমরা তাদের খবর রাখি? নাকি পাশে এসে দাঁড়াই? আজকে ‘রকমারি.কম’-এর মতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি আমাদের পছন্দমতো আচরণ না করে, আমরা তাদের দোষ দিই কোন্ মুখে? ওরা তো ব্যবসায়ী, অ্যাকটিভিস্ট না, দার্শনিক বা তাত্ত্বিক কোনো মিশন নিয়ে তো আর ওরা বইয়ের দোকান খোলেনি!

বিদেশে থাকার অনেকগুলো কষ্টের একটি হল দেশে প্রকাশিত বইগুলো হাতে পেতে চাইলে নানা জনের কাছে ধর্না দিতে হয়। সে কারণে ‘রকমারি.কম’-এর মতো ব্যবসায়িক উদ্যোগ দেখলে তখন অনেকে হয়তো ভাবেন তারা হাতে চাঁদ পেয়েছেন! কারণ এ ধরণের বাকি সাইটগুলোর কোনো কোনোটা তো এমনকি চিহ্নিত জামাতিদের দ্বারাই পরিচালিত। অবশ্য বলে রাখা দরকার — ব্যক্তিগতভাবে আমি বই বিক্রি বা বিপণনের ব্যবসাটিকে আর অন্য সব ব্যবসা থেকে কিছুটা আলাদাভাবে দেখি। কারণ এটা এক ধরণের মিশনও, অন্তত তাই হওয়া উচিত বলেই সবসময় ভেবেছি। আগে ‘রকমারি.কম’ থেকে একসময় কিছু বই আমিও কিনেছি। এখন আর কিনি না। কিন্তু তাতেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আমি এ বিষয়ে পুরোপুরি একমত যে — এ ধরণের পশ্চাৎপদ চিন্তা যারা ধারণ করে তাদের যে-কোনো উদ্যোগকে বর্জন করা উচিত, এমনকি সেটা যদি বই বিক্রির সাইটও হয়। সেই বর্জনের পদক্ষেপটুকু দরকারি, কিন্তু তারপরও সেটা তুলনামূলকভাবে একটা সহজ কাজ। কঠিন কাজ হল — সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই একই ধরণের উদ্যোগগুলো গড়ে তোলা এবং তার বিকাশে সবার ব্রতী হওয়া।

আমরা কি সেই কঠিন কাজগুলো করার সাহস রাখি?

রায়হান রশিদ

জন্ম চট্টগ্রাম শহরে। পড়াশোনা চট্টগ্রাম, নটিংহ্যাম, এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমান আবাস যুক্তরাজ্য। ১৯৭১ সালে সংঘটিত অপরাধসমূহের বিচার প্রক্রিয়াকে সহায়তা প্রদান, এবং ১৯৭১ এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের দাবীতে সক্রিয় নেটওয়ার্ক 'ইনটারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম' (ICSF) এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাস্টি।

2
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
মাসুদ করিম
সদস্য

মাসুদ করিম
সদস্য

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.