আমার পড়াশোনা আইন বিষয়ে। ‘ক্রসফায়ারের’ সাথে আমার পরিচয় বেশ কয়েক বছর আগে, সেই ২০০৭ সালে, যখন আমি ছাত্র অবস্থায় ‘অধিকার’ নামক একটি মানবাধিকার সংগঠনে কাজ শুরু করি। আমি সেখানে মূলত ডকুমেন্টেশানের কাজ করতাম। প্রধানত র‌্যাব কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ক্রসফায়ারের ঘটনার উপর তৈরি করা অধিকারের প্রতিবেদন আমি বাংলা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতাম। বলতে গেলে অনুবাদ করার সুবাদেই আমার টানা বেশ কয়েক বছর অগণিত ক্রসফায়ারের বিষদ বর্ণনা পড়ার সুযোগ হয়। প্রায় সব ঘটনাতেই র‌্যাব -এর পক্ষ থেকে বলা হত যে একটি সোর্স-এর মাধ্যমে তারা ঘটনাস্থলে হাজির হওয়ার পর সেখানে উপস্থিত একটি সন্ত্রাসী/ডাকাতের দল তাদের উপর আক্রমণ চালায়। সেই আক্রমণের ফলে র‌্যাব সদস্যরা আত্মরক্ষার স্বার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হয়। গুলি বিনিময়কালে একজন মারা যান (যিনি ক্রসফায়ারের শিকার) এবং সন্ত্রাসী/ডাকাত দলের অন্যান্য সদস্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। গুলিবিদ্ধ সন্ত্রাসী/ডাকাতের পাশে কুড়িয়ে পাওয়া যায় একটি রিভল্ভার এবং কয়েক রাউন্ড গুলি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান যথার্থই বলেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন র‌্যাবের গুলি কখনো ক্রসফায়ার ভিক্টিমের ‘পায়ে’ লাগে না কেন? কেন তাদের গুলি সবসময়েই ‘বুক’ বা তার কাছাকাছি স্থানে আঘাত হানে? সেই প্রশ্ন সবারই। এমনসব প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাই পরবর্তী বছরগুলোতে আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর জন্য কিছু কাজ করতে গিয়ে। আমার মনে আছে হেনরিক আলফ্র্যামের সাথে ঢাকা এবং গাজিপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলোর কথা। আমরা ক্রসফায়ার ভিক্টিমদের কথা শুনতাম। হয়তোবা একজন হতভাগা মা আমাদের জানাতেন কিভাবে তার সন্তানকে র‌্যাব তাদের বাসা বা বাসার সামনের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। কিভাবে জীবিত অবস্থায় সেই সন্তানকে আর খুঁজে পাওয়া হয়ে ওঠে না। আমার আজও মনে পরে কিভাবে ক্রসফায়ার ভিক্টিমদের পরিবারের সদস্য আমাকে টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করতেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট প্রকাশিত কবে হবে? তাদের বুকে তখন অনেক আশা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মত বিদেশী মানবাধিকার সংগঠন তাদের না বলা কথা তুলে ধরবে আর সেই সুবাদে বিচারের পথ প্রশস্ত হবে, এই ছিল তাদের চাওয়া। দুবছরের মধ্যে দুটি পৃথক (২০০৯ ও ২০১১ সালে) রিপোর্ট প্রকাশিত হয় । শুরুর দিকে মনে অনেক আশা ছিল – মহাজোট সরকার ক্রসফায়ারকে শক্ত হাতে দমন করবে যেমন তারা…

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে আল-জাজিরায় গোলাম আযমের গ্রেফতার এবং বিচার নিয়ে প্রচারিত এক বিতর্কিত সংবাদ প্রতিবেদনকে ঘিরে দেশী বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এবং মূলত সাংবাদিকদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে নতুন কিছু বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নাগরিক সমাজের দুটি অংশের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। বহুল-আলোচিত এই প্রতিবেদনটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর বিচারের বিষয়ে আল-জাজিরা ঘরানার সাংবাদিকতাকে আরেকটু ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়। [...]

[এই লেখাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছে 'সাপ্তাহিক ২০০০' পত্রিকার স্বাধীনতা দিবস (২০১২) সংখ্যায়] আজ থেকে দু'বছর আগে ২০১০ সালের স্বাধীনতা দিবসকে সাক্ষী রেখে শুরু হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে ১৯৭১-এ সংঘটিত অপরাধ সমূহের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার যাত্রা। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে, বিচারকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, প্রসিকিউশন টিম গঠন করা হয়েছে, তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়েছে। গত দু'বছরের মধ্যে গোলাম আযমসহ আট জন আসামীর প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট এবং আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রও জমা দেয়া হয়ে গেছে; আসামী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জ গঠন করে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণও শুরু হয়ে গেছে। এই বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতির সাথে সাথে একদিকে যেমন অবসান ঘটছে ১৯৭১-এ সংঘটিত অপরাধগুলোকে ঘিরে প্রায় দীর্ঘ চার দশক বিস্তৃত বিচারহীনতার এক অন্ধকার অধ্যায়ের, তেমনি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রতি পদে বাধাগ্রস্ত করার, বিতর্কিত করার, প্রশ্নবিদ্ধ করার তৎপরতাগুলোও চলছে সমান জোরের সাথে। বিতর্কের এই নতুন ফ্রন্টগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে মিডিয়া, উইকিপিডিয়ার মতো উম্মুক্ত বিশ্বকোষ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং ফোরামগুলোকেও। লক্ষণীয় হল, এই সব প্রচারণার ক্ষেত্রে কি দেশী কি বিদেশী মিডিয়া, কেউই কিন্তু কারও থেকে পিছিয়ে নেই। যেমন, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দায়ের হয় ১২ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে। অথচ, তার দু’দিনের মাথায়, ১৪ ডিসেম্বর, দেশের সমস্ত টিভি মিডিয়ার উপস্থিতিতে গোলাম আযম সংবাদ সম্মেলন করেন এবং তা দেশের প্রধান টিভি চ্যানেলগুলোতে ফলাও করে সময় দিয়ে প্রচারও করা হয়। আসামী গোলাম আযমের মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যের ব্যাপারে মিডিয়ার আগ্রহ থাকতেই পারে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত একজন আসামী এভাবে মিডিয়ার সামনে সাক্ষাৎকার দিতে পারেন কি না, কিংবা সংবাদমাধ্যমগুলোরও সে বিষয়ে কোন দায় দায়িত্ব আছে কি না -- সেই সব বিষয়ও ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। এবার আসুন চোখ ফেরাই বিদেশী সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার দিকে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্বখ্যাত এই টিভি চ্যানেলে গোলাম আযমের গ্রেফতার এবং বিচার নিয়ে প্রচারিত হয় বিতর্কিত এক সংবাদ প্রতিবেদন। ২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড দীর্ঘ এই প্রতিবেদনকে ঘিরে আবার দেশী বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এবং মূলত সাংবাদিকদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে নতুন কিছু বিতর্কেরও সৃষ্টি হতে আমরা দেখেছি। আমাদের নাগরিক সমাজের একাংশ মিডিয়াতে আল-জাজিরার প্রতিবেদনটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত,…

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়েরের সাথে সাথে দু'টো বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে: (১) গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এ সংঘটিত অপরাধের বিষয়টি নাকি সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক মীমাংসিত একটি ইস্যু; (২) এমন বয়স্ক একজন মানুষকে বিনা জামিনে গ্রেফতার করে হেফাজতে রাখা বা বিচার করা ঠিক না। এই দু'টো বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই পোস্টে।

গত ৫ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউশন টিমের পক্ষ থেকে আসামী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়। এই অভিযোগপত্র দায়েরের সাথে সাথে শুরু হল আসামীর বিরুদ্ধে বিচারের প্রক্রিয়া, এবং সেইসাথে অবসান ঘটলো ১৯৭১-এ সংঘটিত অপরাধসমূহের দায়ে এক অভিযুক্ত শিরোমণির প্রায় চার দশক বিস্তৃত বিচারহীনতার অধ্যায়ের। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচার শুরু হয়েছে এখন, এবং আইন তার নিজের গতিতে চলবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু যেটা লক্ষণীয় তা হল, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের এবং তাঁর গ্রেফতারের পর থেকেই মিডিয়ায়, উইকিপিডিয়ার মতো উম্মুক্ত বিশ্বকোষগুলোতে (যে বিষয়ে পরে একসময় লেখার ইচ্ছে আছে), এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু কিছু প্রচারণা চালানো হচ্ছে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। এর মধ্যে যে দু'টো বিষয় বারবার সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে গোলাম আযমের অনুসারী এবং নিযুক্ত আইনজীবীরা সেগুলো হল: (ক) গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এ সংঘটিত অপরাধের বিষয়টি একটি মীমাংসিত ইস্যু, কারণ ১৯৯৪ সালে তাঁর নাগরিকত্ব মামলার সময় দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে তেমনটিই নাকি বলা হয়েছে; (খ) গোলাম আযমের বয়স এখন ৮৯ বছর, এবং এমন বয়স্ক একজন মানুষকে বিনা জামিনে গ্রেফতার করে হেফাজতে রাখা বা বিচার করা ঠিক না। দুই ভাগে ভাগ করে নেয়া এই পোস্টটিতে এই দু'টো বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। কিন্তু তার আগে পাঠক এক নজরে দেখে নিন গোলাম আযমের মামলার বিষয়ে এই পোস্ট লেখা পর্যন্ত ঠিক কী কী ঘটেছে: ১৫ জুলাই ২০১০: আসামী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কার্য শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্তের উদ্দেশ্য -- আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন ১৯৭৩-এর ধারা ৩(২)-এর আওতায় উল্লেখিত অপরাধসমূহে অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতা যাচাই। ৩১ অক্টোবর ২০১১: তদন্ত শেষে আসামীর বিরুদ্ধে বিস্তারিত তদন্ত রিপোর্ট, অন্যান্য তথ্য প্রমাণ, এবং আলামত তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউশন অফিসে দাখিল করা হয়। ১২ ডিসেম্বর ২০১১: প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইবুনালের কাছে আসামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (formal charge) দাখিল করা হয়। ২৬ ডিসেম্বর ২০১১: অভিযোগপত্রে উল্লেখিত অভিযোগসমূহ আমল গ্রহণের (cognizance) জন্য ধার্য এই দিনে ট্রাইবুনাল অভিযোসমূহ আমলে নেয়ার পরিবর্তে তা আবার প্রসিকিউশনের কাছে ফেরত পাঠান। কারণ, দাখিলকৃত অভিযোগপত্রটি সঠিক বিন্যাসে (not in form) উপস্থাপিত হয়নি। ৫…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.