আমার মাতৃভাষা বাংলা। আমি জন্ম থেকে এ-ভাষায় অভ্যস্ত অন্য অনেক নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তের মতো যারা জন্মসূত্রে এটি পায় এবং নিজের অজান্তেই এটি ভালোবেসে ফেলে। এ-ভাষায় কথা বলতে গিয়ে, এ-ভাষা নিত্যদিনের নানা কাজে ব্যবহার করতে গিয়ে, এতে প্রেম-অপ্রেম, দ্রোহ, ক্রোধ, ভালোলাগা, মন্দলাগা ইত্যাদি প্রকাশ করতে গিয়ে কখন যে অন্তর্গত রক্তস্রোতের সাথে মিশে গিয়ে এটা মর্মে পশেছে, তার ইতিহাস বা পুরাণ নিয়ে কপচাই নি কখনো, কারণ, উত্তর নেই। পৃথিবীতে সন্তান জন্ম দিয়েছেন অনেকেই, কিন্তু, মা আমার একজনই, তেমনি মাতৃভূমিও একটাই, আর মাতৃভাষাও। তাই, আমি হাজার ভাষা জানলেও (যদি জানতাম কখনো!) এই একটি ভাষাতেই সাবলীল এবং থাকবোও আমৃত্যু, যেমন মায়ের কাছে আমি (যাকে হারিয়েছি এবং হারিয়েছি সে-আশ্রয়)। এই বাংলা ভাষায় সচ্ছন্দ হওয়ার জন্য, বাংলা আমৃত্যু উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করার জন্মগত দুষ্টির জন্য, বাংলায় মনোভাব প্রকাশ করে সহজ আনন্দ পাওয়ার অক্ষম অপরাধের জন্য আমি আমার শাস্তি চাই, আমার দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড চাই, আমার প্রভূত প্রায়শ্চিত্ত চাই। ছেলেবেলা থেকে, সম্ভবত অন্য বিনোদনের অভাবে এবং একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমার মাতাপিতার কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকায়, বই-ই হয়ে ওঠে আমার অবসর কাটানোর একমাত্র মাধ্যম। আজ যখন শুনতে পাই অহরহ বইবিমুখিতার তথ্য এবং দেখতেও পাই চারপাশে, তখন কেমন যেন অবাক লাগে। অথচ, এটাই হয়েছে আজ স্বাভাবিক। দু’টি মলাটের, মাত্র দু’টি মলাটের মাঝখানে একটি পৃথিবী দেখতে পাওয়ার অপার রহস্যের কথা, যা নানা রূপে, নানা রসে, নানা রঙে ধরা দেয় পাঠকের কাছে, তা যে কেউ এড়িয়ে যেতে পারে, তা ভাবাটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য। শিশুসাহিত্য থেকে উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্য বা ছড়াপদ্যকবিতা বা প্রবন্ধ, সবকিছুই আমার মনোহরণ করে। যাঁরা লেখেন, তাঁদের প্রতিও শ্রদ্ধানত হই, ভাবি “তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী”। সময় কাটাতে বা মননের ঊর্ধ্বগামিতা অন্বেষণে বা প্রতিক্রিয়াশীলদের বীভৎস ছায়া এড়ানোর বা তাড়ানোর যুদ্ধে আমি সর্বদাই ‘পুস্তকং শরণং গচ্ছামি।’ আর, অবশ্যই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই গ্রন্থটি বা লেখাটি চাই বাংলায়। কারণ, ওটিই যে হৃৎকন্দরে পশে আকুল করে মনপ্রাণ। বাংলা সাহিত্য বা লেখালেখির প্রতি আমার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জন্য, বাংলা ‘অপাঠ্য সব পাঠ্য’ পেলে তাতে মনপ্রাণ ঢেলে দেওয়ার জন্য, নিরন্তর বাংলায় অন্যদের লেখা পড়তে চাওয়ার নেহাৎ নগণ্য অথচ, ব্যক্তিগতভাবে তীব্র অলজ্জ বাসনা পোষণ করার জন্য আমি আমার…
একুশে ফেব্রুয়ারি মৃত, তাকে ওরা 'ইতিহাস' বানিয়ে ফেলেছে। শহীদরা জীবন দিয়েছে সমষ্টির মধ্যে থেকে সমষ্টির হয়ে, তাদের ওরা নিঃসঙ্গ বীর করে দিয়েছে। একুশ ছিল ক্রোধ আর সংগ্রামের, আগুন নিভিয়ে তাকে ওরা বসিয়ে রেখেছে করুণ গানের আসরে। [...]
একুশে ফেব্রুয়ারি মৃত, তাকে ওরা 'ইতিহাস' বানিয়ে ফেলেছে। শহীদরা জীবন দিয়েছে সমষ্টির মধ্যে থেকে সমষ্টির হয়ে, তাদের ওরা নিঃসঙ্গ বীর করে দিয়েছে। একুশ ছিল ক্রোধ আর সংগ্রামের, আগুন নিভিয়ে তাকে ওরা বসিয়ে রেখেছে করুণ গানের আসরে। বাংলা আজ কাজের ভাষা -- কাজের লোকের ভাষা হিসেবে সর্বত্র প্রচলিত -- রাজভাষা তখনও এবং এখনো ইংরেজি। যাদের সন্তানেরা একুশ গড়েছে একাত্তর রচনা করেছে, সেই জনগণের বড় অংশ আজো তাদের মাতৃভাষার অক্ষর চেনে না। নিরক্ষর নিরস্ত্র দশায় তাই ভাষাকে তারা রক্ষা করতে পারে নাই বলে ভাষাও চলে গেছে অপরের দখলে। সমগ্র ভাষাভাষীর মর্যাদা না এলে ভাষাও পুজির গৃহভৃত্য হয়ে যায়, যেমনটা হয়েছে এই ভাষার নামের জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ আজ নয়া উপনেবিশিক প্রভুদের কাছে আত্ম-সমর্পণের ধর্মগাথা। যে সমাজ একুশ থেকে একাত্তর হয়েছিল, সেই সমাজ অবশ, তার একাংশ বিহ্বল অন্য অংশ বিক্রিত। করপোরেট পুঁজির ভাবমূর্তি গঠনে সকল জাতীয় দিবসগুলি যখন ভাড়া খাটছে, তখন যা কিছু জাতীয় বলে প্রচার পায় তা আর স্বজাতীয় নয় বিজাতীয়'র উপনিবেশিক মুখোশ। ভাষাই দেশ, ভাষাভাষীরাই জনগণ, সেই ভাষাভাষীরা আজ সারা বিশ্বে একটি ছত্রভঙ্গ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে ভীরু ও অসম্মানিত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। ভাষা ও মানুষ মূর্ত হয় যে রাষ্ট্রবোধে সেই রাষ্ট্রবোধ পুজির মূল্যবোধের কাছে নিস্তেজ, সেই রাষ্ট্র সাম্রাজ্যের স্থানীয় সরকার পরিষদ বৈ আর কিছু নয়। এর জাতীয় সংগীত সাম্রাজ্যের কোনো এক কোণের এক ট্রাইবের ট্রাইবাল বেদনার কথাই বলে শুধু -- যে দেশ লুপ্ত হচ্ছে সেই দেশের জন্য কান্নাই তো 'আমার সোনার বাংলার' মধ্যে মাতম করে। প্রত্যেকে যখন আমরা প্রত্যেকের মাথা ছাড়িয়ে উঠতে চাইছি তখণ দেশের সকল শহীদ মিনারগুলির মাথা পরাজয়ে নত ও লজ্জিত। শহীদের বেদীতে আগে রক্তদান হতো, এখন নীরবে অশ্রু ঝরে। সেই উপকথার স্মরণে শিশু-কিশোরেরা আজো বাঁশ-কাঠের মিনার বানায় -- একদার বাঁশের কেল্লার মতো।
আসামের বাঙালিরা মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতর রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, শহীদ হয়েছেন — আমরা অনেকেই তাঁদের আত্মাহুতির কথা মনে রাখি না। বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ভাষাশহীদদের পরিচিতি তুলে ধরার জন্য দুটি লেখা এখানে সংকলন করা হলো। [...]
আসামের বাঙালিরা মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতর রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, শহীদ হয়েছেন — আমরা অনেকেই তাঁদের আত্মাহুতির কথা মনে রাখি না। বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ভাষাশহীদদের পরিচিতি তুলে ধরার জন্য দুটি লেখা এখানে সংকলন করা হলো। অধ্যাপক মাহবুবুল হক ও প্রয়াত সাংবাদিক মুহম্মদ ইদ্রিসের এ প্রবন্ধ দুটি ছাপা হয়েছিল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখা কর্তৃক প্রকাশিত সংকলন মাতৃভাষা-য়। সংকলনটির প্রকাশকাল : ১৮ বৈশাখ ১৪০৯, ১ মে ২০০২; সম্পাদক : আমীর রিদয়; সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডা. শুভার্থী কর। শুভার্থী নিজে বরাক উপত্যকা থেকে ঘুরে এসেছিলেন; তাঁর উদ্যোগেই বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ও একষট্টির উনিশে মে-র দুই স্বতন্ত্র ভাষা আন্দোলনকে একই সঙ্গে যথাযোগ্য মর্যাদায় উপস্থাপন করে প্রকাশিত হয়েছিল মাতৃভাষা নামের সংকলনটি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তথ্যসমৃদ্ধ স্বতন্ত্র গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। . . . ভাষার লড়াই : বরাক উপত্যকায় মাহবুবুল হক ১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলায় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল সে আন্দোলনের কথা বাংলাদেশের জনগণের মনে চির জাগরূক হয়ে আছে। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের নয় বছর পরে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এমন আর একটি আন্দোলন হয়েছিল আসামের বরাক উপত্যকায়, সে কথা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না। কিন্তু সে আন্দোলনে রক্ত ঝরেছিল। বাঙালির আত্মপরিচয় ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামে সেখানেও শহীদ হয়েছিল এগারোটি তাজা প্রাণ। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন এবং বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের মধ্যে একাধিক ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় অভিন্নতা। প্রথমত, দুটি আন্দোলনই সংগঠিত হয়েছিল বাংলা ভাষার উপর অন্য ভাষার ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয়ত, দুটি আন্দোলনেই দলমত-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দুই ভূখণ্ডের বাঙালি জনগোষ্ঠী প্রতিবাদী সংগ্রামে অংশ নিয়ে আত্মদান করেছিল অধিকার আদায় করতে গিয়ে। অন্যদিকে এ দুই আন্দোলনের মধ্যে আলাদা বিশিষ্টতাও ছিল। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষীর (৫৬%) উপর পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সংখ্যালঘিষ্ঠ (৭%) ভাষা উর্দুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে আসামের বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ বাঙালির ভাষা অধিকার খর্ব করে তাদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠের অসমিয়াকে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে। বরাক উপত্যকায় বসবাসরত বাঙালির যে ভাষা আন্দোলন তা আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশের…
বিয়ের সময় কান্নাকাটি করা আমাদের দেশের মেয়েদের এবং মেয়ের মায়েদের যেনো একটি অবশ্যই করনীয় প্রথা। যেকোন পরিস্থিতিতে, যেভাবেই বিয়ে হোক না কেন, কান্নাকাটি যেনো বিয়ের একটি আবশ্যিক আচার [....]
বিয়ের সময় কান্নাকাটি করা আমাদের দেশের মেয়েদের এবং মেয়ের মায়েদের যেনো একটি অবশ্যই করনীয় প্রথা। যেকোন পরিস্থিতিতে, যেভাবেই বিয়ে হোক না কেন, কান্নাকাটি যেনো বিয়ের একটি আবশ্যিক আচার। সমাজে শত শত বছর ধরে এ আচারটি বহমান, কিন্তু কেনো? সামাজিকভাবে মেয়েরা দুর্বল আছে এবং থাকবে সেটাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই কি? একটি ছেলে হাসি মুখে গর্বিত ভঙ্গীতে বিয়ে করে একটি ক্রন্দনরতা মেয়েকে নিয়ে নিজের বাড়ি যায়। এই ব্যাপারটা সমাজে ক্ষমতাবান ছেলে আর দুর্বল মেয়েদের অবস্থানের একটা বাস্তব প্রতিফলন। মেয়েদেরকে হাস্যকরভাবে দুবর্ল প্রমান করার একটি চিরাচরিত ও সযত্নে লালিত কায়দা। নতুন জীবন শুরু করার আগেই কাঁদিয়ে মানসিক শক্তি ভেঙ্গে দেয়া হয় যাতে স্বামীর ঘরে আর নিজের দাবী প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে। এমনকি অনেক সময় কোন মেয়ে কতোটুকু কাঁদল, কিভাবে কাঁদল সেটাও মার্ক করে তার ওপরে রেটিং করা হয়। মেয়েটার কলিজা কতোটুকু পাত্থর কিংবা কতোটুকু মায়াধরা তার একটা প্রাথমিক এসেস হয় এটা থেকে। সুতরাং কনে বেচারীর কান্নাকাটির বেষ্ট পার্ফমেন্স দেয়া ছাড়াতো উপায় নেই, মনে যাইই থাক না কেনো। আজকাল কনে সাজানোর বিউটি পার্লার গুলোও এ ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বন করে, ওয়াটার প্রুফ মাশকারা, আইলাইনার ইত্যাদি মেকআপ ইউজ করেন, কতোটুকু মেকাপ দেয়া হয়েছে, কতোটুকু কান্নাকাটি এ্যালাউড বলে দেন, যাতে পরবর্তীতে ভিডিওটা ঠিক ঠিক আসে, ভূতনী না দেখায়। কোন মেয়ের হয়তো বহু দিন বিয়ে হচ্ছে না, বিয়ের জন্য অনেক চেষ্টা করছেন মা – বাবা, শাপ শাপান্ত করে অলক্ষী বলে গালি দিচ্ছেন, তারপর হয়তো অনেক সৃষ্ঠে বিয়ে ঠিক হলো, তারপর যেই না কাজী সাহেব খাতা খুলে বসলেন সাথে সাথেই বাবা - মায়ের যৌথ বিলাপের ধ্বনিতে পাড়া মুখরিত হবে। কেউ বা প্রেম করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করছে, ধরে বেঁধে শেষ কালে মতান্তরে বিয়ে দিচ্ছে, এরমধ্যে কয়েক পশলা ঘরে আটকে রাখা, মারধোর হয়ে গেছে, কিন্তু আবার সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি, কাজী সাহেব যখনি বলবেন বলো মা কবুল, আরম্ভ হবে মায়ে - ঝিয়ের যুগল বন্দী। এধরনের বহু ঘটনা হরহামেশাই ঘটে থাকে। কষ্টের জন্য কান্নার চেয়েও লৌকিকতার জন্য কাঁদা হয় বেশি। পাছে লোকে কি ভাবে সেই চিন্তায় ভারতীয় উপমহাদেশের লোকেরা ভীষন দুর্বল। আর সেই সুযোগই কাজে লাগান অন্যেরা। কেউ কেউ…
মাতৃভাষা...আণবিক বোমা[...]
ভাষা একধরনের বর্ণবাদ। মাতৃত্ব একধরনের অস্তিবাদী সংকট। মাতৃভাষা একধরনের বর্ণবাদী অস্তিবাদী সংকট। মায়ের ভাষা, আমার মা যেভাষায় কথা বলে, আমার মায়ের সাথে আমি যেভাষা শিখতে থাকি, যেভাষা আমার ইন্দ্রিয়ের ভাষা, সেভাষা যদি আমার অস্তিত্বের চিন্তার ভাষাও হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে আমার ভাষা, তখনই ভাষা আমাকে যেখানে দাঁড় করায়, সেখানে আমি যদি বর্ণবাদী না হয়ে উঠি, আমি যদি মাতৃত্বের অস্তিবাদী সংকটের অভিমুখ বুঝতে পারি, তাহলে ভাষা আমার যেমাধ্যম হয়ে ওঠে, সেমাধ্যম বিপন্ন করতে ও বিপন্ন হতে দিতে আমার মন সায় দেবে না। ভাষাকে, কথার এ মাধ্যমকে – ভালবাসা, শ্রদ্ধা করা, প্রাণবন্ত রাখা – আমাদের সারাজীবনের কাজ হয়ে উঠলেই – মাধ্যমের বৈচিত্র্যে, এ পৃথিবী নবনবউন্মেষশালিনী বুদ্ধিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে। আণবিক মানে অণুতে অণুতে অসীম ক্রিয়া। বোমা মানে বিস্ফোরণে বস্তুরাশি ধ্বংস করা। আণবিক বোমা মানে অণুতে অণুতে অসীম ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিস্ফোরণে অপার বস্তুরাশি ধ্বংস করা। মানুষের এ কোন খেয়াল, কোথায় যেতে চায় মানুষ – হয়তো ওরা চলে যেতে চায় ভিনগ্রহে – এই বিকট বিভৎস কার্যক্রমের সীমাহীন উল্লম্ফনে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ বিষণ্ন বিপদাপন্ন বদ্ধ বদ্বীপে বসবাস করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়ে বড় আতঙ্কে, বার্মা ভারত পাকিস্তান চীন এ দেশগুলোর আণবিক উচ্চাশার ভেতর আমরা কতটুকু নিরাপদ, আমরা জানি না। এই বিপন্নতা, ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগিয়ে যাওয়া আমরা ঠেকাতে পারব কি? একুশে ফেব্রুয়ারি ও ছয়ই আগস্ট – এ দুটি দিবস আরো বড় বিস্তৃত পরিসরে পালন করা উচিত সারা পৃথিবীর। ভাষাকে বিপন্ন করার প্রচেষ্টা, হিরোশিমা নাগাসাকিতে আণবিক বোমা হামলায় গণমানুষকে বিপন্ন করার প্রচেষ্টা – এ দুইয়ের বিরুদ্ধে আরো জনমত, আরো জনমত, আরো জনমত চাই।
