মুক্তাঙ্গন-এ উপরোক্ত শিরোনামের নিয়মিত এই সিরিজটিতে থাকছে দেশী বিদেশী পত্রপত্রিকা, ব্লগ ও গবেষণাপত্র থেকে পাঠক সুপারিশকৃত ওয়েবলিন্কের তালিকা। কী ধরণের বিষয়বস্তুর উপর লিন্ক সুপারিশ করা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম, মানদণ্ড বা সময়কাল নেই। পুরো ইন্টারনেট থেকে যা কিছু গুরত্বপূর্ণ, জরুরি, মজার বা আগ্রহোদ্দীপক মনে করবেন পাঠকরা, তা-ই তাঁরা মন্তব্য আকারে উল্লেখ করতে পারেন এখানে। ধন্যবাদ।
ন্যুয়র্কে স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে আমি নিজেকে 'এই নরক থেকে বেরুতে হবে, হেনরি' এ-কথা বলে ঝোলাতে ক'টা কাপড় ভরে নিয়ে, বুড়ো আঙুল তুলে একটা গাড়ি থামিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে পড়তাম [..]
হিচহাইকিং ন্যুয়র্কে স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে আমি নিজেকে 'এই নরক থেকে বেরুতে হবে, হেনরি' এ-কথা বলে ঝোলাতে ক'টা কাপড় ভরে নিয়ে, বুড়ো আঙুল তুলে একটা গাড়ি থামিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে পড়তাম, জানি না কোন্ নিরুদ্দেশের পানে। আমার অঙুলিনির্দেশে প্রথম যে-গাড়িটি থামতো আমি সেটাতেই উঠে পড়তাম, সেটি কোথায়, কতদূর যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে আমি কী করবো এইসব সাতপাঁচ না ভেবেই। "আপনি কোথায় যাচ্ছেন?" আমি জিজ্ঞাসা করতাম। তিনি হয়ত জবাব দিতেন, "রলে", এবং আমি সেই সম্পূর্ণ আগন্তুকের সঙ্গে সেখানেই চলে যেতাম চমৎকার আড্ডায় মজে গিয়ে। পথে আমি এমন-সব মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি যাদের সঙ্গে খুব মনখোলাভাবে মিশতে পেরেছি, কেননা তাদের কোন লোকদেখানো ভদ্রতার ভনিতা ছিলনা। আমি সেইসব লোকের সঙ্গে জগতের যে-কোন বিষয় নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে কথা বলতে পারতাম: ট্রাক ড্রাইভার, চাষা, বেচনদার, যত ধরনের লোকের কথা আপনি ভাবতে পারেন। আমি যাদের বলি, আসল মানুষ। মাঝেমাঝে তাদের কেউ আমাকে রাতের খাবার কিনে দিত পথে, কেউবা বাড়িতে নিয়ে রাতে ঘুমাতেও দিত। সেইসব সহজসরল সাধারণ মানুষেরাই কিন্তু সত্যিকারের মানুষ। শহুরে শিক্ষিত, উন্নতভ্রু, তথাকথিত রুচিশীল মানুষেরা নয়- আমার দেখা রাস্তার মানুষগুলোর কাছে তারা প্রায় বামনতুল্য। সেইসব পথ-অভিযান থেকে আমি সবচেয়ে মূল্যবান যে শিক্ষা নিয়েছি সেটি হলো, কিছু নির্দিষ্ট ধরনের মানুষ ও জায়গা সম্পর্কে আমার যে পূর্বধারণা ও মতামত ছিল সেগুলো একেবারে ডাহা ভুল। সর্বস্তরে এবং সর্বত্রই যে অসাধারণ সব মানুষ রয়েছে আমার এই আবিষ্কারটা ছিল সত্যি চমকপ্রদ। রাস্তার সবচেয়ে সেরা অভিজ্ঞতাটি হয়েছিল আমার জুন-এর সঙ্গে। সে এত চোখে পড়ার মত সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিল! আমাদের দুজনের জুটি ছিল যাকে বলে অপ্রতিরোধ্য। আমি কী বলতে চাইছি আশা করি বুঝতে পেরেছেন আপনারা। এক দম্পতি আমাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে ঝাড়া পাঁচ/ছয় ঘন্টা ধরে গাড়ি চালান আর আমরা দুজনে যাবতীয় কথা বলাবলি করি। তাঁরা আমাদের তাঁদের বাড়িতে রাতের খাবার খেতে বলেন, এটা সম্ভবত দক্ষিণের কোন রাজ্যে হবে, কী সুস্বাদু ভোজই না ছিল সেটা! আমি সবসময় দক্ষিণের খাবার ভালোবেসেছি, সেখানকার রান্নাঘরে বাদাম-কাঠের ধোঁয়ার গন্ধের কথা মনে করেই আমার জিবে জল আসে। আমরা খেতে বসি এবং যাকে বলে ভুরিভোজন করি। সত্যি অসাধারণ ছিল তা। এই…
তোমার প্রিয় ছিল সুরাইয়া--চাঁদবদনী সুগায়িকা-সুকবি ফিল্মস্টার। সুরাইয়া ছিল তোমার চোখে সরস্বতী। তোমার মেজদাদা (মুলুকচাঁদ) কাননদেবীর 'মানময়ী গার্লস স্কুল' দেখেছেন উনিশবার…এই নিয়ে তুমি হাসতে কত! তোমার প্রিয় ছিল বাইল্যামাছের ঝুরিভাজা।পাবদা মাছ কি গুলশামাছের ঝোল। ডাঁটা-আলু-বেগুন দিয়ে। চিতল মাছের কোপ্তা। তোমার প্রিয় ছিল মুরগির মেটে। তোমার প্রিয় ছিল টকের ডাল বা আমখিচুড়ি। চৈত্রবৈশাখমাসের দুপুরে, পাখার তলায় বসে আরামে ডাল মেখে ভাত খেয়েছি কত। তোমার সঙ্গে। বাইরে ঝাঁঝাঁ দুপুর, বাইরে কাক ডাকছে কমলা টাগরা বের করে। তামসিক জীবন তোমার অপছন্দ ছিল, মাছ আর মাংসের পদ একই বেলায় খেতে চাইতে না। ছোটমামার ঝাল-গরগরে রান্না পছন্দ ছিল--তুমি অনুযোগ করতে নানী কেবল ছোটমামার পছন্দমতনই রান্না করেন, যদিও ছোটমামাকে তুমি দারুণ ভালবাসতে--বাইবেলের প্রডিগ্যাল সান্-এর মতন। ছোটমামা এন্তার বলে যেতেন--"তগো মাথায় যতডি চুল আসে, ততগুলি নায়িকার নাম কইতে পারি আমি" কিংবা "শোলে দেইখা দোস্তো-দুশমন দেকসি, দোস্তো-দুশমন বেশি ভাল্লাগসে"। তখন রীনা রায়-অমৃতা সিং-রেখা-অনিতা রাজ-টিনা মুনিমদের জয়জয়কার। 'প্রেমগীত' ইত্যাদি সিনেমা ভিসিআর-এ দেখার সময় হেঁকে বলতেন--"পুলাপান, চক্ষু বন্ধ কর্", বড়রা খাবার ঘরের ডিম্বাকার টেবিলের চারদিকে চেয়ারে বসে সিনেমা দেখতেন, আমাদের মতো জুলজুলে চোখ ইঁদুরছানাদের জায়গা হতো টেবিলের তলায়, ছোটমামা মাঝে মাঝে টেবিলের তলায় ঝুঁকে দেখতেন তাঁর সেন্সরশিপ মেনে নিয়ে আমরা আসলেই চোখ বুঁজেছি কিনা--মামার এইসব কাণ্ডকারখানায় তুমি হাসতে। কিছু বলতে না। যতবার তুমি টের পেয়েছ মৃত্যুর কড়ানাড়া, ততবার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে--"তোমার মামাকে দেইখো!" আমি কিন্তু খাপ্পা হতাম, কোথায় মামাকে বলে যাবে আমাদের দেখতে তা না, মামাকে দেইখো! তুমি রোজা রাখতে পারতে না শেষের বছরগুলিতে। ছোটমামী আর তুমি দুপুরের ভাত খেতে খাবার ঘরের দরজা ভেজিয়ে, ছোটমামী এর নাম দিয়েছিলেন--আমাদের গেটলক সার্ভিস। তুমি খুব বেশি নামাজ-কালামও জানতে না, সকালবেলা উঠলে তোমার গুনগুন শোনা যেত--"দ্বীনদুনিয়ার মালিক খোদা দিল কি দয়া হয় না"…কিংবা "আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালু/ শেষ করা তো যায়না গেয়ে তোমার গুনগান"…সেটাই তোমার তর্পণ ছিল। সেকালের সাত্ত্বিকলোকদের নিয়মে তুমি ভোরে উঠতে। আমি উঠতে উঠতে তোমার রুটি খাওয়া শেষ। পত্রিকা পড়া শেষ। তোমার গলা ছিল পঙ্কজ মল্লিকের মতো। একসময় রীতিমতো গান করতে তুমি। কাননদেবীর "যদি আপনার মনে মাধুরী মিশায়ে/এঁকে থাকো কোনো ছবি" কিংবা নজরুলের "আজ আগমনীর আবাহনে/ কী সুর উঠিছে বাজি/ সে সুরে…
ট্রেন এসে থামল কাউলুনের হোংহাম স্টেশনে। প্রাচ্যের এক আধুনিক শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা মিটিয়ে বাইরে এসে দেখা পেলাম শ্বেতশুভ্র কেশের মক ভাইয়ের। [...]
প্রিয় শহরে সতেরো বছর পরে ট্রেন এসে থামল কাউলুনের হোংহাম স্টেশনে। প্রাচ্যের এক আধুনিক শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা মিটিয়ে বাইরে এসে দেখা পেলাম শ্বেতশুভ্র কেশের মক ভাইয়ের। আমাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছেন। এই সুযোগে মক ভাইয়ের পরিচয়টা দেয়া যাক। পুরো নাম মক চিউ ইউ, আমার অগ্রজ নাট্যজন মামুনুর রশীদের বিশেষ বন্ধু, বঙ্গপ্রেমিক। সেই ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে আসা যাওয়া, বাংলাদেশের সাথে নাটক বিষয়ক বিস্তর আদান-প্রদান করেছেন। নিজের নাটকের দল আছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে ঘুরে এসেছেন। আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখেন, আর ম্যান্ডারিন চাইনিজ বলতে পারি বলে তাঁর কাছ থেকে পাই আলাদা একটা কদর। এই মক ভাইয়ের উদ্যোগেই এবার প্রদর্শনীর আয়োজন এবং সুদূর বেইজিং থেকে হংকং অভিমুখে চলে আসা। মক ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল কয়েক বছর আগে যখন তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন মামুন ভাইয়ের সাথে যৌথ উদ্যোগে একটি ছবির চিত্রায়ণ উপলক্ষে। তখন পুরো টিমকে আমার বাসায় দাওয়াত করে খাইয়েছিলাম। মক ভাই এতদিন পরে আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। শুভ্র কেশের মক ভাই সেই আগের মতোই আছেন। সমস্ত চুল সাদা হয়ে গেছে অনেক আগে থেকেই। বয়স ষাটের কোঠায়, তবে চুল সব সাদা হয়ে গেছে। রেশম-সাদা ধবধবে চুল মক ভাইকে আলাদা এক ব্যক্তিত্ব এনে দিয়েছে। মালপত্র নিয়ে তাঁর সাথে ট্যাক্সিতে উঠে যাত্রা করলাম তাঁদের সিসিসিডি অফিস অভিমুখে। সিসিসিডি অফিসটি মূলত একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠন, কমিউনিটি সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কাজ করেন। মক ভাইদের এই সংগঠনটিই আমার ছাপচিত্র প্রদর্শনীর স্পন্সর। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে দেখছিলাম হংকং শহরটিকে নতুন করে। সেই আগের মতোই আছে, শুধু সময়ের ছায়া পড়েছে। আমার মধ্যে একটি অনুভূতি কাজ করে — যদি আমার পরিচিত কোনো জায়গায় অনেকদিন পরে আবার যাওয়া হয় তবে ছায়াগুলি অনেক বেশি গাঢ় মনে হয়, মনে হয় এখানে সময় জমা হয়ে আছে। রাস্তায় যেতে যেতে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, কী অদ্ভুত সুন্দরভাবে এই শহরটিকে এরা গড়ে তুলেছে! অল্প জায়গা, অথচ কী চমৎকার ভাবে ম্যানেজ করেছে! হংকং শহরটি বোধহয় স্পেস ম্যানেজমেন্টে পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। আমার কাছে মাঝে মাঝে একে ম্যাচবক্স সিটি মনে হয়। শহরের ভিতর অজগরের মতো এঁকেবেঁকে কত রাস্তা যে চলে গেছে তার ইয়ত্তা নেই, কত যে উড়াল সেতু আর একতলা দোতলা…
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে দাঁড়িয়ে আসামি পক্ষের আইনজীবী ফকরুল ইসলাম বললেনঃ '৭১ এর যুদ্ধ ছিল পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে এবং তা আমাদের ভুখণ্ডে হয়েছিল [..]
তিনি জনাব ফকরুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে আসামি পক্ষের একজন আইনজীবী। গতকাল ট্রাইবুনালে অভিযুক্ত ৪ জনের পক্ষে নিজের বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে তিনি বললেনঃ ক) '৭১ সালের যুদ্ধ হয়েছিল পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে। খ) যদিও আমাদের এই ভুখণ্ডে ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এরপর তার বক্তব্যকে শাণিত করতে গিয়ে, তিনি উদাহরন টানেন এই বলে যে, "একাত্তর সালের ১৭ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষনায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোন কথা বলা হয়নি।" দেখুনঃ যুগান্তর ২২ সেপ্টেম্বর ২০১০ তিনি আরো বলেন, "স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে 'যুদ্ধ' শব্দটি নেই।" দেখুনঃ প্রথম আলো, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১০ ট্রাইবুনালের অনেক খবরের ভিড়ে এই খবরটি ছিল অনেক গুরুত্ববহ। কিন্ত অনেক পত্রিকাই এই রিপোর্টটি করতে পারেনি। জানি না কেন? এটি কি অনেক গুরুত্বপূর্ন একটি সংবাদ নয়? আমরা কি জনাব ফকরুল ইসলামদের কাছ থেকে "স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রের" নতুন পাঠ নেবো? তার কাছে আমরা কি জবাব চাইবো না?
