বাংলাদেশে সদ্য জনপরিসরে উন্মোচিত “বাংলাদেশ সনদ” আন্দোলনের অঙ্গীকারনামায় “সমাজতন্ত্র” শব্দটির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতদিন বিতর্ক জারী ছিল, এখন আচমকা বিজ্ঞ জনসমাজ সমাজতন্ত্র বিষয়ে উদ্যোক্তাদের নিয়ত কি সে প্রশ্ন করছেন । কেউ এটিকে আকস্মিক বিয়োজন ধরে নিয়েছেন। কেউ আবার এটির অনুল্লেখ আদর্শিক বিচ্যুতি বলেও মনে করছেন। যা স্বাভাবিক। কিন্তু এই অনুল্লেখ একটি বড়ো কাজ করে ফেলেছে। আচমকা জনপরিসরে চলমান মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে নিয়ে ভাবছে না, তার চেয়ে বেশি ”সমাজতন্ত্র” ধারণাটি নিয়ে মানুষ নাড়াচাড়া শুরু করেছে। https://www.bangladeshcharter.org/our-journey/

এ প্রসঙ্গে বাংলার গত শতাব্দীর ইতিহাস নিয়েও একটু নাড়াচাড়া করা যাক। কি বলেন? ইতিহাস কি জানায় আমাদের? ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত জানায় যে—সমাজতন্ত্র এই বাংলায় হঠাৎ নাজেল হওয়া কোনো চেতনা নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, শ্রেণীগত বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক চেতনা, যা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম একটি মূলনীতি।

ভুললে চলবে না যে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের অন্যতম কারণ।
১৯৬০-এর দশকের পূর্ব-পাকিস্তান ছিল গভীরভাবে অসাম্য চর্চার এক রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সমাজ ছিল আশরাফ-আতরাফ, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ, এ জাতীয় নানা স্তরে বিভক্ত। এর মধ্যে জনসাধারণের বিপুল অংশ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন কৃষিসমাজের জনগণ। আশরাফ মুসলমান চালিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মদদে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলা অসাম্যের ছোবলে সমাজ ক্ষত-বিক্ষত ছিল।

একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পুঁজি সঞ্চিত হচ্ছিল। পুঁজি আসতো পূর্বাঞ্চল থেকে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব-বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর কাঠামোগত বঞ্চনা ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছিল। পাট, কৃষি ও শ্রমশক্তি থেকে উৎপন্ন সম্পদ চলে যেত কেন্দ্রের ( পশ্চিমাঞ্চলের) দিকে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উন্নয়ন আসতো না পূর্ব-বাংলায়। এই বাস্তবতায় “শ্রেণী” কোনো তাত্ত্বিক শব্দ ছিল না—এটি ছিল বাংলার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন যে নেতৃত্ব, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলায় যিনি স্বদেশের জনগণের ”বঙ্গবন্ধু” ডাকের ভেতর দিয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার দলীয় ৬ দফা কেবলমাত্র সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। এর ভেতরে ছিল অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের দাবি। রাজস্ব, মুদ্রানীতি, বাণিজ্য—সবকিছুর ওপর আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। অর্থাৎ, এক ধরণের অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা তিনি ভেবেছেন, যা সরাসরি শোষিত ও বঞ্চিত শ্রেণীর স্বার্থকে দেখভাল করতে চেয়েছে।

এই ধারাবাহিকতায়, ১৯৬৯ সালের সদস্যপদ শপথনামায় অওয়ামী লীগ যে সমাজতন্ত্র কায়েমের প্রতিজ্ঞা যুক্ত করেছে, তা স্রেফ একটি অলঙ্কারিক শব্দ রূপে তাতে যুক্ত হয় নি। এ ইতিহাস সেই সময়কার রাজনৈতিক উপলব্ধি কেমন ছিল তা প্রতিফলিত করে । মূল ধারণাটি এমন যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক কাঠামো না বদলালে শোষণ চলতেই থাকবে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি পার্থক্য আছে, যা প্রায় আলোচনায় অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। “সমাজতন্ত্র” শব্দটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টি বেশ জনপ্রিয় ধারণা। অপরদিকে “গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র” এবং “কল্যাণমূলক গণতন্ত্র”—এই ধারণাগুলো উপরের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, সব একই ধারণাকে বোঝায় না। আবার “সমাজতন্ত্রবাদিতা” (socialist orientation) নিজেও একটি পৃথক রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবস্থান সমাজতন্ত্রবাদিতার ধারণায়। তা সমাজতন্ত্রকে কেবল একটি কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে দেখে না। এটি ছিল মূলতঃ এক ধরণের ন্যায্য বণ্টন-ব্যবস্থার চিন্তা, যেখানে উৎপাদনের সুফল সমাজের বৃহত্তর জনগণের অংশে ছড়িয়ে পড়বে, এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা একটি সীমিত সুবিধাভোগী শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না।

স্বাধীনতার পর সংবিধানে সমাজতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তি তাই হঠাৎ কোনো মতাদর্শিক আমদানি নয়। তা ছিল পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাংবিধানিক রূপ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে, যখন অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত, সম্পদের ঘাটতি চরম, তখন শিল্প জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কারের পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্প্রসারিত করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়। এসব পদক্ষেপ ছিল সেই সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

অবশ্যই, সমাজতন্ত্রের মূল নীতি বলতে যা বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝানো হয় নবীন বাংলাদেশের নতুন রাস্ট্র ব্যাবস্থায় তার বাস্তব প্রয়োগ সীমাবদ্ধ ছিল । কেননা, সদ্যোজাত দেশে মধ্যপন্থী আওয়ামী লীগের পক্ষে পূর্ণ সমাজতন্ত্র কায়েম সম্ভব ছিল না, প্রত্যাশিতও নয়। অপর দিকে, স্বাধীনতার আগে থেকেই এবং পরে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নিয়ে যারা রাজনীতি করে এসেছেন, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের কৌশলগত রাজনীতির মধ্যে আপামর জনসাধারণকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের বড়ো ধরণের ব্যর্থতা ছিল। তারপরও বলতে হয়, রাষ্ট্র ও সমাজনীতির প্রয়োগে দল বা গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতা উক্ত আদর্শের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করে দেয় না।

ব্যার্থতার পর বরং প্রশ্ন উত্থাপন জরুরী যে — কেন সেই আদর্শ জনজীবনের মৌলিক মূল্যবোধরূপে অধিষ্ঠিত হয়নি, যার ফলে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা ক্রমশঃ দূর্বল হয়েছে। প্রশ্ন ওঠা উচিত যে কোন্ শ্রেণীশক্তি তা প্রতিহত করে ক্রমান্বয়ে সে মূল্যবোধের শূণ্যস্থান দখল করেছে ও করছে। সবশেষে এ প্রশ্নও তোলা অত্যাবশ্যক যে, সাম্রাজ্যবিস্তারকারী বৈশ্বিক গোষ্ঠীর চাপে যে অর্থনৈতিক কাঠামো মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে তার বর্তমান চরিত্র কি?

হাল আমলের বাংলাদেশে আয়-বৈষম্য চরমপথ ও সন্ত্রাসের সাথে হাতে হাত রেখে বাড়ছে। সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সন্ত্রাসে বিশ্বাসী চরম মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠীর হাতে। একই সাথে পুরণো প্রশ্নগুলো নতুন করে ফিরে আসছে। দেখা যাচ্ছে সমাজতন্ত্রে যারা বিশ্বাসী বলেই আমরা জানতাম, তাদেরই এক একটি অংশ “সমাজতন্ত্র” শব্দটিকেই আদর্শ রূপে ধারণ করে না। বরং একে বিতর্কিত করে তুলতেই যেন তারা সক্রিয়। সমাজতন্ত্রের অন্তর্নিহিত প্রশ্ন—অর্থনৈতিক ন্যায়, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, এবং শ্রেণীগত বৈষম্য দূর করা—এসব অমীংসিত বিষয় মীমাংসা করার ক্ষেত্রে স্বাধীন স্বদেশের জনগণকে নেতৃত্ব দিতে সমাজতন্ত্রের পথের দিক-নির্দেশকগণ ব্যার্থ হয়েছেন।

ইতিহাসকে স্লোগানে নামিয়ে আনা সহজ। কিন্তু ঐতিহাসিক জাতীয় দলিলসমূহ, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের সুদীর্ঘ ধারাবাহিক সময়কে ফিরে দেখলে বোঝা যায়—বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাতাবরণে মধ্যবিত্তের, এমন কি দরিদ্রেরও বোধে সমাজতন্ত্র ছিল গভীরভাবে প্রোথিত এক ধারণা। যা উঠে এসেছে মাটির মানুষদের জীবনের নিয়ত সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে। এ দেশের সংগ্রামশীল জনতার জীবনের বাস্তবতায়ে এটা প্রামান্য যে, নানাবিধ দল ও গোষ্ঠ নানা সময়ে শ্রমজীবিদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বিষয়ে লাগাতার প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছে। কিন্তু পিরামিডের একেবারে পাদদেশে অবস্থিত দীনহীন যে জনগণ, তাদের জন্য বাস্তবভিত্তিক কিছু করার তেমন উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তেমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে সরকারগুলোকে যথোপযুক্ত চাপ দেয়ার পরিস্থিতিও গড়ে ওঠে নি।

এই শূণ্য স্থানে আওয়ামী লীগ এক ধরণের মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে। সাম্রাজ্যবাদের চাপে থাকা লীগ ও তার জোট সরকার বিশ্বের লিবারেল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাপুটে নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু তারই ভেতরে থেকেও জনগণের ন্যূনতম অধিকার বাস্তবায়নের পক্ষে মধ্যস্থতা করতে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। সেই সব প্রয়াসের একটি সম্মিলিত রূপের চোহারটা কেমন? তা নিঃসন্দেহে এক ধরণের কল্যানমূলক রাষ্ট্রের রূপরেখা, যা অনেকটা উত্তরের ইউরোপীয় কয়েকটি কল্যান রাষ্ট্রের চিন্তার মতো।

তবে কল্যান রাষ্ট্র হতে হলে রাষ্ট্রকে কতিপয় শর্ত পূরণ করতে হয়:

১. আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা : যার মূল কথা কার্যকর গণতন্ত্র এবং তার দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন।আইনের শাসন, ন্যূনতম নীতিমালা, সরকারী সেবা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ মনিটরিং ও আয়কর পরিশোধ ইত্যাকার রাষ্ট্রীয় নিয়ম নীতি সর্বস্তরে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী। রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তা থাকবে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, অডিট, অভ্যন্তরীণ মনিটরিং নিশ্চিত হবে। পরন্তু Rule of Law বা আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া দরকার। কল্যান রাষ্ট্রে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এসব নিশ্চিত হলেই শুধু কল্যান রাষ্ট্রের ধারণা কিছুটা সাফল্য লাভ করতে পারে। বাংলাদেশে সিভিক সমাজের ভেতরই এই আদর্শ ও নীতিসমূহের ব্যাপক বরখেলাপ সর্বস্তরে কল্যান পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের মতো লোকই যখন সরকারকে আয়কর দিতে চান না, নিজেই ক্ষমতায় বসে নিজের আয়করের মামলা তুলে নিতে বাধ্য করেন আদালতকে, তখন গোটা সিভিক সমাজের ন্যায়-পরায়ণতায় যে বিপুল ধ্বস নেমেছে তা বলাই বাহুল্য।
২. টেকসই রাজস্ব ও করব্যবস্থা

কল্যান রাষ্ট্রের থাকতে হবে প্রশস্ত ট্যাক্স বেস, প্রগতিশীল করনীতি (Progressive Taxation) এবং উচ্চ কর-অনুগত্য (Tax Compliance)

৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক নীতি

কল্যান রাষ্ট্রের নীতির মধ্যে অন্যতম কয়েকটি নীতি হতে হবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা (Universal Healthcare), মানসম্মত শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা (বেকার ভাতা, পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি)। কল্যান রাষ্ট্র শুধু দান ই করবে না, সমান সুযোগও তৈরী করবে।

৪. সামাজিক আস্থা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ

কল্যান রাষ্ট্রের আরও যা নিশ্চিত করা জরুরী তা হলো নাগরিকদের আস্থা নির্মাণ। নাগরিকরা বিশ্বাস করবে যে করের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে যার মাধ্যমে Social Trust তৈরী হবে। রাষ্ট্রে নিয়ম মানার সংস্কৃতি তৈরী হবে জনগণের মধ্যে এবং তারা পারস্পরিক দায়বদ্ধতা (Social Contract) মেনে চলবেন।

৫. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা: কল্যান রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্র অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পথে থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করবে এবং নীতিনির্ধারণে জনগণের প্রভাবকে স্বাগতম জানাবে। কল্যাণনীতি টেকসই হয় যখন তা জনগণের সম্মতিতে গড়ে ওঠে।

৬. অর্থনৈতিক ভিত্তি: সবশেষে না বললেই নয় যে কল্যান রাষ্ট্রের একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি থাকতে হবে। সে অর্থনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে ও দারিদ্র্য কমিয়ে মধ্যবিত্তের বিস্তার ঘটাবে।

এই ইতিহাস কেন এখানে উল্লেখ অত্যাবশ্যক? এই ইতিহাস মনে রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন এ কারণে যে, ২০২৪ সালের জুলাইতে একটি সংঘর্ষপূর্ণ অভ্যূত্থান দ্বারা আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের অধিক কালে দেশের জনগণ সন্ত্রাস, ভীতি, ও চারিদিকে সবকিছু ভেঙ্গে ফেলার ভেতর বাস করছে। প্রয়োজন এ কারণও যে, চলতি ক্রন্তিকালে ভাঙ্গনের বাঁশিওয়ালারা বারংবার এই দেশেরই গৌরবের ও গর্বের জন্ম- ইতিহাসকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা হলো অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তীকালীণ সরকার প্রধান ও তার উপদেষ্টাগণ বিদেশী করপোরেট সংস্থার লবিয়িস্ট হিসেবে দেশের সম্পদ ও আয়ের উৎস বিদেশী কোম্পানীসমূহকে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন যা আমাদের স্বদেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করেছে। অথচ দেশের অর্থনীতি উন্নতিশীল ছিল। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বে মধ্য আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার কথা ছিল।


এ পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারীতে চূড়ান্ত অনিয়মের একটি নির্বাচন হয়েছে। দেশ চালাচ্ছে বিএন পি ও তাদের পূর্বের (ও চলমান) জোটের ইসলামিক চরমপন্থী দলগুলো। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট লীগ সরকার পতনের পর থেকেই রাষ্ট্র যারা চালাচ্ছে তাদের হাতে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন ও মুক্তি সংগ্রামের পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায় পেরিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে এখন মুক্তিযুদ্ধ ও তার মূল নীতিসমূহই আক্রান্ত। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক গণহত্যা চলছে। এখন এখানে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দিলেও পুলিশ এসে আটক করে। জনতার মন ও মনন থেকে স্বাধীনতাকেন্দ্রিক সব চেতনা ও বোধ-বুদ্ধি ভীতি প্রদর্শন করে, বলপূর্বক, সাজা দিয়ে মুছে ফেলবার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে জনসাধারণের ভয় দূর করার অন্যতম প্রেরণা কি? তাদের নিজস্ব মহীমাময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং পূর্ব প্রজন্মের কর্মধারাই অন্যতম প্রেরণা। মুক্তির যে মূলগত চেতনা, সে বিষয়ে সচেতনতাই জনগণের জন্য বরাভয়। ফলে সে সকল স্মৃতি-শ্রুতি ও গণ-সাহসিকতার যাবতীয় ইতিহাসে জেগে ওঠা, এবং সচেতনভাবে দেশের প্রশ্নে জনগণের এক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এটি এখনকার একমাত্র অত্যাবশ্যকীয় কাজ। কিভাবে তাদের পূর্ব প্রজন্ম দেশকে স্বাধীন করেছে, সে ইতিহাস থেকেই একটি জাতি ও তার নবীন প্রজন্ম বুক টান করে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করতে পারে। তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভয়াবহ বিপন্নতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হতে পারে।

এই লক্ষ্যেই মেলাঘর অভিধায় নানা প্রজন্ম দলবদ্ধ হয়ে একসাথে মাসের পর মাস আলোচনার মাধ্যমে প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সনদ নামক অঙ্গীকারনামা। এর উদ্দেশ্য দেশের নানা মত ও পথের জনতাকে দেশের প্রশ্নে, স্বাধীনতার প্রশ্নে ন্যূনতম এক সর্বজনীন বোধে ঐক্যবদ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ।

অন্তরে ও বাহিরে বাংলাদেশ সনদ একটি সামাজিক, বৌদ্ধিক ও আদর্শিক আন্দোলন যা স্বদেশ পুণর্গঠনের পথে জনগণকে এক হতে আন্তরিক আহ্বান করছে।

কিন্তু বিগত ২৬ ই মার্চ, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সনদ প্রকাশের পর দেশের নানা দলের ব্যক্তিবিশেষ এক বা একাধিক প্রশ্ন বারবার উত্থাপন করে এই উদ্যোগ থেকে তরুণ সম্প্রদায়কে বিরত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন হলো, সমালোচনা তো কাঙ্ক্ষিত। কেন এতে “সমাজতন্ত্র” উল্লেখ নেই, সংবিধানের চার নীতি নেই, বঙ্গবন্ধু নেই, জয়বাংলা নেই এমনতরো প্রশ্ন চলছেই। সমালোচনা, ট্রলও চলছে। এরপর কি শোনা যাবে – কেন এতে বিসমিল্লাহির রহমানের রহিম নেই? হয়তো। কেননা, আমাদের স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে আকাজকে কাজ বানানো, গতিকে অগতিতে রূপান্তর করা। এসব কূ-রাজনীতি লাগাতার চালিয়ে রেখে দেশের মহা সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলা হয়েছে।

একটি বিশেষ গোষ্ঠীর এক বা একাধিক প্রজন্ম বায়াত্তরের সংবিধানকে, মুক্তিযুদ্ধকে, সেকুলারিজমকে, মানবাধিকারকে, সমাজতন্ত্রকে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশের জন্য জনগণের জন্য জীবনব্যাপী সংগ্রামকে, তার স্বাধীনতার সংগ্রামে ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার লাগাতার চেষ্টা করেছে বিগত কয়েক দশকে এবং এখনও করছে। এ ছিল এক বিরতিহীন প্রক্রিয়া। সে ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক সংস্কৃতির আগ্রাসন এর বিভৎস প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখবে না বাংলাদেশ সনদ অঙ্গীকারনামাকেও।

তথাপি, বাংলাদেশ সনদ আন্দোলন এ ধরণের প্রশ্ন উত্থাপনকে যৌক্তিক মনে করছে ও প্রশ্ন করাকে স্বাগতঃ জানাচ্ছে । উদ্যোক্তারা এসব প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। এ পথে চলে, হেতুহীন প্রশ্ন শোনা দিয়ে শুরু হয়ে যখন অভিশম্পাত, গালিগালাজে পর্যবসিত হবে, উত্তর হাতের কাছে থাকা স্বত্ত্বে ও যুক্তিকে অবজ্ঞা করা হবে, যেমন এখন হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্যোক্তাদের কাজ হবে, এই সমালোচকদেরই —বাংলাদেশ সনদ কী, এবং কী নয়- বিষয়টি সবার আগে বুঝে নেবার আহ্বান জানানো। এ ছাড়া গতি কি?


ক’টি বিষয় সংক্ষেপে স্পষ্ট করা যাক।

প্রথমতঃ, এটি কোনো ঐতিহাসিক দলিলের পুনরাবৃত্তি নয়। এটি সমসাময়িক নাগরিকদের দেশ গড়ার পথে পা দেবার এক অঙ্গীকারনামা যাকে নাম দেয়া হয়েছে ”বাংলাদেশ সনদ”। এর লক্ষ্য বর্তমানের সমস্যা সমাধানে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে জনগণের মধ্যে আটটি অঙ্গীকারে উচ্চারিত মূল্যবোধ সমূহে এক ধরণের ন্যূনতম ঐকমত্য (minimum common ground) তৈরি করা। ফলে এখানে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যার উদ্দেশ্য দলীয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা নির্দিষ্ট মতাদর্শের সরাসরি পুনরুৎপাদন নয়, বরং সেসব আদর্শের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধকে ভাষা ধারণ করবে। ন্যূনতম যে সব বিষয়ে জনগণ ঐকমত্য জ্ঞাপন করলেই দেশের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব, সেসব কমন গ্রাউণ্ডে উদ্যোক্তাগণ জনগণের সাথে আলোচনায় যেতে প্রথম পদক্ষেপ দিয়েছেন।


দ্বিতীয়ত, “সমাজতন্ত্র” শব্দটি অনুপস্থিত হলেও তার মৌলিক উপাদান—ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সমতা, শোষণবিরোধিতা—সনদের ভেতরে স্পষ্টভাবে উপস্থিত। খেয়াল করা দরকার যে, এ সনদে সংবিধানের ও স্বাধীনতার ঘোষণার শব্দসমূহ নয়, সেখানে উচ্চারিত চিন্তার নীতিগত সারবস্তু (substance over slogan) প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের চুয়ান্ন বছরের বাস্তবতায়, “সমাজতন্ত্র” শব্দটিও বহু রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গেছে। সেই বিতর্কে না গিয়ে, বাংলাদেশ সনদ এক সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত, ১৯৭২ সালের সংবিধান বা Proclamation of Independence-এর সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, সনদের প্রথম অংশে যে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, এবং জাতীয় চেতনার ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে—তার অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ ঐতিহাসিক দলিলগুলোর চেতনাকে ভিত্তি করে প্রণীত। এখানে পদ্ধতিটি হলো ইঙ্গিতমূলক অন্তর্ভুক্তি (implicit inclusion), সরাসরি উদ্ধৃতি নয়।


বাংলাদেশ সনদে এসব অনুল্লেখের উদাহরণ অস্বীকৃতির প্রমাণ নয়; বরং বলা যায়, এসবই সনদ প্রণেতাদের রাজনৈতিক ভাষার কৌশলগত নিরপেক্ষতা (strategic neutrality)—যা ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। অধিকন্তু সনদ ঐসব মূল্যবান দলিলের আদর্শিক ভাষা ও ধ্বনিকে রাষ্ট্রীয় আসনে অধিষ্ঠিত মালিকানার বাইরে নিয়ে যেতে চায়।

পঞ্চমত, একটি সনদ সবকিছু বলে না, বলার কথাও নয়। যে কোনও সনদ এক ধরণের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে। বাংলাদেশ সনদের ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার নানা জাতিস্বত্তার ইতিহাস, নেতা, রণধ্বনি—সবই থাকবে, কিন্তু সেগুলো হবে জনগণের সম্মিলিত চর্চার অংশ, লোক দেখানো উল্লেখ ও প্রদর্শনী নয়। যা সনদের লক্ষ্য।

সবশেষে, একটি মৌলিক প্রশ্ন না করলেই নয়। আমরা কি আমাদের জাতীয় মূল্যবোধকে এমন পরিসরে নিয়ে যেতে চাইব না, যেখানে তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ন্যূনতম ভিত্তিতে আমাদের একত্র করবে ও এ ই পথে যেসব বিতর্ক রয়েছে সেসব সমাধানের পথ খোঁজার দুয়ার উন্মুক্ত করবে?

বাংলাদেশ সনদের শক্তি কোথায়? যে সব জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহতী ঐতিহাসিক দলিল ক্লাসিক শব্দের সমন্বয়ে রচিত, সেসব দলিলের আদলে শব্দ চয়ন না থাকায় তা অনুপস্থিত মনে হওয়ার বিষয়টিই প্রমাণ করে, এখন আরও ব্যাপকভাবে এই জাতীয় দলিলগুলো ব্যাখ্যা করে তার অন্তর্নিহীত মূল্যবোধকে বোঝানো জাতীয়ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। এসবই সনদের অঙ্গীকারসমূহের মৌলিক ভিত্তি। এ হলো সনদের আত্মা । এটাই সনদের আসল শক্তি। অপরদিকে, এর মধ্যে যে সব নির্বাচিত মূল্যবোধের উপস্থিতি স্পষ্ট —যার বর্ণনায় শব্দ কম, কিন্তু নীতির পরিসর বড় করার চেষ্টা রয়েছে, সবই এই “বাংলাদেশ সনদ আন্দোলন” -এর বর্তমান কাঠামো। এটি জীবন্ত। এ সনদ ক্রমশঃ সময়োপযোগী হয়ে ওঠার পথে জনগণকেও হয়ে উঠতে দিতে এক ধরণের ঐক্যবদ্ধ সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টি করতে আগ্রহী।

বি.দ্র. : বাংলাদেশ সনদ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সাইটে যান: https://www.bangladeshcharter.org/

সাবস্ক্রাইব করুন
অবগত করুন
guest

0 মন্তব্যসমূহ
সবচেয়ে পুরোনো
সাম্প্রতিকতম সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
Inline Feedbacks
View all comments
  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.
0
আপনার ভাবনাগুলোও শেয়ার করুনx