কারণ আমি বুঝতে পেরেছি মতামতও এক ধরনের শিল্প।[...]

কয়েক দিনের মধ্যে এমাসেই আমার বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ হবে। জীবনের এতগুলো বছর পার করে বিষণ্ণ তো লাগছেই না, তার চেয়ে কেমন যেন নিজেকে হালকা নির্মেদ নিঃশঙ্ক লাগছে। হালকা, কারণ এতদিনে আমি বুঝতে পেরেছি যতই বিরক্তি নিয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠি না কেন তার চেয়ে বেশি আসক্তি নিয়ে ঘুমোতে যাই পরদিন আবার জেগে উঠব বলে। নির্মেদ, কারণ আমি বুঝতে পেরেছি মতামতও এক ধরনের শিল্প। নিঃশঙ্ক, কারণ এই টীকাটি না দিলে পরবর্তী জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। আমরা কবিতা গান ছবি উপন্যাস গল্প ভাস্কর্য নাটক সিনেমায় শিল্প খুঁজেছি। কেন জানি নিছক মত প্রকাশের মাধ্যম মতামতে শিল্পের খোঁজ করিনি। আমরা ভুল করেছি, অত্যন্ত উঁচুমানের শিল্প হওয়ার সমস্ত কিছু মজুদ আছে মতামতে। আমাদের প্রথমে ইশারাকে জানতে হবে, তারপর অক্ষরকে, এরপর কণ্ঠস্বরকে, চিনতে হবে ভাষাকে, হৃদয় শরীর ও মনের চারপাশকে। তখন একটি ইঙ্গিত, একটি বর্ণ, একটি শব্দ, একটি বাক্য, একটি দীর্ঘশ্বাস – সবই প্রকাশ করবে মতামতকে, মতামতের শিল্পকে। শিল্প নিয়ে বাঁচার চেষ্টা কখন থেকে শুরু করেছি আজ আর মনে পড়ে না। কিন্তু এটা জানি এর

উপরই সবসময় সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছি এবং বাকি জীবনও এই নির্ভরতা নিয়ে জীবনচর্যা অক্ষুণ্ণ রাখব। মতামত বড় উত্তেজনাহীন, বরং সে বিরক্তিকরই। এভাবেই সে বেঁচে থাকে – উদ্বেলিত করে না, অনুধ্যান জারি রাখে। তাড়াহুড়ো করে না, তিরস্কার করে না – সতর্ক থাকে, সংকলিত থাকে। সবার উপরে মতামতের শিল্প হয়ে থাকে। মতামতের শিল্প রাজনীতির, মতামতের শিল্প অরাজনীতির। মতামতের শিল্প পরবর্তী বাংলাদেশের। ১২ অক্টোবর ২০১১ ফানুস পূর্ণিমার পরের রাত অপভূ চট্টগ্রাম

নামাজ পড়লেও লিখি না পড়লেও লিখি। শুয়োর খেলেও লিখি না খেলেও লিখি। কিন্তু এর মধ্যে পুলিশটা কে?[...]

আমি স্বাধীন তাই লিখি। লিখে কিছু পাই বা না পাই লিখি, শুধু পাই পয়সার জন্য লিখি না। পাতা পেলে লিখি ব্লগ পেলেও লিখি। নামাজ পড়লেও লিখি না পড়লেও লিখি। শুয়োর খেলেও লিখি না খেলেও লিখি। কিন্তু এর মধ্যে পুলিশটা কে? পুলিশ মানে কি পরাধীনতার শৃঙ্খল? যদি পুলিশ তাই হয় তাহলে আমাকেও ঘোষণা করতে হবে আমি স্বাধীন তাই পরাধীনতার শৃঙ্খল হাতে বসে থাকা সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লিখি। বাংলাদেশের কাছে সে-স্মৃতি মোটেই তেমন পুরনো নয়, এই তো ৪০ বছর আগেই তো আমরা ঝাড়ে-বংশে পরাধীন ছিলাম। কেউ বলতে পারবে না বাংলাদেশের লেখকরা সেই পরাধীন দিনে লেখেননি, লিখেছেন এবং তালিকাভুক্ত হয়েছেন এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশ, এই চল্লিশ পেরনো বাংলাদেশ যদি আজ চালশের ছানিতে 'স্বাধীনতা বিরোধী'দের বিরুদ্ধে তসবিহ জপতে জপতে নিজেরাই আরো বৃহত্তর অর্থে পুলিশের মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধিতার চর্চা করতে চায় তাহলে ওই কুলাঙ্গার গুণধর এএসপি রফিকুলের কথার সূত্রে আমরা যারা স্বাধীনতার জন্য লিখি তাদের বলতেই হবে : রাষ্ট্র, আমরা তোমার বিপক্ষে, এসো আমাদের নির্যাতন কর। যেজন্য চীনকে উপহাস করি -- পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের শাসকদের সাধারণ মানুষের যম বলি -- যেজন্য প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সত্তার সাধনা করি : সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে সেই হাত সন্ত্রাসীর হাত বলেই বিবেচিত হবে। ২০০১--২০০৮-এর অস্বাভাবিক সময়ের বিরুদ্ধে যদি দাঁড়াতে চান যদি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সত্যিই লড়তে চান মত প্রকাশের স্বাধীনতায় শস্য পরিমাণ হস্তক্ষেপ করবেন না। আমার মতের সমালোচনা করুন, যদি আমার মত বিধ্বংসী ও বিস্ফোরক বা মানহানিকর হয় মামলা করুন। কিন্তু আমার চোখ বাঁধবেন না, মুচলেকার অসভ্যতা দেখাবেন না, আমাকে শারীরিক মানসিকভাবে নির্যাতন করবেন না। জাতির অভূতপূর্ব উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে 'গুলাগ' সৃষ্টি করবেন না। উচ্চশিক্ষায় সরকার বিনিয়োগ করবে, না অভিভাবক বিনিয়োগ করবে, না দেশি-বিদেশি আর্থিক সংস্থা বিনিয়োগ করবে এটা পুরোপুরি 'পলিসি'র ব্যাপার -- 'পলিসি'র ব্যাপার নিয়ে বাকতিণ্ডা খুবই স্বাভাবিক, সেই স্বাভাবিকতার একটা অপরিহার্য কর্মপদ্ধতি হল সৃষ্ট অসন্তোষের ভেতরে পৌঁছে অসন্তোষের প্রকৃতিটাকে আগে বুঝতে পারা। তা না করে অসন্তোষ ছত্রভঙ্গের পুলিশি তৎপরতা 'দানা বাঁধতে দেব না' নামক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ ঘটায়। যা যেকোনো সরকারের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই সবার আগে সামনে নিয়ে আসে। এখন সরকার…

মুক্তাঙ্গন-এ উপরোক্ত শিরোনামের নিয়মিত এই সিরিজটিতে থাকছে দেশী বিদেশী পত্রপত্রিকা, ব্লগ ও গবেষণাপত্র থেকে পাঠক সুপারিশকৃত ওয়েবলিন্কের তালিকা। কী ধরণের বিষয়বস্তুর উপর লিন্ক সুপারিশ করা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম, মানদণ্ড বা সময়কাল নেই। পুরো ইন্টারনেট থেকে যা কিছু গুরত্বপূর্ণ, জরুরি, মজার বা আগ্রহোদ্দীপক মনে করবেন পাঠকরা, তা-ই তাঁরা মন্তব্য আকারে উল্লেখ করতে পারেন এখানে। ধন্যবাদ।

আমি আর কোনো কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। সবকিছুকে মায়া মনে হতে লাগল।[...]

ইউনুস আমাকে ২০০৭ সালের শেষদিকে বলেছিলেন, কোথায় পড়ে থাকলেন – আমি এখন নোবেল পুরস্কার পেয়েছি, একটা ঋণ মডেল ও একটা ব্যবসা মডেল নিয়ে সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছি, আর আপনি কিনা পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর গুরুতর মানুষের-ভারে-জর্জরিত কখন-জ্বলবে-তার-খবর-নেই একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীত্ব বরণ করলেন অতিবৃদ্ধ এক রাজনৈতিক ডাইনেস্টির মোহময় ক্ষমতাময়ীর অনুরোধে? যেদেশ ইউনুস বানিয়েছে সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে শীর্ষবৈঠক সেরে উঠব উঠব, এমন সময় ভাবলাম হাসিনাকে কথাটা বলি। হাসিনা চুপচাপ শুনলেন, তাকে কেমন যেন উদভ্রান্ত মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণের জন্য। কিছুই ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমি এবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আপনি ইউনুসের উপর এমন চটেছিলেন কেন? – আপনাকে ওই কথা বলেছিল তো, আমাকে বলল একেবারে উল্টো কথা – প্রধানমন্ত্রীত্বটা আমাকে দিয়ে দিন যেমন সোনিয়া মনমোহনকে দিয়েছিলেন, আমি আপনাকে আমার ঋণ মডেল ও ব্যবসা মডেল দিয়ে দেব, আপনি সারা পৃথিবী চষে বেড়াবেন, চান তো ওই অর্ধেক নোবেলটাও দিয়ে দেব, আপনার কতদিনের শখ! এরপর থেকে আমি আর কোনো কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। সবকিছুকে মায়া মনে হতে লাগল। বারবার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতে লাগল – বারবার একটা ধুনই আঘাত করছিল আমাকে নিঃশব্দে নিরবধি – জীবনে কিছুই তো করতে পারলাম না। ভারতের অর্থনীতির রিফর্ম করেছি আমি, ওই অর্থনীতিটাকে ‘হিন্দু বিকাশ’ থেকে ‘ব্যাঘ্র বিকাশ’-এর পথে নামিয়েছি আমি, তখন আমি ছিলাম অর্থমন্ত্রী। আর রিফর্মের ১৫ বছর পর দেখলাম আমার রিফর্ম ভালই এগিয়েছে, আমিও তখন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতায় প্রায় দুবছর কাটিয়ে ফেলেছি, কিন্তু সাথে সাথে এটাও বুঝতে পারছিলাম রাজনৈতিক(!) ক্ষমতাহীন(!) আমি(!) দুই হাজার ছয় থেকে অনবরত সেই রিফর্মে ক্লোরোফর্ম ঢেলেছি – আমিই এই অঞ্চলে নয়াব্রাহ্মন্যবাদের প্রবর্তন করেছি ঘৃতাহুতির বদলে এই ক্লোরোফরম ঢালার বিধান চালু করেছি। খালি মনে হচ্ছে পৃথিবীর কোনো কিছুতে শান্তি নেই। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ও সর্দারজি হয়ে থাকতে হয় – পৃথিবীতে স্বীকৃত অসাধারণ অর্থনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী হয়েও এই আমাকে নয়াব্রাহ্মন্যবাদ নিয়েই থাকতে হয়। ভারত সন্ন্যাসের পূণ্যভূমি। আমার স্ত্রীকে দিল্লি ফিরে এসে বললাম, কিছু মনে কোরো না – মনে হয় আর এই সংসারধর্ম পালন করব না। এবারের শীর্ষবৈঠকে আমি জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে এমন কিছু জেনেছি তাতে মনে হচ্ছে, সন্ন্যাসগ্রহণ ছাড়া আমার সামনে দ্বিতীয় পথ খোলা নেই। আমার স্ত্রী অভূতপূর্ব…

তোর জন্মতারিখ জানবার প্রয়োজন পড়েনি কখনো। কিন্তু তুই যেদিন চলে গেলি, অনিচ্ছায়, দুঃস্বপ্নের মতন শাবল আর গাঁইতি দিয়ে খোদাই হয়ে গেল দিনটা। [...]

তোর জন্মতারিখ জানবার প্রয়োজন পড়েনি কখনো। কিন্তু তুই যেদিন চলে গেলি, অনিচ্ছায়, দুঃস্বপ্নের মতন শাবল আর গাঁইতি দিয়ে খোদাই হয়ে গেল দিনটা। একটা ফোন-কল কী ভয়াবহ হতে পারে আগে বুঝতে পারি নাই। প্রথম যেদিন তোকে দেখি, তুই একা ছিলি না; দেবেশ আর রিয়াজও ছিল তোর সাথে। চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের চারতলার অফিসঘরটার একপাশে বসেছিলি, সপ্রতিভ। আমি, আকতার আর আলভী একসাথে ঢুকলাম কেন্দ্রে। শৈবালদা পরিচয় করিয়ে দিলেন, তোরা কেন্দ্রের নতুন সদস্য। আমরা তিনজন মুহূর্তেই ঈর্ষাপরায়ণ আর শঙ্কিত হয়ে উঠলাম। শৈবালদা, শ্যামলদার কাছে আমাদের আবদারের নতুন ভাগীদার হয়ে যাবি ভেবে। তারপর আরম্ভ হলো তোদের তিনজনের সাথে আমাদের তিনজনের হাস্যকর প্রতিযোগিতা। আজ এতদিন পর ভাবতে অবাক লাগে, আবার হাসিও পায়। কী ছেলেমানুষই না ছিলাম আমরা! কেন্দ্রে তোদের যে-কোনো কাজ যে-কোনো কথাকে কেমন সতর্কতা আর সন্দেহের চোখে দেখতাম! রিয়াজ আর দেবেশ খানিকটা নিরীহ আর চুপচাপ ছিল। তুই ছিলি ওদের ভিতর নেতা। ফলে তুই ছিলি আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। আস্তে আস্তে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব আর প্রদর্শনীর ভিতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা বন্ধু হতে থাকি। এর মধ্যে আলভী ঢাকায় আর আকতার চলে যায় ভারতে পড়াশোনার জন্য। তুই আমি ভর্তি হই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তোর বন্ধুরা আমার বন্ধু এবং আমার বন্ধুরা তোর। ফলে কেন্দ্রের আঙিনা পেরিয়ে বন্ধুত্ব দীর্ঘতর হতে থাকে ছায়ার মতো। তোর সদাহাস্য মুখ, মজা করবার সহজাত ক্ষমতা যে-কোনো বিষয়ে; ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তোর বন্ধুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে লাগল। এর মাঝেই আবিষ্কার করলাম ফটোগ্রাফিতে তোর আগ্রহ আছে। নিয়মিত ছবি তুলছিস। একদিন কেন্দ্রে তোকে বলে বসলাম, আমিও ছবি তোলা শিখতে চাই। তুই আমার দিকে তাকালি, স্বভাবসুলভ হাসলি। তারপর জিজ্ঞেস করলি, আমার ক্যামেরা আছে কি না। জবাবে জানালাম, নাই। তখন তুই বললি, 'ফটোগ্রাফি শিখতে দুটো জিনিস লাগে : ক্যামেরা আর ফিল্ম। তারপর যা করতে হবে : ক্যামেরায় ফিল্মটা ভরে ফিল্মের প্যাকেটের ভিতর যে-নির্দেশিকা থাকে তা অনুসরণ করে আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে ছুবি তুলতে থাক। দেখবি ফটোগ্রাফি শেখা হয়ে গেছে। প্রথমেই খামোখা বইটই পড়ে মাথা নষ্ট করিস না।' আমার অন্যান্য শখের মতো ফটোগ্রাফি শেখাও হয় নাই কখনো, কিন্তু তুই আমার একটা খুব বড়ো উপকার করলি। তোর ঐ উপদেশ থেকে একটা জিনিস আমি শিখলাম :…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.