জহির রায়হান তাঁর জীবন ও শিল্পের গন্তব্যকে গ্রন্থিত করেছিলেন মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে। জীবন ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পরিভ্রমণের স্থান আর শিল্প ছিল সেই পরিভ্রমণ উদ্ভাসনের দীর্ঘ পথ। জীবন ও শিল্পের পরিভ্রমণ ও উদ্ভাসন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল আরও এক দীর্ঘ পথের বাকে, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, পরাধীন দেশে জীবন ও শিল্প অর্থময় হতে পারে না। তিনি তাই স্বাধীকার আন্দোলনের দীর্ঘতর পথ ধরে হাঁটতে থাকেন। তাঁর জীবন ও শিল্পের গন্তব্য এক ও অভিন্ন হয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। [...]

জহির রায়হান তাঁর জীবন ও শিল্পের গন্তব্যকে গ্রন্থিত করেছিলেন মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে। জীবন ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পরিভ্রমণের স্থান আর শিল্প ছিল সেই পরিভ্রমণ উদ্ভাসনের দীর্ঘ পথ। জীবন ও শিল্পের পরিভ্রমণ ও উদ্ভাসন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল আরও এক দীর্ঘ পথের বাকে, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, পরাধীন দেশে জীবন ও শিল্প অর্থময় হতে পারে না। তিনি তাই স্বাধীকার আন্দোলনের দীর্ঘতর পথ ধরে হাঁটতে থাকেন। তাঁর জীবন ও শিল্পের গন্তব্য এক ও অভিন্ন হয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। দীর্ঘতর ওই পথ তাঁর জীবনকে হ্রস করে দিয়েছে - কেননা মুক্তির জন্যে মানুষকে মূল্য দিতে হয়। জহিরকেও দিতে হয়েছে, তিনি নিরুদ্দেশে গেছেন, পরে উদ্ঘাটিত হয়েছে তিনি শহীদ হয়েছেন। জীবন তাঁর হারিয়ে গেছে, কিন্তু শিল্প তাঁর এখনও উজ্জল আলো ছড়াচ্ছে; কেননা মুক্তির নিরবধি সংগ্রাম এক পরম শৈল্পিকতা, ওই শৈল্পিকতায় জহির রায়হান এক হয়ে গেছেন, লীন হয়ে আছে তাঁর জীবন ও শিল্প। প্রায়-উপনিবেশিক এক শাসন যে পূর্ববাংলায় জীবন ও শিল্পের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে রেখেছে জহির রায়হান তা জেনেছিলেন নিজের জীবনের মধ্যে দিয়ে। সিনেমাতে তাঁর প্রথম ফুটপ্রিন্ট ছিল ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ১৯৫৭ সালে ছবিটিতে সহকারী পরিচালকের কাজ করেন তিনি। কয়েক বছরের মধ্যেই পরিচালক হয়ে ওঠেন, ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেন ‘কখনো আসেনি’, ১৯৬২ তে ‘সোনার কাজল’ আর ১৯৬৩তে ‘কাচের দেয়াল’। কিন্তু পরপর তিনটি চলচ্চিত্রই অসফল হয় বাণিজ্যের দৌড়প্রতিযোগিতায়। সমাজের অবকাঠামো তার কাঠামোর উপযোগী মনস্তত্ব তৈরি করে চলে, মারাত্মক সেই মনস্তত্ব ষাটের দশকে তো বটেই, এখনও আমাদের প্রতিনিয়ত হিতোপদেশ দেয় - জীবন এত কষ্টের, সিনেমা, নাটক আর গল্প উপন্যাস যদি আমাদের একটু হাসাতেই না পারে, তা হলে কি দরকার ওসবের? অতএব জহিরকে একপা এগুনোর জন্যে দু’পা পেছাতে হলো। মুখ ফেরাতে হলো বাণিজ্যিক ছবির দিকে। ভাষা আন্দোলন গভীরতর ছাপ ফেলেছিল তার ওপরে। তিনি তাই পরিকল্পনা করেছিলেন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামের একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের। ততদিনে বাণিজ্যিক ছবির কল্যাণে তিনি প্রযোজক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সামর্থ্য এলেও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাঁকে তাই রূপকাশ্রয়ী হয়ে নির্মাণ করতে হলো ‘জীবন থেকে নেয়া’। পরাধীন দেশে জীবন ও শিল্পের অবনমিত চেহারার সঙ্গে প্রতিনিয়ত এভাবেই মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সেই যে স্পেন দেশের এক…

আমাদের মুক্তিযু্দ্ধের মাত্র তিন বছর চার মাস পূর্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে পিপিপি অর্থাৎ পাকিস্তান পিপলস পার্টির। এই সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অবশ্যই আলোচনার দাবিদার এক প্রতিষ্ঠান। অথচ এটি খুবই বিস্ময়ের বিষয় যে এটি নিয়ে আমরা তেমন আলোচনাই করি না। শুধুমাত্র ভুট্টোর নামটি মাঝে মাঝে ...[বিস্তারিত]

আমাদের মুক্তিযু্দ্ধের মাত্র তিন বছর চার মাস পূর্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে পিপিপি অর্থাৎ পাকিস্তান পিপলস পার্টির। এই সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অবশ্যই আলোচনার দাবিদার এক প্রতিষ্ঠান। অথচ এটি খুবই বিস্ময়ের বিষয় যে তা নিয়ে আমরা তেমন আলোচনাই করি না। শুধুমাত্র ভুট্টোর নামটি প্রসঙ্গক্রমে মাঝে মাঝে উচ্চারিত হয়। এর আলোচনা করা দরকার দুটি কারণে- ১. মুক্তিযুদ্ধে এর সার্বিক কাজের ধরন নির্ণয় ২. পাকিস্তানের সংসদীয় রাজনীতিতে এর ঈর্ষণীয় উত্থান! আমরা এত জানিই যে পিপিপির প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন সামরিক শাসক আইউব খান সরকারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং তিনি ওই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। সেই লোক একসময় আইউবের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন। তার প্রাথমিক কারণ হিসাবে ৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে আইউবের টোটাল কার্যক্রমকে পাকিস্তানের পক্ষে অপমানজনক বলে সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং একপর্যায়ে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি লাহোরে ৩০ নভেম্বর-পহেলা ডিসেম্বর/১৯৬৭-এ এক সম্মেলনের মাধ্যমে পিপিপি গঠন করেন এবং তিনিই নির্বাচিত হন এর চেয়ারম্যান। এখানে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, তিনি আইউব খানের সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। অনেকটা মুজাফফরপন্থি ন্যাপের মতোই ধর্ম-সামাজিক কর্ম-সর্বকল্যাণমুখর গণতন্ত্র-অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্রের পতাকাকে উর্দ্ধে তুলে ধরেন। তিনি বারবার মিলিটারি-জমিদার নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানের এই দুই জান্তব সত্যের (মিলিটারিজম-ফিউডালিজম) বিরুদ্ধে তাঁর সংগঠনকে দাঁড় করান। কৃষক-শ্রমিক-মজদুর-ছাত্রদের ভিতর এক অদ্ভুত জাগরণ তৈরি হয়। ৭০-এর নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল রোটি-কাপড়া-মাখান(অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান)। এর জন্য নির্বাচনী মেনিফেস্টো তৈরি করে বিপুল জনজাগরণ তৈরি করতে সক্ষম হয় তার দল। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা খুবই জরুরি যে, তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক মুরুব্বির পরিবর্তন করেন। আইউবের মুরুব্বি ছিল চিন-আমেরিকা। জনশ্রুতি আছে যে, রাজনীতির একপর্যায়ে মৌলানা ভাসানী এমন আস্থা রাখতেন যে, আইউবের থ্রুতে চিনের মাধ্যমে এই দেশে সমাজতন্ত্রের কাজ অনেকদূর এগোনো সম্ভব! যাই হোক, পিপিপি চিনের দিক থেকে মুখ-বুক সবই ফিরিয়ে নেন। তিনি মুরুব্বি হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকেই যথার্থ মনে করতে থাকেন। যাই হোক, ৭০-এর নির্বাচনে সিন্ধু আর পাঞ্জাবে খুবই ভালো ফলাফল করে এ দল। পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৪ আসনের ভিতর ৮৭ আসন পায় তারা। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ পায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু ভুট্টোর খায়েশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। ক্ষমতার কলনাঠি নাড়লেও ভুট্টো খুব একটা সামনে আসেন না। ইয়াহিয়াকেই ক্ষমতা না ছাড়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা…

মার্চে শোকের মাতম আর ডিসেম্বরে বিজয়ের বাজনা_ এ-ই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ উদযাপন। সেই স্মরণের তালিকায় সব কিছু আসে, আসে না কেবল সেইসব নারীদের কথা, যাদের শোকের শরিক রাষ্ট্র হয়নি। তাদের বিজয় আজো আসেনি। বিজয়হীনা সেই নারীদের আমরা বীর ডাকি না, ডাকি ‘বীরাঙ্গনা’ বলে। ‘বীরাঙ্গনা’ মানে বীরের অঙ্গনা, বীরের নারী। বীরত্বের যে পুরুষতান্ত্রিক সংজ্ঞা তাতে কেবল পুরুষেরই অধিকার। নারীর কোটায় কেবল বীরের অঙ্গনা হবার ছাড় ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা নারী আর ধর্ষণ-নির্যাতন আর গণহত্যার শিকার লক্ষ লক্ষ নারীদের কেন এক দাগে পুরুষের পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে? স্বাধীনতা অর্জনে যদি তাদেরও বিরাট ত্যাগ ও অবদান থেকে থাকে, তবে কেন তাদের কেবল ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবের মধ্যে আটকে থাকতে হবে? এটা কি বীরের সম্মান না অধঃস্তনের প্রতি করুণা ও অবজ্ঞা? একাত্তরের সব থেকে বিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্থ নারীরা। তাদের ঘরে থাকা সহজ ছিল না, পালানো ছিল আরো কঠিন। যুদ্ধে যেতে চাওয়াও যখন প্রায় অসম্ভব ছিল, তখনও যুদ্ধে সামিল হয়েছেন এমন নারী বিরল নয়। অথচ সত্তরের ডিসেম্বরে ছাত্রীদের কাঁধে ডামি বন্দুক দিয়ে কুচকাওয়াজ করানো হলেও যুদ্ধের সময় মেয়েদের নিয়ে আলাদা কোনো বাহিনী গঠন কিংবা তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। অথচ ধর্ষিতার সারিতে তারা, গণহত্যার মোট সংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশও তারা। শাহীন আফরোজের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মেয়েরা তাদের চোখের সামনে স্বজনদের খুন হতে দেখে প্রতিশোধ স্পৃহায় যুদ্ধে নেমেছিল। অথচ আজো মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিকের প্রতিচ্ছবি কেবলই পুরুষেরই দখলে। জাতীয়তাবাদ কি তবে পুরুষের মতাদর্শ? আজ এতদিন পর পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে ঘৃণায় কথার আগ্নেয়গিরি জ্বালানো বরং সহজ; কিন্তু কঠিন সেসব নারীদের কথা বলা; স্বাধীনতার দাম যাদের সবচেয়ে বেশি মূল্যে শুধতে হয়েছিল। সরকারি হিসাবে আড়াই লাখ এবং কোনো কোনো গবেষকের মতে প্রায় চার লাখ নারী একাত্তরে ধর্ষিত হয়েছিলেন। ৮ থেকে ৮৭ বছর বয়সের। একবার নয়, একদিনের জন্য নয়_ বারবার অনেক দিন ধরে অমানবিক পরিবেশে আটক থেকে। আত্মহত্যা করারও উপায় ছিল না। মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সিলিংয়ে ঝুলে পড়তে না পারে। ‘ধর্ষণ’ শব্দটি তাদের নিপীড়নের ভয়াবহতার পুরোটা প্রকাশের জন্য যথেষ্ঠ নয়। আমরা পুরুষরা সেই নিপীড়নের শিকার হতে পারি না বলে হয়তো পুরুষালি ভাষায় তা প্রকাশ করাও কঠিন। মার্চ থেকে ডিসেম্বর…

'প্রসাদ সিংহ পরিকল্পিত' মাসিক উল্টোরথ পত্রিকার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় শৈশবে―প্রয়াত মাতামহের (মুন্সেফ আদালতের সরকারি উকিল) দলিলপত্রভর্তি স্থূলকায় আলমারি লুঠ করে পেয়েছিলাম আরও অনেক বইয়ের সঙ্গে উল্টোরথ-এর একটি বিশেষ সংখ্যা (বর্ষ ২০, সংখ্যা ১০, পৌষ ১৮৯৩ শকাব্দ); ছোট মামা কর্তৃক স্বাক্ষরিত এই পত্রিকা আমার বহু দুপুরের অবকাশরঞ্জিনী হয়ে ছিল। [...]

'প্রসাদ সিংহ পরিকল্পিত' মাসিক উল্টোরথ পত্রিকার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় শৈশবে―প্রয়াত মাতামহের (মুন্সেফ আদালতের সরকারি উকিল) দলিলপত্রভর্তি স্থূলকায় আলমারি লুঠ করে পেয়েছিলাম আরও অনেক বইয়ের সঙ্গে উল্টোরথ-এর একটি বিশেষ সংখ্যা (বর্ষ ২০, সংখ্যা ১০, পৌষ ১৮৯৩ শকাব্দ); ছোট মামা কর্তৃক স্বাক্ষরিত এই পত্রিকা আমার বহু দুপুরের অবকাশরঞ্জিনী হয়ে ছিল। কণিষ্ক (রাম বসু) ও বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসদুটির (যে যার অজ্ঞাতবাসে ও বনের খেলা) কথা আমার আমৃত্যু মনে থাকবে। পরবর্তীকালে আরও বাইশটি সংখ্যা সংগ্রহ করেছি পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে; ধূসর কাগজে ছাপা কাটা-কাটা চেহারার অক্ষরগুলো আমাকে মোহগ্রস্ত করে রাখে এখনও। মূলত চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা হলেও উল্টোরথ-এর বড় অংশ জুড়ে থাকত গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, সাক্ষাৎকার ও রম্যরচনা; আর যা ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষক―'মেলব্যাগ'। নিয়মিত এ-বিভাগে পাঠকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হতো। একটি পূজা সংখ্যায় (১৮৯৯ শকাব্দ) ঘোষণা করা হয়েছিল যে শ্রেষ্ঠ প্রশ্নকর্তাকে ২৫.০০ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। সাধারণত প্রশ্নের তুলনায় উত্তরগুলো সংক্ষিপ্ততর হলেও বুদ্ধিদীপ্তি ও সরসতায় উপভোগ্য হয়ে উঠত। উত্তরদাতা ছিলেন মিসেস প্রসাদ সিংহ ও প্রসাদ সিংহ স্বয়ং; কোনও-কোনও সংখ্যায় অবতার কিংবা শ্রীপঞ্চাননকেও দেখা গেছে, আবার কয়েকটি সংখ্যায় নামই ছাপা নেই কারও। মার্চ ১৯৭২ সংখ্যায় (বর্ষ ২১, সংখ্যা ১, চৈত্র ১৮৯৪ শকাব্দ) প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানা যাচ্ছে : উল্টোরথ-এর মুদ্রাকর, প্রকাশক ও সম্পাদকের নাম মনোজ দত্ত; পত্রিকার ঠিকানা―দি ম্যাগাজিন্‌স্ প্রাইভেট লিমিটেড, ১২৪/বি, বিবেকানন্দ রোড, কলকাতা-৬। একই প্রকাশনালয় থেকে পাশাপাশি বেরোত একই আদলের আরেকটি মাসিক পত্রিকা : সিনেমাজগৎ। 'মেলব্যাগ' সেখানেও নিয়মিত বিভাগগুলোর একটি। পত্রিকাদুটির প্রকাশতারিখ উল্লেখিত হতো শকাব্দে (যার সঙ্গে ৭৮ যোগ করলে খ্রিস্টীয় সন মিলবে)। 'মেলব্যাগ'-সূত্রে জানতে পারি, 'উল্টোরথ' নামের প্রবর্তক প্রসাদ সিংহ এবং এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। আমার সংগৃহীত সর্বশেষ সংখ্যাটি (বর্ষ ৩৬, সংখ্যা ৯, বৈশাখ ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ) একটু ব্যতিক্রমী (আকার : ১০.২৫‌" x ৮"; অন্যান্য সংখ্যার আকার : ৮.২৫" x ৫.২৫")―শকাব্দের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে বঙ্গাব্দ এবং অন্তত এই প্রথমবারের মতো প্রারম্ভিক আখ্যাপত্র দেখতে পাচ্ছি, তাতে লেখা : প্রধান সম্পাদক―শক্তিপদ রাজগুরু, সম্পাদক―ডি. পি. আগরওয়াল, সহযোগী সম্পাদক―শ্যামল বসু। পালটে গেছে কার্যালয়ের ঠিকানাও : ১ বি রাজা সুবোধমল্লিক স্কোয়ার, কলিকাতা-৭০০০১৩। 'পাত্র পাত্রী' বা 'আপনার প্রশ্ন ও আপনার ভাগ্য' শিরোনামে নতুন বিভাগ…

জগৎজ্যোতি দাস মুক্তিযুদ্ধের শহীদ। সব শহীদই বীর, বীরশ্রেষ্ঠ। জন্ম হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। ১৯৭১ সালে বয়স হয়েছিল ২২। [...]

আতোয়াঁ দ্য সা-এক্সুপেরির দ্য লিটল প্রিন্স বইয়ের গল্পে আছে -- ভিন গ্রহের বাসিন্দা ছোট রাজকুমার নিজ গ্রহে চলে যাওয়ার সময় পৃথিবীবাসী বন্ধুকে এই বলে আশ্বস্ত করে গিয়েছিলেন যে, রাতেরবেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে সে যখন রাজকুমারের তারাটি খুঁজবে, তখন তিনি নিজ তারায় বসে হাসবেন। তার মনে হবে যেন, সব তারাই হাসছে। সব দুঃখ তখন সে ভুলে যাবে (সময় সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়)। আর সুখী হবে এই ভেবে যে, সে একদিন রাজকুমারকে ভালোবেসেছিল। রাজকুমার আরও বলেছিলেন, সবারই একটি করে তারা আছে। আমিও তা বিশ্বাস করতে চাই; এবং এই ভেবে সুখী হতে চাই যে, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ আকাশের তারা হয়ে আছেন। তাতে আছেন জগৎজ্যোতিও। জগৎজ্যোতি দাস মুক্তিযুদ্ধের শহীদ। সব শহীদই বীর, বীরশ্রেষ্ঠ। জন্ম হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। ১৯৭১ সালে বয়স হয়েছিল ২২। তার হয়ে ওঠার বয়ান নিষ্প্রয়োজন। কেননা, মুক্তিযোদ্ধাদের সিংহভাগই দরিদ্রজনের সন্তান। আর জগৎজ্যোতিও এর ব্যতিক্রম নন। সুনামগঞ্জ কলেজে ছাত্র থাকাকালে গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য শিলংয়ে প্রেরিত ১১৪ জনের প্রথম দলটিতে মনোনয়ন পান জগৎজ্যোতি। ৩২ দিনের কোর্স সাফল্যের সঙ্গে সমাপ্ত করেন। শেখেন যুদ্ধ ও অন্তর্ঘাতের নানা কৌশল। প্রশিক্ষণ শেষে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের হেড কোয়ার্টারে এলে ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে গঠিত একটি দলের নেতৃত্ব তিনি পান, যে দলটি পরে 'দাস-পার্টি' নামে পরিচিত হয়েছিল। সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা এবং নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের কিছু এলাকা ছিল টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীন। এসব এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে সড়কপথে চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠলে পাকিস্তানিরা জলপথ ব্যবহার শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে শত্রুদের জলযান ধ্বংসের দায়িত্ব পায় 'দাস-পার্টি'; এবং কুশিয়ারা নদীতে তারা কার্গো-নৌযানের একটি বহর অ্যামবুশ করে ডুবিয়ে দেয়। জগৎজ্যোতি পানিতে ডোবানো খুঁটিতে বাঁধা দড়িতে মাইন ঝুলিয়ে নৌযান ধ্বংসের একটি নিজস্ব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং ক্রমাগত গানবোট ও কার্গো-ভেসেল ডোবাতে থাকেন। দাস-পার্টির অসংখ্য সফল অপারেশনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য -- বানিয়াচং থানা দখল, পাহাড়পুরে হানাদার অ্যামবুশ, বদরপুরে ব্রিজ ধ্বংস, জামালগঞ্জ থেকে পাক সৈন্য ও রাজাকার বিতাড়ন এবং গোটা এলাকা মুক্তকরণ, তাহিরপুর আক্রমণ, খালিয়াজুড়ি থানায় হামলা, রানীগঞ্জ ও কাদিরপুর অভিযান, দিরাই ও শালল্গা বিনাযুদ্ধে দখল ইত্যাদি। বিপজ্জনক ও রক্তক্ষয়ী এসব অভিযানে সাফল্য ছিল উদ্ভাবন দক্ষতানির্ভর। এভাবেই জগৎজ্যোতি নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছেন, দক্ষ যোদ্ধা হয়ে উঠেছেন, শত্রুর…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.