তাই যখন নভেরা এখন আবার আমাদের ভাবনায় সচল হয়েছেন তখন এই আকাঙ্ক্ষা কি আমরা করতে পারি না যে, আমাদের এই পথিকৃৎ ভাস্করকে দেখবার জন্যে আমাদের এক জোড়া নতুন চোখ চাই? [. . .]

নভেরা আহমেদ আর নেই — এই কথাটি প্রচারিত হবার পরে নভেরা যেন আবার ফিরে এলেন সাধারণ থেকে অসাধারণ, সব পাঠকের আলোচনায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে প্রচার মাধ্যম নভেরা বিষয়ে আবার একটু বিশেষভাবে সরগরম হয়েছে। আর এই পৃথিবীর আর এক প্রান্তে বসে সেই সরগরম দুনিয়াটায় আমি ঘুরছিলাম। খুঁজছিলাম কোথায় কী লেখা হচ্ছে, বলা হচ্ছে নভেরাকে নিয়ে। কী রূপে ফিরছেন আমাদের পথিকৃৎ ভাস্কর তাঁর মৃত্যুর পরে? খুব অল্প কিছু সংখ্যক লেখা চোখে পড়েছে যেগুলোর শব্দের গাঁথুনিতে নভেরার শিল্পী-মূর্তি ধরা পড়েছে। বাকিরা ফিরে ফিরে দেখেছেন হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘নভেরা’ উপন্যাস থেকে উঠে আসা নায়িকাকে। আমাদের শিল্পকলার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যাঁকে বাদ দিলে, সেই নভেরার কেবল জীবনযাপনের গল্পই যখন তাঁকে সামনে নিয়ে আসার প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভাবতেই হয় আমরা এখন নভেরার জন্মসাল ১৯৩০-এ দাঁড়িয়ে আছি। নভেরা আমাদের ছাড়িয়ে টাইম মেশিনে চেপে পেরিয়ে যাচ্ছেন একবিংশ শতক। বিংশ শতকের মধ্যভাগে যে নারী ভাস্কর হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে লড়েছেন তাঁকে আমরা দেখছি ছানি-পড়া চোখে। যে চোখের ঝাপসা দৃষ্টি তাঁর সৃষ্টিকে কাষ্ঠবৎ জড় বিবেচনায় অবহেলা করেছে, আর রক্তমাংসের মানুষটির জীবনাচারকেই তাঁর সমস্ত জীবনের মাপকাঠিতে রূপান্তরিত করেছে, সেই দৃষ্টি কি পারে সময় থেকে এগিয়ে থাকা মানুষটির প্রকৃত স্বরূপের মূল্যায়ন করতে? পারে না, পারে না বলে এই সব দৃষ্টির অধিকারীরা তাদের নিজের অবস্থানে টেনে নামাতে চায় তাঁর শিল্পীসত্তাকে। নভেরার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেনি, ঘটবার কথাও ছিল কিনা বুঝতে পারি না। দীর্ঘকাল তো চলেছে আমাদের শিল্পকলার ইতিহাস নভেরাকে বাদ দিয়ে কিংবা আড়াল করে। কিছু অনুসন্ধানী চোখ তাঁর শিল্পীসত্তা আর তাঁর সৃষ্টিকে নতুন করে ফিরিয়ে না আনলে নভেরা তো হারিয়েই গিয়েছিলেন। নভেরার নয়, বরং আমাদেরই সৌভাগ্য যে কেউ কেউ ফিরে দেখেছিলেন তাঁকে, নইলে ভুলভাল শিল্পের ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকতো আমাদের শিল্পকলার ইতিহাস। কিন্তু এর পরেও কথা থেকে যায়, কেননা শিল্পের ইতিহাস সাধারণ অর্থে শিল্পকলার মানুষেরই। সর্বসাধারণের কাছে তবে কী করে পৌঁছাবেন আমাদের শিল্পের ইতিহাসের প্রথম এবং প্রধানতম ভাস্কর? তাঁকে সাধারণের কাছে প্রথমবারের মতো নিয়ে এলেন হাসনাত আবদুল হাই। ১৯৯৪ সালের হাসনাত সাহেব ‘নভেরা’ উপন্যাসের মধ্যে দিয়েই নভেরাকে সাধারণ শিল্পানুরাগী বা কৌতূহলী পাঠকের সামনে নিয়ে আসেন। এর পরেও এই উপন্যাস বহুবার…

“আজ যদি আমি নিজেকে বাদ দিয়ে একা মানুষদের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা শৌখিন তাত্ত্বিক সম্পাদকীয় লিখি, তাহলে আমার আগের এবং আগামী দিনের সব ‘ফার্স্ট পার্সন’ মিথ্যে হয়ে যাবে। আর, বিনে পয়সায় রোববার পান বলে আপনারা মিথ্যে কথা পড়বেন কেন? যে জীবন হয়তোবা আমাকে একাকিত্বের এই বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিতে পারত, আমাদের সমাজে তার কোনো স্থান নেই।” [. . .]

বাবার উৎসাহে একসময় পড়েছিলাম সাগরময় ঘোষের ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়, নিজেই বেছে নিয়ে পড়তাম ‘সানন্দা’র পাতায় অপর্ণা সেনের সম্পাদকীয়। এর বাইরে সম্পাদকীয় বলতে কেবল সম্পাদিত গ্রন্থের শুরুতে সম্পাদকের কথা। ফলে সম্পাদকীয়র একটা চেনা ছক ছিল, সম্পাদকীয় মানেই বই বা পত্রিকার ধারণকৃত বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ বা আপাত ধারণা। চেনা ছকের ভেতর হুড়মুড়িয়ে এলো এটা — মেয়েলি বলে যে প্রান্তিকতার অপমান আমাকে বারবার আক্রমণ করেছে, মোটা বলে তার থেকে কিছু কম করেনি কোনোদিন। অথবা — মাদুরের সঙ্গে গালিচা বা কার্পেটের একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে। আভিজাত্যের দিক দিয়ে কার্পেটের মূল্য হয়তো অনেকটা, আবার মাদুর যেন তার সহজতার জন্যই পবিত্র। এ যেন শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কার্পেট তা সে যতই দামি হোক না কেন, তার স্থান আমাদের পায়ের নীচে। দেয়ালে কার্পেট টাঙানোর ঔপনিবেনিক কায়দা যদিও এখন নানা ধনী বাড়িতে দেখতে পাই। তার পরিপ্রেক্ষিতে মাদুরের স্থান অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। মাদুর আক্ষরিক অর্থেই আসন। শোওয়ার কিংবা বসার। না! তাকে পায়ের তলায় রেখে তার ওপর আসবাব রাখার নয়। মাদুর পিছলে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারে। ... মাদুরের কাছে আমার একটা জিনিসই শিখতে বড় ইচ্ছে হয়। নম্রতা। দেখি, এ জীবনে হয় কি না! কন্টেন্টের সাথে সম্পর্কশূন্য এ রকমের সম্পাদকীয় এই প্রথম। এবং সম্পাদক তাঁর সৃজনশীল চরিত্রের চাইতে বেশি আলোচনায় এসেছেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনাচরণের জন্যে। ঋতুপর্ণ ঘোষ।  পরিচয় তো ছিলই চিত্রপরিচালক, চিত্রনাট্যকার, ঘোষ অ্যান্ড কোং-এর আড্ডাবাজ ঋতুপর্ণ ঘোষের সাথে। সে পরিচয় দর্শক সারিতে বসে তাঁর সৃজনশীলতায় মুগ্ধ হয়ে ওঠার সুবাদে। সে পরিচয় অবিশ্রাম হাততালিতে মুখর। আপাত বিচিত্র জীবনযাপনের জন্যে আলোচনার তুঙ্গে অবস্থান করা ঋতুপর্ণ ঘোষের সাথে পরিচয় ছিল অনেকেরই। দরকার ছিল কি তবে এই বাড়তি জানা-শোনার? তাঁরই বা দায় ছিল কোথায় নিজেকে এমন জানান দেবার? ছিল একটা তাগিদ তাঁর নিজের মধ্যে, সে তাগিদ বোধ করি তিনি যে-সব প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁদের অস্তিত্বের লড়াইকে শাণিয়ে নেবার। ছিল একটা অভিলাষ কিছু মানুষের অনমনীয় কৌতূহলের মুখে কুলুপ এঁটে দেবার। নিজেকে সযত্নে মেলে ধরবার আকাঙ্ক্ষাও ছিল হয়তো আপাত-নিঃসঙ্গ মানুষটির। এই রকমের নানা ইচ্ছের ডানা মেলবার আকাশ ছিল তাঁর রোববার-এর ‘ফার্স্ট পার্সন’। ফলে সেটা নিছক সম্পাদকীয় না হয়ে, হয়ে ঊঠেছিল ঋতুপর্ণের অন্তরমহল, যেখানে…

সেই প্রথম বায়োস্কোপ দেখা, সেই প্রথম কালো বাক্সের ভেতর চোখ রেখে দেখা ক্ষুদিরামের ফাঁসি। আহা সেই প্রথম মন কেমন করে ওঠা, ইতিহাসের ভেতর পা রাখা। [. . .]

স্কুল ছুটির দিনগুলোতে কাঁধে বাক্সটা ঝুলিয়ে নিয়ে লোকটা আসতো আমাদের পাড়ায়। তখন ছুটির দিনের সকালটা হয়তো গড়াতে শুরু করেছে কেবল। অদ্ভুত একটা স্বরে বায়োস্কোপ দেখার আমন্ত্রণ। সেই প্রথম বায়োস্কোপ দেখা, সেই প্রথম কালো বাক্সের ভেতর চোখ রেখে দেখা ক্ষুদিরামের ফাঁসি। আহা সেই প্রথম মন কেমন করে ওঠা, ইতিহাসের ভেতর পা রাখা। প্রথমবার তাজমহল, লালকেল্লা, চারমিনার ভ্রমণ শেষে মাথাটা বাক্সের বাইরে খেলার মাঠে স্থির হলেও মনটা তখনো পরিব্রাজক। পরিব্রাজক হতে পারিনি, তবু সেই প্রথম দেখা বায়োস্কোপের বাক্সের ভেতর থেকে লোকটাকে না জানিয়ে চুরি করেছি এই পরিব্রাজক মন। তাই বিশেষত্বহীন সেই বায়োস্কোপ দেখানো লোকটাকে ভুলিনি কখনো। মুখটা মনে নেই কি আছে — ঝাপসা! মনে আছে শুধু উদাসীন একঘেয়ে গলার সেই ‘আহা দেখো বাহার দেখো’র এক মিনিটের গান। চার আনায় কিনে নেয়া চার কোটি টাকার আনন্দ! আনা আধুলির হিসেব থেকে টাকায় পৌঁছাতে যে সময় লাগে, তার খানিকটা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে বায়োস্কোপের বাক্স। লোকটা কোথা থেকে এসে কোথায় ফিরে যেত, জানা হয়নি। তবু লোকটা আর না এলেও জানলায় একজোড়া চোখ ছুটির দিনগুলোতে মরিয়া হয়ে বাক্সটার জন্য অপেক্ষা করে থাকতো। একটা বাক্সের জন্য প্রতীক্ষার ভেতর ছেলেবেলার দৌড় কি আর থামে? বরং বড়োবেলার দিকে ছুটতে ছুটতে পেছনে ছেড়ে আসে অসংখ্য মুখ, যাদের বেশিরভাগ আর মনেই থাকে না। তবু কেউ কেউ থাকে, ঘুরে ফিরে আসে ছোটবেলার রঙমহল থেকে বড়োবেলার উঠোনে। মাঝে মাঝেই ফিরে আসে আমার দেখা প্রথম ভাস্করের মুখ। বাঁশের মাথায় একটা পাতলা পলিথিনে ঢেকে তার ওপর একটা কাপড়ের পাগড়ি মুড়ে নিয়ে আসতো, সাদা আর গোলাপির নানান শেডের রঙ মাখানো চকলেট ফেরি করতে। মায়ের বদৌলতে পেয়েছিলাম একজোড়া বড় চোখ, বিস্ময়ে সেটা আর চোখ না থেকে গলফ খেলার বল হয়ে যেত! লোকটা সুকুমার রায়ের সেই ফেরিওয়ালার মতোই জানতে চাইতো, ‘তোমার কী চাই?’ তারপর গল্পে গল্পেই কেমন গড়ে দিত ফুল, পাখি, মাছ অথবা বাহারি গয়না। অবাক হবার পালা শেষ হবার আগেই চকোলেটের ভাস্কর্য মুখের ভেতর মিলিয়ে যেত। আর লোকটা তার সামানা গুটিয়ে নিয়ে অন্যপথে ছুট। কেবল আমরা জনাকয় আরো কিছুক্ষণ চকোলেট না মূর্তি , মূর্তি না চকোলেট করতে করতে দুপুর ডেকে আনতাম। বিস্ময়ে প্রাণ জেগে উঠতো কিনা জানি…

মেইল বক্স থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ছেলেবেলার ভেতর হামাগুঁড়ি দিয়ে সোজা খাটের নীচে। অন্ধকার হাতড়ে টেনে বের করি টিনের বাক্সে রাখা পুতুলের সংসার, এলোমেলো করে দিতে দিতে ভাবি বাবা বুঝি 'ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী' হাতে নিয়ে পড়তে ডাকবে। বাবার দিকে ছুটে যেতে যেতে দেখি বুড়ো জেলের মুখটা বাবার। [. . .]

আমাদের পুরোনো বাড়ির উঠোনের লম্বা ঢ্যাঙা একমাথা ঝাঁকড়া সবুজ চুলের কামিনী গাছটা, আমার প্রথম প্রেমিক। প্রতিবারের বর্ষায় মাথায় সাদা টুপি পরে সে যখন প্রলুব্ধ করতে আসত, চারপাশে তখন সুগন্ধে ম'ম'। রানী সমেত মৌমাছির দল সারাদিন গুনগুন গানে ওর চারপাশটা ভরে তুলতো। একটু জোরে হাওয়া দিলে পালকের মতো ঝরে পড়ত সাদা পাপড়ি। পড়ার টেবিল থেকে মুখ তুলে ওর হাতছানির ভেতর হেঁটে হেঁটে কলঘরে গিয়ে অপেক্ষা করতাম আর একটা ঝড়ো হাওয়ার, অথবা ঝুমবৃষ্টির। স্কুলের জন্যে তাড়া দিতে থাকা বন্ধুদের শত্রু মনে হত। ‘আসছি... যাই’ করে করে আরও খানিকটা সময় গাছটার নীচের ছাদখোলা কলঘরে দাঁড়িয়ে থাকতো বালিকা। বর্ষাশেষে নরম সবুজ নতুন পাতার ভেতর থেকে কয়েকটা সাদা পাপড়ি কুড়িয়ে বইয়ের ভাঁজে গুঁজে দিতে দিতে ভাবত, বারোমাস — সে কত দীর্ঘ! আঙুলের করে গুনে শেষ হয় না। অপেক্ষা মৃত মীনের চোখ, উল্টে পড়ে থাকে পড়ার টেবিলে কিছুদিন। তারপর বাসার সামনের ছাতিম গাছটা বুনো গন্ধের ফুল ফোটাতে শুরু করলে ছাতিম গাছটাকে মনে হত সবচাইতে প্রিয়। জানালার বাইরে মুগ্ধ চোখজোড়া ফেলে এসে অঙ্কের খাতা ভরে যেত ভুলে। আর সন্ধ্যায় স্যারের কাছে শাস্তি নিতে নিতে মনে হত আমি অবুঝের মতো এ কী করেছি। এই এই করে কখনো দোলনচাঁপা কখনো শিউলি কখনো চন্দ্রমল্লিকার চারপাশে ঘুরঘুর। ভূগোল বইয়ের পাতা থেকে উঠে গিয়ে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসতে আসতে আমার কামিনী গাছে বর্ষা নামে। ‘বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’ শুনতে শুনতে বালিকা তার কলঘরের সময়কে প্রলম্বিত করে। কামিনীর সেই সুগন্ধি সাদা টুপির জন্যে, ঝড়-জল-কাদায় মোড়া বর্ষাকে মনে হত প্রিয় ঋতু। তারও অনেক পরে কোনো এক এপ্রিলের রাতে পৃথিবী কেমন বন্ বন্ করে ঘুরতে থাকে, বাতাসের গায়ে চাবুক পেটাতে থাকে নারকেলের পাতা। রাতভর শিব তার প্রলয়নাচন নেচে সব কেমন গুঁড়িয়ে দিতে থাকে! একসময় সব চুপকথা হয়ে গেলে ঘষা কাচের ভেতর দিয়ে আলো আসার মতো করেই ভোর আসে। ঘর থেকে বাইরে আসে কেবল বড়রা। ছোটদের কাজ কেবল জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা। একটু পর বাসার বারান্দায় আসার অনুমতি পেলে ছোটরা সব অবাক চোখে দেখতে এল বাসার উঠোনে মস্ত একটা আকাশ! এতকাল আকাশটা কেবল গাছেদের ছিল; আজ সকাল থেকে সেটা বাসার সবার হয়ে গেল।…

সেই কোন্ ছেলেবেলায় সকাল হতো ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’ শুনতে শুনতে। একই গানের ভিতর রোজ সকাল গড়িয়ে ইস্কুলের মাঠে। সেখানেও আসতেন তিনি [. . .]

সেই কোন্ ছেলেবেলায় সকাল হতো ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’ শুনতে শুনতে। একই গানের ভিতর রোজ সকাল গড়িয়ে ইস্কুলের মাঠে। সেখানেও আসতেন তিনি — ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি’। রোজ সকাল থেকে রাত অবধি মাকে নানা ভাবে জ্বালিয়ে, কাঁদিয়ে, নির্বিঘ্নে যখন ঘুমিয়েছি, জানিনি মলিন মুখের মায়ের জন্যে ব্যথা হয়। জানিনি আমার চেনা মায়ের বাইরে আর যাকে মাতৃ রূপেন সংস্থিতা জেনে ভালবাসতে গিয়ে এই দূরের দেশে চোখ ভেসে যাবে জলে। রোজ এমন করেই জীবনের নানান অনুভবকে রাঙিয়ে দিয়ে, বাজিয়ে দিয়ে তিনি যখন আমার নিত্যদিনের ভিতর জুড়ে বসেন তখন বুঝি আর কেউ নয়, গানের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নন, তিনি নিজেই। সমস্ত দিন বৃষ্টিতে ভিজে এই শহরটা যখন একটা মনখারাপের চাদর জড়িয়ে ঘুরছে, তখন সন্ধ্যা নামার মুখে দূরের আকাশে মেঘ সরে গিয়ে একটুকরো সাদা মেঘে জড়িয়ে সূর্যটা উঁকি দিলে, আমি তাঁকেই যেন হাসতে দেখলাম আমার এই মেঘলা দিনের ভিতর। আর মনের ভিতর থেকে তিনিই গাইলেন ‘নূতন আলোয় নূতন অন্ধকারে/ লও যদি বা নূতন সিন্ধুপারে/ তবু তুমি সেই তো আমার তুমি,/ আবার তোমায় চিনব নূতন করে।’ এমন নিত্যজানার ভিতর দিয়ে আমার চিরকালের ভিতর যখন তিনি সত্যি হয়ে ওঠেন, আর সব কিছুকে ছাপিয়ে তাঁর উপস্থিতিই জীবন উপভোগের ইচ্ছেকে জাগায়। মনের ভিতর যে অসম্পূর্ণতা সারাক্ষণ অস্থির তাকে স্থিতি দিতেই গীতবিতানের পাতা উল্টে দেন। স্বরবিতানের সাথে পরিচয় ঘটেনি তখনও, গীতবিতানই কেবল উল্টেপাল্টে দেখতাম। সেইসব দিনগুলোতে মা কেমন উদাস গলায় গাইত ‘ভালোবেসে যদি সুখ নাহি’। কিসের অসুখ মায়ের সেটা জানবার অবকাশ ছিল না ওই বয়েসে। কেবল মায়ের রিনরিনে গলার ভিতর গানটাকে পেতে চাইতাম সে সময়ে। আরো কত পরে নিজের উপলব্ধিকে শাণিয়ে নিয়ে বুঝেছি ভালবেসেও অসুখী হবার ব্যথার ভিতর আমার মা আর রবি ঠাকুর মিলতেন। কিংবা তিনি হয়তো এমনি করেই নানান বয়েসের ভিতর নানান জনের নানান রূপের ঈশ্বর হয়ে ওঠেন। কোনো কোনো রুক্ষ রোদের দিনে উঠোনে কাপড় নাড়তে গিয়ে মায়ের সাথে গলা মিলিয়ে গেয়েছি ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে’। সমস্ত সংসারের চারদিকে রুক্ষ তাপ দুঃখ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যখন, সেই রকমের একটা সময়ে এই গান গাইবার মন মাকে রবি ঠাকুর পাইয়ে দিয়েছিলেন।…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.