আজকের বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট এর পূর্ববর্তী ৫২টি বিজয় দিবস থেকে ভিন্ন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার মাস আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়, রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হয় একটা রিসেট বাটন প্রেস করার নিরলস প্রচেষ্টা। ধ্বংসপ্রায় মুক্তিযুদ্ধের বহু ভাস্কর্য এবং স্মৃতিচিহ্ন, যার বিবরণ ৯ ডিসেম্বরের সমকাল পত্রিকায় প্রতিবেদন থেকে খুবই পরিষ্কার। মুজিবনগরের স্মৃতিস্তম্ভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বর, অসংখ্য উদাহরণের মাত্র দুটি।

প্রথমেই বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই ৩০ লাখ শহীদ ও ৪ লাখ মা-বোনকে, যাদের অপরিসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। শ্রদ্ধা জানাই অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাকে, যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে, নিজ-নিজ অবস্থান থেকে, যার যা আছে, তাই নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখেছিলেন। সব সেক্টর কমান্ডারকে জানাই আমার শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুদীর্ঘ ২৩/২৪ বছরের নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফসল। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের নির্বাচন, ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ (Epic Liberation War) ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটা এক মিনিটে দেশ হানাদার মুক্ত হয়, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ পটভুমিতে রয়েছে ধারাবাহিক গণসম্পৃক্ত আন্দোলন। বিভিন্ন পর্যায়ে অগ্রপথিকের ভূমিকায় ছিলেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। একজন তরুন নেতা হিসেবে

সব আন্দোলনেই সরব উপস্থিতি ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের। বিশেষত ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে তাঁর ভূমিকা ছিলো সর্বাধিক সুস্পষ্ট এবং তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার অসন্দিগ্ধু প্রতিভূ। তাঁর অবর্তমানে স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাস অত্যন্ত প্রতিকুল সময়ে সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান। তাঁদের সবার প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। আজকের বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট এর পূর্ববর্তী ৫২টি বিজয় দিবস থেকে ভিন্ন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার মাস আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়, রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হয় একটা রিসেট বাটন প্রেস করার নিরলস প্রচেষ্টা। ধ্বংসপ্রায় মুক্তিযুদ্ধের বহু ভাস্কর্য এবং স্মৃতিচিহ্ন, যার বিবরণ ৯ ডিসেম্বরের সমকাল পত্রিকায় প্রতিবেদন থেকে খুবই পরিষ্কার। মুজিবনগরের স্মৃতিস্তম্ভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বর, অসংখ্য উদাহরণের মাত্র দুটি। বিজয় দিবসের সরকারী ব্যানারে ২০২৪ জুলাই গণঅভুত্থানে নিহত আবু সাঈদের ছবি সাঁটানো কতটা শোভন, কতটা প্রাসঙ্গিক? আবু সাঈদ কতটা শ্রদ্ধা পেলেন। বিজয় মহিমা ও গৌরবকে ছোট করতে কেন এই ব্যর্থ প্রয়াস? এসব করে কি একাত্তরকে মুছে ফেলা যাবে? আর…

"তোমরা ভাত খেয়ে খেয়ে কী ফুটবল খেলবে?" শুধু বাংলাদেশের ফুটবল নয়, পুরো বাংলাদেশের ইতিহাসের ৪৭-৭১ পর্বকে এই ছোট একটি বাক্যেই বেঁধে ফেলা যায় বোধহয়।

"তোমরা ভাত খেয়ে খেয়ে কী ফুটবল খেলবে?" শুধু বাংলাদেশের ফুটবল নয়, পুরো বাংলাদেশের ইতিহাসের ৪৭-৭১ পর্বকে এই ছোট একটি বাক্যেই বেঁধে ফেলা যায় বোধহয়। আরেক ফুটবলার মেজর জেনারেল নূরুন্নবী, আরেকটু খোলাসা করে বললেন, পাকিস্তান ফুটবল দলে কখনোই এক দুজনের বেশী বাঙ্গালীর জায়গা হয়নি, পূর্ব পাকিস্তানের খেলাধুলার বিস্তারে সরকারী ফান্ডিং ছিল না বললেই চলে। কিন্তু "তোমরা ভাত খেয়ে খেয়ে কী ফুটবল খেলবে?" জাকারিয়া পিন্টুর এই এক বাক্যে পুরো পাকিস্তান আমলের শোষণ, বঞ্চনা, জাতিগত বিদ্বেষ পুরোটাই উঠে আসে। ভাত খেয়ে খেয়ে ফুটবল খেলা চলে না, ক্রিকেট হয় না, যুদ্ধ করা যায় না, যোগ্য প্রশাসক হওয়া যায় না, কিছুই করা যায় না। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে দেখা গেলো, ভাত খেয়ে খেয়েই সর্বাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত লাখখানেক সৈন্যের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে হারিয়ে দেওয়া যায়। ১৯৭১ সালের পরপর ভাত খাওয়া এই জাতি কিস্যু করতে পারবে না, দেশি বিদেশি অনেক কুতুবই এমন কথা বলেছেন। কিন্তু ৭১ এর পরে এই অনেকগুলো বছর বাদে পেছনে ফিরে দেখা যাচ্ছে ভাত খেয়ে খেয়ে অনেক কিছুই অর্জন করা হয়েছে, জাতি হিসাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ভাত খাওয়াটা কোন বাধা হবে না বলেই মনে হচ্ছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল কোন সাধারণ দল নয়, 'খেলার সাথে রাজনীতি' মেশানো দল। কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের নেতৃবৃন্দ তাঁদের অসামান্য দূরদর্শিতার কারণে যুদ্ধকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ফুটবলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের পরিকল্পনা করেন। শুধু জনমতই নয়, ফুটবল খেলে যুদ্ধের জন্য টাকাও জোগাড় করতে হবে। ভারতে চলে আসা খেলোয়াড়রা তো বটেই, ঢাকায় থেকে যাওয়া খেলোয়াড়দেরও উদ্বুদ্ধ করে নিয়ে আসা হয়। কাজী সালাউদ্দিন, বাংলাদেশের একমাত্র সুপারস্টার ফুটবলার, ৭১ এ কিশোর বয়সী ছিলেন, তিনি নিজের উদ্যোগেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে গিয়ে এই দলে যোগ দেন। https://www.youtube.com/watch?v=8AGtkIfjrFI স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল বিষয়ক এই তথ্যচিত্রটির অন্যতম নির্মাতা জনাব আবু নঈম মাহতাব মোর্শেদ এবং সঙ্গীত পরিচালক জনাব আলমগীর কবির আমার বাল্যবন্ধু। তাঁরা কোনরকম ধারাভাষ্য ছাড়া শুধুমাত্র সাক্ষাৎকার, মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্টক ফুটেজ আর স্থিরচিত্র ব্যবহার করে মাত্র বিশ মিনিটের মাঝে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড যেভাবে তুলে এনেছেন, সেটা বেশ বাহাদুরির ব্যাপার। "তোমরা ভাত খেয়ে খেয়ে কী ফুটবল খেলবে?" অথবা "ওরা যদি…

তাঁর আর কোনো ভাস্কর্যের জন্য না হোক, অন্য কোনো কৃতির জন্য না হোক, ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামের মুক্তিযুদ্ধের এই স্মারক-ভাস্কর্যটির জন্য সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদকে বাংলাদেশ মনে রাখবে। [ . . .]

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে (অধুনা চারুকলা ইনস্টিটিউট) ভাস্কর্যকলার অধ্যাপক ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। এছাড়াও ছিলেন – এখনো আছেন – অধ্যাপক অলক রায়। এই দুজন স্বনামধন্য ভাস্করের কাছেই আমাদের ভাস্কর্য শিক্ষার হাতেখড়ি। প্রথম বর্ষের একেবারে প্রথমদিকের এক ক্লাসে খালিদ স্যার আমাদের মাটি দিয়ে গোলক তৈরি করতে দিয়েছিলেন, মনে পড়ছে। মনে পড়ছে, সম্ভবত সে-বছরই, ১৯৯৩-এর কোনো একদিন, চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে মেডিকেল কলেজের পূর্ব গেইটের বাইরের এক সাধারণ রেস্তোরাঁয় চলচ্চিত্র কেন্দ্রের উপস্থিত সবাইকে নিয়ে আড্ডা আর মধ্যাহ্নভোজে শামিল হয়েছিলেন, তিনিই বিল মিটিয়ে দিয়েছিলেন। সে-সময়ে খালিদ স্যার চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের উপদেষ্টা। আরো পিছিয়ে গিয়ে আমাদের কলেজের সাইক্লোস্টাইল-পদ্ধতিতে-ছাপা হাতে-লেখা পত্রিকা ‘প্রবাহ’র কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে, যেটির একটি সংখ্যার শেষ প্রচ্ছদে একবার তাঁর ‘অঙ্কুর’ ভাস্কর্যটির ছবি আমরা ব্যবহার করেছিলাম। আর লজ্জার সঙ্গে এও মনে পড়ছে যে, ভাস্করের নামটি সেদিন সঠিক বানানে আমি লিখতে পারিনি! তাঁর ভাস্কর্য প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ তখন কারো মাধ্যমে আমাদের হাতে এসে পড়েছিল, দারুণভাবে আলোড়িতও করেছিল। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে শেষ দেখা ও কথা গত বছরের (২০১৬) ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে। ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণপর্বকে দীর্ঘ সময় জুড়ে ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন মিশুক মুনীর; সেইসব স্মরণীয় মুহূর্তের সংকলন ‘মন জানালা’র সেদিন ছিল প্রকাশনা অনুষ্ঠান, সিনেট ভবনের সেমিনার কক্ষে। খালিদ স্যার, কুলসুম ভাবী ও তাঁদের এক পুত্র এবং প্রয়াত মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলি কাজী ও একমাত্র পুত্রও সেদিন উপস্থিত ছিলেন। পরে স্যার ও ভাবীকে ঘিরে আমাদের দ্বিতীয় দফা আড্ডা জমেছিল মধুর ক্যান্টিনে। কারো কারো নিশ্চয়ই মনে পড়বে, নব্বইয়ের দশকের এক পহেলা বৈশাখে চট্টগ্রামের ডি.সি. পাহাড়ে তিনি ডাব বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলেন! অস্বাস্থ্যকর-অথচ-বিজ্ঞাপিত পানীয় কোক-পেপসি বিপণনের বিরুদ্ধে সেটা ছিল ‘শিল্পীর প্রতিবাদ’। নিছক খ্যাপামোর বশেই তিনি এ কাজ করেছিলেন – এমনটা ধরে নিলে বোধহয় ভুল করা হবে। যদিও তাঁর স্বভাবে খ্যাপামো ছিল, সহজে রেগে যেতেন কখনো কখনো; নিজের নানা কাজে, আচরণে ও অবস্থানের কারণে নানা সময়ে তিনি বিতর্কের জন্মও দিয়েছেন। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদকে ঘিরে একটি ঘটনা-পরম্পরার কথা শুনেছিলাম নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা ও দেবী শর্মার কাছ থেকে। একবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সোভিয়েত দেশীয় স্মারক-ভাস্কর্যের একটি সচিত্র বই মস্কো থেকে কিনে এনে দ্বিজেন শর্মা একজনের মাধ্যমে উপহার পাঠিয়েছিলেন…

এই ছবিটি কি মুক্তিযুদ্ধের গল্প? খানিকটা তো বটেই, পাক বাহিনীর নৃশংসতা আর মুক্তি বাহিনীর সদস্যদের সাহসিকতা আর আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ এ ছবিতে এসেছে। [..]

https://www.youtube.com/watch?v=SqtwzRU-NLU চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র কর্মী রফিকুল আনোয়ার রাসেল ২০১৪ সালে 'দ্য অ্যাডভেঞ্চারার' নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তখন থেকেই ছবিটি দেখার একটা আগ্রহ ছিল, সম্প্রতি তিনি এই ছবিটি ইউটিউবে অবমুক্ত করায় দেখার সুযোগ ঘটে। এই চলচ্চিত্রটির গল্প মোটামুটিভাবে এমন, চট্টগ্রামের কিছু তরুণ তরুণী বর্ষাকালে পাহাড়ে বেড়াতে যায়, এক পর্যায়ে এদের একজন পা হড়কে পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়। আহত সঙ্গীকে তারা একজন সিএনজি চালকের সহায়তায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে আসে এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। সঙ্গীর অপারেশনের খবরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তরুণ তরুণীরা হাসপাতালের বাইরের এক চায়ের দোকানে আসে এবং তাদের সিএনজি চালককে দেখতে পায়। তিনিও আহত তরুণের খবরের জন্য অপেক্ষা করছেন। কথা প্রসঙ্গে একসময়ে প্রৌঢ় সিএনজি চালক জানান যে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাক বাহিনীর আক্রমণে তাঁর বৃদ্ধা মা সহ গ্রামের অনেকেই নিহত হন। তিনি প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেসময়ে তিনি রোগা দুবলা এবং ভীরু এক কিশোর ছিলেন। তাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক অভিযানে অংশ নেওয়ার পথে তাঁর সহযোদ্ধারা পাকবাহিনীর গুলির মুখে পড়ে এবং সকলেই নিহত হন। এই চরম সঙ্কটের সময়ে তিনি সাহসী হয়ে উঠেন এবং মৃত সহযোদ্ধাদের অস্ত্র সংগ্রহ করে দুর্গম পাহাড়ি পথে ক্যাম্পে ফিরে আসেন। সিএনজি চালকের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শেষ হতে না হতেই হাসপাতাল থেকে খবর আসে যে আহত তরুণের জ্ঞান ফিরেছে এবং ফাঁড়া কেটে গেছে, এভাবেই ছবিটি শেষ হয়। চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি দলবদ্ধ প্রক্রিয়া হলেও শেষ বিচারে এটি একটি ব্যক্তিগত শিল্প মাধ্যমই। ছবি নির্মাণে অভিনেতা, কলা কুশলী অনেকের সংশ্লিষ্টতা থাকে, কিনতু তাদের কাজকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করে গল্পটা বলার দায়িত্ব পরিচালকের, সে হিসাবে পরিচালক রফিকুল আনোয়ার রাসেল বেশ চমৎকার একটি শিল্পকর্মই উপহার দিয়েছেন বলতে হবে। পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া এবং দুর্ঘটনার দৃশ্যায়ন নিঃসন্দেহে ব্যয়বহুল, পরিচালককে খুব সম্ভবত তাই সে পথে না গিয়ে সংলাপ, ক্লোজ এবং মিড শটের মাধ্যমে দর্শককে বোঝাতে হয়েছে কি ঘটেছে। তিনি এ কাজটি খুব ভালভাবে করেছেন। আহত তরুণের বন্ধুরা এবং পরিবারের সদস্যদের সবাই টেনশনে আছেন, মেয়ে দুটোকে নিজেদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতেও দেখা গেল, কিন্তু পুরো ব্যাপারটিতেই…

গত ২১শে ডিসেম্বর বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে ৭১ এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন ঠিক কত লাখ শহীদ হয়েছে সেই নিয়ে বিতর্ক আছে। [..]

গত ২১শে ডিসেম্বর বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন ঠিক কত লাখ শহীদ হয়েছে সেই নিয়ে বিতর্ক আছে। খালেদা জিয়া যে মতাদর্শের রাজনীতি করেন তাতে ৭১- এর শহীদের সংখ্যা তো বটেই, শহীদের 'সংজ্ঞা' নিয়েও তাঁর মনে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। যেমন আমাদের বড় ভাই শৈবাল চৌধূরী (চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের পরিচালক)। একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল সাত আট বছর। সে সময়ে শৈবালদার বাবা মা ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে ভারতে চলে যান। যুদ্ধ শেষে তাঁরা নিজেদের বসত বাটিতে ফেরত আসেন বটে, তবে আটজনের বদলে ফেরত আসেন তিনজন। শৈবালদার পাঁচ ভাই বোনই ভারতের শরণার্থী শিবিরে কলেরায় মারা যায়। এই ৫টি হিন্দু শিশুকে কি খালেদা জিয়া 'শহীদ' বলে স্বীকার করবেন? আমার তো মনে হয় না। বছর চারেক আগে এক ভারতীয় ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়েছিল (তিনি ৬৫ সালে ফরিদপুর থেকে ভারতে চলে যান)। ৭১ সালে ফরিদপুরে থেকে যাওয়া তাঁর বড় ভাই গ্রামের অন্যান্য লোকজনের সাথে পালাতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে মাটিতে পড়ে যান এবং পলায়নপর জনতার পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মারা যান। এই হিন্দু কৃষককে খালেদা জিয়া শহিদ বলে মানবেন? আমার তা মনে হয় না। আমার স্ত্রীর মেঝ মামা, ৭১-এ কিশোর বয়সী ছিলেন। এপ্রিলের শুরুতে হারিয়ে যান। সেই সাথে তাদের বাড়ির বিহারী দারোয়ানও লাপাত্তা হয়ে যায়। সেই কিশোর আর কখনোই ফিরে আসেনি। এই হারিয়ে যাওয়া কিশোরকে খালেদা জিয়া শহীদ বলে মানবেন? আমার সন্দেহ আছে। তবে শুধু খালেদা জিয়াও নন, ৭১ এর নিহতের সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের নানা সুধী জনও বেশ 'একাডেমিক' আগ্রহ দেখাচ্ছেন (যেমন আফসান চৌধুরী বা অধ্যাপক আমেনা মহসীন)। ডেভিড বার্গম্যানও তাঁর ব্লগে একাত্তরের নিহতের সংখ্যা নিয়ে নানা 'পণ্ডিতের' বিভিন্ন লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। কেউ বলছেন ৫৮ হাজার, কেউ বলছেন ২ লাখ ৫৮ হাজার, কেউ বলছেন ৫ লাখ। এইসব বিভিন্ন সংখ্যার সবই 'বৈজ্ঞানিক' সত্য, শুধু ৩০ লাখ সংখ্যাটিই 'বাড়িয়ে' বলা। তবে সবশেষে এও বলেছেন যে, ৭১ সালে 'বিপুল' সংখ্যায় মানুষের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। সন্দেহ যখন নেই, তবে নিহতের 'প্রকৃত' সংখ্যা নিয়ে এত বিতং করার কি মানে আছে? মানে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলা। বাংলাদেশে অনেক বিষয়েই…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.