চেনা মানুষ অচেনা হয়ে উঠলে যে দুঃসহ কষ্ট আমরা পাই, চেনা মানুষের মুখোশ চিরে আরেক মানুষ বেরিয়ে পড়লে আমরা যেমন যন্ত্রণায় ছটফট করি — সেইরকম একটা অনুভূতি নিয়ে আমি নিশ্চিত পৃথিবীর সকল প্রান্তের বাঙালীরা আজকে রাতে এবং এরপর আরো অনেক রাতে ঘুমোতে যাবে। [...]

হা হন্ত তথাপি জন্ম-বিটপী ক্রোড়ে মনো ধাবতি…

১.

চেনা মানুষ অচেনা হয়ে উঠলে যে দুঃসহ কষ্ট আমরা পাই, চেনা মানুষের মুখোশ চিরে আরেক মানুষ বেরিয়ে পড়লে আমরা যেমন যন্ত্রণায় ছটফট করি — সেইরকম একটা অনুভূতি নিয়ে আমি নিশ্চিত পৃথিবীর সকল প্রান্তের বাঙালীরা আজকে রাতে এবং এরপর আরো অনেক রাতে ঘুমোতে যাবে। আমরা বাংলাদেশকে আর চিনতে পারছি না। অথচ, এই মৃতমানুষের কনভয়, এই জীবিতমানুষের শোকমিছিল এই মৃ্ত্যু উপত্যকাই আমার দেশ। দীর্ঘদিন তাই ছিল — কেন ভুলে ছিলাম? কেন ভ্রমে ছিলাম?

আমাদের চোখের সামনেই কি আমাদের ভাগ্যান্বেষণরত পরিচিত মানুষরা পত্রিকায় মৃতমানুষের সংখ্যা বাড়ায়নি? লঞ্চডুবি হয়ে, গুলি খেয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মরে ফুলে পড়ে থেকেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসার অভাবে সাহায্যের অভাবে কাতরে কাতরে মরে গেছে। আর একদল বোকা মানুষ একদল পাগল তাদের খালিহাতে এই মানুষগুলিকে বাঁচাবার চেষ্টায় নিজেদের প্রাণ দিয়েছে। কখনো আমরা তাদের নাম ভুলে গেছি। কখনো তাদের বীরশ্রেষ্ঠ ডেকেছি। দেয়ালে টাঙানো বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি প্রণিধানযোগে দেখলেই আপনি বাংলাদেশের স্বরূপ দেখতে পাবেন — এই মানুষগুলির কারো চেহারা/প্রফাইল ‘সিগনিফিক্যান্ট’ না, ঝাপসা মুখ, ভিড়ের একজনের মতো অভিব্যক্তি — আমাদের ছোট্ট দেশটার ইনসিগনিফিক্যান্ট মানুষগুলিই আমাদের বীর। আমাদের নেতারা কোনোদিন বীর ছিল না, যোদ্ধা ছিল না, স্বার্থত্যাগী ছিল না। মানুষের মৃত্যু তাদের বিচলিত করেনি, মৃত্যু মানে হয় জয়ের তুরুপের তাস, অথবা পরাজয়ের ধ্বনি। আমাদের নেতারা কোনোদিন সামাজিক মানুষ যেমন করে কাছের মানুষের মৃত্যুকে গ্রহণ করে, যে বেদনায়, তা ধারণ করেনি। ফলে বাংলাদেশের শ্রমজীবি মানুষ অকাতরে মরবার খবরে কেবল সাধারণ মানুষই ছুটে যাবে — নেতারা নানাভাবে নিজের পাপক্ষালনের চেষ্টা করবে (আগের দল ক্ষমতায় থাকতেও এমন ঘটেছে, যারা করেছে তারা আমাদের কেউ না) এবং রাষ্ট্রনায়ক/নায়িকা ভান করবেন তাঁরা এখনো তাঁদের দলের নেতা, দেশের দায় তাঁদের নেই — এতে অবাক হবার কিছু নেই।

তাহলে এমন যাতনা কেন?

সাভারের গার্মেন্টসে যে মানুষগুলি এমন করে মরে গেল, তাদের নিরন্তর সংগ্রাম ছিল বেঁচে থাকার, জীবনের দিনগুলিকে অল্প দামে বেচে দিয়ে জীবনযাপনের জন্যে অসামান্য সেই সংগ্রাম।আমি জেনেছি, অনেক শ্রমিক উদ্ধার পেয়ে বিকলাঙ্গ-জীবন যাপনের চেয়ে সেই জগদ্দলের তলায় সমাধিস্থ হতে চেয়েছেন — যেন কোনোভাবে তাঁদের মৃত্যু অন্ততঃ একটা আর্থিক মূল্য পায়। এই তো বাংলাদেশ। নেতানেত্রীরা তখন দায় এড়াতে ব্যস্ত, প্রত্যেকে। প্রধানমন্ত্রীও একই ‘বালিশচোর’ খেলা খেলছেন তখন- মালিক আওয়ামীলীগার কি না, এর আগে এমন হয়েছে কি না। আর আছে ভাবমূর্তির দোহাই, আমরা মানুষ মরতে দিতে প্রস্তুত, তাকে উদ্ধার করবার সাহায্য চাইতে আমাদের লজ্জা লাগে। অন্য দেশকে নিজের আসল চেহারা দেখতে দিতে লজ্জা লাগে, যেন আমি না দেখতে দিলে অন্য দেশ আমার স্বরূপ দেখতে পাবে না। পশ্চিমা সাংবাদিকের হাতে হেনস্থা হবার সময়েও আমি ছিন্নবস্ত্রে (পশ্চাদ্দেশ অনাবৃত করে) মাথা ঢাকতে ব্যস্ত, আমার মনে হয়না একবার পালটা জিজ্ঞেস করি- তোমাদের দায় নাই? সবচেয়ে সস্তায় খাটাতে পারো দেখেই তো আমাদের দিবারাত্রির শ্রম কেনো, নাকি ভুল বললাম? তোমরা এতকিছুতে জোর খাটাতে পারো, জিব্রাইলের ডানায় করে গণতন্ত্র নিয়ে আসতে পারো দেশে দেশে, তোমাদের দায়িত্ব ছিল না মানুষগুলি কত পায় তা দেখা, কোথায়গিয়ে তোমাদের বলি হয় তা দেখা — প্রয়োজনে সে পরিস্থিতিগুলি শোধন করা?

২.

শ্রমিকের ঘাম শুকাবার আগে শ্রমের মূল্য চুকিয়ে দেবার কথা আমরা ইসলামিয়াত বইয়ে আকছার পড়েছি। শ্রম দূরে থাক, তার এমন মৃত্যুতেও বিচলিত নয় আমাদের হেফাজতে ইসলাম। (ইসলাম এদের হেফাজত ছাড়াই বাংলাদেশে এতদিন বেঁচে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে- এটা তারা জানে বলে মনে হয় না।) তাদের জ্বালাও-পোড়াও এর দৃশ্য দেখলে মনে হয়– এ যেন অন্য কোনো দেশের ছবি দেখছি আমরা, মধ্যপ্রাচ্যের চিরবিরোধরত দেশগুলির দৃশ্য, আফ্রিকার কোনো দেশের রাস্তার আগুনঝরা দৃশ্য — এ আমার বাংলাদেশ হতেই পারে না। দুঃখ এই, যে, এটা বাংলাদেশ, এটা আমার আদরের শহর ঢাকা। আমার স্কুল থেকে ফিরে ভাত খাওয়ার শহর। আমার সহিষ্ণু ইসলামিয়াত স্যারের সাথে সনাতন-ধর্মশিক্ষকের এক বাটি থেকে তেল-মুড়ি খাওয়ার শহর। এই শহরের মেয়েরা সাহসে-সক্ষমতায়-মেধায় নিজেদেরকে ছেলেদের চেয়ে কোনো অংশে কম জেনে বোর্ডের পরীক্ষায় বসতো না। এই দেশের নারীরা পুরুষের সাথে এক কাতারে থেকে যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধাহতর পরিচর্যা করেছে, যুদ্ধফেরতকে খেতে-পরতে দিয়েছে-তার পরিচয় গোপন করেছে। শান্তির সময় গান গেয়েছে, বীরগাঁথায় অভিনয় করেছে, নেচেছে আর রঙ মেখেছে প্রাণের স্ফূর্তিতে। মোবাইলফোন হাতে নিয়ে বিলবোর্ডে দাঁড়িয়ে থেকেছে মডেল নারীর পাশে দেহাতি নারী। অকর্মণ্য পুরুষের সাথে সংসার করবার সংগ্রাম এর মতো করে কেউ জানে না — কি গ্রামে, কি শহরে। প্রাকৃতিক দূর্যোগের পর সহায়হীন নারী সংসারের বাকি সদস্যদের তালগাছতলায় রেখে এসে শহরের বাসাবাড়িতে কাজ নিয়েছে আবার ঘর-গেরস্তি-কুমড়ামাচা-হাঁসের খোঁয়ার গড়বে এই স্বপ্ন থেকে।

এইটুকু পর্যন্ত আসতে তাকে কম সইতে হয়নি —

মার্গারিট মিচেল লিখেছিলেন — পুরুষের আঙুলে পেরেক ফুটলে বাড়ি মাথায় করা চলে, মেয়েদের বাচ্চা বিয়োবার বেলায়ও শব্দ করা চলবে না…দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ এ যেমন ছিল- “রমণীর মন কাতর হইলে বিনোদনের কিছুমাত্র উপায় নাই”। তার জন্যে একসময় স্কুল-কলেজ ছিল না, কোর্টকাছারি ছিল না, সভাসমিতি ছিল না, বাগানবাড়ির বা থিয়েটারের আমোদ ছিল না — ‘রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা’র চাকায়ই বাঁধা ছিল তার জীবন।

নারীশিক্ষা-নারীর স্বাস্থ্য-নারীর গর্ভধারণের অধিকার-নারীর বিবাহের অধিকার ইত্যাদি মিলিয়ে যতটুকু আমরা এসেছি (খুব যে এগিয়েছি, তা বলবো না), তা অনেকদিনের কষ্টের উপার্জন, অনেকগুলি অশেষ জীবনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফল। সভ্য দেশকে চেনা যায় তার নারীর প্রতি ব্যবহার দেখে — আমরা এখনও সভ্য হতে পারিনি, কিন্তু নিরন্তর আমাদের একক ও সম্মিলিত প্রয়াস সেদিকে ধাবমান। এই যাত্রা আমরা বদলাব কেন? কিছু পরান্নপুষ্ট-পরভৃত-পরদারলোলুপ-অশিক্ষিত বর্বর মানুষের দাবিতে? সংখ্যায়ই যারা গরু-ছাগলের মতন বাড়িয়া চলেছে?

আমি হেফাজতের ১৩ দফা পড়েছি, অন্যসময় হলে আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম, এই দাবি এমনি হাস্যকর — অকিঞ্চিৎকর।

১. আল্লাহর উপর পুর্ণ আস্থার মানদণ্ড কী? কোন বাটখারায় সেটা মাপা হবে এবং কে মাপবেন? যিনি মাপবেন, তিনি যদি মুসলমান হন, তিনি কি জানেন যে — এই অধিকার কোনো নশ্বর মানুষকে সমর্পিত হয়নি কখনো? যে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে এঁদের এমন আপত্তি, এমন শয্যাকন্টকী, সেটির বদলে তাঁরা কি চান যে ধর্ম অনুযায়ী মানুষকে বিচার করা হোক? মুসলমানের অপরাধ হবে না, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টানের হবে — সেইরকম? মুসলমান চাকরি পাবে, অন্য ধর্মাবলম্বীরা পাবে না, মুসলমানের রাষ্ট্রে থাকতে পারার সুবাদে তারা জিজিয়া কর দেবে? একবার ভেবে দেখেছেন কি, আল্লাহর চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ কেউ কি আছেন? তিনি কি কোনো কারণে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান-জৈনকে এক তোলা অক্সিজেন কম দেন? পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেন? চাকুরিতে বৈষম্য করেন? সংসার-সন্তান-সম্পদের অধিকার দেন না?

২. আল্লাহ-রাসুল-ইসলাম ধর্ম বিষয়ে কুৎসা গাইবার শাস্তি মৃত্যুদন্ড হতে হবে কেন? মুসলমান হিসেবে আপনার আর কোনো সক্ষমতা নাই তরবারী ধরা ছাড়া? আপনি যু্ক্তি দিতে জানেন না? যুক্তিখন্ডন করতে জানেন না? আপনার লিখবার হাত নাই? বলবার মুখ নাই? যে যূগে যেমনটি চাই- আল্লাহ তেমন পয়গম্বর পাঠিয়েছিলেন মু’জিজা দিয়ে, যাদুমন্ত্রের যূগে শ্রেষ্ঠ যাদুবিদ্যা দিয়ে (হযরত মুসা আঃ), কাব্যের যূগে অনবদ্য কাব্যগুণের ধর্মগ্রন্থ দিয়ে (হযরত মুহাম্মদ সাঃ), আর আপনি ব্লগের সাথে লড়াই করবেন মান্ধাতা আমলের দা-বটি আর রক্তপিপাসা দিয়ে? কেন আপনার মনে হয় অপরাপর মানুষ এমনই অজ্ঞ আর অনভিজ্ঞ যে, যেকোনো সম্প্রচারেই সে নীতিভ্রষ্ট হয়ে যাবে? সমাজপিঞ্জরের এই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বলাভের জন্যে আপনার যোগ্যতা কি (শিক্ষাগত লিখলাম না।)?

৩. শাহবাগের ব্লগাররা নাস্তিক, মুরতাদ, কুৎসারটনাকারী, ইসলামবিদ্বেষী শুনতে পাই। ধর্মবিশ্বাস-ধর্মচর্চা শেষ অব্দি ব্যক্তিগত অভিপ্রায, ব্যক্তিগত চর্চাকে টেনে এনে সমষ্টির গুরুতর অভিযোগকে ঢাকবার এই প্রয়াস কেন? জামা’তে ইসলামীর শীর্ষনেতাদের রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং যুদ্ধাপরাধ উলঙ্গভাবে প্রকাশ হয়ে যাবার পরেই আপনার কেন খুঁজে বের করতে হচ্ছে- এই ছেলেমেয়েগুলি নাস্তিক না আস্তিক? বিশ্বাস করুন, আল্লাহকে এই ছেলেমেয়েরা-আপনি-আমি বিশ্বাস করি আর নাই করি, আদর করে আসমাউল হুসনা দিয়ে ডাকি আর গঞ্জনা দিয়ে ডাকি, আল্লাহর তাতে কিছুই যায় আসে না। তাঁর আপনাকে প্রয়োজন নেই, আপনার-আমার তাঁকে প্রয়োজন। আর ইসলামবিরোধী অপপ্রচারের কথা যদি বলেন- তাহলে চোখ মেলুন, চোখ খুলুন। তাকিয়ে দেখুন ইসলামের নামে মুসলমানরা কি করছে। আপনি জেলখানায় যান, সেখানে বছরের যেকোনো সময়ে সবচেয়ে বেশি কয়েদী মুসলমান, না ধর্মবিশ্বাসের কারণে তারা কারাবাস করছে না, অপরাধ করেছে তারা — সেই অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। আপনি কোনো সৌধে যান — কোনো স্মৃতির মিনারে যান — কোনো কীর্তি দেখতে যান, আপনি দেখবেন আপনার মুসলমান ভাইবোনেরা খোদাই করে সবচেয়ে বেশি তাদের নাম লিখে গেছে। আপনি-আমি ভাবতে ভালবাসি যে, মুসলমানদের নামে বেনামীতে এইসব নাসারাদের কারবার। কিন্তু এমন দিন দূরে নয়, যেদিন কেবল মুসলমান পরিচয় দেখলেই মানুষকে মেরে ফেলা হবে, নিজের আনন্দ-পরের স্বস্তি-নিজের অনধিকার-পরের মানবিক অধিকার-নিজের ও অপরাপরের সৌন্দর্যবোধ সবকিছুর প্রতি মুসলিমরা যে অন্যায় করে আসছে জ্ঞানতঃ এবং অজান্তে — তার প্রত্যেকটির মাশুল দিতে হবে।

৪. “ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে বেহায়াপনা-অনাচার-ব্যভিচার-প্রকাশ্যে নারীপুরুষের অবাধ বিচরণ”, এইবার আমি আর হাসতে পারছি না। আজকের বাংলাদেশের মেয়েরা যেখানে দাঁড়িয়ে তা বহু সাধনার- বহু ত্যাগের ফসল। বাল্যবিবাহ-বহুবিবাহ-সহমরণ-অনুমরণ-অসমবিবাহ-সতীদাহ পাড়ি দিতে হয়েছে, ‘মনুর বিধান আর মুসলমানি আব্রু রক্ষার তাগিদ’ এর সাথে তাকে যুঝতে হয়েছে, একদা তাকে গঙ্গাস্নানের জন্যে পালকিশুদ্ধু চুবিয়ে আনা হতো, বছরে একদিন তেতলার ছাদে দাঁড়িয়ে দশমীর বিসর্জন দেখতে দেয়া হতো- সেই দস্তুর মেনে নিয়ে, বাধাবিপত্তি পাড়ি দিয়ে লেখাপড়া শেখা-জামাজুতো পরা- অন্তঃপুরের বাইরে বের হওয়া-মোটরগাড়ি চড়া-অনাত্মীয় পুরুষের সামনে আসা পর্যন্ত একটি দীর্ঘ বিপদসংকুল পথ তাকে হেঁটে পার হতে হয়েছে। আজকে সে পরীক্ষায় বসে, পুরুষকে টেক্কা দিয়ে ফল লাভ করে, চাকরি করে বাড়ির আর পাঁচটা মানুষের অন্নসংস্থান করে। পুরুষ কেবল ধর্ষকামী প্রেত নয় তার জন্যে- পুরুষ বন্ধু-মিত্র-স্বজন-প্রেম। ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা বলতে যা বোঝায় তা চিরকালই হেফাজতের চোখে ‘বেহায়াপনা-অনাচার-ব্যভিচার’ মনে হবে- কখনোই সেটা চিন্তার এবং ভাবপ্রকাশের সুস্থ অধিকার মনে হবে না। গোপনে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ চান আপনারা? নাকি গোপন বিচরণেও বাধ-নির্মান খাতে আপনাদের শ্রম-প্রয়াস-সময় প্রবাহিত হবে? মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের মতন আমাদের নারীরাও একদিকে শিশুকাল থেকে আত্মীয়পুরুষের লালসার শিকার হবে আরেকদিকে তাদের স্বামীরা আশা করবে পুষ্পদলনের প্রথম অধিকার- সেটার অশ্লীল ঝান্ডা ওড়াবে তারা- এই তো আপনাদের গন্তব্য? নারীপুরুষের অবাধ বিচরণের দোহাই দিয়ে একদা আপনারা গ্রামাঞ্চলে নারী উন্নয়নকর্মীদের বাইসাইকেলে চড়া বন্ধ করেছেন (পায়ের পেশীর আন্দোলনেও আপনাদের কি হয়?), একদিন গার্মেন্টস শ্রমিক মেয়েদের মিছিল বন্ধ করবেন। অর্থ উপার্জনের সততা-স্বনির্ভরতা কেড়ে নিয়ে তাকে আসবাব বা তৈজসে পরিণত করবেন এই তো?

৫. ‘ইসলামবিরোধী নারীনীতি’ মানে কি? আমাদের উচ্চশিক্ষা এমনিতেই নানান ভারে ক্লিষ্ট, চলিত নিয়ম থেকে শুরু করে বেসিমার পদ্ধতি ইত্যাদি এখনও আমরা ফেলে দিতে পারিনি। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করে আপনি কি প্রতিষ্ঠা করতে চান? নিজেদের দিকে কি আপনারা তাকিয়ে দেখতে পান, আজন্ম ধর্মশিক্ষা পাওয়ার পরেও আপনারা কতটা মানুষ হতে পেরেছেন? উচ্চশিক্ষার গন্তব্য মানুষকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে সে সকল ঔচিত্যকে প্রশ্ন করতে সক্ষম হবে, আপনারা কি তা চান? যদি তা নাই চান, তাহলে উচ্চশিক্ষার সিলেবাস নিয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করুন। সম্ভবতঃ হযরত আলী রাঃ বলে গেছেন — যাহা বুদ্ধির বাহিরে, তাহা ছাড়িয়া দাও।

৬. কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে এই দাবীর সাথে আমি পুর্বপরিচিত। আমি আবারও জিজ্ঞেস করতে চাই, যিনি ঘোষণা দেবেন, তিনি যদি মুসলমান হন, তিনি কি জানেন যে- এই অধিকার কোনো নশ্বর মানুষকে সমর্পিত হয়নি কখনো? কে মুসলিম, কে মুসলিম নয়, কে কতটা মুসলিম এই বিচারভার কোনোভাবেই আপনাকে দেয়া হয়নি, আপনারা নিজেরাই ব্লাসফেমি করবেন যদি এ ভার তুলে নেন।

৭. মসজিদের শহর ঢাকাকে মূর্তির শহরে পরিণত করা যাবে না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করা যাবে না। মূর্তিস্থাপন মানেই মূর্তিপূজা আর প্রণতি? এমনই টলায়মান আপনাদের ঈমান? সাধারণ মানুষকে সহজে বোঝাবার এবং গল্প শোনাবার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে- ছবি আঁকা আর মূর্তি(!) গড়া। আদি ক্রিশ্চিয়ানরা প্রথমে এর বিরোধী ছিল কারণ খ্রীস্টধর্মের আগের পেগান-ধর্ম থেকে যে ক্রিশ্চিয়ানরা আলাদা, তাদের ঈশ্বর যে নিরাকার তা তাদের চর্চা দিয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছিল। কিন্তু চার্চ একসময় টের পেল, বাইবেলের গল্পগুলি সাধারণ মানুষের অন্তরের সবচেয়ে কাছে পৌঁছে দেবার মাধ্যম হতে পারে ছবি আর ভাস্কর্য। মানুষ গুহায় থাকার সময় থেকে ছবি আঁকে আর মূর্তি গড়ে, এটা তার ভাবপ্রকাশের সবচেয়ে সরাসরি উপায়গুলির একটি। কিন্তু এইসব আপনাদের বুঝিয়ে লাভ কি। আপনারা জানেন, আল্লাহ কেয়ামতের দিন এইসব মূর্তি আর ছবিকে জীবন দান করতে বলবেন, আপনাদের শেখানো হয়েছে আল্লাহ সৌন্দর্যপিপাসা বোঝেন না, শিল্প বোঝেন না এমনকি ভাষার বিষয়েও নাকি তাঁর পক্ষপাত রয়েছে।

৮. জাতীয় মসজিদসহ দেশের সকল মসজিদে নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়-ওয়াজ নসিহত এবং ধর্মীয় কার্যকলাপ অবাধ হোক চেয়েছেন আপনারা। নামাজশেষে জায়নামাজে আগুন দেয়ার অধিকারের কথা ভুলে গেলেন কেন? ওয়াজ-নসিহতের নামে প্রতি শুক্রবার খুতবায় অশ্লীল-অশ্রাব্য কথা মাইকে বলার অধিকারের কথা, মসজিদ বানিয়ে অন্যের জমি জবরদখলের অধিকারের কথা বলতে ভুলে গেলেন? আপনাদের এই দাবী আমাকে আমার শৈশবে নিয়ে গেল হঠাৎ, আমার অসম্ভব নামাজী বাপ বেজার মুখে সেহরীর সময় বসে আছেন, এক তালেবে-এলেম ফ্রি মাইক পেয়ে বেসুরো গলায় এবং ভুল উচ্চারণে প্রতিদিন হামদ ও নাত গায়, রাত্রির ঐ প্রহরে সেটা সহ্য করা তাঁর পক্ষেও অসহনীয় ছিল। মাইক আপনারা যত ভালবাসেন, হযরত ইস্রাফীল আঃও বোধ করি তাঁর শিঙ্গাকে তত ভালবাসেন না। আপনারা ভুলে যান, সম্ভবতঃ কাফেলা একটি মোকামে পৌঁছবার পর যখন সাহাবারা সজোরে ঘোষণা দিচ্ছিলেন আল্লাহ ও নবীজির নামে, হযরত মুহম্মদ সাঃ মানা করেছিলেন, বলেছিলেন — যাকে ডাকছ, তিনি দূরেও নন, বধিরও নন।

৯. রেডিও টেলিভিশনে টুপি-দাড়ি সম্বলিত লোককে নিয়ে হাসিঠাট্টা করা যাবে না, নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস পরিয়ে তরুন প্রজন্মের মনে বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না- এই দাবী করবার আগে আপনাদের নেতিকে ইতিতে আনতে হবে। আপনাদের চর্চা-কথা-কাজ-আচরণ-চিন্তার অনুদার-অশোভন-অসুন্দর অভিব্যক্তি বদলাতে হবে। যা দেখানো হয়, তা তো সত্যের অপলাপ নয়, আপনারা সেরকমই, বরং ভয়ে ভয়ে কম দেখানো হয় বলেই জানি।

১০. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য সকল স্থানে মিশনারীদের অপতৎপরতা ও ধর্মান্তর করা নিয়ে আপনাদের আপত্তি, আপনারা সেখানে থাকলে কি করতেন? একই কাজই আরো বাজেভাবে করতেন। শিক্ষা-স্বাস্থ্যের কোনো ব্যবস্থা না করে, তাদের কৃষ্টি-তাদের ভাষা-তাদের উৎসব-তাদের নাচগান-তাদের ধর্মের বারোটা বাজাতেন, তাদের শিখাতেন ঘৃণা, আরো ঘৃণা করবার পন্থা।

১১. রাসুলপ্রেমিক আলেম-ওলামাদের নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করা বিষয়ে গত কয়েকদিন ইলেক্র্সনিক মাধ্যমগুলি সোচ্চার রয়েছে — কতজন মারা গেছেন, কতজন ফটোশপে মারা গেছেন, কতজন মরার ভান করে পড়ে ছিলেন পরে পানির ছিটা খেয়ে উঠে বসেছেন। আপনাদের সাথে আমিও একমত, অন্ততঃ একটি বিষয়ে, তবে আমি একটু সম্প্রসারণ করতে চাই — রাসুলপ্রেমিক এবং রাসুলবিদ্বেষী কাউকেই নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন-গলা কাটা-রগ কাটা-চোখ তোলা যাবে না। কেমন? আপনি ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলে আপনার মায়ের যেমন লাগে, লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলে আপনার বাবার যেমন লাগে, রাসুলবিদ্বেষী মানুষটির বাপমায়ের হুবহু সেইরকমই লাগে।

১২. কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-হুমকি-ধমকি চলবে না — বরং তা একবারে তুলে দেয়া হোক। যতদূর জানি ধর্মশিক্ষা রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতিতে এমনিতেই অন্তর্গত, তার বাইরে গিয়ে আপনাদের মতো কিছু পরান্নভোজী-রাষ্ট্রবিরোধী-জন্মান্ধ-নীতিহীন অশিক্ষিত সমাজ তৈরি করার কোনো অর্থ নেই। কওমী মাদ্রাসাখাতে যে ব্যয় হতো তা কারীগরী শিক্ষায় উপযুক্তভাবে ব্যয় হোক। এতদিন যারা মাদ্রাসায় পড়ে আসছে এবং এখনও পড়ছে তাদের যথোপযুক্ত জীবনমুখী শিক্ষা দেয়া হোক, তাদের দেশবিদেশের ছবি ও মূর্তি দেখানো হোক, অন্য ধর্মের পুস্তক পড়তে দেয়া হোক যাতে তারা নিজের ধর্মকে প্রকৃত আলোকে উপলব্ধি করতে শেখে, তাদের অবাধ বিচরণের সুযোগ দেয়া হোক যেন নারীকে তারা মা-মাতৃভূমি-বন্ধু-প্রেমিকা-চিরসঙ্গী-সহায়ক শক্তি হিসেবে আবিষ্কার করতে পারে।

১৩. ক্ষতিপূরণের দাবী কি আপনাদের মুখে শোভা পায়? আমার ধর্মকে কলুষিত করা মানে আমার শৈশব-কৈশোর থেকে অমূল্য কিছু জিনিস কেড়ে নিয়ে তাতে বিষ্ঠাত্যাগ করা। আমি এবং আমরা তার ক্ষতিপূরণ চাই। দিতে পারবেন? নাকি এই প্রশ্ন বোঝেন নাই বা সিলেবাসে ছিল না বলে পরের প্রশ্নের উত্তর দেবেন?

৮ মে ২০১৩

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

বিপন্ন বিস্ময়ের অন্তর্গত খেলায় ক্লান্ত।

5
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
onupom deb
অতিথি
onupom deb

লেখাটি চমতকার হয়েছে!

মোহাম্মদ মুনিম
সদস্য

রেফারেন্স হিসাবে হেফাজতের ১৩ দফা দাবী এখানে দেওয়া হলোঃ ১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা। ২. আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুত্সা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস। ৩. কথিত শাহবাগি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয়নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুত্সা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা। ৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। ৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক… বাকিটুকু পড়ুন »

মাসুদ করিম
সদস্য

বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে নামাজ পড়তে ‘বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা’ কখনো হয়েছে? তার চেয়ে বরং তরিকায় সমস্যা নিয়ে হুজুরেরা মসজিদে মসজিদে অনেক চুলোচুলি, গালাগালি, লাঠালাঠি, মসজিদ দখল এবং কার্পেট পোড়ানোয় অনেক সিদ্ধহস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। আর লেখক অশ্রাব্যভাবে মাইক ব্যবহারের কথা যা বললেন, এই মূর্তিমান অত্যাচার থেকে মসজিদসংলগ্ন মানুষকে বাঁচানোর কোনো সাহস বাংলাদেশের কোনো সরকার কোনোদিন দেখায়নি, অথচ এই কাজটা করা খুবই জরুরি ছিল — ছাড় দিতে দিতে হুজুরদের আস্ফালন সাধারণত এমন পর্যায়ে যায়, গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে, আস্ফালনকারীর নাকি খেয়ালই থাকে না তার পরনের লুঙ্গিটি অনেক আগেই খসে গেছে — আমার তো মনে হয় হেফাজতের ১৩ দফায় তাই হয়েছে।

সুমিমা ইয়াসমিন
সদস্য

ধর্মচর্চার নামে সহিংসতা করলে ধর্মের কোনো উপকার হয়না। ইসলাম ধর্মের কোথাও বলা হয়নি, কাউকে আঘাত করে ধর্মের প্রচার করতে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা হঠাৎ উদ্ভুত উদ্দেশ্য প্রণোদিত একটা বিষয়। এর পেছনে ধর্ম নয়, অন্য উদ্দেশ্য, এটা তো তাদের কর্মকাণ্ডেই প্রমাণিত।

অদিতি কবির
সদস্য

হায়রে ভজনালয় তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড স্বার্থের জয় গায়।

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.