'দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে'

'অনন্যা' থেকে এ বছরের [২০০৮] ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত শিল্পের নন্দনতত্ত্ব নানা কারণেই একটি উল্লেখযোগ্য বই। নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে বাংলা ভাষায় খুব বেশি বই নেই; আর বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত এ-বিষয়ক বইয়ের সংখ্যা তো অঙ্গুলিমেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, শিল্পের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কোনো লিখিত আলোচনা এখনো পর্যন্ত বেরোয়নি, কিংবা বেরিয়ে থাকলেও আমাদের চোখে পড়েনি। এই বইয়ের লেখক জুলফিকার নিউটনের অন্য কোনো বই আমি আগে পড়িনি। [...]

‘অনন্যা’ থেকে এ বছরের [২০০৮] ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত শিল্পের নন্দনতত্ত্ব নানা কারণেই একটি উল্লেখযোগ্য বই। নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে বাংলা ভাষায় খুব বেশি বই নেই; আর বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত এ-বিষয়ক বইয়ের সংখ্যা তো অঙ্গুলিমেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, শিল্পের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কোনো লিখিত আলোচনা এখনো পর্যন্ত বেরোয়নি, কিংবা বেরিয়ে থাকলেও আমাদের চোখে পড়েনি।

এই বইয়ের লেখক জুলফিকার নিউটনের অন্য কোনো বই আমি আগে পড়িনি। যদিও তাঁর নামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই আমরা পরিচিত। ঢাকা ও চট্টগ্রামের দু-একটি দৈনিকের সাময়িকীতে তাঁর লেখা গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হতে দেখা যায়।

শিল্পের নন্দনতত্ত্ব বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে জানা গেল:

বাংলা ভাষায় মুষ্টিমেয় যে কজন প্রত্যয়ী লেখক ও গবেষক আছেন, তাদের মধ্যে জুলফিকার নিউটন অন্যতম। তাঁর লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা জানেন আমাদের জীবনযাত্রার, সমাজ ব্যবস্থার, ধ্যান ধারণার, ভাষা এবং সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন জুলফিকার নিউটনের সাহিত্য চর্চার মূল উদ্দেশ্য।

এই বইয়ে সংকলিত ‘লেখকের শিল্প সম্পর্কিত এক ডজন প্রবন্ধ’ প্রসঙ্গে ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে :

তাঁর নিজস্ব চিন্তা, যুক্তি ও সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা, রুচি, বিবেক ও বুদ্ধি নির্ভর এই রচনাগুলির অন্তর্লীন গভীরতা যেমন পাঠককে নিয়ত প্রাণিত করে, তেমনই বিস্ময়ের উদ্রেক করে এই বিষয় বৈচিত্র্য। ‘শিল্পের নন্দনতত্ত্ব’ গ্রন্থে নিজস্ব চিন্তা ও মত প্রকাশে জুলফিকার নিউটন কোথাও আপস করেননি।

কিন্তু শিল্পের নন্দনতত্ত্ব পড়তে গিয়ে প্রবন্ধগুলোর অন্তর্লীন গভীরতা, বিষয়বৈচিত্র্য কিংবা এসব লেখায় লেখকের নিজস্ব চিন্তা ও মতের দ্বিধাহীন প্রকাশের কারণে নয়, আমার বিস্ময় উদ্রিক্ত হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে। জুলফিকার নিউটনের এই প্রবন্ধগুলো কি ইতিপূর্বে কোনো পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল? অন্তত আমি তো এর আগে সেগুলো পড়িনি। তাহলে কেনই-বা বইয়ের পাতা ওলটাতে গিয়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে আমার পূর্বপাঠের স্মৃতি?

নিউটনের বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় শ-তিনেক। ৫৫ থেকে ২৭১ পৃষ্ঠা জুড়ে যে-আটটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে সেগুলি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের রূপ, রস ও সুন্দর : নন্দনতত্ত্বের ভূমিকা বইটির আটটি অধ্যায়ের অনুক্রমে বিন্যস্ত। প্রথমে নিউটনের বই ও বন্ধনীতে দেবীপ্রসাদের বইয়ের প্রবন্ধ/অধ্যায়গুলির শিরোনামের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। শিল্পীসত্তা ও শিল্পবস্তু (শিল্পীসত্তা, শিল্পবস্তু ও সমাজ), শিল্পের স্বাতন্ত্র্য (শিল্প কি অনুকৃতি, না কি বিকৃতি?), শিল্পের রসবিচার (রস), শিল্পের রূপজিজ্ঞাসা (রূপ), শিল্প প্রকাশ ও শিল্পকর্ম (প্রকাশ অপ্রকাশ ও শিল্পকর্ম), সুন্দর ও অসুন্দর (সুন্দর ও অসুন্দর), শিল্পচৈতন্য নগ্ন ও উলঙ্গ (নগ্ন ও উলঙ্গ), শিল্পচিন্তা ও শিল্পবিচার (শিল্প ও শিল্প-বিচার)। নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেবীপ্রসাদের বইটিকে পরবর্তী কোনো লেখক ‘মডেল’ হিসেবে গ্রহণ করতেই পারেন। তবে সেই ঋণটুকুর স্বীকৃতি থাকলে ভালো হতো নিশ্চয়। কিন্তু বই দুটোকে পাশাপাশি রাখলেই আমরা বুঝতে পারব, কেন নিউটন ঋণ স্বীকারের সৌজন্যসম্মত পথে পা বাড়াননি। কারো সর্বস্ব অপহরণের পর ঠগি নিশ্চয় তাকে বলবে না যে, ‘মশাই, আপনার কাছে আমি চিরঋণী রইলুম!’

শিরোনাম সামান্য নেড়েচেড়ে দিয়ে পাঠকের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করলেও মূল লেখা নিউটন বড়ো একটা পালটাননি। তবে দেবীপ্রসাদের লেখার উপশিরোনামগুলি তিনি বর্জন করেছেন, নিজের খেয়াল-খুশিমতো বাদ দিয়েছেন কোনো কোনো অংশ, কখনো অনুচ্ছেদ ভেঙেছেন, কোথাও-বা বাক্যকে খণ্ডিত করে অর্থের বিপর্যয় ঘটিয়েছেন। ‘শিল্পের স্বাতন্ত্র্য’ রচনায় মূল লেখার কয়েকটি অংশের স্থানান্তর ঘটানোয় সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ-কৃত কোনো কোনো লেখকের নাম এদেশীয় পাঠকের কথা মনে রেখে পালটে দিয়ে বিচক্ষণতারও পরিচয় দিয়েছেন নিউটন! যেমন, দেবীপ্রসাদের ‘…তারাশঙ্করের লেখায় বীরভূমের ভূগোল এবং বিভূতিভূষণের লেখায় গ্রাম-বাংলার উদ্ভিদের নির্ভুল পরিচয় পাই’ (২১-২২) পালটে দিয়ে তিনি লিখেছেন : ‘… সৈয়দ শামসুল হকের লেখায় রংপুরের ভূগোল এবং কবি জসিমউদ্দিনের লেখায় গ্রাম-বাঙলার নির্ভুল পরিচয় পাই’ (৭৪)। উপরন্তু দেবীপ্রসাদের বইয়ের তথ্যসূত্র, টীকা ও প্রাসঙ্গিক শিল্পকৃতির ছবি পরিহার করে তিনি নিজের ও প্রকাশকের ভার লাঘব করে নিয়েছেন!

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, রূপ, রস ও সুন্দর : নন্দনতত্ত্বের ভূমিকা এবং লোকায়ত দর্শন-এর লেখক একই ব্যক্তি নন। যদিও তাঁদের নাম ও পদবী হুবহু এক। রূপ, রস ও সুন্দর-এর লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর এই অসামান্য বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে। ১৯৮৯ ও ২০০৭ সালে বইটি পুনর্মুদ্রিত হয় যথাক্রমে ‘ঋদ্ধি-ইন্ডিয়া’ ও ‘নয়া উদ্যোগ’ থেকে। এর ‘কৃতজ্ঞতা স্বীকার’ অংশে লেখক জানিয়েছেন : ‘এই রচনার মানসিক সূত্রপাত ১৯৬২-৬৩ সালে লন্ডনের ওয়ারবুর্গ ইনস্টিটিউটে গম্ব্রিখের বিশ্লেষণদীপ্ত ও অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতাশ্রবণে।’ জুলফিকার নিউটনের তখনো জন্মই হয়নি।

নিউটনের শিল্পের নন্দনতত্ত্ব বইয়ে ‘শিল্পের রেনেসাঁস’ নামে একটি প্রবন্ধ আছে। এর সূচনা-বাক্যটি এরকম : ‘অনেকেই হয়তো জানেন না ফরাসি ঐতিহাসিক মিশেলে রেনেসাঁস শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেন তাঁর ‘ফ্রান্সের ইতিহাস’ গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডে (১৮৫৫)।’ এই তথ্যটা কি স্বয়ং প্রাবন্ধিকও জানতে পারতেন অমলেশ ত্রিপাঠীর ইতালীর র‌্যনেশাঁস ও বাঙালীর সংস্কৃতি (আনন্দ, ১৯৯৪) গ্রন্থটি তাঁর হস্তগত না হলে? ওই গ্রন্থভুক্ত ‘ইতালীর র‌্যনেশাঁস’ (১১-৩১) প্রবন্ধটিই নিউটনের বইয়ে ‘শিল্পের রেনেসাঁস’ নাম ধারণ করেছে। কেবল ত্রিপাঠীর ‘র‌্যনেশাঁস’কে নিউটন ‘রেনেসাঁস’ করে নিয়েছেন, যেরকম দেবীপ্রসাদের ‘প্লাতো’কে করে নিয়েছেন ‘প্লেটো’। সেই সঙ্গে প্রবন্ধের প্রথম অনুচ্ছেদ থেকেই যুক্ত হয়েছে মুদ্রাকর প্রমাদ।

‘শিল্পের নন্দনতত্ত্ব’, ‘আর্টের জন্য আর্ট’ ও ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা’ নামে নিউটনের আরো তিনটি প্রবন্ধ রয়েছে বইটিতে। তাদের সুনির্দিষ্ট উৎসের সন্ধান আমার জানা নেই, যদিও ওই লেখাগুলোর গদ্যশৈলী বেশ পরিচিত।

শিল্পের নন্দনতত্ত্ব বইয়ের উৎসর্গপত্রটিও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য :

উৎসর্গ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শ্রদ্ধাস্পদেষু

সময়টা সুবিধের নয়
কিছু না করে
যে পারে সেই হাতিয়ে নিচ্ছে
যারা কথা বলতে জানে না
তারা ভাষণ দেয়
যারা কোন কথা কানে তোলে না
তারা শোনে
যারা দেখতেই পায় না
তারা দেয়াল লেখে।

এ বছরই প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের জুলফিকার নিউটন-কৃত বঙ্গানুবাদ। এসব বইয়ের কোনো কোনোটির ভূমিকা লিখে দিয়েছেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। ‘রোদেলা প্রকাশনী’র মবি ডিক-এ তাঁর ভূমিকা পড়তে গিয়ে বুঝতে পারি যে, এরই অংশবিশেষ ব্যবহৃত হয়েছে শিল্পের নন্দনতত্ত্ব বইয়ের ফ্ল্যাপে। এই ভূমিকা থেকেই জানতে পারি :

জুলফিকার নিউটন একাধারে লেখক, গবেষক এবং অনুবাদক। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাড়া জাগানো কিশোর উপন্যাস ‘ইলাডিং বিলাডিং’ এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘শিল্পের নন্দনতত্ত্ব’। তারপর থেকে তিনি নিরলসভাবে লিখে যেতে থাকেন যা আমাদের সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাকে সমৃদ্ধ করেছে।

শিল্পের নন্দনতত্ত্ব কি তাহলে এর আগেও প্রকাশিত হয়েছিল?

মবি ডিক-এর অনুবাদ প্রসঙ্গে কবীর চৌধুরী লিখেছেন :

জুলফিকার নিউটনের মেলভিলের ‘মবি ডিক’ উপন্যাসের অনুবাদ সাবলীল উপভোগ্য, উচ্চ প্রশংসার দাবিদার। … হারমান মেলভিলের চিরায়ত উপন্যাস ‘মবি ডিকে’র জুলফিকার নিউটনকৃত সাবলীল বাংলা অনুবাদ পাঠক মহলে সমাদৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস। অনুবাদ তাঁর পূর্ব প্রতিষ্ঠাকে অধিকতর সংহত ও উজ্জ্বল করবে।

প্রবীণ বহুপ্রজ অনুবাদকের এই শুভকামনা সত্ত্বেও অমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই! ২০০৫ সালে কলকাতার প্যাপিরাস থেকে মুদ্রিত গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য অনূদিত মবি ডিক হাতে নিলেই আরো একবার চমকে উঠতে হবে সবাইকে। ওই অনুবাদটি প্রথম ছাপা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। চার দশক পরে মবি ডিক-এর হুবহু একই অনুবাদ করেছেন জুলফিকার নিউটন! অবশ্য যথারীতি পালটেও নিয়েছেন দু-চারটা শব্দ।

মবি ডিক-এর সঙ্গে ওই একই প্রকাশনী থেকেই বেরিয়েছে জুলফিকার নিউটনের আরেকটি অনুবাদ — ‘স্ত্যাঁদাল’-এর উপন্যাস দি রেড এন্ড দি ব্ল্যাক। ওই ফরাসি লেখক অবশ্য ‘স্তাঁদাল’ হিসেবেই আমাদের কাছে সুপরিচিত। মূল ফরাসি উচ্চারণের আরো কাছাকাছি যেতে চাইলে সম্ভবত লেখা উচিত ‘স্তঁদাল’। সে যাই হোক, এ বইয়ের ভূমিকাও কবীর চৌধুরীর লেখা। এর শেষ অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন:

স্ত্যাঁদালের কালজয়ী উপন্যাস ‘দি রেড এ্যান্ড দি ব্ল্যাক’-এর অনুবাদ জুলফিকার নিউটনের সাহিত্যিক খ্যাতিকে বিশ্লেতিত [?] করবে। অবশ্য বয়সে প্রৌঢ় হয়েও তিনি ইতিমধ্যে আমাদেও সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। স্ত্যাঁদালের কালজয়ী উপন্যাসটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করে রোদেলা প্রকাশনীর কর্ণধার রিয়াজ খান যে সাহস ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

এই উপন্যাসটি ইতিপূর্বে কি বাংলায় অনূদিত হয়েছিল? ভূমিকা-লেখক সে-প্রসঙ্গে কিছু জানাননি। ২০০০ সালে সাহিত্য অকাদেমি (কলকাতা) থেকে প্রকাশিত লাল এবং কালো বাংলাদেশেও পাওয়া যায়। মূল ফরাসি থেকে উপন্যাসটি অনুবাদ করেছেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি সাহিত্যের অধ্যাপক পূর্ণিমা রায়। সে-বইটির আদ্যোপান্ত জুলফিকার নিউটনের অনুবাদ হিসেবে ছেপে প্রকাশক মহোদয় সত্যিই ‘সাহস’-এর পরিচয় দিয়েছেন! না, ‘আদ্যোপান্ত’ বলাটা অবশ্য ঠিক হলো না। কারণ বইয়ের শুরুতে ‘প্রকাশকের বিজ্ঞপ্তি’, সবশেষে ‘স্তাঁদালের পাদটীকা’ এবং দুই খণ্ডের সূচনায় ও প্রায় সব পরিচ্ছেদের শিরোনামের নিচে উদ্ধৃত মহান লেখকদের বাণীগুলিকে নিউটন বিনা নোটিসে ছাঁটাই করে দিয়েছেন। বইয়ের ফর্মা-সংখ্যা কমাতে গিয়ে মূল উপন্যাসের অঙ্গহানি করা যেতে পারে বই-কী! সে-কারণেই বাদ পড়েছে বাংলাভাষী পাঠকের সুবিধার্থে সংযোজিত আঠারো পৃষ্ঠার ‘সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ’ও।

নিউটন তাঁর এই ‘অনুবাদগ্রন্থ’ উৎসর্গ করেছেন তিতাশ চৌধুরীকে। উৎসর্গপত্রে তিনি একটি কবিতাও লিখেছেন। আসলে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সত্য সেলুকাস (১৯৯৫) গ্রন্থভুক্ত ‘থাকা মানে’ কবিতাটির শরীরে তিনি প্রথমে যথেচ্ছ ছুরি-কাঁচি চালিয়েছেন, তারপর সেটাকে ‘আপন করে নিয়েছেন’। আগ্রহী পাঠক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠ কবিতা (দে’জ পাবলিশিং, ২০০৩) গ্রন্থের ২১৬ পৃষ্ঠায় মূল কবিতাটির সন্ধান পাবেন।

জুলফিকার নিউটন অনূদিত মার্কেজের শ্রেষ্ঠ গল্প প্রকাশিত হয়েছে ‘অন্বেষা প্রকাশন’ থেকে, ২০০৭-এর ঢাকা বইমেলায়। এই বইটিরও ভূমিকা কবীর চৌধুরীরই লেখা। এই ভূমিকায় মার্কেসের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনার পর শেষ দুই অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন :

এখানে জুলফিকার নিউটনের বাংলা অনুবাদে প্রকাশিত হল মার্কেজের চল্লিশটি গল্প। জুলফিকার নিউটন প্রগাঢ় যত্নের সঙ্গে বৌদ্ধিক প্রণোদনাকে হৃদয়বত্তার সঙ্গে মিলিয়ে গল্পগুলি অনুবাদ করেছেন। তিনি ইতোপূর্বে একাধিক রচনায় অনুবাদক হিসেবে তার দক্ষতার নির্ভুল প্রমাণ রেখেছেন। বর্তমান গ্রন্থেও পাঠক তার পরিচয় পাবেন।

মার্কেজের কয়েকটি উপন্যাসের অনুবাদ আমরা পেয়েছি কিন্তু গল্পাবলীর কোনো অনুবাদগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। জুলফিকার নিউটনকে তার এই উদ্যোগের জন্য আমি অভিনন্দন জানাই।

এই শেষ অনুচ্ছেদটি পড়ার পর আমরা নতুন করে ধন্দে পড়ে যেতে বাধ্য। আলী আহমেদ, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণ ঘটক, সুরেশরঞ্জন বসাক প্রমুখের অনুবাদে মার্কেসের গল্পের বহুল-পঠিত সংকলনগুলি কি আদৌ কবীর চৌধুরীর চোখে পড়েনি?

অমিতাভ রায়ের অনুবাদে গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস্-এর গল্পসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে দে’জ পাবলিশিং থেকে, ২০০৬ সালে। ওই বইয়ের ভূমিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন :

দিল্লি প্রবাসী এই লেখক [অমিতাভ রায়] অনেক দিন ধরেই মার্কেস অনুবাদে প্রবৃত্ত রয়েছেন। আগেও তাঁর অনুবাদে মার্কেসের বাংলা গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এবারে গল্পসমগ্র। তাঁর অনুবাদ সাবলীল এবং সরস-পাঠ্য।…

এই বইটিও নিশ্চয়ই অধ্যাপক চৌধুরীর চোখে পড়েনি। তবে জুলফিকার নিউটন বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের খোঁজ ভালোই রাখেন; অমিতাভ রায় অনূদিত মার্কেসের গল্পসমগ্র-ও তিনি বিলক্ষণ সংগ্রহ করেছেন। মার্কেজের শ্রেষ্ঠ গল্প বইয়ের অনুবাদক হিসেবে তাঁর পক্ষে ওইসব গল্পের অন্য অনুবাদে চোখ বোলানোর আগ্রহ তো স্বাভাবিক।

দুটি বই পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে, নিউটন অমিতাভ রায়ের চেয়ে অন্তত দুটি ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন। প্রথমত, নিউটনের বইয়ে একটি গল্প বেশি আছে; দ্বিতীয়ত, বোকার মতো ‘অনেক দিন ধরেই মার্কেস অনুবাদে প্রবৃত্ত’ না থেকে অমিতাভের অনুবাদগুলিই নিউটন নির্দ্বিধায় আত্মসাৎ করেছেন!

তবে কুম্ভীলকপ্রবরের জালিয়াতি এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি গল্পগুলিকে ক্রমানুসারে না সাজিয়ে ইচ্ছেমতো আগে-পরে করেছেন, এমনকী কয়েকটি গল্পের নামও পালটে দিয়েছেন। ‘সুপ্ত সুন্দরী ও বিমান’-কে করেছেন ‘সবুজ সুন্দরী’, ‘ইভা রয়েছে নিজের বিড়ালের ভেতরে’-কে ‘ইভার ইতিকথা’, ‘সেন্ট’-কে ‘সেন্টের স্বীকৃতি’, ‘কর্নেলকে একজনও লেখে না’-কে ‘নিঃসঙ্গ নায়ক’, ‘বেচারী এরেনদিরা ও তার নির্দয় ঠাকুমার অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনী’-কে ‘রোদন রূপসী’ ইত্যাদি। শেষোক্ত গল্পটার ক্ষেত্রে অবশ্য কেবল নাম পালটানোই যথেষ্ট মনে করেননি, গল্পের প্রথম বাক্যেই অমিতাভর ‘ঠাকুমা’-কে নিউটন করে নিয়েছেন ‘দাদী’ — সহজবোধ্য কারণেই।

জুলফিকার নিউটন এই বইটি উৎসর্গ করেছেন সৈয়দ শামসুল হককে। উৎসর্গপত্রে একটি পদ্যও জুড়ে দিয়েছেন, যার শেষ পঙ্‌ক্তি হলো : ‘সৈয়দ হক হাত বুলিয়ে দিলেন আমার মাথায়।’ এত কাণ্ডের পরও কি নিউটনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন কেউ? কোনো ভদ্রলোক?

আমরা যে-বইগুলি নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করলাম এর প্রত্যেকটিই কবীর চৌধুরীর লিখিত অনুমোদন ও প্রশস্তি লাভে সমর্থ হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অধ্যাপক চৌধুরী সে-সব ভূমিকায় বাংলা সাহিত্যে নিউটনের অবদান নিয়েও আলোচনা করেছেন এবং ‘নির্ভুলভাবে লক্ষ’ করেছেন ‘তাঁর জিজ্ঞাসু মন এবং বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীলতা’।

আমাদের দেশের এই প্রবীণ, খ্যাতিমান ও বহুপ্রজ অনুবাদক কি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের খবর আদৌ রাখেন না? অন্তত নিউটনের বইগুলির ভূমিকা পড়ে তো যে-কেউই সেরকমই মনে করবেন। নিউটনের সঙ্গে যৌথভাবে পাস্তেরনাকের ডাক্তার জিভাগো অনুবাদের কথা ভাবছেন কেন তিনি?

জুলফিকার নিউটনের নকল বইগুলি যে-সব প্রকাশক ছাপছেন, তাঁদের কাছ থেকে কি নিউটন লেখক/অনুবাদক হিসেবে সম্মানী পাচ্ছেন? এসব প্রকাশক কি সাহিত্যজগতের কোনো খবরই রাখেন না? না কি এই তস্করের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেই এঁরা পাঠক ও ক্রেতাসাধারণের সঙ্গে অন্তহীন প্রতারণায় লিপ্ত হয়েছেন?

জুলফিকার নিউটন এভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে থাকেন

জুলফিকার নিউটন এভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে থাকেন

. . .

[এ লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল bdnews24.com-এর আর্টস পাতায়, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখে। সে-সময়ে যাঁরা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের প্রতি এবং আর্টস পাতার সম্পাদকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। যাঁরা এ লেখাটি এখানেই প্রথম পড়ছেন তাঁদের প্রতি পুরোনো মন্তব্যগুলো পড়ার অনুরোধ রইল।]

রেজাউল করিম সুমন

একজন সামান্য পাঠক।

৩৬ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.