কাসান্দ্রা দর্শন : ভাষা সংস্কৃতির বিলাস ও শিক্ষা সংকট

"আপনাদের বাচ্চারা থাকবে মাটির কাছাকাছি, তারা মাটির গন্ধ নিয়ে বড় হবে।" বেশ কয়েক বছর আগে, একটি আধুনিক ইংরেজি কেজি স্কুলের উদ্বোধনীতে আমাদের বিখ্যাত এক কবি ও সাংবাদিক বলেছিলেন কথাগুলো, শিশুদের দেশের মাটি ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে। আমি ঠাট্টাচ্ছলে প্রতিবাদ করলাম, "এটা কি বললেন, স্যার! আমাদের বাচ্চারা কি চাষা হবে নাকি, তারা কেন মাটি কাদা নিয়ে পড়ে থাকবে? দোয়া করেন, তারা যেন আপনার সন্তানদের মতো নু'ইয়র্ক, টরোনটো-তে থাকতে পারে।" আমার লুম্পেন মধ্যবিত্ত টাইপ কথা শুনে তিনি কিছু না বলে হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। [...]

“আপনাদের বাচ্চারা থাকবে মাটির কাছাকাছি, তারা মাটির গন্ধ নিয়ে বড় হবে।”

বেশ কয়েক বছর আগে, একটি আধুনিক ইংরেজি কেজি স্কুলের উদ্বোধনীতে আমাদের বিখ্যাত এক কবি ও সাংবাদিক বলেছিলেন কথাগুলো, শিশুদের দেশের মাটি ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে। আমি ঠাট্টাচ্ছলে প্রতিবাদ করলাম, “এটা কি বললেন, স্যার! আমাদের বাচ্চারা কি চাষা হবে নাকি, তারা কেন মাটি কাদা নিয়ে পড়ে থাকবে? দোয়া করেন, তারা যেন আপনার সন্তানদের মতো নু’ইয়র্ক, টরোনটো-তে থাকতে পারে।” আমার লুম্পেন মধ্যবিত্ত টাইপ কথা শুনে তিনি কিছু না বলে হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।

21-February-Ekushey-Wallpaper-rootsbd.com-34

দেশ জাতি মাতা ভাষা নিয়ে যারা বেশী সোচ্চার, যারা এই ভাষা সংস্কৃতির ধারক বাহক, তারা এবং তাদের ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত এবং সমস্ত সুবিধা নিয়ে তারা দেশ বা দেশের বাইরে থাকেন। আর আমরা তাদের মন ভুলানো কথায় দেশ-মাটি-ভাষা নিয়ে পড়ে থাকি। আবার দিন শেষে দেখা যায়, আমরা যখন কষ্ট করে মাঠে হাল চাষ করে ফসল তুলে ঘরে তুলবো, তখন তারা জমিদারের মতো বিদেশ থেকে এসে আমাদের অবস্থান বা অবদানগুলো কেড়ে নিয়ে দেশ ও দশের নেতৃত্ব দেয় । কারন, তারা বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত, তারা দশের মাথা ও অতুলনীয়! তাদের সাথে থাকে বিদেশী যোগাযোগ, যা তাদের আমাদের উপর রাজত্ব বিস্তারে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। আমরা সারা বছর এই দেশের হাটে মাঠে ধুলোয় কাদায় চড়ে ক্লান্ত এবং দিন শেষে তাদের দার্শনিক শেকলে অতঃপর বন্দি হই। আমাদের সন্তানেরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেই মাঠে পড়ে থাকে, রাস্তায় গুলি-বোমা খায় – খেয়ে চলে। রাষ্ট্র আমদের সন্তানদের নিশ্চয়তা বিষয়ে উদাসীন। খুব বেশি শোনা যায় না, রাস্তায় বুদ্ধিজীবীদের, রাজনীতিবিদদের, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা গুলি খেল, ককটেল খেল। তারা এসব থেকে অনেক দূরে, শুধু ফসল তোলার সময় হাজির হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক – বুদ্ধিজীবীরা ঠিকই জানেন উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি জানা কেমন দরকারি । তারা নিজ সন্তানদের ঠিকই তা বুঝিয়ে দেন, কিন্তু চাষা,মজুর, খেটে খাওয়া লোকদের সন্তানদের তারা উপেক্ষা করেন। অনেকক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ গুলো নিতে দেন না। পরামর্শ তো দেন না, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালনা করেন। এদের ছেলেমেয়েরাও বিদেশের মাটিতে নিজেদের বাচ্চাদের টুংটাং বাংলা ছড়া আর দেশাত্মবোধক গান শুনিয়ে আমাদের জানান – তাদের শিশুরাও এগিয়ে। ভাষা-সংস্কৃতি বিলাসী সুবিধা সম্বলিত এই মানুষগুলো বংশ পরম্পরায় আভিজাত্য ও সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে উচ্চ শিক্ষায় মানুষ হয় । এদিকে আমাদের ছেলেমেয়েরা বছরের প্রথম দিন বিনা পয়সায় বই পেয়ে খুশিতে বাসায় এলো ঠিকই, কিন্তু সারা বছর কেমন করে পড়বে, পিতা মাতা খেতে দিতে পারবে কি পারবে না ? নাকি কাজ করে খেতে হবে, এইসব নিয়ে জীবন পার করে।

2011_01_02_1_15_b

তাই, এই ভাষার মাসে আপনাদের জানাই – বাংলা আমাদের মাতৃভাষা ঠিক আছে। কিন্তু এর চেয়ে বেশী দরকার জাতি হিসেবে আমাদের উন্নতি লাভ করার। ভাষা নিয়ে আস্ফালন করা বুদ্ধিজীবীদের এইসব ন্যাকা, ন্যাকা মার্কা কথায় ভুলবেন না। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হলে, প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষিত জনশক্তি। এর জন্য দরকার সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর উপর সর্বাত্মক দখল। অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ আমলে যেমন ধর্মীয় কারনে মুসলিমরা শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে গিয়েছিল, শুরুর দিকে ইংরেজি চর্চা না করার কারনে; তেমনি এখনো সেই ভুল করবেন না নয়া ঔপনিবেশিক মানসিকতার বুদ্ধিজীবীদের কুমন্ত্রনে।

দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বা পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি পাঠ এর সামর্থ্যহীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইংরেজি থেকে পাশ করা মেধাবী লোকজন দেখা যায়, পেশা হিসেবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে কেউ তেমন সম্মানের চোখে দেখে না।ফলে এখন টানা সময় ধরে বিদ্যালয় গুলো তরুন শিক্ষক ধরে রাখতে পারছে না। পুরনো যে শিক্ষকরা ছিলেন, তারা অবসরে চলে যাচ্ছেন। ফলে বিদ্যালয় গুলোতে ভাল শিক্ষক পাওয়া মুশকিল। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা তেমন আকর্ষণীয় নয়, একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা ছাড়া। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায়। ডিমান্ড ও ভালো। নানা সুযোগ সুবিধা, বিদেশ স্কলারশিপ, ইচ্ছেমত ছুটি আর বর্তমানে যুক্ত হল মিডিয়াতে, টকশোতে বেশ রমরমা পারফরমেন্স দেখাতে পারলে সেলিব্রিটি ইমেজ – আর কি লাগে ? এটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য যে এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ছাত্রদের ক্যারিয়ার চিন্তার চেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে বেশী ভাবেন। ছাত্ররা কোন গোল্লায় গেলো না বোমায় মরলো – তাতে তাঁদের কি এসে যায় ? তরুন শিক্ষকদের তো এই প্রবনতা আর বেশী। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়া মাত্র ছ’মাস/একবছরের মধ্যে লেখালিখি-প্রকাশনা করেই বিদেশের স্কলারশিপের জন্য আবেদন-দেন দরবার করতেই থাকে।

sp 04
sp 02

আবার মেধাবী তরুণরা মাধ্যমিক বা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক হতে যাবে কোন দুঃখে ? ২০১২ সালে ঢাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের কথা ধরা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ভাবে এই সব শিক্ষকের অবস্থা গার্মেন্টস শ্রমিকের চেয়ে খারাপ। আন্দোলনে করতে এসে দাবী আদায় না হলে গার্মেন্টস কর্মীরা কারখানা জ্বালাতে পারেন, ভাংচুর করতে পারেন। এতে শ্রমিকদের জন্য সাধারণ দেশবাসীর নানা দরদ উতলে ওঠে। শ্রমিকদের সাথে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেন। কিন্তু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করলে তারা না পারেন স্কুল ভাঙতে, না পারেন স্কুল জ্বালিয়ে দিতে। ফলে তাঁদের দাবী আদায় হয় না, তাঁদের প্রতি সহানুভূতিও আমাদের থাকে না। সরকার পিপার স্প্রে বা জল কামান দাগিয়ে তাঁদের ঠাণ্ডা করে দেন। একজন বৃদ্ধ শিক্ষক তো মারাই গেলেন। ফলে লোকগুলোর পরাজিত হওয়া বাদে আর কোন উপায় থাকে না। যে পুলিশ এই শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলল, তারা যেন কোনদিন বিদ্যালয়ে যায় নি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিছু বললেন না, বুদ্ধিজীবীরা ঘটনাটা এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু আমাদের যেনে রাখা উচিত যে জাতি এই প্রাইমারী শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা নিয়ে প্রতিবাদ করলো না সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর যাই হোক, মানবিক গুণে উন্নত হতে পারবে – এটা আমি মনে করিনা। জাতির পক্ষ থেকে আমাদের সেই শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন ছিল।

worker_0

আরেকটা প্রসঙ্গ আনতে চাই — দেশের বেশির ভাগ সেক্টরে আমাদের নিম্নবিত্ত লোকের সুযোগ লাভের বড়ই অভাব। আপন সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া এখন ব্যাপক অর্থলগ্নির ব্যপার। তাই নিম্ন বা কৃষক মজুর মানুষ অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনে ছুটছে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়শিয়ায় বা অন্য দেশে। দেশে যারা আছে উঠতি মধ্যবিত্ত কমবেশি দুর্নীতি গ্রস্ত কিংবা কর্পোরেট চাকুরিজীবী। সমস্যা নেই এখানে, কিন্তু উন্নত বেসরকারি স্কুল গুলোতে গত বেশ কিছু বছর ধরে এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। সাক্ষাৎকারে পিতামাতা দুজনকে ডাকা হয়। ছাত্রের ভর্তি পরিক্ষায় মেধা যাচাই নয়, বরং পিতামাতার সামর্থ্যকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে টিন (TIN – Tax Identification Certificate) সার্টিফিকেট চাওয়া হয় এবং সাথে বাৎসরিক আয়। সবচেয়ে কাহিল অবস্থা মধ্যপ্রাচ্য বা প্রবাসী শ্রমিক ভাইদের সন্তানদের। তারা সেখানে যাই করুক না কেন,বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন দেখে পিতা আসেন নাই বা জানতে পারেন মধ্যপ্রাচ্য শ্রমিক, সন্তান বা মাকে সাক্ষাতকার করা দূরে থাক, আসনে বসতে পর্যন্ত দেয়া হয় না। কোমল শিশু বুঝতেও পারে না, ঠিক কি অপরাধে তাকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত করা হল। এই সন্তানের উন্নত বা আধুনিক শিক্ষার কোন সুযোগ নেই এখানে, অথচ এই সন্তানটিকে ছেড়ে তার পিতা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে রেমিটেন্স বাড়িয়ে দেশের উন্নতি-প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। ইউরোপ-আমেরিকা- অস্ট্রেলিয়া তে থাকলে হয়তো পরিবারকে নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য হলে তো সেই সুযোগ নেই। আর দেশেও তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ নেই। আর সরকারি স্কুলগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ভর্তি বানিজ্য চরম হয়ে পড়ছে। তাহলে এই লোকগুলো যাবে কোথায়? ( অনেকক্ষেত্রে এদের ঠাঁই হয় জামাত বা প্রতিক্রিয়াশিলদের বা দুর্বল কাঠামোর ব্যক্তি মালিকানাধিন বিদ্যালয়গুলোতে) দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে না থাকে নিজের ভবিষ্যৎ, না থাকে সন্তানের!

কিন্তু কারা এই নিয়ম বানিয়েছে? কেন এই নিয়ম? বাংলাদেশের সংবিধানের কোথায় লেখা আছে যে আমার সন্তানকে বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে হলে অবশ্যই তাঁর পিতামাতাকে মোটা টাকার বান্ডিল নিয়ে উপস্থিত থাকতে হবে? আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা এই বিষয়ে কি বলেন বা কিছু বলেন নাই বা কেন? আজ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পিতামাতা বা অভিভাবকের টিন সার্টিফিকেট চাওয়া হয় তবে দেশের খেত মজুর বা নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের কি হবে? তাই এটা কি সুক্ষভাবে আগেভাবে কেটেছেটে একটি ধনীদের শিক্ষাক্ষেত্র নির্মাণ করা হচ্ছে না? টাকা থাকলে এগিয়ে যাও, নইলে পিছিয়ে থাকো। এটা খুবই দুঃখজনক, দেশে সুবিধাবাদী শ্রেণী, ঘুষখোর বা দুর্নীতিবাজদের সন্তানদের জন্য শিক্ষালাভের যে সুযোগ সুবিধা, সৎ উপায়ে উপার্জনের দেশী বা প্রবাসী মানুষের সন্তানের সুবিধা একেবারেই অবহেলিত।

এটা ঠিক, বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের প্রানের ভাষা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এর জন্য রক্ত দিয়েছেন। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, আমার কাছে আমার ভাষা যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি অন্য জাতির কাছে তাঁর ভাষাও শ্রেষ্ঠ। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল উঠতি মধ্যবিত্ত অভিজাত বাঙ্গালী সম্প্রদায় তাঁর নিজস্ব সবকিছুকেই বিশ্ব শ্রেষ্ঠ মনে করে। অনেক দিন আগে কলকাতার মৌসুমি ভৌমিক এলেন চট্টগ্রামে। বিশ্বের স্ট্রিট কণ্ঠ শিল্পীদের উপর একটি মাল্টিমিডিয়া লাইভ অনুষ্ঠান। আমাদের একজন সাংবাদিক বললেন, “তোমার কি মনে হয়, আমাদের এই অঞ্চলের শিল্প কি শ্রেষ্ঠ নয়?” তিনি খুব সচেতন ভাবে উত্তর দিলেন, কাউকে ছোট না করে। আমি অবাক হলাম, এটা কেমন মানসিকতা হতে পারে, এই অঞ্চলের সব কিছু এমনকি রাস্তার সঙ্গীত ও বিশ্বসেরা হবে? যেমন আমাদের কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও আমাদের বিশ্বসেরা মনে হতে পারে। কেউ কেউ তা আপাদমস্তক বিশ্বাস করেন। তাই আমাদের ভাষাও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষা। অন্য যেকোনো ভাষা যেন এঁর কাছে নস্যি। মহান ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান দিয়েছেন, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের কারনে নয়। এই মাতৃভাষার জন্য একদল তরুনের আত্মাহুতি দেয়ার কারণে।

যদিও এই সংস্কৃতির হাজার বছরের পরিক্রমায় অভিজাত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর যে শক্তি ও ব্যপকতা লাভ করেছে, তার সাথে লড়াই করার ক্ষমতা আমাদের মতো মানুষদের নেই, ছিলও না। এরা সবসময় সুবিধাপ্রাপ্ত — প্রতিক্রিয়াশীল বা প্রগতিশীল যে কোন পরিবেশে এদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত। এরা এতো সুন্দর কথা বলে, এতো সুন্দর গায়, এতো সুন্দর লেখে, এতো পরিশীলিত, নম্র আর মিষ্টি যে আমাদের পোড়ামুখো খেটে খাওয়া চেহারার সাথে এঁদের তুলনা একেবারেই নিষিদ্ধ।

তবুও শেষ করি এই প্রত্যাশায় — একদিন আমাদের ভাষা বা সংস্কৃতি নিয়ে এই বিলাস বন্ধ হবে। আমাদের মানসিকতায় এই সুপেরিওরিওরিটি কমপ্লেক্স কেটে গিয়ে আমাদের নিজেদের অন্য জাতি বা ভাষার সাথে সম্মিলন ঘটবে। আমাদের দেশের সন্তানেরা সামগ্রিকভাবে লেখাপড়ায় সুশিক্ষিত হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শুধু বিশেষ শ্রেণীর সন্তানেরা না গিয়ে খেতমজুর-শ্রমিক বা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের শ্রমিক ভাইদের সন্তানেরাও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে তাঁদের পিতামতার পরিশ্রমকে সার্থক করে তুলবে। বাংলাদেশ যেদিন পৃথিবীর বুকে গৌরবের সাথে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, সেদিন বিশ্বের মানুষ যেমন এই জাতিকে সম্মান করবে, তেমনি এই ভাষাকে তাঁর যথাযথ প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে।

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

চলচ্চিত্র কর্মী, সমালোচক, নির্মাতা এবং গবেষক ।

8
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
রায়হান রশিদ
সদস্য

ভাষার এই মাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবনার সাহসী উচ্চারণের জন্য কৃতজ্ঞতা।

হুমায়ুন কবির
অতিথি
হুমায়ুন কবির

অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ আমলে যেমন ধর্মীয় কারনে মুসলিমরা শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে গিয়েছিল, শুরুর দিকে ইংরেজি চর্চা না করার কারনে; তেমনি এখনো সেই ভুল করবেন না নয়া ঔপনিবেশিক মানসিকতার বুদ্ধিজীবীদের কুমন্ত্রনে আপনার কি মনে হয় যারা ইংরেজি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত বা ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা ইংরেজিতে পারদর্শী নয় তারা ভাষাপ্রেমের চেতনা কিংবা বুদ্ধিজীবীদের “ন্যাকা ন্যাকা” কথা শুনে ইংরেজি ত্যাগ করে থাকে? আমার তো মনে হয় আমাদের চেয়ে উন্নত অনেক দেশের চেয়ে ফট-ফট করে ইংরেজি বলা লোক আমাদের দেশে অনেক বেশী।আমাদের দেশের পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণীর বাচ্চাটি ইংরেজিতে যে প্যারাগ্রাফ লিখতে পারে,ইউরোপের অ-ইংরেজিভাষী অনেক দেশের কলেজ পড়ুয়ারাও হয়তো সে মানের… বাকিটুকু পড়ুন »

mahtab
অতিথি
mahtab

ভালো লাগলো

মাকশুম
অতিথি
মাকশুম

রাসেল ভাই, বেশ ভালো লাগলো লিখাটি। শিক্ষার শ্রেণী কুক্ষিকরন ইস্যু নিয়ে আলাদাভাবে লিখলে মূল বিষয়টা আরও পরিস্কার হত। – কৃতজ্ঞতা রইল।

মনসুর টুটুল
অতিথি

ভালো লাগলো ।

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.