বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের রায় নিয়ে শিরোনামহীন লেখা…..

কাদামাটি নোনাজল চাষবাস এই তিনের সমন্বয়ে জীবনযাপন করা বাঙালি যখন অস্ত্র হাতে তুলে জীবন বাজী রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন সারা বিশ্ব অবাক তাকিয়ে ছিল! নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়ী জাতির যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল মাত্র চার বছরের মধ্যে তা ধুলোয় মিশে যায়। সপরিবারে জাতির জনককে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। স্তম্ভিত বিশ্বকে, পুরো বাঙালি জাতিকে আরো স্তম্ভিত করে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা পুরস্কৃত হন। দেশে-বিদেশে তাদের পুরস্কৃতও করা হয়। এক জঘন্য ইনডেমনিটি আদেশ জারি করে সেই আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের পথও রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই এই জাতির যে শিশুটি জন্মেছে সেও বড় হয়ে জেনেছে এই আমাদের দেশ! যেখানে জাতির জনককে হত্যা করার পরও জাতি সেই খুনিদের বিচার করতে পারেনি! এটা যে এই জাতির জন্য কতটা গ্লানির আর কতটা কষ্টের তা বাইরের কেউ আমাদের মত উপলব্ধি করতে পারবেন না। সেই থেকে আমরা কেবলই অসহায় নিরূপায় প্রহর গুনে চলেছি। নিজেদের অর্জিত স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের সেই স্বর্নজ্জল দিনগুলো স্মরণ করেছি এবং এমনই একটি দিনের প্রতীক্ষায় থেকেছি।
রায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল। রায় ঘোষণার পর ১১ বছরেও তা কার্যকর হয়নি। নিয়মরীতি অনুসরণের পরামর্শ অথবা বিচারপতিদের বিব্রতবোধের কারণে কিছুটা বিলম্বের পরও ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিচারপতি মোঃ রুহুল আমিন এবং বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বিভক্ত রায় দেন। সে রায়ে বিচারপতি রুহুল আমিন ১০ জনের এবং বিচারপতি খায়রুল হক ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডই অনুমোদন করেছিলেন। এর নিষ্পত্তি করে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারপতি ফজলুল করিমের দেওয়া হাইকোর্টের রায়ে মোট ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন পাওয়া যায়।
তারপর আবার এই বিচার কাজ থেমে যায়। বলা ভাল- থামিয়ে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে আমরা আবার আশায় বুক বাঁধি- এবার নিশ্চই বঙ্গবন্ধুর খুনী কুখ্যাত সেই জাতির কলঙ্কগুলোর বিচার সম্পন্ন হবে। এত কিছুর পরও খুনিরা থেমে থাকেনি। আজকের এই রায় ঘোষণার আগে তাদের দোসররা একের পর এক নাশকতা ঘটাতে চেয়েছে, পরিস্থিতি ওলটপালট করে আবার এই রায়কে থামিয়ে দিতে চেয়েছে। ২১টি বছর ধরে এই বিচার এবং রায় নিয়ে এদেশের মানুষের উৎকণ্ঠায় কেটেছে। যে বিচার শেষ করা না হলে এই জাতির পাপমোচন হতো তা, যে বিচার শেষ করা না হলে এই জাতি সভ্য বিশ্বে মাথা তুলে বলতে পারত না যে আমরা লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম, যে রায় না হলে প্রমাণ করা যেত না যে এই দেশটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সেই ঐতিহাসিক রায় আজ ঘোষিত হলো। ২০০০ সালের ১৪ আগষ্টে খুনিদের ফাঁসীর আদেশ দিয়ে যে রায় ঘোষিত হয়েছিল আজ সেই রায়কেই বহাল রাখলেন সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিদের বেঞ্চ।
এখন আমরা বলতে পারি- আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছি। এখন আমরা বলতে পারি হে জাতির পিতা তোমায় আমরা রক্ষা করতে পারিনি, তোমার সাধের বাংলা তোমায় তোমার প্রাপ্ত আয়ু অব্দি লালনও করতে পারেনি, কিন্তু তোমাকে যারা নির্মম ভাবে হত্যা করে জাতির মাথায় এক কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল আজ আমরা তাদের বিচার করতে পেরেছি। আজ আমরা তোমার খুনের বদলা নিতে পেরেছি।

এর আগেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রনায়কদের হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও এই রকম হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করা হয়নি, তাদের বাঁচানোর জন্য ইনডেমনিটি জারি করা হয়নি, খুনিদের বিচার কার্যক্রমকে বছরের পর বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়নি। এই সকল কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং তার বিচার কার্যক্রম এ দেশের ইতিহাসে এক অন্য মাত্রায় অলংকৃত হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশে শুরু থেকেই এই নিয়ম মানা হয় নাই। সে নিজেই আদালত হয়ে উঠছে। আদালতের বিকল্প রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষকে ধরে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল। রক্ষীবাহিনী যাওয়ার পর সেনারা আদালতের দায়িত্ব নিয়েছে। পুলিশকেও এই দায়িত্ব দিয়েছে। সবশেষে র‌্যাব বানানো হয়েছে।তারাও নির্বিচারে মানুষ খুন করে চলেছে, কিন্তু আদালত কিছুই করে নাই।
এই প্রথম দেখলাম আদালত সরব হয়েছে, কাজ করেছে। বাংলাদেশের প্রথম সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধুকে দেশেরই সেনাবাহিনী হত্যা করার পরে যে আদালত অনুমোদন দিয়েছে, ইনডেমনিটি জারি করেছে। বিচার-আচারের জন্য আদালতে না এনে মানুষ হত্যা করার অপরাধে সেনা-পুলিশ-র‌্যাবকে কখনো যে আদালত কিছু বলেনি নি, সেই আদালত গত ১৭ নভেম্বর গৌরবজ্জল কাজ করেছে, আদালতের মতো কাজ!
১৫ তারিখ রাতে মাদারীপুরে দুই ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে র‌্যাব, আদালত র‌্যাব এর বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু করছে, নিজে নিজেই। সুয়েমোটো রুল জারি করে হাইকোর্ট বিভাগ তাদের কাছে জবাব চেয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম।
এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ, ১৯ নভেম্বর, আরেকটি প্রথম ঘটনা ঘটেছে। বিচারবহির্ভূত তো বটেই, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড প্রধানত, দেশের প্রধান রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে। নাগরিক হিসাবে আজ আমার-আপনার শুকরিয়ার আদায়ের দিন। আদালতকে আমরা শুকরিয়া জানাই। জানাই আইনজীবীদেরও।

পঁচাত্তরে আমি অনেক ছোট ছিলাম, সেই দিনের, সেই ১৫ ই আগষ্টের সকালটা আমার কাছে ঘোর অমাবস্যার রাত মনে হয়েছিল। স্তম্ভিত আমি সেই থেকে আর স্বাভাবিক রৌদ্রোজ্জ্বল দিন দেখিনা! এতটা বছর জুড়ে কেবলই মনে হয়েছে এক ঘোর অমানিশায় পথহারা আমি-আমরা শ্বাপদসংকুল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি….. সেই হাঁটার যেন আর শেষ নেই! আজ, হ্যাঁ আজ মনে হচ্ছে নিকষ আঁধার পেরিয়ে আমরা হাঁটার যবনিকা টানতে পেরেছি। আমরা রৌদ্রোজ্জ্বল দিবালোকে পৌঁছেছি। আলোকময় দিন এক হ্যাঁচকা টানে সকল আঁধারকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা এতটা বছর চেপে রাখা অবিশ্বাস নিশ্বাস থেকে বের করে প্রাণ ভরে নতুন বাতাস টেনে নিতে পারছি। আমরা এবার একটি লম্বা ঘুমের প্রস্তুতি নিতে পারব।
(অপারগতাঃ খুব কম সময়ে লেখাটি লিখতে হয়েছে, তাই বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পোস্টে সংযোজন করা সম্ভবব হয়নি। সরাসরি সংবাদপত্রের লিংক দেওয়া হয়েছে।)
* কনডেম সেলে ৫ খুনি যে ভাবে আছে
*বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং বিচারের বিবরণ……..
*২১ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর খু‍নিদের পালানোর পরিকল্পনা ছিল…..
*চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আপডেট।

মনজুরাউল

আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে চারদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা হাজার শিশুর জন্ম দেয় যারা মানুষ......

16
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
মাসুদ করিম
সদস্য

এই তড়িঘড়ি কাজের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা সত্যিই ‘রৌদ্রজ্জ্বল দিবালোকে পৌঁছেছি’। লম্বা ঘুম দিতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু আমি আপনি সবাই জানি, তা আর সম্ভব নয়, আমাদের সজাগই থাকতে হয় অহর্নিশি।

রায়হান রশিদ
সদস্য

ধন্যবাদ মনজুরাউল, সময়োপযোগী এই পোস্টের জন্য। ৩৪ বছর পর হলেও বিচারের রায় চূড়ান্ত হল। এই রায়টির খুব দরকার ছিল আমাদের। বিষয়টি প্রতিশোধের নয়; চোখের বদলে চোখ নয়। বিষয়টি ন্যায়বিচারের। অন্যায়ের স্মৃতি নিয়ে যখন কোন জাতিকে বাঁচতে হয়, তখন তা ভেতর থেকে তাকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। এই ক্ষয় থেকেই তৈরি হয় আমাদের ‘গা সওয়া’ নৈর্ব্যক্তিকতা, যা থেকে আরও বড় বড় সব অন্যায়ের এবং সে সব অন্যায়ের প্রতি ‘সহনশীলতার’ মানসিকতা দানা বাঁধে। বিষয়টা অপরাধবোধেরও। ঠিক সময়ে ঠিক কথাটি না বলতে পারার অপরাধবোধ, ঠিক সময়ে ঠিক অবস্থানটি না নিতে পারার আক্ষেপ। এমন অপরাধবোধ কিংবা আক্ষেপ নিয়ে ব্যক্তি মানুষই বাঁচতে পারে না; আর… বাকিটুকু পড়ুন »

সৈকত আচার্য
সদস্য

কাজ থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, আমাদের মুক্তাঙ্গনে নিশ্চয়ই এতক্ষনে কেউ অন্ততঃ একটা পোষ্ট দিয়ে ফেলেছে। নিশ্চয়ই দারুন এবং অসাধারণ চিন্তাশীল কিছু মন্তব্যও চলে এসেছে। মনজুরাউল একটা দারুন কাজ করেছেন। এই ঐতিহাসিক একটা মূহুর্তকে নির্মাণের ক্যামেরায় চটজলদি তুলে রেখেছেন। আলোচনায় পরে অংশ নেব। তার আগে মনজুরাউল এবং আলোচনায় অংশ নেয়া অন্যদের বিপ্লবী অভিবাদন।

মাসুদ করিম
সদস্য

গতকাল প্রথম আলো ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বিশেষ সংখ্যা’ প্রকাশ করেছিল।

মাসুদ করিম
সদস্য

আজকে সকালে ভারতের যে কয়েকটি বাংলা ইংরেজি পত্রিকা উল্টেপাল্টে দেখেছি, শুধু ‘দি হিন্দু’ মুজিব হত্যা মামলার রায় নিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে। A large section of the people considered the coup and the assassination as part of a sinister and determined plot to turn the nation away from the path of socialism, democracy, nationalism, and secularism. If Bengali nationalism was the guiding spirit of the liberation struggle, a form of Bangladeshi nationalism, with stress on religious identity, was being sought to be established. The most significant outcome of the Supreme Court’s verdict should therefore be a reaffirmation of the dream of 1971.… বাকিটুকু পড়ুন »

অবিশ্রুত
সদস্য

শেখ কামালকে নিয়ে উইকিপিডিয়াতে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার : কেউ কি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন না?

রাগিব
অতিথি

ইংরেজি উইকিতে বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রায় হাজারখানেক ভুক্তি আমার হাতে তৈরী করা বিধায় সেগুলো নজর তালিকায় আছে। এর মধ্যে এই ভুক্তিটিও রয়েছে বই কি। কিন্তু আমার নজর তালিকায় সর্বমোট আড়াই হাজার নিবন্ধ রয়েছে বলে দৈনিক ২০০ টির মতো আপডেট আসে। ব্যক্তি হিসাবে ২৪ ঘণ্টা সময় উইকিতে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আর ইদানিং সিংহভাগ সময় বাংলা উইকিতেই কাটাচ্ছি। এসব কথা বলার কারণ এটাই, আপনারা সবাই যদি ধরে থাকেন, আমি বা আর হাতে গোনা যে দুই বা এক জন বাংলাদেশী উইকিপিডিয়ান সব ভুক্তির উপরে নজর রাখতে পারবেন, তাহলে ভুল হবে। বহুদিন (প্রায় বছর ৪ হয়ে গেলো) ধরে আমি উইকিপিডিয়াতে সবাইকে সক্রিয়ভাবে অংশ… বাকিটুকু পড়ুন »

কামরুজ্জামান  জাহাঙ্গীর
সদস্য

প্রথমেই বলে নিই, শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়া বাংলাদেশের বিচারব্যাবস্থার অতি দরকারি এক বিষয়। বিচারবিহীন এত হত্যাকাণ্ড দেখে দেখে আমরা ধরে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, বিচার-টিচার করার পূর্ণাঙ্গ অধিকার পরজীবী রাষ্ট্রসমূহের থাকতে নেই। এটা আরও দরকার ছিল এ কারণে যে, এটি অন্তত বুঝিয়ে দেয়া, রাষ্ট্রপালিত জলপাই শাসকদেরও বিচার সম্ভব। এ বিচারকাণ্ডের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসাবে এটি অন্যতম।
রাষ্ট্রপালিত সহিংস প্রতিটি হত্যাকাণ্ড দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর ক্ষত রেখে যায়। একটা মানুষকে, তার পরিবারকে, সমাজকে ক্লেদাক্ত করে। তবু আমরা হত্যাকাণ্ড দেখতে বাধ্য হচ্ছি।
এতে কি ধরে নেব যে, রাষ্ট্র আর বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ড ঘটাবে না?! এর কি আদৌ সার্বভৌম কোনও সুরাহা হবে???

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.