যারা বস্তুগত শক্তির সাহায্যে ক্ষমতাশালী জাতি গড়তে চায় তারা ইতিহাস জানে না ও সভ্যতাকেও বুঝতে পারেনি। নিছক শক্তির উপর নির্ভরতা বর্বরতার লক্ষণ, যারা তার উপর নির্ভর করেছিল তারা হয় ধ্বংস হয়েছে অথবা বর্বরই থেকে গিয়েছে।[...]

সোনা, অহিফেন আর যৌনসঙ্গী এই তিনের প্রতি ছিল চীনাদের আকর্ষণ – প্রবীণ চীনের সেই আকর্ষণের বস্তুতান্ত্রিকতা ও গণমানুষের উপর অনিঃশেষ শোষণের বিরুদ্ধে নবীন চীন রুখে দাঁড়িয়েছিল – তাদের সাম্যবাদী বস্তুতান্ত্রিকতার পরিকল্পনায় প্রধান বাহন ছিল শিল্পমুখী যন্ত্রশক্তি – এদুয়ের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের আদর্শবাদ বা আধ্যাত্মবাদ মোটেই সুবিধা করতে পারেনি – তাই ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথের চীন ভ্রমণ ব্যর্থ না হলেও নবীন চীনের কাছে অপমানিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিকিং-এ যেখানেই বক্তৃতা দিতে গেছেন তিনি, তার বিরুদ্ধে চীনের নতুন যুগের ছোকরারা চীনা ভাষায় মুদ্রিত প্রচারপত্র বিলি করেছিল। রবীন্দ্রনাথ যাদেরকে চীনের ছোকরা বলেছিলেন তারা কারা – অবশ্যই ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থকেরা – যাদের মধ্যে তখন চল্লিশোর্ধ বিখ্যাত চীনা সাহিত্যিক লু স্যুনও ছিলেন। এই বস্তুবাদীদের কার্যকলাপে রবীন্দ্রনাথ এতই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন যে শেষ পর্যন্ত সফর অসমাপ্ত রেখেই তিনি পিকিং ত্যাগ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল তাদের – রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন চীনের সভ্যতার গুণকীর্তন করেছিলেন, আধ্যাত্মবাদী ব্রহ্মধর্ম ও উপনিষদের বাণী প্রচার করেছিলেন, বৌদ্ধধর্মের সূত্রে ভারত-চীন সেতুবন্ধের কথা বলেছিলেন, চীনের প্রগতিশীল সহিংসতাকে গান্ধীর অহিংস নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন আর বস্তুবাদী বিপ্লবের যন্ত্রনির্ভর শিল্পের দৈত্যের বিপরীতে মানুষের মধ্যে দেবতার আকাঙ্ক্ষায় উচ্চতর স্বর্গ লাভের চূড়ান্ত মানবিক উৎকর্ষের কথা বলেছিলেন। তিনি চীনের তরুণদের উদ্দেশ্যে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন

যারা বস্তুগত শক্তির সাহায্যে ক্ষমতাশালী জাতি গড়তে চায় তারা ইতিহাস জানে না ও সভ্যতাকেও বুঝতে পারেনি। নিছক শক্তির উপর নির্ভরতা বর্বরতার লক্ষণ, যারা তার উপর নির্ভর করেছিল তারা হয় ধ্বংস হয়েছে অথবা বর্বরই থেকে গিয়েছে।

এরকমের উচ্চারণের বিরুদ্ধে চীনের যুবকেরা চীনা ভাষায় চিৎকার করে বলেছিল, পরাধীন দেশের দাস ফিরে যাও – আমরা দর্শন চাই না, বস্তুবাদ চাই।

কেন তার বিরুদ্ধে এইসব বিরোধিতামূলক প্রচারপত্র, প্ল্যাকার্ড, চিৎকার? রবীন্দ্রনাথ জানার চেষ্টা করেছিলেন এবং জেনেও ছিলেন। কিন্তু তিনি তার উপলব্ধিতে স্থিতধী ছিলেন – আত্মিক শক্তির উচ্চতায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন – তিনি বারবার আধ্যাত্মিক সভ্যতা ও বিজ্ঞানের পথে পার্থিব উন্নতির সমন্বয় ঘটানোর পথেই মানুষের মুক্তির আদর্শবাদে নিমগ্ন ছিলেন। এই সীমাহীন দূরত্ব চীনের বিপ্লবী যুবশক্তির কাছে রবীন্দ্রনাথকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ পরিচয়ে পর্যবসিত করেছিল। এ তো গেল আধ্যাত্মবাদ ও বস্তবাদে অটল বিশ্বাসের কারণে দুপক্ষের সংঘাতের জ্বলন্ত দিক। কিন্তু এটাও তো জানতে ইচ্ছে হয়, কেউ কেউ কি জানত না এই ঠাকুর ওই ভারতীয় অহিফেন সরবরাহকারী ঠাকুর-এর বংশজাত – এবং এটা জেনে কি রবীন্দ্র বিরোধিতার তীব্রতা মুক্তিকামী তরুণদের মধ্যে আরো প্রজ্জ্বলিত হয়নি?

জাপান জাভা পারস্য রাশিয়া ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ে চিঠি ডায়েরি সংকলিত বই আছে রবীন্দ্রনাথের, চীন ভ্রমণ নিয়ে কিন্তু এরকম কিছুই নেই। ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিকে রবীন্দ্রনাথ তো সমর্থন দিয়েই ফেলেছিলেন, রমাঁ রলাঁ থাকায় সেই আগ্রাসী শক্তির রূপ রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন এবং ইউরোপের সেদিনের গণচেতনার সহিংস দিককে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু চীনের মুক্তিকামী গণচেতনায় উদ্বুদ্ধ তারুণ্যের শক্তিকে বুঝতে সেদিন রমাঁ রলাঁর মতো চীনের কোনো ব্যক্তিত্বের সাথে রবীন্দ্রনাথের কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মবাদী আত্মিক মহত্ব ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ পরিচয়ের অপমান যেমন বহন করেছিল তেমনি চীনের মুক্তিকামী যুবসমাজও এক অনন্য শান্তিকামী মানুষের অন্তরের উপলব্ধি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।

আমার আরো রবীন্দ্রনাথ : অহিফেন ঠাকুর, মুখের কথা লেখা, উপন্যাস : যোগাযোগ, রবীন্দ্রনাথ

মাসুদ করিম

লেখক। যদিও তার মৃত্যু হয়েছে। পাঠক। যেহেতু সে পুনর্জন্ম ঘটাতে পারে। সমালোচক। কারণ জীবন ধারন তাই করে তোলে আমাদের। আমার টুইট অনুসরণ করুন, আমার টুইট আমাকে বুঝতে অবদান রাখে। নিচের আইকনগুলো দিতে পারে আমার সাথে যোগাযোগের, আমাকে পাঠের ও আমাকে অনুসরণের একগুচ্ছ মাধ্যম।

১৮ comments

  1. সাইদুল ইসলাম - ৭ এপ্রিল ২০১১ (১:২৩ অপরাহ্ণ)

    ধন্যবাদ মাসুদ করিমকে, রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণইতিহাসের এ অনালোকিত দিকটি আলোকিত করার জন্য। এ-বিষয়ে আরো বিশদভাবে পড়তে চাই। মাসুদ ভাই আশা করি লিখবেন।

  2. প্রণব আচার্য্য - ৭ এপ্রিল ২০১১ (৫:৫৬ অপরাহ্ণ)

    ধন্যবাদ মাসুদ করিম।। অজানা ছিল– এ সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত জানার আগ্রহে রইলাম।।

  3. নাসরীন - ১০ এপ্রিল ২০১১ (৩:১৭ অপরাহ্ণ)

    আপনার লেখাটি খুব ভাল লেগেছে।আপনার আরো লেখা পড়তে চাই।

  4. 5th in the alfabet - ১৭ এপ্রিল ২০১১ (৭:৩৫ পূর্বাহ্ণ)

    জানার দরকার ছিলো ।

  5. Pingback: মুক্তাঙ্গন | সীমানা ছাড়ায়ে | মাসুদ করিম

  6. অজানা - ৫ জুন ২০১১ (২:১৬ অপরাহ্ণ)

    চীন খারাপ ভারত ভাল,কারন রবীন্দ্রনাথের মত জমিদারের পুএ চীনে শ্রমিক শ্রেনীর শাসন ভাল লাগেনি! যাই হোক উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সংঘাত ভালো কিন্তু শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লড়াই ভালো না। জমিদারিটা ছেড়ে রবীন্দ্রনাথ কথা বলেননি,শ্রেনির বাইরে তিনি কতটুকু নিম্নবর্গের স্বার্থের পক্ষের হয়ে কথা বলেন?মালিকেরা সহিংস কিন্তু শ্রমিককে অহিংস হওয়ার মালিক পক্ষের চালাকি আর ধুর্তামি উপদেশ দেওয়া শঠতা।

    • সরব দর্শক - ৫ জুন ২০১১ (৮:৫৯ অপরাহ্ণ)

      @ অজানা

      আপনি লিখেছেন,

      চীন খারাপ ভারত ভাল, কারণ রবীন্দ্রনাথের মত জমিদারের পুত্র [পুত্রের] চীনে শ্রমিক শ্রেণীর শাসন ভাল লাগেনি!

      কোন্ সালে চীনে ‘শ্রমিক শ্রেণীর শাসন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? লালফৌজের বিখ্যাত লং মার্চই-বা হয়েছিল কোন্ সালে?

  7. মাসুদ করিম - ২৪ মার্চ ২০১২ (২:০৮ অপরাহ্ণ)

    ৮৮ বছর পর চীনে আবার রবীন্দ্রনাথ, অনান্থ কৃষ্ণান ‘দি হিন্দু’তে লিখছেন

    When Rabindranath Tagore set foot in Shanghai in 1924, he began a whirlwind tour that left behind a complicated legacy.

    Welcomed as a wise and sage-like figure by intellectuals and liberal romantics, Tagore was also vilified by Western-influenced and nationalist supporters of the ‘May 4 movement,’ seen as an anti-modern and unwelcome throwback.

    Strong criticism and protests greeted his first visit, which marked for China a long and complex relationship with Tagore. Over decades, however, his literature came to be widely loved by Chinese intellectuals — so much so that even today, Tagore is studied in Chinese high schools and universities, and perhaps given more attention than even in Indian schools.

    Now, 88 years later after he first arrived in China, the poet is being remembered here through a unique tribute. On Saturday, Students at the Lanzhou University, in north-western Gansu province, will stage the first-ever Chinese language production of Tagore’s play Chitrangada.

    In coming weeks and months, the play will travel all over China — giving people in Beijing, Shanghai and Guangzhou a chance to reacquaint themselves with the figure who has, more than anyone else, shaped their imagination of India.

    Behind the initiative is Mao Shichang, a professor at Lanzhou University whose love affair with Tagore began during a stint at Jawaharlal Nehru University, where he studied Indian epics.

    বিস্তারিত পড়ুন : 88 years later, Tagore comes to China again

  8. Pingback: মুক্তাঙ্গন | রবীন্দ্রনাথ | মাসুদ করিম

  9. মাসুদ করিম - ২০ মে ২০১৩ (১:১৪ অপরাহ্ণ)

  10. Pingback: হন্যতে : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোপন ডায়েরি | মাসুদ করিম

  11. মাসুদ করিম - ৮ এপ্রিল ২০১৪ (৩:৩২ অপরাহ্ণ)

    আরো অপমান এবার মেক্সিকোয়, দিয়েগো রিবেরার মুরালে।

    দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

    জানাতো দূরের কথা, আমাদের অনুমানেও কখনো এই ভাবনা আসেনি যে পৃথিবীর বিখ্যাত মুরাল শিল্পী দিয়েগো রিবেরাও তার এক শিল্পকর্মে রবীন্দ্রনাথকে একজন প্রধান চরিত্র হিসেবে গণ্য করেছিলেন। অনুমানে না আসার কারণ হয়তো এই যে রিবেরা ছিলেন রাজনীতি দ্বারা, বিশেষ করে বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শের দ্বারা প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত এক শিল্পী। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার জগতটি রাজনীতি বর্জিত ছিলো না বটে, কিন্তু বাম কিংবা ডান–কোনো রাজনৈতিক আদর্শেরই তিনি সক্রিয় লেখক ছিলেন না। বামপন্থী আদর্শের বিজয়ী দেশ রাশিয়া যে তাকে মুগ্ধ করেছিলো সেটুকু জানাটা আমাদেরকে কেবল এই নিশ্চয়তা দেয় যে বাম রাজনৈতিক আদর্শের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। তবে রিবেরার ছবির প্রধান চরিত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথের এই সহানুভূতি যে কোনো ভূমিকা রাখেনি–সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাহলে কী এমন অভিন্ন বিষয় পরস্পরকে কাছে এনেছিলো? আমার ধারণা উভয়ের নৈকট্যের কিংবা নৈকট্যের মাধ্যমে বিরোধের ধারণাকে স্পষ্ট করার পেছনে সত্যিকারের ভূমিকাটি ছিলো মেহিকোর সে সময়ের উজ্জল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রনাথের প্রবল অনুরাগী হোসে বাসকনসেলোস। বাসকনসেলোস যদিও বাম রাজনৈতিক বা দর্শনের অনুরাগী ছিলেন না, তবে তার ব্যক্তিত্বের চুম্বকীয় শক্তি ছিলো এতই প্রবল যে ভিন্নমত ও পথের ব্যক্তিদেরকে তিনি একত্রিত করতে পারতেন অনায়াসেই। করেছিলেনও তিনি। আর তাই পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞা, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, দিয়েগো রিবেরা প্রমুখ লেখক শিল্পীদেরকে তিনি তাঁর শিক্ষা, শিল্প ও জনকল্যানমূলক প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন।

    শিক্ষামন্ত্রী এবং সচিব থাকার সময় বাসকনসেলোসের বহুবিদ প্রকল্পের একটি ছিলো চিত্রকলা আর মুরালের মাধ্যমে জাতির মনকে নান্দনিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। ১৯২২ সালের দিকে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে “বাসকনসেলোস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফর শুরু করেন, সঙ্গে ছিলেন বুদ্ধিজীবীদের একটি দল যেখানে বাদ যাননি চিত্রশিল্পীরাও;”
    (Raquel Tibol, Diego Rivera: Luces Y sombras, Lumen, Mexico. 2007, P-52)

    দেশের প্রথম সারির চিত্রশিল্পীদেরকে দিয়ে তিনি চেয়েছিলেন গোটা দেশের ধর্মীয় স্থাপনা ও শিক্ষানিকেতনগুলোকে মুরালের রংয়ে রাঙিয়ে দিতে। কিন্তু কাজটা সহজ ছিলো না তার পক্ষে। কারণ প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্ব একটা জগত আছে, আছে পছন্দ অপছন্দের দ্বন্দ্ব। আরও একটা বড় ঘটনা হলো এই যে ঐ সময়টাই রিবেরাসহ আরও কয়েকজন শিল্পী মেহিকোর কম্যুনিষ্ট পার্টিতে (PCM) যোগ দিয়েছিলেন। রিবেরার বামপন্থা এতটাই তীব্রতায় ভরা ছিলো যে এক সময় তিনি মেহিকোরই মুরাল শিল্পী দাবিদ আলফারো সিকেইরোসের সাথেও তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সুতরাং বাসকনসেলোসের সাথে একটা সংঘাত যে অবশ্যম্ভাবী ছিলো তা, সহজ হিসেবেই অনুমান করা সম্ভব। এ ছিলো কেবল সময়ের ব্যাপার। রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য আর এই পার্থক্য থেকেই পরস্পরের মধ্যে শিল্পচিন্তার ক্ষেত্রেও দেখা দিতে শুরু করে রুচির ভিন্নতা। মূলত এই পার্থক্যগুলোই তাদের মধ্যেকার বিরোধকে ঘনীভুত করে তোলে। রিবেরা ছিলেন উন্মুক্ত তরবারির মতোই ঝকঝকে আর শানদার এক কম্যুনিস্ট, তার উপর স্বঘোষিত নাস্তিকতার আলো এসে পড়ায় তা হয়ে উঠেছিলো আরও বেশি চোখ ধাঁধানো ও বেপরোয়া। অন্যদিকে, বাসকনসেলোস ছিলেন তার উল্টো পিঠ, অক্তাবিও পাসের ভাষায়:
    “তিনি চেয়েছিলেন লাতিন আমেরিকাকে বৈশ্বিক সংস্কৃতির এমন একটি ভিত্তি হিসেবে তৈরি করতে যেখানে পূর্ব ও পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ উপাদানগুলোর মিলন ঘটবে। বিপরীতে, শিল্পী ও অন্যান্য বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী যখন মার্ক্সবাদের দিকে ছুটে গেছেন তখন এর প্রতি ঘৃণাবশত বাসকনসেলোস গেছেন ক্যাথলিকবাদের দিকে।” (Selden Rodman, Tongues of Fallen Angels, New Directions, USA, 1974, P-138)

    মার্ক্সবাদ নয়, বরং ক্যাথলিকবাদ বা ধর্মকেই কেন্দ্রে রেখে বাসকনসেলোস তার ভাবনার বিন্যাস ঘটিয়েছিলেন। তবে সে ধর্মবোধ কোনো গোড়ামিতে পূর্ণ ছিলো না, বরং তা অপরাপর ধর্মগুলোর মানবিক ধারণার সম্মিলনে ছিলো উদার। উদারতা সস্ত্বেও চরিত্র ও রুচির এই ভিন্নতাই পরস্পরকে বিরোধের দিকে নিয়ে গেছে। রিবেরা যদিও বাসকনসেলোসের আমন্ত্রণে যোগ দিয়েছিলেন গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে, কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়ই রিবেরা আঁকলেন এমন এক মুরাল যা দুজনের সৌজন্যের সম্পর্কেই কেবল ছিন্ন করেনি, অধিকন্তু জন্ম দিয়েছিলো এক বিতর্কের। চিলেতে যেমন নেরুদা এবং বিসেন্তে উইদোব্রোর মধ্যে বিবাদ দেখা দিয়েছিলো রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে, এখানেও, রিবেরার ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি রবীন্দ্রনাথ। যদিও রিবেরার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য অবশ্য বাসকনসেলোসই ছিলেন। তবে বাসকনসেলোসকে আক্রমন করতে গিয়ে তিনি লাতিন আমেরিকার সে সময়কার কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকেও আক্রমনের অংশভাগ করে তুলেছিলেন।
    ১৯২৮ সালে আঁকা রিবেবার ‘জ্ঞানীরা’ (Los sabios) নামের এই শিল্পকর্মটিতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কথা আমাদের জানা ছিলো না। এর কথা আমি প্রথম জানতে পারি মেহিকোর কবি কার্লোস পেইয়িসেরকে ১৯২৭-২৮ সালে লেখা রিবেবারই বন্ধু ও সহপাঠী শিল্পী রবের্তো মন্তেনেগ্রোর একটি চিঠি পড়তে গিয়ে। মন্তেনেগ্রো চিঠির এক জায়গায় বলছেন:
    “শেষ পর্যন্ত গনশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কিছু প্যালেন আঁকা হয়েছে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের সামনে হাতির উপর বসা লিসেনসিয়াদোর( এখানে ‘লিসেনসিয়াদো’ বলতে হোসে বাসকনসেলোসকে বুঝানো হচ্ছে) পেছনদিকটা দেখা যাচ্ছে আর তার হাতের পালক-কলমটি একটা সুন্দর ফুলে রূপান্তরিত হয়ে আছে। এটা তোমাকে মজার বিষয় হিসেবে বলছি না, বরং ঘটনা হিসেবে বলছি।”
    মন্তেনেগ্রোর চিঠিতে ‘মজার’ এবং ‘ঘটনা’ শব্দ দুটিকে আলাদা করে বুঝতে গিয়েই এই চিঠির পাদটিকায় আমার চোখ আটকে যায়। চিঠিগুলোর সম্পাদক বলেছেন এই ছবিটি দিয়েগো রিবেবার আঁকা। বিরেরা রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছিলেন এটা নিশ্চয়ই কেবল মজার ব্যাপারই নয়, একটা ঘটনাই বটে। কিন্তু রিবেরার মতো পাড় কমুনিষ্ট কোন কৌতুহল থেকে রবীন্দ্রনাথকে বেছে নিয়েছিলেন সেটা না জানলে এই ছবিতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির আসল রহস্যটি বুঝা যাবে না।

    রিবেরার এই ছবিতে মোট পাঁচটি প্রধান চরিত্র রয়েছে, আর এদের পেছনেই রয়েছে আরও পাঁচটি গৌন চরিত্র যারা কৌতুহলী সাধারন মানুষ। পাঁচটি প্রধান চরিত্রের মধ্যে আছেন এসেকিয়েল আদেওদাতো চাবেস (১৯ সেপ্টেম্বর ১৮৬৮-২ ডিসেম্বর ১৯৪৬)। এসেকিয়েল দুবার র‌্যাক্টর হয়েছিলেন মেহিকোর প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় উনাম (UNAM)-এর। উনামকে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমতুল্য করতে চেয়েছিলেন তার কাজের মাধ্যমে। মেহিকোর আগুয়াস কালিয়েন্তেস রাজ্যে গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থিত আছেন মেহিকোর আধুনিক ধারার কবিতার প্রধান পুরুষ হোসে হুয়ান তাবলাদা (৩ এপ্রিল ১৮৭১-২ আগস্ট ১৯৪৫)। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, চিত্রসমালোচক, সাংবাদিক এবং কূটনীতিবিদ। মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে জাপান, ফ্রান্স, একুয়াদর, কেলোম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। স্পানঞল সাহিত্যে তিনি হাইকু রীতির প্রবর্তক। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বহু লেখক সম্পর্কে যেমন লিখেছেন তেমনি অনুবাদও করেছেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারার নন্দনতত্ত্বের মিশ্রনের ফলে তার কবিতা হয়ে উঠেছিলো নতুন ধরনের প্রকাশ। গিয়োম এপোলেনিয়ারের পাশাপাশি সময়েই তিনি স্পানঞল কবিতায় ইডিওগ্রামেরও প্রবর্তক। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য প্রতিভাবান এই কবি জীবদ্দশাই হয়ে উঠেছিলেন তুমুল আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব।

    তৃতীয় চরিত্র হিসেবে রয়েছেন রুশ বংশোদ্ভুত আর্হেন্তিনীয় অভিনেত্রী ও আবৃত্তিশিল্পী বের্তা সিনহের্মান। গোটা লাতিন আমেরিকাতেই বের্তা তখন জননন্দিত এক শিল্পী। স্পানঞলভাষী বহু কবির কবিতা আবৃত্তির জন্য তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো গোটা মহাদেশে।

    চতুর্থ চরিত্র বাসকনসেলোস । তাঁর পরিচয় আগেই দেয়া হয়েছে। এই চরিত্রটিকে কেন্দ্র করেই রিবেরা তার ছবি’র অন্য সব চরিত্রগুলোকে জড়ো করেছেন।

    পঞ্চম চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু আশ্চর্য এই, রবীন্দ্রনাথকেই তিনি বসিয়েছেন অন্য সবার কেন্দ্রে। ছবিটি দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরেই বিশিষ্ট চার ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি।

    রিবেরার আঁকা ‘জ্ঞানীরা’ নামক মুরালের এই প্যালেনটি যে তিনি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এঁকেছিলেন তাঁর প্রমান পাওয়া যাবে মানুয়েল আগিলার-মোরেনো এবং এরিকা কাব্রেরার লেখা দিয়েগোর জীবনীর একটি অংশে:
    “‘জ্ঞানীরা’ এবং ‘ধনীদের রাত’ শীর্ষক প্যানেল দুটোয় রিবেরা সেইসব বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের এঁকেছেন যারা, তাঁর মতে, মেহিকোর বাস্তবতা সম্পর্কে অসচেতন। তাঁরা হলেন দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ হোসে বাসকনসেলোস, তার তখনকার বান্ধবী লেখিকা আন্তোনিয়েতা রিবাস মের্কাদো, কবি হোসে হুয়ান তাবলাদা, শিক্ষা-উপসচিব এসেকিয়েল চাবেস, বিখ্যাত ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাসকনসেলোসকে আঁকা হয়েছে সাদা এক হাতির উপর বসা অবস্থায়, যে-হাতিটি প্রতিনিধিত্ব করছে তাঁর ভাববাদী প্রকল্পগুলোর–বসে আছেন দর্শকের দিকে পিঠ দিয়ে। বাসকনসেলোস ছিলেন নেতৃস্থানীয় সেই সব ব্যক্তিত্বদের একজন যিনি মেহিকোতে গণশিক্ষা কার্যক্রম এবং মুরাল আন্দোলনের কৃতিত্বের অধিকারী। বাসকনসেলোসের অর্থানুকূল্যে গঠিত এই মুরালসমুহের কমিশনে রিবেরাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কিন্তু রিবেরা এখানে তাকে একজন রক্ষণশীল ও হৃতগৌরবসম্পন্ন এক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন ”
    ( Manuel Aguilar-Moreno and Erika Cabrera, Diego Rivera: A Biography, Greenwood, 2011, P-39)

    সর্বহারা শ্রেণীর স্বপ্নের রাজত্ব কায়েম করার জন্য দিয়েগো বাম রাজনৈতিক আদর্শের দ্বারা তীব্রভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্প সাহিত্যকেও তার সহযোগী শক্তি হিসেবে আশা করতেন, যেমনটা এক সময় রাশিয়ায় সর্বহারাদের উদ্ধারের নামে গড়ে উঠেছিলো দলীয় সাহিত্য(Party Literature)। রিবেরা তার নিজের চিত্রকলা ও মুরালে শ্রমজীবী ও সর্বহারা শ্রেণীর স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার এক রূপকার ছিলেন। যারা এই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার রূপকার নন, কিংবা নন সর্বহারা শ্রেণির পক্ষে উচ্চকিত তাঁরা যে রিবেরার কাছে বুর্জোয়া লেখক-বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত হবেন–এটাই ছিলো স্বাভাবিক।

    রিবেরার এই ছবিটি ছিলো মেহিকোর গোটা ‘বুর্জোয়া’ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি এক তীব্র সমালোচনা। আর এই সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথও।

    সেনোবিয়া-হিমেনেথ, হোসে বাসকনসেলোস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো প্রমুখদের আনুকূল্য, চর্চা ও অনুবাদে বিশের দশকে শুধু মেহিকোতেই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকাতেই আইকনিক (Iconic) ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বহু লেখক ও সাধারণ পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন এক অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে অবস্থান করছিলেন। রিবেরা এসব ঠিকই লক্ষ্য করেছিলেন। তা না হলে আর কোনো বিদেশি লেখক নন, রিবেরা কেন বেছে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকেই উক্ত চার প্রতিভার মাঝখানে? খোদ মেহিকোতেই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বাসকনসেলোসের প্রকল্পের অধীনেই রবীন্দ্রনাথের চারটি বইয়ের একটি সংকলন বেরিয়েছিলো। এটি ছাড়াও বেরিয়েছিলো ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম’ নামে আরও একটি বই। আর এই সব প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞার মতো সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। মেহিকোর বাইরে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও রবীন্দ্রনাথের কাল্ট-ফিগার হয়ে ওঠার সংবাদও তিনি নিশ্চয়ই জানতেন। এই জানার কারণেই হয়তো তার একচোখা বামপন্থী মন তিতিয়ে উঠে থাকতে পারে। রবীন্দ্রনাথকে বাসকনসেলোস তাদের জাতির মনোগঠনের ক্ষেত্রে অনুকূল মনে করলেও, রিবেরা তাকে দেখেছেন ঠিক বিপরীত অবস্থান থেকে। আর এই কারণেই বাসকনসেলোসের পাশাপাশি নিধন করেছেন তাঁর ভাবনা-গরু রবীন্দ্রনাথকেও। শুধু নিধনই নয়, এমনকি হাস্যকর দেখবার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের মাথায় তিনি একটি ফানেলও বসিয়ে দিয়েছেন। রিবেরার অসহিষ্ণু মন থেকে রেহাই পাননি তারই এক সময়কার পৃষ্ঠপোষক বাসকনসেলোসের ভাবমূর্তিটিও। দর্শকের দিকে বাসকনসেলোসের পৃষ্ঠদেশ এঁকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সর্বহারা শ্রেণির ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ঠিক বিপরীতে তার অবস্থান। এমনকি অপমানজনকভাবে চিত্রায়িত করার জন্য তিনি পালকের একটি কলম তার হাতে তুলে দিলেও সেটির মুখ রয়েছে দোয়াতের পরিবর্তে একটি মলপাত্রের দিকে। রেহাই দেননি তিনি এসেকিয়েল চাবেসকেও। আসন হিসেবে ব্যবহৃত বইগুলোর মাধ্যমে রিবেরা এটাই বুঝাতে চাইছেন যে দেশের সত্যিকারের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসেকিয়েলের জন্য বইপত্র কোনো বাঁধা হয়ে উঠছে না। ঠিক একই দৃষ্টি কোন থেকে, অনেকটা তীব্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোন থেকেই এঁকেছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রবল অনুরাগী লায়ার-বাদনে মগ্ন কবি হোসে হুয়ান তাবলাদাকে নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এক চরিত্র হিসেবে। বেচারী বের্তাও রিবেরা-রোষ থেকে মুক্তি পাননি, কারণ তিনি ‘বুর্জোয়া’ কবিদের কবিতার আবৃত্তিকার হিসেবে লাতিন আমেরিকায় তখন জনপ্রিয় এক শিল্পী। সেনোবিয়া-হিমেনেথের অনুবাদে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতাও আবৃত্তি করেছিলেন বলে জানা যায়।

    যত সমালোচনা, নিন্দা আর নিধনকাণ্ডই এর বিষয় হোক না কেন, লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্র-উত্থান ও ভোগের আনুপূর্বিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবেও যে এই ছবির বহুমুখী তাৎপর্য রয়েছে তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। প্রথম তাৎপর্য হচ্ছে, এই ছবির মাধ্যমে রিবেরা প্রথম প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেন বা এক রকম যুদ্ধই ঘোষণা করলেন তাদের বিরুদ্ধে যাদেরকে মার্ক্সবাদের ক্লিশে ও ধুসর পরিভাষায় ‘শ্রেণি শত্রু’ বলে গণ্য করা হতো। রবীন্দ্রনাথ যেন এই শত্রুদেরই একজন। দ্বিতীয় তাৎপর্য হচ্ছে বাসকনসেলোস ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রবল অনুরাগী। মূলত তার উৎসাহ ও উদ্যোগের ফলেই রবীন্দ্রনাথ প্রথমত মেহিকো এবং পরে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার পক্ষপাত ও প্রীতির কথা সবিস্তারে লিখিতভাবে জানিয়েওছিলেন তিনি বিভিন্ন লেখায়। রবীন্দ্রনাথের এই প্রসার ও প্রীতিকে রিবেরার বামাচ্ছন্ন মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথকে তিনি সম্ভবত ভাববাদী এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতেন বলেই এই বিরূপতা । ছবিটিতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন এক সন্তের আদলে। এ থেকেই বুঝা যায় রবীন্দ্রনাথকে তিনি কী ধারণায় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হয়তো আশংকা করতেন রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় ভাবমূর্তি লাতিন আমেরিকার জনগণকে আরও বেশি ধর্মমুখী করে তুলবে। রিবেরার প্রবলভাবে একমুখী মন হয়তো রবীন্দ্রনাথকে তলিয়ে দেখার কোনো সুযোগই পায়নি যে লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্র-প্রসারের মূল কারণ তার ধর্মবোধ ততটা নয়, বরং ভাবনা ও কল্পনার উদারীকরনের পাশাপাশি বিশ্বমানব সম্পর্কে এক সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষার কাব্যময় প্রকাশই ছিলো মূল বিষয়। আর তাই, লেখক বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষকেও যে তিনি আকৃষ্ট করেছিলেন তার একটা বড় কারণ রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণীয় অভিব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের এই আবেদনই তাকে লাতিন আমেরিকায় দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছিলো। রিবেরা এই আবেদনের মর্মে প্রবেশ না করলেও রবীন্দ্রনাথের জনগ্রাহী ভাবমূর্তির খবরটা জানতেন বলেই হয়তো তার ছবিতে রবীন্দ্রনাথকে প্রতিপক্ষের এক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন।

    তৃতীয় একটি তাৎপর্য হচ্ছে এই যে লাতিন আমেরিকার অভ্যন্তরীন সংঘাতের, যে সংঘাতের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ, তারই ঘুর্ণিপাকে আবর্তিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ রবীন্দ্রনাথ বরাবর ফ্যাসিবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর শোষণ-পক্রিয়ার নিন্দা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের এই পরিচয়ের সঙ্গে রিবেরা পুরোপুরি অপরিচিত ছিলেন বলেই ছবিতে তাকে বিতর্কিত এবং প্রতিক্রিয়াশীল একটি চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেন। রিবেরার এই চিত্র আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সমাজতান্ত্রিক চীনে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির সেই সময়টাকে যখন ভুল বুঝাবুঝির এক অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ আরও একবার সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে ভুল বুঝাবুঝির শিকার হলেন সুদূর লাতিন আমেরিকায়। আর হলেন এমন এক ব্যক্তির দ্বারা যিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুরাল শিল্পীদের একজন।

  12. মাসুদ করিম - ১৪ জুলাই ২০১৪ (২:০১ অপরাহ্ণ)

    Tagore has a birthday party in Beijing

    In 1924, while visiting Beijing, Rabindranath Tagore received a pair of precious stones inscribed with his name in Chinese: Zhu Zhendan. The encyclopedia says that Zhendan, meaning the sun that rose after a storm during the day, was what Indians used to call China. Tianzhu, on the other hand, was China’s name for India.

    While giving him the stones, the philosopher and journalist professor Liang Qichao told Tagore that this was a perfect symbol of Sino-Indian unity.

    Tagore celebrated his 63rd birthday in Beijing by attending one of his own plays performed in Chinese. His birthday in May coincided with a longer 49-day tour he was taking of six cities in China.

    He had arrived in the country at a time of some turmoil. The Republic of China had deposed the last emperor from the Manchu dynasty in 1912, but by the 1920s was finding it difficult to retain power, as local military leaders began to fight back. But Tagore’s trip was free of disturbance. He gave six speeches across six cities and returned home duly impressed with both his name and the people he met.

  13. মাসুদ করিম - ২৯ আগস্ট ২০১৪ (৯:৫৯ অপরাহ্ণ)

  14. মাসুদ করিম - ২২ ডিসেম্বর ২০১৫ (১০:০৫ পূর্বাহ্ণ)

    চীনে বিতর্কে রবীন্দ্র অনুবাদ

    রবীন্দ্র কবিতায় যৌন অনুষঙ্গ খুঁজে পেয়েছেন চীনা অনুবাদক ফেং তাং। সেই নিয়ে চীনা ভাষায় তাঁর অনুবাদগ্রন্থ ঘিরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সরকারি সংবাদপত্র ‘চীনা ডেইলি’তে লেখক রেমন্ড ঝাউ বলেছেন, এই অনুবাদ প্রশংসার নয়, হাসির খোরাক। রেমন্ডের কথায়, পেশায় চিকিৎসা জগতের সঙ্গে যুক্ত ফেং সম্প্রতি লেখালিখি শুরু করেছেন। যৌনতাকে উপজীব্য করে লিখে থাকেন তিনি। নিজের লেখালিখির ক্ষেত্রে তা কোনও সমস্যার নয়। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো মহীরুহের লেখার অনুবাদ করতে গিয়ে নিজের মতামত মিশিয়ে দিয়ে কাঁচা কাজ করেছেন তিনি। তিনবার চীনে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তৈরি হয়েছিল চীনে রবীন্দ্র গুণগ্রাহী সমাজ। রবীন্দ্রনাথের লেখা স্কুলপাঠ্য। তাঁর লেখা নিয়ে পঠনপাঠন হয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৯ সালে দেশের চীনের মুক্তির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘আধুনিক চীন গঠনে ৫০ জন’ বিদেশির নাম চেয়ে অনলাইন ভোট করেছিল সরকার। সেই তালিকায় জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম।

    Lust in translation

    By Raymond Zhou (China Daily)

    There’s a fine line between imprinting creative works with unique personality and screaming for attention. Feng Tang just crossed it, when he translated Tagore’s tranquil verse into a vulgar selfie of hormone saturated innuendo.

    Classical literature deserves more than one translation.

    Rarely does one language have the exact equivalent for every word, phrase or concept in another language.

    So even the best translators have to choose what is most important or relevant in the original and attempt to find the expressions in the target language deemed to overlap the most with the original. The choices can be subjective.

    Rabindranath Tagore is Asia’s foremost literary titan, revered throughout the world and very much beloved in China. There are many Chinese versions of his poetry, so it is not surprising one more would appear.

    But a recent take made headlines, not only because the translator is himself a man of letters but also because of the personal spin the translator inserted in the text.

    Stray Birds is a collection of Tagore’s lyrical poems known for their simplicity and sublime beauty.

    The poet published them while he was well into middle age, but they aren’t age-specific. If one has to check to determine the age of the person who wrote a body of verse, I’d say they’re reading a mature poet with no need to follow conventions. The language flows like a mountain stream, with no hint of artificial tinkering or mannerisms.

    Never in a thousand years would I guess there was a horny teenager behind these lines. Thanks to the new Chinese translation, I was jolted out of my complacency.

    The translator, Feng Tang-the pen name of Zhang Haipeng-is considered a crossover wunderkind. He was a medical professional by training but veered toward management consulting after getting a Master of Business Administration at Emory University. Deep in his heart, he probably always wanted to be a master of literature.

    Above all, he comes across as a testosterone-driven lad obsessed with one thing and one thing only. That’s not a problem when he writes his own novels and poems.

    But this time, he’s translating someone else’s words as if they were his own. Take this line: “The great Earth makes herself hospitable with the help of the grass.” Feng’s rendition is: “Because of green grass, the great Earth becomes quite horny.”

    Does “hospitable” in this context carry an active sexual innuendo?

    Dumb as I am, I honestly cannot fathom it.

    But in the eyes of someone proud of his “bulge”, it must be an implication waiting to be taken aboveground.

    As a matter of fact, “bulge” is a buzzword that seeps into all of Feng’s writings, including his translations, to the point the mere mention of the word becomes associated with him. It has become his de facto trademark.

    Now, the translation of this next line has turned into an instant classic, for ridicule rather than for appreciation. Tagore’s original says: “The world puts off its mask of vastness to its lover. It becomes small as one song, as one kiss of the eternal.” But Feng’s take is: “The wide world unzipped its crotch to its lover. Long as a tongue kiss, small as a line of a poem.”

    As with all translation, you gain some and you lose some.

    The previous Chinese version, published in the 1920s, was brushed aside by Feng as too flat. It sticks very closely to the original except for the title of the collection. Instead of Stray Birds, it translates as Flying Birds instead-a moot point noticed by Feng.

    Strangely, he didn’t change that.

    Rather, he sprinkled lines with sexual imagery.
    Feng also adopted some strange tactics, such as highlighting a word or two by putting them in separate lines of their own-words that are part of a flowing sentence in the original text.

    Most dubious of all, the choice that convinced me of his mediocrity, is his insistence on rhyming.

    He had stated earlier that a poem without rhyme is not really a poem. For me, this is tantamount to saying dance without ballet moves is not really dance.

    A professional writer who holds this belief falls into the category of craftsperson.

    I hope someone proves me wrong, but I firmly believe that we’re way past the rhyme-or-no-rhyme debate and, though it may defy definition, we know a poem when we read it.

    Worse still, Feng’s rhyming lines are often limericks at best. They do not carry the internal rhythm that goes with ancient verses.

    He often includes words wildly disparate in style ostensibly for the purpose of rhyming. The result is a hodgepodge with potential for a comedian’s material. If he had called it a spoof of Tagore, it would be judged as competent-perhaps even brilliant.

    Yet, what Feng lacks is a sense of self-deprecation, which I consider a sign of maturity for a great writer or a good comedian.

    He has this look-at-me attitude that smacks of colossal insecurity. Once he was asked to write a preface for famed sexologist Li Yinhe. Feng turned in a piece all about how great he was, without a single word about Li or her book.

    His swipe at Han Han, another crossover whiz kid, was redolent of jealousy.

    Han talks more about his auto racing than about his writing, which raised Feng’s suspicions.

    But Han positions himself as an entertainer more than a serious writer and he is treated and paid as such.

    Feng wants to possess both-the weight of a serious writer and the popularity of a mass entertainer.

    He should be reminded that writing is a lonely profession. You don’t see Mo Yan or Yu Hua flaunting their romances or being portrayed on the big screen as the object of affection by screen goddess Fan Bingbing.

  15. মাসুদ করিম - ২৭ মে ২০১৬ (১২:১১ পূর্বাহ্ণ)

  16. মাসুদ করিম - ৫ ডিসেম্বর ২০১৬ (৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ)

    China publishes Tagore’s collected works in Chinese

    China has recently published the collected works of the Bengali Nobel Laureate Rabindranath Tagore in Chinese, according to reports reaching in the city, reports BSS.

    It is a 33 volume labour of love by Chinese-Bengali experts in collaboration with the Bengali service of China Radio International (CRI) and encompasses the poet’s poems, songs, essays, letters, novels and short stories.

    However, this is not the first translation of Tagore in Chinese. In the ’90s a translation of Tagore’s selected works were published in China.

    In his life time Tagore visited China several times and had a great impact on Chinese intellectuals and society, which has not waned over the ages.

    The complete works of Tagore have been translated directly from Bengali into Chinese on the occasion of the poet’s birth anniversary by the efforts of Professor Dong Youchen, a professor at the Center for South Asia Studies, Beijing Foreign Studies University.

    The project took a dedicated team of 17 translators nearly six years. They include Mrs. Yu Guangyue, Director of the Bengali Language Service of China Radio International (CRI); Prof. Bai Kaiyuan, Prof.Shi Jingwu, Madam Zhong Shaoli at the CRI Bengali Service, Pan Xiaozhu, a veteran reporter of the Xinhua News Agency and Liu Yunzhi, an official at the Chinese Ministry of Foreign Affairs. .

    The writings of Tagore are extremely popular in China even today and it shows the great love and high esteem with which the Chinese people view him and his writings. In the words of Professor Dong Youchen, Tagore “not only built up deep friendship with renowned Chinese literary figures, but also exerted significant influence on many Chinese writers.” Dong said, “When we read him, we don’t feel it is foreign literature; we feel it is our own story. He had a great love for China.

    In 1881 as a teen, the Nobel Laureate wrote an essay on the opium trade in China, expressing deep sympathy for the Chinese. He also had a strong sense of justice. Though drawn to Japanese art and culture, he strongly condemned the Japanese attack on China. When someone tried to justify it by calling it a process to unify Asia, he called it wrongful aggression.”

    As Mrs.Yang Wei Ming, a CRI Bengali presenter and translator put it “Chinese readers got familiar with the unique writings of Rabindranath Tagore through the English translations of Tagore’s works in the early twentieth century. The translation process of Rabindra literature directly from Bengali to Chinese language began with the hands of Bengali experts of China Radio International in the middle of 1970s”.

    Rabindranath Tagore was very popular in China. As a poet he had significant impact on China’s literature. Chinese is the language which has done the most for Tagore’s publications, second only to Indian languages and English.

    Prof. Bai Kaiyuan, veteran presenter of CRI Bengali Service, is a well-known translator of Rabindranath Tagore’s major literary works. He has translated 17000 lines of Rabindranth Tagore’s poems, essays and novels in Chinese for his love for Tagore. He received the second prize for his translated writing “Taigeer shi xuan” awarded by China Radio International in 1999. Another senior presenter of CRI -Bengali Service Prof. Shi Jingwu, a renowned scholar, also translated the literature of Rabindranath Tagore into Chinese.

    Praising Tagore’s songs, Chen Aiming, the President of the World Music Society of Chinese Musicians Association, said: “There had been many publications of Tagore’s literary works but hardly any musical works and it is the first grand celebration for his achievements in music, which reflected Chinese people’s admiration for Tagore and the ever-deepening friendship between China and India.”

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.