এখন ইউনূসকাহনের সূত্র ধরে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি বাংলাদেশে তাদের আকাঙ্ক্ষিত কথিত রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তোলার আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে, আমরা উপনীত হয়েছি কথিত রাজনৈতিক বিকল্প-অনুসন্ধান পর্বের দ্বিতীয় অধ্যায়ে।[...]

এখন ইউনূসকাহনের সূত্র ধরে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি বাংলাদেশে তাদের আকাঙ্ক্ষিত কথিত রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তোলার আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে, আমরা উপনীত হয়েছি কথিত রাজনৈতিক বিকল্প-অনুসন্ধান পর্বের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। এই কথিত রাজনৈতিক বিকল্প-অনুসন্ধান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সংগঠিত হয়েছিল ১১ জানুয়ারি বা ওয়ান-ইলেভেন। তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হননি। সামরিক বাহিনীর তৎকালীন প্রধান মইন উ আহমদের বইয়ে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী (আরও অনেক সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে), ইউনূস তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে তার যে পরিকল্পনা রয়েছে তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সীমিত শাসনামলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তাই তিনি দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। ড. ইউনূসই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ফখরুদ্দীনের নাম প্রস্তাব করেন। এর পরের ঘটনাও সবার কমবেশি জানা আছে-সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতাপূর্ণ তত্ত্বাবধায়ক শাসনামলে ইউনূস চেষ্টা করেন রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার। আমাদের সুশীল কাণ্ডারিরা বার বার কমপক্ষে দু বছর সময় চাইতে থাকেন ‘লাইনচ্যুত ট্রেনকে লাইনে টেনে তুলতে’। কিন্তু খুব দ্রুতই ড. ইউনূস বুঝতে পারেন, এই যাত্রায় কাজ হবে না। তিনি তাই সব কিছু ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দিয়ে সাময়িক বিরতি দেন। তার বিবৃতিতে তিনি অবশ্য জানিয়েছেন, যারা তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা তা রক্ষা না করায় তিনি এ উদ্যোগে ক্ষান্তি দিচ্ছেন। কিন্তু ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, প্রস্তুতির জন্যে তিনি ও সুশীলগণ আরও খানিকটা সময় চাইছিলেন। আধুনিক মহাজন ইউনূসকে নির্যাতিত ইউনূস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে জনগণের সহানুভূতি আদায় করার সুযোগ খুঁজছিলেন তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন, সহানুভূতির পাত্র হয়ে উঠেছেন।
এবং এতে কোনও সন্দেহ নেই ড. ইউনূসকে বাংলাদেশের প্রাণভোমরা হিসেবে প্রমাণ করার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সুশীল সমাজ যা-যা করা সম্ভব তার সবই করবে।
কিন্তু ড. ইউনূস সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে এখন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? হয়তো এটি সঠিক প্রশ্ন নয়, কেননা আসলে ড. ইউনূস নন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। এই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এখন ব্যবহার করতে পারে দুটি উপায়ে : হয় দেশটিতে ইসলামী জঙ্গিবাদকে চাঙ্গা করে তুলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দিয়ে; নয়তো নতুন একটি বিকল্প রাজনৈতিক চরিত্র ও দল দাঁড় করিয়ে। এই দুটি পথই খুব কঠিন সাম্রাজ্যবাদীদের জন্যে। কেননা জঙ্গিবাদ যুক্তরাষ্ট্রকেও ছোবল মারতে পারে, অন্যদিকে বাংলাদেশে ধর্মজ রাজনীতিবিরোধী স্রোতও অনেক শক্তিশালী। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দক্ষিণ এশিয় মিত্র ভারতও এ পন্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী নয়। আবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের জালে জনগণের একটি বড় অংশকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছে যে, রাজনৈতিক একটি বিকল্প রাজনৈতিক চরিত্র ও দল দাঁড় করানোর কাজটি মূলত বিপ্লবাত্মক কাজ। তারপরও বহুদিন আগে থেকেই সাম্রাজ্যবাদীরা বাংলাদেশে তাদের একজন প্রতীকী ব্যক্তিত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সেই প্রতীক ছিলেন না, বামপন্থীদের কারও সেরকম প্রতীক হয়ে ওঠার তো প্রশ্নই ওঠে না-শেষ পর্যন্ত তারা তাদের প্রতীকী ব্যক্তিত্ব হিসেবে খুঁজে পেয়েছে ড. ইউনূসকে। অন্তত খানিকটা কথা ঠিকই বলেছেন অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন-‘এই মুহূর্তে পাশ্চাত্যকে মুহাম্মদ ইউনূসের যতটা প্রয়োজন, তারচেয়ে পাশ্চাত্যের বেশি প্রয়োজন ইউনূসকে।’ বাংলাদেশের সুশীলআবিষ্ট মধ্যবিত্ত শ্রেণী মুখিয়ে উঠেছে তাঁকে শাসক হিসেবে পেতে। আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যবহার এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নর্তন-কুর্দনে ঢোলের বারি হয়ে দেখা দিয়েছে, তারা সুশীল দৈনিকগুলিকে কেন্দ্র করে নিজেদের নর্তন-কুর্দন দেখিয়ে চলেছে দেশবাসীকে।

অতএব এই ইউনূসকাহনকে গুরুত্বহীন ভাবার কোনও কারণ নেই। পৃথিবীতে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটে যখন বাঘ ও ছাগলকে একঘাটে পানি খেতে দেখা যায়, যখন সাপ ও বেজিকে একই গুহায় চোখ বুজে ঘুম দিতে দেখা যায়, যখন মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও খালেদা জিয়া-ফরহাদ মজহার-শফিক রেহমানদের একই বিষয়ে একই ভঙ্গিতে উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়। এখন, পৃথিবীতে সেরকম একটি ঘটনা ঘটছে-খালেদা জিয়া, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ফরহাদ মজহার আর শফিক রেহমানরা সমভঙ্গিতে, সমপরিমাণে উদ্বিগ্ন – কেননা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।|
খালেদা জিয়া এখন বলছেন, এ সরকার সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান দিতে জানে না। তার সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের উপযুক্ত সম্মান দেবে। তাকে আমরা বলতে শুনছি, ড. ইউনূস অবৈধ হলে এই সরকারও অবৈধ। বলা হচ্ছে, বিচার বিভাগ এই সরকারের হাতের মোয়া।
আর ড. ইউনূসকে নিয়ে খোদ সরকারের দেউলিয়াত্বও কম নয়। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তাঁর দুই হাতে তেল মেখে নাকে পিয়াজ দিয়ে কাঁদতে বসেছেন, নোবেল পুরস্কার তো শেখ হাসিনা আর সন্তু লারমার পাওয়ার কথা ছিল! সরকারের যেখানে উচিত ড. ইউনূসের বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়মগুলি উন্মোচন করা, সেখানে তারা এই ধরণের বালসুলভ কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে প্রতি পদে পদে প্রমাণ করছেন, বিশ্বের বিভিন্ন ভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি পেতে পেতে শেখ হাসিনা এখন নোবেল পাওয়ার জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছেন।
অথচ এই নোবেল শান্তি পুরস্কারের অন্তর্নিহিত রাজনীতি কে না বোঝে? ড. ইউনূসের আইনজীবী রোকনউদ্দিন কয়েকদিন আগে বলেছেন, নোবেল পুরস্কার কি গাধারা পায়? এর উত্তর অবশ্য রোকনউদ্দিনেরও জানা আছে-গাধারা পাবে কেন? এই পুরস্কার পান সর্বোৎকৃষ্ঠ ঘৃণ্য ব্যক্তিরা। কে না বোঝে, কেন এই পুরস্কার পান হেনরি কিসিঞ্জার, কেন পান আইজাক রবিন আর শিমেন পেরেজ, কেনই বা পান কোনও কিছুই না করে বারাক ওবামা! ড. ইউনূস তো সে পুরস্কার পেতেই পারেন।
‘মুই কি হনু রে’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে বাংলাদেশেই, আরও একটি কথা আছে-‘ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা’। এই দেশে এখন একজন ‘মুই কি হনু রে’ দেখা দিয়েছেন, তিনি ড. ইউনূস, যার নোবলেপ্রাপ্তির দিনটিকে বাংলাদশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সঙ্গে তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখতে হচ্ছে আমাদের নির্বাক চোখে; আরও দেখা দিয়েছে কিছু ‘ছাগলরে তিন নম্বর বাচ্চা’ যারা দুগ্ধ না পেলেও দুগ্ধের সুগন্ধে ও দুগ্ধের প্রত্যাশায় উদ্বাহু নৃত্য জুড়তে পারেন। তাই আমাদের শুনতে হচ্ছে, ড. ইউনূসই নাকি সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং!
মুহম্মদ জাফর ইকবাল এ ব্যাপারে আরেক কাঠি সরেস; তিনি তাঁর ইউনূসসঙ্গীতের শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যাঁরা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের আইনকানুন নিয়ে নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ আলোচনা পড়তে চান, তাদের এ লেখাটি পড়ার প্রয়োজন নেই।’ এরকম একজন মানুষের কাছ থেকে ছাত্রছাত্রীরা একটা শিক্ষাই পেতে পারে, তা হলো কোনও কারণ ছাড়াই কারও প্রতি মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার শিক্ষা। লেখাটি তাই তার সংবিধি সতর্কীকরণের পরও মনযোগ দিয়ে পড়ে দেখেছি। তাতে দেখা গেল, ইউনূসের প্রতি তাঁর এত মোহের কারণ, ‘আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিদেশের মাটিতে কী নিষ্ঠুরভাবে তাচ্ছিল্য এবং অসম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়… মুহাম্মদ ইউনূস একা সেটিকে কত বড় একটি মর্যাদার আসনে নিয়ে গেছেন।’ লিখেছেন তিনি, ‘সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশ পৃথিবীর সামনে পরিচিত হতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। এই সরকার বিশ্বাস করুক আর নাই করুক এই দশকে পৃথিবীতে বাংলাদেশ পরিচিত হয় প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে দিয়ে।’
এই বাক্যগুলি সত্যিই হতবাক হওয়ার মতো। মুহম্মদ জাফর ইকবাল হয়তো জানেন না, এখনও বাংলাদেশকে বিদেশের মাটিতে নিষ্ঠুরভাবে তাচ্ছিল্যই করা হয়। কেননা বিদেশীরা জানে, এ দেশের জনগণ না চাইলেও রাজনীতিকদের একটি অংশ দেশকে জঙ্গি বানানোর জন্যে সদা তৎপর; বিদেশীরা জানে, এ দেশে এমন এক শ্রেণির বিশাল গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রয়েছে, যারা বিদেশে কাপড় ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করলেও নারী শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি দিতে নারাজ, ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগলে পুড়ে মরা ছাড়া কোনও পথ খোলা নেই এই নারী শ্রমিকদের; এই বিদেশীরা এটাও ভালো করে জানে, ১০০ টাকার ঋণ নিলে একজন নারীকে ৪৫ টাকা সুদ দিতে হয় গ্রামীণ ব্যাংককে এবং সেই ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি ন্যুনতম সহানুভূতিও নেই কোনও বিদেশীর। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালরা তো কেবল গুটিকয় একাডেমিক ও স্বার্থবাদী বিদেশীর সঙ্গে মেশেন-পাঠক ও অ্যাকটিভিস্ট বিদেশীদের সঙ্গে মিশলে এই ভ্রান্ত ধারণা তার মনে হয়তো জন্ম নিতো না। বাংলাদেশের মানুষদের নানা কিসিমের বিদেশীরা তাচ্ছিল্যের পাশাপাশি তবুও শ্রদ্ধা করে, কারণ, এত কিছুর পরও এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে, তাই দারিদ্র দূর করার জন্যে বিমানের চাকায় করে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি নেয় এবং মৃত্যুবরণ করে, বিদেশে অবৈধভাবে বসবাস করেও প্রতি মাসে দেশের স্বজনের কাছে টাকা পাঠায়। ঠিকই লিখেছেন জাফর ইকবাল, বাংলাদেশকে একসময় বিদেশীরা শেখ মুজিবের নামে চিনতো আর এখন চেনে ইউনূসের নামে; তবে তফাৎ হলো, তখন বাংলাদেশের নাম শুনলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাঁতের পাটি শক্ত হয়ে উঠতো (মুজিব হত্যার পর সেই দাতেঁর পাটি নরম হতে শুরু করে), আর এখন বাংলাদেশের নাম শুনলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কিছু শক্ত হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবের নামে পরিচিত বাংলাদেশ বিদেশীদের কাছে ছিল মুক্তিকামী অদম্য স্বপ্নচারী মানুষদের আবাসভূমি; আর ইউনূসের নামে পরিচিত বাংলাদেশ বিদেশীদের কাছে এমন একটি দেশ যে-দেশটির অধিবাসীরা অচিরেই নিজেদের গ্রামে বসে চা খেতে খেতে ড. ইউনূসদের তত্ত্বাবধানে ওয়ালমার্টের পাহারাদারি করবে, যে দেশের প্রবালদ্বীপ ও সমুদ্রবন্দরটিকে অচিরেই সাম্রাজ্যবাদীদের ইচ্ছে অনুযায়ী সাজানো হবে, যে দেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদকে সামাজিক ব্যবসায়ের মাধ্যমে আহরণ করা হবে। বিদেশীরা তো আর আমাদের দেশের কথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নয়-তারা ভালো করেই জানে, নোবেল শান্তি পুরস্কার কেন দেয়া হয়, কাদের দেয়া হয়। তারা তাই এটুকুও বোঝে, বাংলাদেশে এখন এমন একজন ব্যক্তিত্ব পাওয়া গেছে, যাকে দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সাম্রাজ্যবাদের ঘানি টানানো যাবে। বাংলাদেশকে এখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিরাপদ মনে করে, সপক্ষের মনে করে, তাদের কর্মের উপযোগী মনে করে-শেখ মুজিব যে-কাজটি করতে পারেননি, ইউনূস সেটি করেছেন, একাই করেছেন এবং মর্যাদাজনকই বটে! মর্যাদা বলতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল আসলে কী বোঝেন, তা আমরা এখন একটু-একটু বুঝতে পারছি। আর তাঁকে তো দরিদ্র নারীদের মতো প্রতি সপ্তাহে ঋণ শোধ করতে হয় না। একদা বাঘের গলায় কাটা ফুটিয়াছিল, মুর্খ বক সেই কাটা তুলিয়াছিল, সে যে বাঁচিয়া আছে, ইহাই তো বড় পুরস্কার। বাংলাদেশের গ্রামের স্বামী-শ্বশুর-দেবরের কিল-গুড়ি-লাথি খাওয়া মহিলাদের যে গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ দেয়, এটিই তো বড় ঘটনা-১০০ টাকায় ৪৫ টাকা সুদ দিতে হয়, এটি কোনও ব্যাপার না কি? তিনি কখনোই বুঝতে পারবেন না, একশ টাকায় ৪৫ টাকা সুদ দিতে মাসের কয়দিন যায়। তিনি তাই খুবই ক্ষুব্ধ ইউনূসকে শেখ হাসিনা গরীবের রক্তচোষা বলায়। অথচ আশি-নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে বাংলাদেশে অনেকেই গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যবক্ষেণ করে যে-মূল্যায়ন করে আসছনে, তার সারমর্ম হলো ড. ইউনূস একজন আধুনিক সুদখোর মহাজন। দুঃখ লাগে, বদরুদ্দীন উমররা প্রাপ্য মর্যাদা পেলেন না। কতবার বদরুদ্দীন উমর এই কথা বললেন, কেউ গায়েই মাখল না-অথচ হাসিনা একবার না দুইবার বলতেই ‘হা রে রে রে’ করে তেড়ে এলো মুহম্মদ জাফর ইকবাল থেকে শুরু করে ফরহাদ মজহার।

বলাই বাহুল্য, নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের আভাসই দেখা যাচ্ছে এই ইউনূসকাহনের মধ্যে দিয়ে। যে-কীর্তির লেজ ধরে ড. ইউনূস প্রতীক হয়ে উঠেছেন সেই মাইক্রোক্রেডিট-এর ব্যবসা বাংলাদেশে আরও অনেকেই করেন, ইউনূসের আগে থেকেই করেন, যেমন ব্র্যাকের ফজলে হাসান আবেদও করেন, কিন্তু ফজলে হাসান আবেদ ড. ইউনূসের চেয়েও গভীর জলের মাছ, তিনি তাই মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে ইউনূসের মতো লাফালাফি করেননি (হয়তো তিনিই অদূর ভবিষ্যতে হবেন ব্যর্থ ইউনূসের সফল উত্তরাধিকার); কিন্তু ইউনূস করেছেন। ইউনূসের মধ্যে যে-দানব বসবাস করে, সেই দানব পল্লবিত হয়েছে গ্রামীণ শব্দযুক্ত আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তির মধ্যে দিয়ে। ইউনূস এমন ব্যবস্থা করেছেন, যার ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও নাকি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে! এরকম একজন মানুষ ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেননা তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে! আমাদের বলা হচ্ছে, মার্কনি যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইউনূসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হোক। বার বার মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে, তিনি নারীদের ক্ষমতায়ন করেছেন। কিন্তু আমাদের বলতেই দেয়া হচ্ছে না যে, নারী নেতৃত্বকে হারাম বলার পরও যেমন এ দেশের মৌলবাদীরা খালেদা জিয়ার বৃহৎ ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তেমনি নারীর ক্ষমতায়নের মতো সমিতি করার কথা বলার পরেও ড. ইউনূসরা মূলত অদৃশ্য শক্তির নতুন আজ্ঞাবহ-তাদের কাছে যুদ্ধাপরাধ কোনও ইস্যু নয়, মৌলবাদ কোনও ইস্যু নয়, ক্রসফায়ারে মৃত্যু কোনও ইস্যু নয়। তারা চান কর্পোরটেদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে জিদান দই, জুতা আর বিশুদ্ধ পানির ব্যবসা করতে (ধন্যবাদ আর্সেনিক সমস্যাকে), হাইব্রডি ধানের মোড়ক উন্মোচন করতে, তারা চান রফিকদের স্বপ্ন চুরি করে পরবিশেবান্ধব অটোভ্যান প্রচলনের কৃতিত্ব ও ব্যবসা গ্রামীণ ফান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের বগলের নিচে রাখতে।
তারপরও মুহম্মদ জাফর ইকবালদের এই মুহাম্মদ ইউনূস এখন ঐশ্বরিক ধর্মের সেই দোয়া ইউনূস, যা পড়তে পড়তে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশকে ভয় পেতে হবে না, কোনও বিপদে পড়তে হবে না, হাঙর-কুমীরের খপ্পরে পড়তে হবে না। গ্রামীণ ব্যাংক যে ৪৫ শতাংশ হারে সুদ নিচ্ছে, জোবরা গ্রামের সুফিয়া যে ঋণের ঘোরে মারা গেছে, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও সুশীলগণের তা চোখে পড়ছে না, এমনকি সরকারও এগুলি আমলে নিচ্ছে না। আর একে অপরের সমালোচনা করলেও করলেও কৃপা পাওয়ার আশায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে কি আওয়ামী লীগ, কি বিএনপি। দীপুমনিদের সংবাদ সম্মেলন করে বলতে হচ্ছে, ‘এ ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে কোনও প্রভাব পড়বে না।’ অন্যদিকে, ড. ইউনূস বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন, দেখাচ্ছেন হিলারী ক্লিনটনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কত সুমধুর (রাণী সোফিয়ার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক নাকি সুমধুর, কিন্তু সেই রাণী সোফিয়া এবার অনেক তদবিরের পরও গ্রামীণ সফরে বাংলাদেশে আসতে রাজি হননি, ড. ইউনূসের দলীয় দৈনিকগুলি কিন্তু এ নিয়ে কোনও রিপোর্ট করেনি), ইউনূসের প্রেস উইং সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে এই প্রচারের পেছনে-ড. ইউনূস রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। বলা হচ্ছে, এই কারণে না কি হিলারী তার সফর বাতিল করেছেন, ওবামারও দেখা মিলবে না। অথচ এসব সফর বা সাক্ষাত সবই ছিল প্রাথমিক পর্বে, তা কখনোই চূড়ান্ত হয়নি, এসব ঘটনার অনেক আগে থেকেই ওই সফর ও সাক্ষাৎ ছিল অনিশ্চিত। এইসব কথা প্রচার করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইউনূসদলীয় দৈনিকসমূহ। ড. ইউনূস তার ব্যক্তিসম্পর্ককে ব্যবহার করছেন রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজে পেতে। তাঁর এই ব্যক্তিসম্পর্কের মাশুল বাংলাদেশকে কীভাবে দিতে হবে তা নিয়ে এদের কারও মাথাব্যথা নেই!
আর যে খালেদা জিয়া কিছুদিন আগেও ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের সন্ধান করেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সেই কুশীলবদের আঁতাত খুঁজে পেয়েছেন, তিনি এখন ঘটনাক্রমে এমন এক অবস্থানে যে মনে হচ্ছে এইসব সুশীল কুশীলবদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সখ্য আবারও জমে উঠেছে।
এই সুযোগে বামপন্থীরাও মুখ খুলছেন-শেখ হাসিনার সরকারকে একহাত দেখে নেয়ার এ সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে নারাজ। আমরা যতদূর জানতাম, বামপন্থীরা বুর্জোয়াদের বিভিন্ন দ্বন্দ্বগুলিকে কাজে লাগায় তাদের মুখোশ উন্মোচনের কাজে। সে-হিসেবে, বুর্জোয়াদের বিভিন্ন অংশের মধ্যেকার এই দ্বন্দ্বপর্বটি ড. ইউনূস ও তাঁর ক্ষুদ্র ঋণ, সামাজিক ব্যবসা ইত্যাদি সব কিছুর মুখোশ উন্মোচনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কিন্তু তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন চর্বিত চর্বনে, আওয়ামী লীগ সরকার কেন এরকম একটি কাজ করতে গেল, সেটি বিশ্লেষণ করে ‘এসবে আমাদের কান দেয়ার কোনও দরকার নেই, কেননা আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই এ কাজ করছে’-এরকম একটি উপসংহার টানাই তাদের মূল লক্ষ্য।

অনেক আগে আমরা এক সাহাবুদ্দিনের সন্ধান পেয়েছিলাম, সেই সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আমরা এত আহ্লাদিত হয়েছিলাম শুধুমাত্র তাঁর চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার জন্যেই দেশের সংবিধান পরিবর্তন করে বসেছিলাম। কেউই তাকে বলতে রাজি হইনি, দেশের এমন এক ক্রান্তিকালে আপনাকে দেশের এ দেশের জনগণ এমন একটি পদে আসীন হওয়ার গৌরব দিচ্ছে, এরপরও কেন আপনি নিজের চাকরিজীবনকে সমাপ্ত করাকেই জীবনের মুখ্য ব্রত মনে করছেন? এখন আমরা এক ইউনূসের সন্ধান পেয়েছি, তাঁকে নিয়ে আমরা এতই আহ্লাদিত যে হিলারী ক্লিনটনদের চড়থাপ্পর খেয়ে হলেও তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিকে মহিমান্বিত করতে চাই, তাকেঁ গ্রামীণ ব্যাংকের মহাপরিচালক বানিয়ে রাখতে চাই, যে-সব দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার সবই ঢেকে রাখতে চাই।

অথচ এই আমরাই নাকি চাই, বিদেশে এ দেশের মাথা উঁচু হোক!

অবিশ্রুত

সেইসব দিন স্মরণে,- যখন কলামিস্টরা ছদ্মনামে লিখতেন; এমন নয় যে তাদের সাহসের অভাব ছিল, তারপরও তারা নামটিকে অনুক্ত রাখতেন। হতে পারে তাৎক্ষণিক ঝড়-ঝাপটার হাত থেকে বাঁচতেই তারা এরকম করতেন। আবার এ-ও হতে পারে, সাহসকেও বিনয়-ভুষণে সজ্জিত করেছিলেন তারা। আমারও খুব ইচ্ছে দেখার, নামহীন গোত্রহীন হলে মানুষ তাকে কী চোখে দেখে... কাঙালের কথা বাসী হলে কাঙালকে কি মানুষ আদৌ মনে করে!

৫৯ comments

  1. Pingback: ইউনূসমিতি ২ | প্রাত্যহিক পাঠ

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.