এ লেখা বিজ্ঞাপন বিষয়ে আমার জ্ঞানপনা জাহিরের চেষ্টাজাত নয়। বাংলাদেশে বা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিজ্ঞাপন কতদূর এগিয়ে গেছে, মুগ্ধতাজনিত কারণে সে বিষয়ক বিস্ময়-সমুদ্রে ভেসে তার কোনো রূপরেখা আঁকবার চেষ্টাও এখানে ধরা নেই। একজন সাধারণ সমাজসদস্য হিসেবে বিজ্ঞাপনকে আমি যেভাবে দেখি, বিজ্ঞাপন যেভাবে আমাকে ও আমার পরিপার্শ্বকে নির্মাণ করে উঠতে চায় লেখাটি তারই একটি স্থিরছবি ধারণ করবার প্রয়াস পেয়েছে মাত্র। [...]

"Advertising is legalized lying" -- H.G. Wells এ লেখা বিজ্ঞাপন বিষয়ে আমার জ্ঞানপনা জাহিরের চেষ্টাজাত নয়। বাংলাদেশে বা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিজ্ঞাপন কতদূর এগিয়ে গেছে, মুগ্ধতাজনিত কারণে সে বিষয়ক বিস্ময়-সমুদ্রে ভেসে তার কোনো রূপরেখা আঁকবার চেষ্টাও এখানে ধরা নেই। একজন সাধারণ সমাজসদস্য হিসেবে বিজ্ঞাপনকে আমি যেভাবে দেখি, বিজ্ঞাপন যেভাবে আমাকে ও আমার পরিপার্শ্বকে নির্মাণ করে উঠতে চায় লেখাটি তারই একটি স্থিরছবি ধারণ করবার প্রয়াস পেয়েছে মাত্র। এতে রচয়িতার মনে বিজ্ঞাপনের যে ছবি ডুবে-ভাসে তার একাংশের ভাষিক উপস্থাপনচেষ্টার অধিক আর কিছু লভ্য নয়। এর অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা যাঁর, তাঁর এ রচনাপাঠ এখানেই রহিত হওয়া উচিত। আমরা সবাই জানি, বিজ্ঞাপন হলো কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাপন, বিদিতকরণ, জানানো ইত্যাদি, যার মাধ্যমে সাধিত হয় প্রচার। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন এক ধরনের প্রচার, যদিও মনে রাখতে হয় যে, প্রচারমাত্রই বিজ্ঞাপন নয়। যে প্রচারের সঙ্গে সরাসরি অর্থযোগ নেই, মুনাফা অর্জন যার অন্বিষ্ট নয়, তা নিছক প্রচার, বিজ্ঞাপন নয়। আজকাল অবশ্য মিডিয়ার বরাতে বিজ্ঞাপন ও প্রচারের প্রভেদও ঘুচতে লেগেছে দেখা যায়। যারা মিডিয়াকে প্রচুর বিজ্ঞাপন দেয়, তারা এর মাধ্যমে তো প্রচারিত হয়ই, আবার তাদের এটা-সেটা নিয়ে মিডিয়া খাতিরবশত নানা সংবাদও প্রচার করে, যাতে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড-এর উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আরো প্রচার পায়। যদিও যে ইভেন্টকে ঘিরে সংবাদ গড়ে ওঠে, তা প্রায়শ সংবাদ হবারই যোগ্যতা রাখে না। অনেকটা প্রায় শালা-দুলাভাইসুলভ সম্পর্কসূত্রে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান মিডিয়ার কাঁধে ভর করে দেদারসে পক্ষপাতমূলক প্রচারও চালাতে পারে, চালাচ্ছেও। আর আমরা আমপাবলিক এহেন দ্বিপাক্ষিক দহরমমহরমে হরদম বিভ্রান্ত হচ্ছি। বিজ্ঞাপন হঠাৎ আবির্ভূত আজ বা কালের কোনো প্রপঞ্চ নয়, এর ইতিহাস সুপ্রাচীন। ধারণা করা হয়, যখন থেকে পণ্য বিনিময়ের সূত্রপাত, বিজ্ঞাপনের সূত্রপাত তার সমসাময়িককালেই। মাধ্যম হিসেবে তখন হয়ত ব্যবহৃত হতো মৌখিক ঘোষণা, যে রূপটার প্রায় অবিকলই আমরা অধুনার ফেরিওয়ালাদের মধ্যে দেখি। মৌখিক ঘোষণা থেকে ক্রমশ লিখিত, চিত্রিত ও চলচ্চিত্রিত হয়ে বিজ্ঞাপন আজকের অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ব্রিটানিকা কনসাইজ এনসাইক্লোপিডিয়া মতে, সপ্তদশ শতকে লন্ডনের একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে প্রথম বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, অষ্টাদশ শতকে যার বিস্তার ব্যাপকতর হয়। বিজ্ঞাপন ভয়ানক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে বেশিদিনের কথা নয়। শুরুর দিককার বিজ্ঞাপন নামক নীরিহ প্রপঞ্চটি কোন কোম্পানির কোন পণ্যটি কিনলে লাভজনক হতে পারে…

আমার জানতে ইচ্ছে করে, সরকারের বিজ্ঞাপন নীতিমালা এই বিজ্ঞাপনগুলোকে সমর্থন করে কি না। আর যদি আমাদের চরম দুর্ভাগ্যবশত সমর্থন করেও থাকে, তাহলে আমরা এই অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হব কি না। [...]

আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খুললেই চটকদার নানান বিজ্ঞাপনচিত্র দেখতে পাওয়া যায়। দেশে এখন বিজ্ঞাপনশিল্প গড়ে উঠেছে। হাজার-হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। অবাক করা বিষয় হল: এফডিসি-তে চলচ্চিত্রের যত না কাজ হয়, তার চেয়ে বেশি কাজ হয় বিজ্ঞাপনের। অনেককেই বলতে শোনা যায়, টিভি-অনুষ্ঠান মানুষ দেখে বিজ্ঞাপন দেখার আশায়। আমাদের অনেক বিজ্ঞাপনচিত্র আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে, তাও আমরা জানি। এমনও নজির আছে: আমাদের দেশে বিজ্ঞাপন সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য বিটিভিতে জনসচেতনতা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের আওতায় বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে প্রচারিত হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি সুনির্মাতা আফজাল হোসেন দ্বারা নির্মিত ছিল। ছোট শিশুদের মায়েদের অনুরোধ ছিল, বিজ্ঞাপনটি না শুনলে তাদের শিশুরা খাবার খেতে চাচ্ছিল না। অন্য কথায় আসি। বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত দু'-চারটি বিজ্ঞাপন আমার মনে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। প্রথমে বলি, ভারতীয় কিছু বিজ্ঞাপন, বিশেষত বহুজাতিক কোম্পানি লিভার ব্রাদার্স-এর দু'-একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন, যেগুলো ভারতের শিল্পী ও কলাকুশলীদের দ্বারা নির্মিত, সেই বিজ্ঞাপনগুলোর কথা বাংলায় তর্জমা করে আমাদের এখানে প্রচার করা হচ্ছে। এখন আমার প্রশ্ন: আমাদের এখানে যেহেতু বিজ্ঞাপনশিল্প, মডেল, শিল্পী, কলাকুশলী আছে, সেহেতু ভারতীয় বিজ্ঞাপনগুলো প্রচারের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না। ভারতীয় বিজ্ঞাপনগুলোর মডেলদের পোশাক-আশাকও আমাদের এখানকার পরিবেশের সঙ্গে যায় কি না ভেবে দেখা প্রয়োজন। সম্প্রতি হরলিক্স-এর একটি বিজ্ঞাপনও আমাদের এখানে দেখানো হচ্ছে, যার মোদ্দা কথা হল: এই হরলিক্স পান করলে বাচ্চারা Taller, Sharper and Stronger হবে। এই বিজ্ঞাপন যখন ইউকে-তে দেখানো হয়, তখন এর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় বলা হয়, এটা কীভাবে প্রমাণিত হল যে স্বাভাবিক খাবার খাওয়া শিশুর চেয়ে হরলিক্স পান-করা শিশু Taller, Sharper and Stronger হয়? তখন হরলিক্স কর্তৃপক্ষ বলেছে, আসলে বিজ্ঞাপনটি ভারত-শ্রীলঙ্কা তথা তৃতীয় দুনিয়ার জন্য বানানো হয়েছে এবং ইউকে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ভুল তথ্য দেওয়া বিজ্ঞাপনটি আমাদের এখানে চালানো হচ্ছে। এবার আসি আমাদের এখানে বানানো দু'টি বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গে। প্রথমটি প্রাণ কোম্পানির ফ্রুটো ড্রিঙ্ক নিয়ে। শিক্ষক বাচ্চাদের আম বিষয়ক রচনা লিখতে দিয়েছেন। বাচ্চারা লিখেছে: ‌'এমন একদিন আসবে, যখন আমের ছালবাকল থাকবে না, আঁটি থাকবে না; বোতলবন্দি থাকবে আম। বৈশাখমাসে নয় শুধু, সারা বছরই আম খাওয়া যাবে। সেই আমকে আদর করে ফ্রুটো ডাকবে সবাই।' হায় রে আমার শিক্ষক, হায় রে আমার পাকা আমের মধুর রস!…

বাংলাদেশে এনজিও-কাযর্ক্রম নিয়ে কিছু আশঙ্কা ও প্রশ্ন [...]

এনজিও যে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছায়ার মতো তাদের থাবা বিস্তার করছে তা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা যদি এনজিও-কার্যক্রমের দিকে নজর দিই তাহলে দেখব, স্বাধীনতার পর-পর মাত্র গুটিকয় এনজিও তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। আর এখন তো বাংলাদেশের প্রতি ধূলিকণায় তাদের রক্তাক্ত ছোঁয়া রেখে যাচ্ছে। রুরাল ইকোনোমির প্রায় সবটুকুই তারা তাদের করায়ত্ত করে ফেলছে। তাদের কাজের বিস্তৃতির কিছু নমুনা দেয়া যাক। রেলের টেলিকম সিস্টেমের সাথে গ্রামীণ ফোনের সম্পর্ক বরাবরই বেশ নিবিড়। এখন এরা সুবর্ণ এক্সপ্রেসের একটা বগি সেলফোনের জন্য নানান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করছে। আরও এক মজাদার বিষয় কেউ কেউ লক্ষ্য করে থাকবেন : চট্টগ্রাম শহরের অলঙ্কার মোড়ে একটি পুলিশ বক্স। তা এমনই দৃষ্টিনান্দনিকতায় পরিপূর্ণ যে, মনে হবে বেহেশতের স্নিগ্ধস্রোত চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে। যে-কোনো পুলিশ বক্সকে বরাবরই ষড়যন্ত্রমুখর, পলায়নপর, যন্ত্রণাময় এক জায়গা মনে হয়। কিন্তু এমন স্মার্ট আর রোমান্টিক পুলিশ বক্স এই দেশে কমই আছে। এটি নির্মিত হয়েছে সানমারের সৌজন্যে। এ-ধরনের বহু কাজ সরকার-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গনে হরহামেশাই চোখে পড়ে। সবচেয়ে বড়ো বিষয় হচ্ছে, এই যে, এনজিও-গ্রাস শুরু হয়েছে তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ কি এতে রুদ্ধ হবে না?

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.