আজ পেছনে তাকিয়ে মনে হয় জীবনে কোন ব্যাপারে কোন খেদ নেই এমনটা ভাবা কোন মানুষের পক্ষে অস্বাভাবিক। আমি সবসময় ভাবতে পছন্দ করেছি যে কোন বিষয়েই আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু এখন মনে হয় এটা অসম্ভব। [...]

অনুশোচনা আজ পেছনে তাকিয়ে মনে হয় জীবনে কোন ব্যাপারে কোন খেদ নেই এমনটা ভাবা কোন মানুষের পক্ষে অস্বাভাবিক। আমি সবসময় ভাবতে পছন্দ করেছি যে কোন বিষয়েই আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু এখন মনে হয় এটা অসম্ভব। আমি আমার জীবন ও কাজ নিয়ে এতটা ব্যতিব্যস্ত ছিলাম যে এখন এই ভেবে আফসোস হয় কেন আমি আমার ছোট বোন লরেটার সাহায্যে এগিয়ে আসি নি; বিশেষ চিকিৎসা কিংবা সুশ্রুষা পেলে সে হয়ত খুবই উপকৃত হতো। আমার মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে খুবই সাদামাটা কিছু একটা শেখানোর চেষ্টা করছেন লরেটাকে, তাঁর এক হাতে একটা চক আরেক হাতে রুলার। এই দৃশ্য আমি কোনদিন ভুলবো না। "দুয়ে দুয়ে কত হয়?" তিনি জিজ্ঞাসা করছেন। আর লরেটা তার সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে মুখে যে উত্তরটা আসছে সেটাই উগড়ে দিচ্ছে, "তিন, না পাঁচ, না তিন..." এবং যত প্রাণপণে সে চেষ্টা করতে থাকে ততই উন্মাদ হয়ে উঠতে থাকেন আমার মা। প্রতিবারই এর পরিসমাপ্তি ঘটতো মারধোরে, তারপর মা চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে আমার দিকে ফিরে, হতাশায় দু'হাত ছুঁড়ে প্রশ্ন করতেন, "এমন শাস্তি পাওয়ার মত কী অপরাধ করেছি আমি?", যেন আমি ঈশ্বর যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে, আমি, এক ক্ষুদে বালক! লরেটা তার নিজের ধরনে ছিল খুব অন্যরকম ও স্পর্শকাতর এক মেয়ে। সে প্রায় সবসময়ই একেবারে ভেঙে পড়ে কান্নাকাটি করতো আর কেউ তার কী হয়েছে জানতে চাইলে বলতো, "আমি অসুখী নই, আমি বিষন্ন নই, আমি শুধু আমাকে সামলাতে পারছি না।" এই কথা ভেবে আমার খুব খারাপ লাগে যে আমি কখনো সময় নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে সে যেন খুব দরকারি বিশেষ সাহায্য ও মনোযোগটুকু পায়, সেটা দেখি নি। আমার তিন সন্তানের জন্যই আমার বিশেষ অনুশোচনা হয় কেননা তারা তিনজনই মন্দবিয়ের শিকার হয়েছে। আমার বড় মেয়ে বারবারা যখন নেহাত শিশু তখন আমি তার মাকে ছেড়ে যাই। আমি বারবারাকে দেখতে চাইলে তার মা সেটাকে জটিল করে তুলতো। এরপর আমি কয়েক বছরের জন্য পারী চলে গেলে সেখানে এক পর্যায়ে আমি বারবারাকে খুঁজে বার করতে চেষ্টা করি কেননা আমার মনে হয়েছিল তাকে কাছে পেলে দারুণ হবে। আমি কল্পনা করি তাকে পাশে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছি, তাকে পারীর দৃশ্যাবলি…

কাজেই, কোনো ছবির নিখুঁতত্বে দোষ খুঁজে পেলে সব সময়ই দুটো কাজ করা উচিত আমাদের। তার একটি হচ্ছে, শিল্পী যা দেখেছিলেন সেটার বাহ্যিক রূপ বদলে দেবার পেছনে কোনো কারণ রয়েছে কিনা এই প্রশ্ন করা। আমাদের এই শিল্পকথার ক্রমন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে এ-ধরনের কারণ সম্পর্কে আমরা আরো জানতে পারবো। [...]

[১. অনুবাদক ও রচয়িতার ভূমিকা, ২. প্রাক্‌কথন-এর সূচনাংশ] প্রা ক্‌ ক থ ন শিল্প ও শিল্পী প্রসঙ্গে (পূর্বানুসৃতি) কাজেই, কোনো ছবির নিখুঁতত্বে দোষ খুঁজে পেলে সব সময়ই দুটো কাজ করা উচিত আমাদের। তার একটি হচ্ছে, শিল্পী যা দেখেছিলেন সেটার বাহ্যিক রূপ বদলে দেবার পেছনে কোনো কারণ রয়েছে কিনা এই প্রশ্ন করা। আমাদের এই শিল্পকথার ক্রমন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে এ-ধরনের কারণ সম্পর্কে আমরা আরো জানতে পারবো। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত না হচ্ছি যে আমরাই ঠিক, চিত্রশিল্পী নন, ততক্ষণ পর্যন্ত কখনোই কোনো চিত্রকে অশুদ্ধভাবে চিত্রিত বলে দোষারোপ করা আমাদের উচিত নয়। আমরা সবাই এরকম একটা রায় দিতে প্রায় মুখিয়েই থাকি যে, 'জিনিসগুলো দেখতে ঠিক ওরকম নয়'। যেসব ছবি দেখতে আমরা অভ্যস্ত, প্রকৃতি সবসময় অতি অবশ্যই সেগুলোর মতো দেখাবে -- এরকম একটি অদ্ভুত ধরনে চিন্তা করতেই অভ্যস্ত আমরা। অল্প কিছুদিন পূর্বের একটি অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারের সাহায্যে সহজেই এর প্রমাণ দেয়া সম্ভব। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকে ঘোড়াকে টগবগিয়ে ছুটতে দেখেছে, ঘোড়দৗড় আর শিকারে অংশ নিয়েছে, এমন সব চিত্রকর্ম আর স্পোর্টিং প্রিন্ট দেখে নয়ন জুড়িয়েছে যেখানে দেখা গেছে অশ্ববাহিনী শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কিংবা কুকুরের পশ্চাদ্ধাবন করছে; কিন্তু সম্ভবত এঁদের মধ্যে একজনও লক্ষ করে দেখেননি ঘোড়া যখন দৌড়োয় তখন সেটাকে 'আসলে ঠিক কেমন দেখায়'। ছবি এবং স্পোর্টিং প্রিন্টে সেগুলোকে সাধারণত শূন্যে পুরোপুরি পা ছড়িয়ে দেয়া অবস্থাতেই দেখানো হয়েছে -- ঠিক যেমনটি দেখিয়েছিলেন উনবিংশ শতকের মহান ফরাসী চিত্রকর জেরিকো (Théodore Géricault), এপসম-এর ঘোড়দৌড়ের একটি বিখ্যাত ছবিতে (চিত্র ১৩)। এর পঞ্চাশ বছর পরে যখন দ্রুতবেগে ধাবমান অশ্বের স্থিরচিত্র গ্রহণের মতো যথেষ্ট দক্ষ ফটোগ্রাফিক ক্যামেরা তৈরি হল তখন এসব স্থিরচিত্র প্রমাণ করল যে চিত্রকরেরা এবং জনসাধারণ উভয় পক্ষই এতোদিন ভুল করে এসেছেন। ছুটন্ত কোনো ঘোড়াই আমাদের কাছে যেটাকে এতো স্বাভাবিক বলে মনে হয় তেমন করে দৌড়োয় না। ঘোড়ার পা যখন মাটি ছেড়ে ওঠে তখন ঘোড়াটি সেগুলোকে ভেতরের দিকে টেনে নেয় (চিত্র ১৪)। খানিকটা চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারবো যে এরকমটি না হলেই বরং সেটার পক্ষে এগোনো অসম্ভব। কিন্তু তারপরেও চিত্রকরেরা যখন এই নতুন আবিষ্কারটি প্রয়োগ করতে শুরু করলেন এবং ছুটন্ত ঘোড়া আসলে যেভাবে দৌড়োয় সেভাবেই সেগুলোর ছবি আঁকলেন,…

আমায় তুমি অলস করেছ[...]

বর্ষায় বিহার শীতে নিদ্রা, কাজ করার কোনো ইচ্ছে নেই আমার, হেমন্তে গান গরমে স্নান, শরৎ নৌকায় বসন্ত ভাষায়।

আসলে 'শিল্প' বলতে কিছু নেই। আছেন কেবল শিল্পী। এক সময় তাঁরা ছিলেন এমন কিছু মানুষ যাঁরা রঙিন মাটি দিয়ে কোনো গুহার দেয়ালে বাইসনের অবয়ব আঁকতেন। আজ তাঁরা রঙ কেনেন এবং বিলবোর্ডের জন্যে পোস্টার ডিজাইন করেন; মাঝখানের সময়টাতে তাঁরা মেলা কিছু করেছেন। এই সব কর্মকাণ্ডকে শিল্প আখ্যা দেয়ায় কোনো ক্ষতি নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা মনে রাখছি যে [...]

[১. অনুবাদক ও রচয়িতার ভূমিকা] প্রা ক্ ক থ ন শিল্প ও শিল্পী প্রসঙ্গে আসলে 'শিল্প' বলতে কিছু নেই। আছেন কেবল শিল্পী। এক সময় তাঁরা ছিলেন এমন কিছু মানুষ যাঁরা রঙিন মাটি দিয়ে কোনো গুহার দেয়ালে বাইসনের অবয়ব আঁকতেন। আজ তাঁরা রঙ কেনেন এবং বিলবোর্ডের জন্যে পোস্টার ডিজাইন করেন; মাঝখানের সময়টাতে তাঁরা মেলা কিছু করেছেন। এই সব কর্মকাণ্ডকে শিল্প আখ্যা দেয়ায় কোনো ক্ষতি নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা মনে রাখছি যে এরকম একটি শব্দ বিভিন্ন সময় এবং স্থানে খুবই ভিন্ন ভিন্ন জিনিসকে বোঝাতে পারে, এবং যতক্ষণ আমরা উপলব্ধি করছি যে মহৎ কোনো শিল্পের অস্তিত্ব নেই। কারণ মহৎ শিল্প জিনিসটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি বিরক্তিকর ব্যাপার, অন্ধ আসক্তির বিষয়। একজন শিল্পীকে আপনি এই বলে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারেন যে, তিনি সদ্য যে কাজটি সৃষ্টি করেছেন সেটি সেটার নিজস্ব ধরনে যথেষ্ট ভালো হতেই পারে, তবে কথা হচ্ছে সেটা 'শিল্প' নয় মোটেই। এবং একটি ছবি উপভোগরত কোনো ব্যক্তিকে আপনি এই বলে হতভম্ব করে দিতে পারেন যে সেটার মধ্যে যা তার ভালো লেগেছে তা শিল্প নয়, বরং ভিন্ন কিছু। আসলে, আমার মনে হয় না যে একটি মূর্তি বা একটি ছবি পছন্দ করার কোনো ভুল কারণ থাকতে পারে। বাড়ির কথা মনে হয় বলে কেউ একটি ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং পছন্দ করতে পারে, কিংবা কোনো বন্ধুর কথা স্মরণ হয় বলে একটি প্রতিকৃতি। এতে দোষের কিছু নেই। কোনো চিত্রকর্ম দেখলে আমাদের সবারই একশো একটা জিনিস মনে পড়ে যেতে বাধ্য, এমন সব জিনিস যা আমাদের পছন্দ-অপছন্দকে প্রভাবিত করে। আমরা যা যা দেখি সেসব জিনিস উপভোগ করার ব্যাপারে যতক্ষণ পর্যন্ত এসব স্মৃতি আমাদের সাহায্য করছে ততক্ষণ আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু যখন কোনো অপ্রাসঙ্গিক স্মৃতি আমাদেরকে পূর্বসংস্কারাচ্ছন্ন করে তোলে, পর্বতারোহণ আমাদের পছন্দ নয় বলে যখন স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে আমরা আল্প্‌স্ পর্বতের কোনো অসাধারণ ছবি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিই, কেবল তখনই আমাদের উচিত মনের ভেতর এই বীতরাগের কারণ অনুসন্ধান করা, যে-কারণে আমরা একটি আনন্দ উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হলাম। একটি শিল্পকর্ম অপছন্দ করার ভুল কারণ কিন্তু সত্যিই রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই ছবিতে ঠিক তাই দেখতে পছন্দ করে যা তারা বাস্তবেও দেখতে চায়। এটি একটি স্বাভাবিক…

এদেশে পশ্চিমারা আমাদেরকে প্রথম পরিচয়ে সচরাচর দুই-তিনটা প্রশ্ন করে। যেমন -- তোমার ভাইবোনরা কি বাবা-মায়ের সাথে থাকে? যেমন -- তুমি কি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ করেছো? [...]

এদেশে পশ্চিমারা আমাদেরকে প্রথম পরিচয়ে সচরাচর দুই-তিনটা প্রশ্ন করে। যেমন -- তোমার ভাইবোনরা কি বাবা-মায়ের সাথে থাকে? যেমন -- তুমি কি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ করেছো? আর জিজ্ঞেস করে -- তোমার দেশে কি স্টারবাক্‌স্‌ আছে? বলাই বাহুল্য সেইসব প্রশ্নোত্তর যাই হোক না কেন, তাতে উত্তরদাতার প্রতি বা তার দেশের প্রতি প্রশ্নকর্তার মনোভাব তেমন বদলায় না। সে তখনও আমার মাথায় মাহুতের পাগড়ি দেখতে থাকে, আমার চুপড়ি থেকে সাপের ফোঁসফোঁস শুনতে থাকে, আমাকে হয়তো তার চোখে সবচেয়ে মানানসই হয় রাস্তার মোড়ে দড়ির ম্যাজিক দেখানো সিড়িঙ্গে লোকটা হিসেবে… কিংবা বড়জোর আমার হাতে হয়তো আজকাল মানায় ম্যাকের সদ্যবানানো বার্গার -- মুখে অধমর্ণের হাসি দিয়ে বার্গার বেচছি। নাজী প্রপাগান্ডা বলতো -- ইহুদীদের গায়ে একরকম অস্বস্তিকর তেতো মিষ্টি গন্ধ। সব প্রপাগান্ডার শুরুই কি গায়ের গন্ধ দিয়ে? বৃটিশরা যেমন আমাদের গায়ে কেবলি পেঁয়াজ কষানো কারির গন্ধ পায়, কোরিয়ানদের গায়ে রসুনের গন্ধ পায়, আফ্রিকানদের গায়ে পোড়াকাঠ আর ভাতের মাড়ের গন্ধ পায়। এইসব সংরক্ত অভিমান গোটা লন্ডন শহরটাকেই আমার চোখে দারুণ ধূসর করে দিয়েছিল। বেন্ডি বাস বলে এশহরে একরকম বাস আছে, তার কটিদেশ স্থিতিস্থাপক, ফলে সেন্ট্রাল লন্ডনের সরু পথঘাট দিয়ে এই আঠের মিটারের দীর্ঘ বাসটা দিব্যি চলতে পারে। টিকিট বা ট্রাভেলকার্ড ড্রাইভারকে দেখাতে হয় না বলে এই বাসে ভবঘুরে-মাতাল-গৃহহীনদের এক অপূর্ব সমাবেশ তৈয়ার হয়। কত জাতের লোক যে এশহরে করে-কেটে খায়, সেটা এ বাসে চড়লে চমৎকার বোঝা যায়। তবে বাসটায় মুখ বুঁজে থাকা চাই। নয়তো গথদের ভয়ালদর্শন কুকুর দেবে গায়ে ঝাঁপ, নয়তো অবিরাম বাইবেল আউড়ে যাওয়া বেহদ্দমাতাল কালো লোকটা দেবে থুতু। কিংবা পোকায় কাটা চেহারার কোনো শ্বেতাঙ্গ ভবঘুরে তোমাকে ডাক দেবে -- "হেই, চিকেন টিক্কা মসালা" (কী মুশকিল, আমি কি তোমাকে খাবারের নামে ডাকি? ডাকি টোড ইন দ্য হোল? বা স্পটেড ডিক?)। সেই সঙ্গে চোখকানও খোলা রাখা চাই, নইলে কাজল টানা ক্রসড্রেসার লোকটা তোমার পিঠের ব্যাগের চেইন খুলে দেখবে কি আছে, নইলে নিপাট চেহারার এশিয়ান বেরাদর তোমার পকেট সাফ করে দেবে ভিড়ের ভেতর। কলসেন্টারে পার্টটাইম কাজ শেষ করে গ্রেট পোর্টল্যান্ড স্ট্রীট বেয়ে এসে আমি এইরকম বেন্ডি বাসে চড়তাম দেড় ঘণ্টার জন্যে, উপায় ছিল না, ঐ বাসটাই কি না যেত আমার বাড়ির…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.