হেনরি মিলারের ‘ভাবনাগুচ্ছ’: শেষ কিস্তি

আজ পেছনে তাকিয়ে মনে হয় জীবনে কোন ব্যাপারে কোন খেদ নেই এমনটা ভাবা কোন মানুষের পক্ষে অস্বাভাবিক। আমি সবসময় ভাবতে পছন্দ করেছি যে কোন বিষয়েই আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু এখন মনে হয় এটা অসম্ভব। [...]

অনুশোচনা

আজ পেছনে তাকিয়ে মনে হয় জীবনে কোন ব্যাপারে কোন খেদ নেই এমনটা ভাবা কোন মানুষের পক্ষে অস্বাভাবিক। আমি সবসময় ভাবতে পছন্দ করেছি যে কোন বিষয়েই আমার কোন আক্ষেপ নেই, কিন্তু এখন মনে হয় এটা অসম্ভব।

আমি আমার জীবন ও কাজ নিয়ে এতটা ব্যতিব্যস্ত ছিলাম যে এখন এই ভেবে আফসোস হয় কেন আমি আমার ছোট বোন লরেটার সাহায্যে এগিয়ে আসি নি; বিশেষ চিকিৎসা কিংবা সুশ্রুষা পেলে সে হয়ত খুবই উপকৃত হতো।

আমার মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে খুবই সাদামাটা কিছু একটা শেখানোর চেষ্টা করছেন লরেটাকে, তাঁর এক হাতে একটা চক আরেক হাতে রুলার। এই দৃশ্য আমি কোনদিন ভুলবো না।

“দুয়ে দুয়ে কত হয়?” তিনি জিজ্ঞাসা করছেন। আর লরেটা তার সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে মুখে যে উত্তরটা আসছে সেটাই উগড়ে দিচ্ছে, “তিন, না পাঁচ, না তিন…” এবং যত প্রাণপণে সে চেষ্টা করতে থাকে ততই উন্মাদ হয়ে উঠতে থাকেন আমার মা। প্রতিবারই এর পরিসমাপ্তি ঘটতো মারধোরে, তারপর মা চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে আমার দিকে ফিরে, হতাশায় দু’হাত ছুঁড়ে প্রশ্ন করতেন, “এমন শাস্তি পাওয়ার মত কী অপরাধ করেছি আমি?”, যেন আমি ঈশ্বর যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে, আমি, এক ক্ষুদে বালক!

লরেটা তার নিজের ধরনে ছিল খুব অন্যরকম ও স্পর্শকাতর এক মেয়ে। সে প্রায় সবসময়ই একেবারে ভেঙে পড়ে কান্নাকাটি করতো আর কেউ তার কী হয়েছে জানতে চাইলে বলতো, “আমি অসুখী নই, আমি বিষন্ন নই, আমি শুধু আমাকে সামলাতে পারছি না।” এই কথা ভেবে আমার খুব খারাপ লাগে যে আমি কখনো সময় নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে সে যেন খুব দরকারি বিশেষ সাহায্য ও মনোযোগটুকু পায়, সেটা দেখি নি।

আমার তিন সন্তানের জন্যই আমার বিশেষ অনুশোচনা হয় কেননা তারা তিনজনই মন্দবিয়ের শিকার হয়েছে। আমার বড় মেয়ে বারবারা যখন নেহাত শিশু তখন আমি তার মাকে ছেড়ে যাই। আমি বারবারাকে দেখতে চাইলে তার মা সেটাকে জটিল করে তুলতো। এরপর আমি কয়েক বছরের জন্য পারী চলে গেলে সেখানে এক পর্যায়ে আমি বারবারাকে খুঁজে বার করতে চেষ্টা করি কেননা আমার মনে হয়েছিল তাকে কাছে পেলে দারুণ হবে। আমি কল্পনা করি তাকে পাশে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছি, তাকে পারীর দৃশ্যাবলি দেখাচ্ছি, এটাসেটা শেখাচ্ছি এবং তার সঙ্গে আমার জীবনের দর্শন নিয়ে ভাব-বিনিময় করছি। কিস্তু বাস্তবে যখন আমাদের পরস্পরের সঙ্গে দেখা হয় তখন সে প্রায় তিরিশ বছর বয়সী এক নারী।

সে বিগ সুর-এ এসেছিল আমাকে ও আমার পরিবার- স্ত্রী ও দুই সন্তানকে দেখতে। চলে যাবার আগে সে আমাদের সঙ্গে এসে থাকার জন্য আমার অনুমতি চাইছিল, আমাকে তা প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছিল কেননা সেটা ছিল এক অসম্ভব অনুরোধ। সে এমন শিশুর মত কাদঁছিল যে তা আমার হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপারে আমি সবসময়ই এক ধরনের দুঃখবোধে ভুগেছি, কিন্তু তার চেয়েও দুঃখজনক যে এটা প্রশমনের জন্য আমার কিছুই করার ছিল না। যে জিনিসটা আমাকে কষ্ট দেয় সবচেয়ে বেশি সেটা এই অনুভূতি যে আমার উপস্থিতি আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারতো তার সময় চলে গেছে। এটা এমন নয় যে আমি বারবারাকে লালনপালন করতে চাই নি, সত্য হলো পরিস্থিতি আমাকে সে সুযোগ দেয় নি।

আমার ছোট দুই সন্তান ভ্যালেন্টিন ও টনির ক্ষেত্রে আমার মাঝেমাঝে মনে হয় যে আমি এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের সম্পর্কের ঘাটতিগুলো পুষিয়ে দিতে। সত্য ঘটনা হচ্ছে, তাদের মা ও আমার মধ্যে যখন ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তখন তারা এত ছোট এবং আমাদের দুজনের মধ্যে তাদেরকে নিয়ে এত টানাহ্যাচড়া চলেছে যে সেটা তাদের জন্য খুব কষ্টকর হয়েছে। সন্তানপালন বিষয়ে তাদের মা ও আমার চিন্তাভাবনা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। আমার ক্ষেত্রে শিশুরা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। আর তাদের মা চাইতো তারা হবে ভদ্র, বিনয়ী, পরিচ্ছন্ন এবং স্কুলে ভালো ছাত্র। হা ইশ্বর! আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মার কাছে ফিরে যাবার সময় তাদের মুখের যে চেহারা হতো তা আমাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতো। তখন আমার মনে হতো তারা যেভাবে বড় হচ্ছে তাতে হয়তো তারা নিজেদের উন্মূল ও অবিশ্বাসী হিসাবে ভাবতে শিখবে। আমার জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলো হচ্ছে আমাদের এই বিচ্ছিন্নতার জন্য আহাজারি করে কাটানো দিনগুলো। এখনও এই কথাগুলো মনে হলেই আমার মন ভেঙে যায়।
________________________________________

আধ্যাত্মিকতা

উত্তেজনাবর্ধক বস্তুর জগতে আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে সবচেয়ে বিস্ময়কর কেননা সুখবোধ ও বিকাশের ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা অপার। তূরীয়ভাব অর্জনের জন্য মানুষ আজকাল যা যা মাধ্যম ব্যবহার করে এটি তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। পরিমাপদণ্ডের সবচেয়ে নিচে অবস্থান মদ, তামাক ও অন্যান্য নেশাবস্তুর।

যুবসমাজ কর্তৃক ড্রাগের যথেচ্ছ ব্যবহারে আমি রীতিমত বীতশ্রদ্ধ! তারা তাদের শরীর ও মস্তিষ্কের বিনিময়ে তূরীয়ানন্দ উপভোগ করতে চায়। আমি বুঝতে পারি না তারা এটাকে কীভাবে তূরীয়ানন্দ বলতে পারে যখন তা কার্যত তাদেরকে মেরে ফেলছে।

দিনদিন অধিকসংখ্যক মানুষ আজ আধ্যাত্মিকতার তূরীয় ক্ষমতা আবিষ্কার করছে। প্রতিদিন আমি সংবাদপত্রে দেখি এই বক্তৃতা, সেই কর্মশালা, গুরুভজনা ইত্যাদি যা যা কল্পনা করা যায় তার বিজ্ঞাপন, আধ্যাত্মিক আলোকায়ন ও বিকাশের নিমিত্তে। এই হচ্ছে আপনার আমেরিকা। পূর্ণতর অস্তিত্বের অধিকার অর্জনের জন্য আমাদের পয়সা খরচ করতে রাজি থাকতে হবে। আমেরিকানদের সবকিছুতেই পয়সা কামাই করতে হবে, এমনকি আধ্যাত্মিকতা থেকেও। এইসব গোষ্ঠী কিংবা গুরুরা কোনকিছুই মাগনাতে দেয় না, অন্তত আমার এমনটি জানা নেই।

আমেরিকানরা যতদিন আধ্যাত্মিকতার জন্য বুভুক্ষু থাকবে ততদিন এইসব মানুষেরাও প্রস্তুত থাকবে তাদের এই চাহিদার অপব্যবহার করতে। যারা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এই দেশে আসে শিষ্য তৈরি করার কাজে, আমি সেই গুরুদের বলি যে আপনার নিজের দেশেই অজস্র শিষ্য রয়েছে, তাদের পরিত্রাণ করুন আগে!

এইসব আলোকিত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বুঝদার কৃষ্ণমূর্তি বলেছিলেন, “কারো ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার প্রয়োজন নেই, আপনার নিজের ভেতরেই সবকিছু রয়েছে। আপনি সবসময় গুরুদের জিজ্ঞাসা করছেন, কেন আপনারা নিজেকেই প্রশ্ন করছেন না! গুরুদের ভুলে যান।” আরো কয়েকটা লাইন মনে পড়ছে, “আপনি নিজেই বুদ্ধ, আপনি তা জানেন না শুধু।” আমি জানি না কে এই কথাটি বলেছিলেন, কিন্তু এটা সত্য। আরো আছে, “যার ঠোঁটে সবসময় ঈশ্বরের অবস্থান তার থেকে সাবধান থাকবেন, কেননা, সেই-ই ঈশ্বরের কাছ থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী”, ইহুদি পণ্ডিত এরিক গুটকিন্ড এর কথা। প্রকৃত আধ্যাত্মিক শিক্ষকেরা যতটা না ঈশ্বরকে খোঁজার কথা বলেন তার চেয়ে বেশি বলেন নিজের আত্মার উন্নয়নের কথা।

তরুণ বয়সে আমার ঈশ্বরের ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ ছিল! আমি মানব-প্রকৃতির সত্য কী তা জানতে আগ্রহী ছিলাম। আমি বুঝতে পারলাম বড় অক্ষরে লেখার মত সত্য বলে কোন একক কিছু নেই, সত্যের বরং অনেক রূপ রয়েছে। ধর্ম ছাড়াই আমি গভীরভাবে একজন ধার্মিক মানুষ। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, কিন্তু অনুভব করি যে জীবন ও তার ভেতরের সবকিছুই পবিত্র।

শেষকথা হিসাবে আমি বলতে পারি যে নিজেকে না জানলে যত খোঁজাখোঁজিই করুন না কেন সেটা আপনাকে ইশ্বরের কাছে নিয়ে যাবে না। ইশ্বর আপনার ভেতরেই অবস্থান করেন। এই কথাটি বলার জন্য আপনার কাউকে টাকা দেওয়ার দরকার নেই, আমি আপনাকে বলছি যেহেতু আমি জানি এটা সত্য।
________________________________________

মৃত্যু বিষয়ে

আমার বিশ্বাস বুকের ওপর হাত জড়ো করে আমি ঘুমের মধ্যে হাসিমুখে মারা যাবো। এখন আমি নিশ্চিত যে আমি মারা যাবো। আমি জানতাম যে মৃত্যু বলে একটা ব্যাপার আছে, তবে তা আমার বেলায় নয়, জানেন না বুঝি! আমি অবশ্য মরতে ভয় পাই না, মৃত্যু এমন কোন খারাপ ব্যাপার নয়। যেটা খারাপ, সেটা হচ্ছে মৃত্যুপ্রক্রিয়াটির নিগ্রহের ভেতর দিয়ে যাওয়া, মৃত্যুর পূর্ববর্তী যন্ত্রণাভোগ। এটাকেই যত ভয় আমার।

আমার বিশ্বাস আগামী একশ বছরের মধ্যে মানুষ মৃত্যুভয় ও মৃত্যুযন্ত্রণা ছাড়াই শান্তিতে মারা যেতে পারবে। আমরা জীবনকে যত পরিপূর্ণভাবে আলিঙ্গন ও যাপন করবো ততই সহজভাবে মৃত্যুর ধারণাটিকে গ্রহণ করতে পারবো। তারপরও আমার মনে হয় শারীরিক যন্ত্রণাভোগের বিষয়টিই মৃত্যু ব্যাপারটির সবচেয়ে ভীতিকর দিক। আমাদের যাবতীয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দিয়ে এই ব্যাপারটির সমাধান করে ফেলা উচিৎ ছিল অনেক আগেই।

জীবনের পরের জীবন নামে মৃত্যু বিষয়ক একটি বই পড়েছিলাম আমি যা অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিল; তার মধ্যে একটি ছিল এই যে জীবনের শেষ পর্যায়ে আমরা জগতের সঙ্গে আমাদের সব দেনাপাওনা, সংস্কার, ঘৃণা ইত্যাদি চুকিয়ে ফেলি। কিন্তু আপনি জানেন কি, আমার মধ্যে এই শয়তানি প্রবৃত্তিটা রয়েই গেছে যা মানুষের প্রতি আমার ঘেন্না ও তাচ্ছিল্যবোধটুকু জিইয়ে রাখতে চায়। আমি নর্দমার কীট ও জারজদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিতে আগ্রহী নই। আমি তাদেরকে জোরালোভাবে ঘৃণা করে যেতে চাই। আমার মধ্যে সাধুপনা দেখানোর কোন প্রবৃত্তি কাজ করে না। আমি খামখেয়ালী, নৈরাজ্যময়, আমি কোন নিয়মের ধার ধারি না। চলার পথে আমি আমার নিয়ম নিজেই তৈরি করেছি এবং আমার সময়ের প্রচলিত নিয়মকানুনের যতটা পেরেছি ভেঙে চুরমার করেছি।

লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি কি না। আমার অতীত জীবনের কোন স্মৃতি নেই। আমার অনেক বন্ধুর নাকি রয়েছে, কিন্তু আমার নেই। আমি অবশ্য বিশ্বাস করি যে আমি এক প্রাচীন মানুষ, খুবই প্রাচীন।

হিন্দুরা বলে আমরা বারবার ফিরে ফিরে আসি জীবনের শিক্ষার জন্য। এক জীবনে আমরা যা শিখতে পারি নি সেটাই আমাদের জন্য পরের জীবনে অপেক্ষা করে। আমি জানি না এটা সত্য কি না, তবে এই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি যে কিছুই শিখি নি সেটার আলোকে বলতে পারি যে আমি সম্ভবত আবার ফিরে আসবো। এই নিয়ে আমার মধ্যে দোলাচল রয়েছে। মাঝেমধ্যে আমার ফিরে আসার ইচ্ছা জাগে আবার কখনো কখনো এই চিন্তাটাই আমার কাছে জঘন্য মনে হয়।

তবে সত্যিই যদি আমি ফিরে আসি এবং আমার যদি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে আমি কিছুতেই শিল্পী কিংবা লেখকের জীবন যাপন করতে চাইবো না। আমি সবকিছুর আগে একজন ফুলচাষী হতে চাইবো। আমার কাছে মনে হয় মালির জীবনটাই সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, বিশুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক। যে-মানুষ বাগানের যত্ন নেয়, ঈশ্বরের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে সেইই।

আলম খোরশেদ

লেখক, অনুবাদক, সংস্কৃতিকর্মী

৪ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.