“আজ যদি আমি নিজেকে বাদ দিয়ে একা মানুষদের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা শৌখিন তাত্ত্বিক সম্পাদকীয় লিখি, তাহলে আমার আগের এবং আগামী দিনের সব ‘ফার্স্ট পার্সন’ মিথ্যে হয়ে যাবে। আর, বিনে পয়সায় রোববার পান বলে আপনারা মিথ্যে কথা পড়বেন কেন? যে জীবন হয়তোবা আমাকে একাকিত্বের এই বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিতে পারত, আমাদের সমাজে তার কোনো স্থান নেই।” [. . .]

বাবার উৎসাহে একসময় পড়েছিলাম সাগরময় ঘোষের ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়, নিজেই বেছে নিয়ে পড়তাম ‘সানন্দা’র পাতায় অপর্ণা সেনের সম্পাদকীয়। এর বাইরে সম্পাদকীয় বলতে কেবল সম্পাদিত গ্রন্থের শুরুতে সম্পাদকের কথা। ফলে সম্পাদকীয়র একটা চেনা ছক ছিল, সম্পাদকীয় মানেই বই বা পত্রিকার ধারণকৃত বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ বা আপাত ধারণা। চেনা ছকের ভেতর হুড়মুড়িয়ে এলো এটা — মেয়েলি বলে যে প্রান্তিকতার অপমান আমাকে বারবার আক্রমণ করেছে, মোটা বলে তার থেকে কিছু কম করেনি কোনোদিন। অথবা — মাদুরের সঙ্গে গালিচা বা কার্পেটের একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে। আভিজাত্যের দিক দিয়ে কার্পেটের মূল্য হয়তো অনেকটা, আবার মাদুর যেন তার সহজতার জন্যই পবিত্র। এ যেন শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কার্পেট তা সে যতই দামি হোক না কেন, তার স্থান আমাদের পায়ের নীচে। দেয়ালে কার্পেট টাঙানোর ঔপনিবেনিক কায়দা যদিও এখন নানা ধনী বাড়িতে দেখতে পাই। তার পরিপ্রেক্ষিতে মাদুরের স্থান অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। মাদুর আক্ষরিক অর্থেই আসন। শোওয়ার কিংবা বসার। না! তাকে পায়ের তলায় রেখে তার ওপর আসবাব রাখার নয়। মাদুর পিছলে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারে। ... মাদুরের কাছে আমার একটা জিনিসই শিখতে বড় ইচ্ছে হয়। নম্রতা। দেখি, এ জীবনে হয় কি না! কন্টেন্টের সাথে সম্পর্কশূন্য এ রকমের সম্পাদকীয় এই প্রথম। এবং সম্পাদক তাঁর সৃজনশীল চরিত্রের চাইতে বেশি আলোচনায় এসেছেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনাচরণের জন্যে। ঋতুপর্ণ ঘোষ।  পরিচয় তো ছিলই চিত্রপরিচালক, চিত্রনাট্যকার, ঘোষ অ্যান্ড কোং-এর আড্ডাবাজ ঋতুপর্ণ ঘোষের সাথে। সে পরিচয় দর্শক সারিতে বসে তাঁর সৃজনশীলতায় মুগ্ধ হয়ে ওঠার সুবাদে। সে পরিচয় অবিশ্রাম হাততালিতে মুখর। আপাত বিচিত্র জীবনযাপনের জন্যে আলোচনার তুঙ্গে অবস্থান করা ঋতুপর্ণ ঘোষের সাথে পরিচয় ছিল অনেকেরই। দরকার ছিল কি তবে এই বাড়তি জানা-শোনার? তাঁরই বা দায় ছিল কোথায় নিজেকে এমন জানান দেবার? ছিল একটা তাগিদ তাঁর নিজের মধ্যে, সে তাগিদ বোধ করি তিনি যে-সব প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁদের অস্তিত্বের লড়াইকে শাণিয়ে নেবার। ছিল একটা অভিলাষ কিছু মানুষের অনমনীয় কৌতূহলের মুখে কুলুপ এঁটে দেবার। নিজেকে সযত্নে মেলে ধরবার আকাঙ্ক্ষাও ছিল হয়তো আপাত-নিঃসঙ্গ মানুষটির। এই রকমের নানা ইচ্ছের ডানা মেলবার আকাশ ছিল তাঁর রোববার-এর ‘ফার্স্ট পার্সন’। ফলে সেটা নিছক সম্পাদকীয় না হয়ে, হয়ে ঊঠেছিল ঋতুপর্ণের অন্তরমহল, যেখানে…

|| ইম্পেরিয়াম রোমানাম :: অগাস্টাস এবং রোমক সাম্রাজ্য || অগাস্টাস ছিলেন এক নতুন ধরনের শাসকের প্রথম প্রতিনিধি। ইংরেজিতে এই শাসকদের বলা হয় ‘emperor’ (আমরা বাংলায় বলি, ‘সম্রাট’), কিন্তু জার্মান ভাষায় শব্দটা ‘Kaiser’, এসেছে ‘Caesar’ থেকে, এবং বেশ আগেভাগেই ঢুকে পড়েছিল জার্মান ভাষা পরিবারে। আধুনিক জার্মানিক ভাষা, যেমন সুইডিশ, ডেনিশ, ওলন্দাজ, এবং আইসল্যান্ডিকেও পাওয়া যাবে শব্দটি। [. . .]

Tore Janson-এর সুইডিশ ভাষায় রচিত Latin: Kulturen, historien, språket গ্রন্থের Merethe Damsgård Sørensen ও Nigel Vincet-কৃত ইংরেজি অনুবাদ A Natural History of Latin-এর বাংলা ভাষান্তর   ইম্পেরিয়াম রোমানাম :: অগাস্টাস এবং রোমক সাম্রাজ্য সিযার নিহত হওয়ার পর জানা গেল যে তিনি তাঁর এক বোনের উনিশ বছর বয়স্ক নাতিকে দত্তক নিয়েছিলেন। আমরা যেখান থেকে খবরটি পাই সেখানে লেখা আছে: Gaium Octávium in familían noménque adotavit — তিনি গাইয়াস অক্টাভিয়াসকে পরিবারের একজন সদস্য এবং তাঁর নামের উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেদিন থেকে যুবকটি গাইয়াস জুলিয়াস সিযার হিসেবে পরিচিত হলেন, আর সেই সঙ্গে বাড়তি একটি নাম হিসেবে পেলেন অক্টাভিয়ানাস (ইংরেজিতে, অক্টাভিয়াস)। গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদরা তাঁকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেন, আর সেটাই হলো তাঁদের সবচেয়ে বড় ভুল। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি তাঁর এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে রোমের বাইরে শিবির ফেললেন এবং সিনেটকে বাধ্য করলেন মাত্র ২১ বছর বয়েসে তাঁকে কনসাল হিসেবে নিযুক্ত করতে। এর পরের পনের বছরের ইতিহাস রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর গৃহযুদ্ধের ইতিহাস, যেখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন অক্টাভিয়ান আর এন্টনি, যিনি একসময় সিযারের ঘনিষ্ঠতম মিত্র ছিলেন। এন্টনি আর মিশরের রানী ক্লিওপেট্রা অবশেষে পরাজিত হন ও মৃত্যুবরণ করেন, এবং, সাম্রাজ্যের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন অক্টাভিয়ান; তখন তাঁর বয়স পঁয়ত্রিশ। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধ চলাকালে বেশ নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি, এবং ধারণা করা হয়েছিল এক আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করবেন অক্টাভিয়ান, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটাই ঘটল। অক্টাভিয়ান সারা জীবনের জন্য ডিক্টেটর বা কনসাল হতে চাননি, এবং তিনি সিনেটকে বলে দিয়েছিলেন যে তিনি তাদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অবশ্য নিজের হাতে তিনি এমন কিছু ক্ষমতা রেখে দিয়েছিলেন যেগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একথা বলা অসঙ্গত হবে না যে, রোমকে তিনি এক নতুন সংবিধান দিয়েছিলেন, যে-সংবিধান অনুযায়ী একজনের হাতেই ছিল বেশিরভাগ ক্ষমতা, কিন্তু সিনেট, কনসাল ও রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মকর্তারাও সেখানে ছিল, এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের কথারও যথেষ্ট মূল্য দেয়া হতো। সেকারণে, তাঁকে ‘Augustus’ (মানে, ‘শ্রদ্ধেয়’, ‘রাজসিক’) উপাধিতে ভূষিত করে সিনেট একভাবে তাদের কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছিল। ভাবীকালের কাছে সেই নামেই পরিচিত হয়ে আছেন তিনি, এবং ২৭ খৃষ্ট পূর্বাব্দ থেকে ১৪ খৃষ্টাব্দে ছিয়াত্তর বছর বয়েসে মৃত্যু পর্যন্ত সেই উপাধি ধারণ করেছিলেন তিনি।…

যতদিন ছুটুমা-সোনাপিসে খালিশপুরের বাড়িতে ছিলেন, ১৪ ডিসেম্বর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে হাদিস পার্কে সারা রাত অনুষ্ঠান হত। এক রাত আমি ওই বাড়িতে ছিলাম, অনুষ্ঠান শেষে। এই রাত্রিদিন গুলি আমার জন্য রক্তের আখরে আঁকা। ছুটুমা বলতেন, ‘ওরা আসবে,’ — ‘ওরা দেখতে পাচ্ছে। তোর মনে হয় না?’ [. . .]

১ আমার পিসিদের তিনজনকে আমি ছোটবেলা থেকে আমি মা বলতে শিখেছি — রাঙামা, ফুলমা, ছুটুমা। সম্ভবত, তাঁদের জৈবিক অর্থে কোনো সন্তান ছিল না বলে, অন্য পিসিরা এবং আমার মাবাবা এই শিক্ষাটা দিয়েছিলেন। মার মতোই আমার পিসিরা, সবাই। মমতায় কাছে টেনেছিলেন তাই নয়, মানুষও করেছিলেন। যে যেভাবে পেরেছেন। প্রত্যেকের হাতেই দেয়ার মতো অজস্র সম্পদ ছিল যে! শেষের জন, মুক্তি মজুমদারের সান্নিধ্যে এসেছি অনেক ছোটবেলা থেকেই, তবে প্রবাস থেকে ফেরার পর সাড়ে দশ বছরের আমি থেকে পরিণত বয়েসি আমি পর্যন্ত আমার প্রত্যেক দিনই ইনি আমার চেতনার অংশীদার হয়ে রয়েছেন। ভালোবাসায়। ২ আসলে ছুটুমাই বোধ হয় আমাকে রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন চিনিয়েছেন, আর চিনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গান, নতুন করে, নতুন আঙ্গিকে। আমার যৌবনকে করেছেন টালমাটাল, অপূর্ব। শান্তিনিকেতনের পরিবেশের আভা তাঁর জীবনে, তাঁর ব্যক্তিত্বে; এটা তাঁর খোলস নয়, তাঁর ধাতু। আবার বাংলাদেশের সচেতন, সাহসী, অসাম্প্রদায়িক পরিবেশের পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর সুবাস। আমি ওই সুবাসে আসক্ত হয়েছিলাম ছোটবেলায়, তাই ছুটুমার বাড়ি যেতে চাইতাম সুযোগ পেলেই। গেলেই বাবার আনা লংপ্লেতে ভারতীয় রাগসঙ্গীত, অথবা চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, অথবা নানা রঙের স্বাদের পুরনো রেকর্ড আমাকে শুনতে দিতেন। আমি সেই সব গান মন্ত্রের মতো বসে বসে শুনেছি, জয়নুল আবেদিন অথবা নন্দলাল বসুর স্কেচের বই হাতড়েছি। অদূরে ধানক্ষেত তখন সবুজ আভায় টুসটুস করছে। ‘আমার যায় বেলা বয়ে যায় বেলা কেমন বিনা কারণে’, শুনতে শুনতে সময় থমকে থেকেছে। সেসব দিনে ছুটুমার গলায় শুনেছি মায়াবী ব্যঞ্জনার গান, নিভৃতে, সেই গ্রামীণ বাংলাদেশের নির্জন, নিরালা সুস্বাদু পরিবেশে, ‘কী সুর বাজে আমার প্রাণে, আমিই জানি, মনই জানে’। উনি জেনেছেন, আমিও বোধ হয় জেনেছি তখন, সেই ছোটবেলাতেই। কেউ বাধা দেয়নি। বরং ছুটুমার কাছে গান শিখতে আসা প্রাণের মেলায় মিলতে আসা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে আমিও মিশে গিয়েছি, শিখেছি এমন সব গান যা আমি আগে শুনিনি, ‘মোরা সত্যের 'পরে মন আজি করিব সমর্পণ’ অথবা ‘জাগো নির্মল নেত্রে রাত্রির পরপারে, জাগো অন্তরক্ষেত্রে মুক্তির অধিকারে’ — প্রবাসে চার বছর কাটিয়ে আসার পর গান, বাংলা ভাষা আর সুমধুর পরিবেশের এই বন্যা, আমার কৈশোরকে, যৌবনকে কোনো বিশাল স্বপ্নকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর একটা কারণ বোধ হয় আমার জীবনের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে, অর্থাৎ আমার প্রাক-বয়ঃসন্ধির সময় থেকে শুরু…

|| ইতিহাসের ভাষা || রোমকদের ইতিহাস সম্পর্কে এখানে বেশ খানিকটা আলোচনা করেছি আমরা, একেবারে তাদের প্রাচীনকাল থেকে পরবর্তী বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত। আমরা যে এসব সম্পর্কে কিছু জানি তার কারণ নিজেদের ইতিহাস লিখে রাখার ব্যাপারে আগ্রহের কমতি ছিল না রোমকদের। [. . .]

Tore Janson-এর সুইডিশ ভাষায় রচিত Latin: Kulturen, historien, språket গ্রন্থের Merethe Damsgård Sørensen ও Nigel Vincet-কৃত ইংরেজি অনুবাদ A Natural History of Latin-এর বাংলা ভাষান্তর   ইতিহাসের ভাষা রোমকদের ইতিহাস সম্পর্কে এখানে বেশ খানিকটা আলোচনা করেছি আমরা, একেবারে তাদের প্রাচীনকাল থেকে পরবর্তী বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত। আমরা যে এসব সম্পর্কে কিছু জানি তার কারণ নিজেদের ইতিহাস লিখে রাখার ব্যাপারে আগ্রহের কমতি ছিল না রোমকদের। ইতিহাস লেখার এই ধারণাটিও তারা পেয়েছিল আসলে গ্রীকদের কাছ থেকেই, যারা রোমকদের বহু শত বছর আগেই নিজেদের ইতিহাস লিখে রাখতে শুরু করেছিল। আর, মজার বিষয় হলো রোমের ইতিহাস বিষয়ে আমাদের কাছে এখনো যেসব উৎস রয়েছে তার অনেকগুলোই গ্রীক ভাষায় লেখা। তবে একবার শুরু করার পর রোমকরা বেশ কিছু উৎকৃষ্ট মানের লেখার জন্ম দিয়েছে। রোমের ইতিহাস যাঁদের আগ্রহের বিষয় তাঁদের জন্য বেশ কিছু রোমক ঐতিহাসিকের লেখা আজও পাঠযোগ্য বলে বিবেচিত। সাধারণত প্রথমেই যাঁর নাম আসে তিনি সালাস্ত (Sallust; লাতিন ভাষায়, Sallustius) — সিযারের ঘনিষ্ঠতম কর্মকর্তাদের অন্যতম, নিজেও সিনেটর হয়েছিলেন, আর প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন নুমিদিয়ার (মোটামুটি বর্তমান আলজেরিয়া বলা যেতে পারে জায়গাটিকে)। সম্ভবত, নিজের প্রদেশটিকে ভালোই শোষণ করেছিলেন তিনি, কারণ রোমের সেরা এলাকায় বিশাল এক বাগানসহ একটা বাড়ি কিনেছিলেন তিনি নিজের জন্য। অবশ্য চল্লিশ বছর বয়েসে অবসর নিয়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। সেসব লেখার মধ্যে যা আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে তা ছোট দুটি বই, যার একটি সেই ক্যাতিলিন সম্পর্কে, যাঁকে সিসেরো আক্রমণ করেছিলেন। পড়তে বেশ ভালো বইটা, স্কুলে পাঠ্য-ও ছিল বেশ কয়েকশ বছর। ছাড়া ছাড়া রচনা শৈলীতে বেশ ভালোই লেখেন সালাস্ত, এবং তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায় মানুষজন কেমন, কেমন তাদের হওয়া উচিত সে-সম্পর্কে পরিষ্কার ভাষায় বলা তাঁর নিজস্ব ভাবনা চিন্তা: যেমন, তিনি বলছেন, “Régibus boni quam mali suspectiores sunt”, অর্থাৎ, ‘রাজার কাছে মন্দ লোকের চাইতে ভালোরাই বেশি সন্দেহজনক।‘ (লাতিন থেকে আক্ষরিক ইংরেজি করলে দাঁড়ায় — To kings, good than bad more suspected are)। ইতিহাসের ঘটনার বর্ণনার মাঝে নৈতিক শিক্ষা খোঁজ করবার একটা প্রবণতা চালু করেছিলেন তিনি রোমক ইতিহাসবিদদের মাঝে। আধুনিক আর রোমক ইতিহাসবিদদের মধ্যে একটা পার্থক্য হলো, তাঁরা তাঁদের চরিত্রদের দিয়ে কোনো বক্তৃতা করিয়ে নিতেন। তবে, এটা এক অর্থে ঐতিহাসিকভাবেও…

মানুষটা তাঁর যুগ ও বাস্তবতার অনেক আগেই জন্মেছেন। জার্মানির একটি গণিত-প্রেমিক, ইহুদি পরিবারে। আইনস্টাইনের প্রায় সমসাময়িক, এবং জীবন-বাস্তবতা প্রায় বিপরীত। আইনস্টাইন খ্যাতি ও সামাজিক পরিচিতির কড়া আলোয় এসেছেন। আর এই মানুষটি দশজনের চোখের আড়ালে, আঘাত ও অসম্মানের সঙ্গে পেছন থেকেই, তাঁর মত এক শান্ত, নির্লিপ্ত সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। [. . .]

মানুষটা তাঁর যুগ ও বাস্তবতার অনেক আগেই জন্মেছেন। জার্মানির একটি গণিত-প্রেমিক, ইহুদি পরিবারে। আইনস্টাইনের প্রায় সমসাময়িক, এবং জীবন-বাস্তবতা প্রায় বিপরীত। আইনস্টাইন খ্যাতি ও সামাজিক পরিচিতির কড়া আলোয় এসেছেন। আর এই মানুষটি দশজনের চোখের আড়ালে, আঘাত ও অসম্মানের সঙ্গে পেছন থেকেই, তাঁর মত এক শান্ত, নির্লিপ্ত সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। দুজনই জার্মান, ইহুদি, ও বিজ্ঞান-সাধক। আরো মিল তাঁদের গভীরে সমাজ ও মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ আগ্রহে ও সহানুভবে, তাঁদের নিঃসীম উদারতায় ও সাদামাঠা জীবনযাপনে, এবং তাঁদের যৌথ বিজ্ঞান-সাধনায়। জার্মানিকে গণিত-সাধনার পাদ-পীঠ বলা হয়। জার্মানির গণিত-ইতিহাস প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী, এবং সেখানে বহু ইহুদির বলার মত অবদান আছে। জার্মান গণিতের কথা বললে গাউস, রীমান, ডেডিকেন্ট, ওয়ার্সত্রাস, মোবিয়াস, বেসেল, কুরান্ট, ক্রনেকার, হিলবার্ট, এমন অনেক নাম গণিত-ছাত্রের মনে হয়ত ধাক্কা দেবে। আর এই মানুষ তো গণিত নিয়েই তার পুরো জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাঁর অভিনব আবিষ্কারে একের পর এক খুলে গেছে বিজ্ঞানের নানা দিকের দরজা। আশ্চর্য জটিল বিষয়ের নির্যাস ছেঁকে, তাদের মৌলিক, সরল ধর্মগুলি তুলে ধরেছেন অদ্ভুত সাবলীলতায়। জন্ম দিয়েছেন গণিতের আধুনিক রূপ, নতুন অবয়ব। স্থানকালের দিক থেকে নোয়েথার মোটামুটি একটি প্রতিকুল পরিবেশ বেছেই জন্মেছেন। জার্মানির তীব্র পুরুষতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক পরিবেশে, তিনি ম্যাক্স নোয়েথারের কন্যা, এক জন উদার, প্রগতিশীল, সমাজবাদের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাভাবাপন্ন মানুষ হিসেবে বিবর্তিত হয়েছেন। যেমন অনুমান করা যায়, এ সব কটি কারণেই তাঁর জীবনে বিপর্যয় এসেছে; অবমাননা, অসম্মান, জীবন-জোড়া আর্থিক সংকট, সংঘাত, সংগ্রাম। কিন্তু যাঁরা নোয়েথারকে চেনেন, তাঁরা তাঁর অস্তিত্বের প্রবল উজ্জ্বল দিকটিও জানেন। সব সংকুলতাকে প্রায় ধুলোর মত কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে তিনি ঝাঁপ দিয়েছেন জীবনের সব অবশ্য-কর্তব্য ইতিবাচক কাজের সমুদ্রে। সংসার ও সমাজের জটিল, নিষ্ঠুর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে শান্তির নীড়ের মত সরল বনস্পতি হয়ে উঠেছেন তাঁর আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু ও ছাত্রদের কাছে। আঠের বছর বয়স্ক এমি তাঁর জীবনের মোড় পাল্টেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে: গতানুগতিক গৃহিণী বা ইস্কুলের শিক্ষক হতে নয়, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো উচ্চশিক্ষা পেতে চান। ১৯০৮ পর্যন্ত চালচিত্রটা এরকম: জার্মানিতে মহিলারা রাজনৈতিক জীবনে বা সভা-সমিতিতে যোগ দিতে পারেন না। চোদ্দ বা পনের বছর পর্যন্ত কথা বলার মত কিছু ইংরিজি বা ফরাসী, ধর্মশিক্ষা, গার্হস্থ্য-বিজ্ঞান ও শিশু-শিক্ষা, বড় জোর ইস্কুল শিক্ষক হবার তালিম ছাড়া কিছু পান না…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.