আমরা এখনো আদমশুমারি ২০১১-এর ফলাফল পাইনি তবে ধারণা করা হয় বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭ থেকে ৮ ভাগ হতে পারে। তার মানে বাংলাদেশের ৪০ বছরে হিন্দুদের শতকরা হার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে।[...]

বাংলাদেশের বড় সংখ্যালঘু হচ্ছে হিন্দু জনগোষ্ঠী। ১৯৪১ সালে আমাদের এই অঞ্চলে হিন্দুরা ছিলেন জনসংখ্যার ২৮ ভাগ, ১৯৫১ সালে এসে হল ২২ ভাগ। এভাবে ১৯৬১ সালে ১৮.৫০ ভাগ, ১৯৭১ সালে ১৩.৫০ ভাগ, ১৯৮১ সালে ১২.১৩ ভাগ, ১৯৯১ সালে ১১.৬২ ভাগ, ২০০১ সালে ৯.২০ ভাগ। এই ষাট বছরে প্রায় ১৯ ভাগ হিন্দু জনগোষ্ঠী কমে গেল আমাদের মোট জনসংখ্যা থেকে – তারমধ্যে প্রায় ১৫ ভাগই কমে গিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগের ৩০ বছরে এবং আরো ৪ ভাগ কমেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের ৩০ বছরে। আমরা এখনো আদমশুমারি ২০১১-এর ফলাফল পাইনি তবে ধারণা করা হয় বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭ থেকে ৮ ভাগ হতে পারে। তার মানে বাংলাদেশের ৪০ বছরে হিন্দুদের শতকরা হার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে।

কেন কমে যাচ্ছে হিন্দুরা? পাকিস্তান আমলে হিন্দুদের ভাগ কমে যাওয়ার মূল কারণ যদি হয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও রাজনৈতিক হিংসা তাহলে বাংলাদেশ আমলেও হিন্দুদের ভাগ কমে যাওয়ার অন্য কোনো কারণ থাকার কথা নয় – ওই একই কারণে কমে যাচ্ছে বাংলাদেশের বড় সংখ্যালঘুর শতকরা অবস্থান।

আর এই যদি হয় বড় সংখ্যালঘুর অবস্থা তাহলে ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু ও আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর অবস্থা যে এর চেয়ে শোচনীয় হবে তাতে তো আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।

আর কতদিন ‘ভোটব্যাংক’ হয়ে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির চর্চা করবেন বাংলাদেশের বড় সংখ্যালঘুরা, যাদের চিহ্নিত ‘ভোটব্যাংক’ হয়ে থাকেন তারা সেই আওয়ামী লীগের আমলেও তো অত্যাচারের সংখ্যা কমলেও অত্যাচার তো বন্ধ থাকে না। বরঞ্চ বিএনপি আমলে অত্যাচার হলে অন্তত আওয়ামী লীগকে বলতে পারেন কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে হলে তো আর কাউকেই বলতে পারেন না তাদের অত্যাচারের কথা। হ্যাঁ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আছে – কিন্তু এটি তো কোনো রাজনৈতিক দল নয়, তারা বড় জোর রাজনৈতিক তদবির করতে পারেন সংখ্যালঘুদের পক্ষে। কিন্তু আর কতকাল কাটবে রাজনৈতিক তদবিরে, যদি এই অব্যাহত অত্যাচারে রাজনৈতিক দলের কথা ভাবেন বড় সংখ্যালঘুরা – সাথে যদি নেন অন্য সংখ্যালঘুদেরও তখন বাংলাদেশের যা একটু ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির চেহারা আছে তার কী অবস্থা হবে?

মাসুদ করিম

লেখক। যদিও তার মৃত্যু হয়েছে। পাঠক। যেহেতু সে পুনর্জন্ম ঘটাতে পারে। সমালোচক। কারণ জীবন ধারন তাই করে তোলে আমাদের। আমার টুইট অনুসরণ করুন, আমার টুইট আমাকে বুঝতে অবদান রাখে। নিচের আইকনগুলো দিতে পারে আমার সাথে যোগাযোগের, আমাকে পাঠের ও আমাকে অনুসরণের একগুচ্ছ মাধ্যম।

৭ comments

  1. মাসুদ করিম - ১ মে ২০১১ (১২:৩২ অপরাহ্ণ)

    আজকের কালের কণ্ঠে ২০০১-এর নির্বাচন পরবর্তী সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতার বিচার চেয়ে দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু লিখেছেন

    সত্যবাবু মরে গেছেন বটে কিন্তু ‘সত্য’ যে কখনো মরে না, ‘সত্য’ তার উপস্থিতি কোনো না কোনোভাবে বিলম্বে হলেও তুলে ধরে, এর প্রমাণ পুনর্বার মিলল ২০০১ সালের নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতা সম্পর্কে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে। প্রায় এক দশকের মাথায় সেসব সহিংস ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে একটি বিশদ প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছে ২৪ এপ্রিল ২০১১ তারিখে। বিএনপি এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা কী বলে? ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনোত্তর ১ অক্টোবর থেকে ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খুন, ধর্ষণ, হাত-পা কেটে নেওয়াসহ অগি্নসংযোগের মতো বহু গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল চারদলীয় জোটের মানবতাবিরোধীদের মাধ্যমে। তখন ওই দুষ্কর্ম নির্বাচনে ‘বিজয়োল্লাসের’ সহিংস প্রদর্শনী হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিল। দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় (কিছুসংখ্যক পত্রপত্রিকা বাদে) এসব ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত হয়ে আসছিল এবং তখনকার ক্ষমতাসীনরা ওই পৈশাচিকতা, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা বন্ধে কোনো রকম পদক্ষেপ তো নেনইনি, উপরন্তু তাঁরা বলছিলেন, এ সবই হচ্ছে মিডিয়ার ‘অতিরঞ্জন’। ওই ক্ষমতাবানরা এ কারণে তখন প্রশাসনের কিছু পদলেহী কর্মকর্তার যোগসাজশে শুধু অনেক সাংবাদিকের ওপরই কৌশলে তাঁদের হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাননি, তাঁদের রোষানল থেকে বাদ যাননি সুশীল সমাজেরও অনেকেই, যাঁরা তখন মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে পরাজিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, এমনকি সংখ্যাগুরু শ্রেণীর প্রতিবাদকারীরাও বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের শরিক দলগুলোর ক্ষমতাবান হিংস্রদের নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন এবং আক্রান্তদের প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রটুকুও পর্যন্ত ছিল না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও মানবতার বুলি কপচানো মানবতাবিরোধীদের উন্মাদনা সব কিছু স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ওই সময় দায়িত্বরত প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসব প্রত্যক্ষ করেও উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে ছিল, তারপর তথাকথিত বিজয়ী চারদলীয় জোট ওই উন্মাদনা চালানোর পথটি আরো প্রশস্ত্ত করে দিয়েছিল, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
    ২০০৯ সালের ৬ মে উচ্চ আদালত ২০১১ সালের নির্বাচনোত্তর এসব ঘটনার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনে সরকারকে নির্দেশ দেন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। এ অনুযায়ী ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কমিশন অব ইনক্যুয়ারি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশন সরেজমিন সাক্ষ্যগ্রহণ ও আলামত সংগ্রহ এবং সে সময়ের পত্রপত্রিকার কাটিং ও আনুষ্ঠানিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে পাঁচ খণ্ডে মোট এক হাজার আটাত্তর পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করেন। এই প্রতিবেদনে পাঁচ হাজার পাঁচ শ একাত্তরটি অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে খুনের অভিযোগ ৩৫৫টিঅগি্নসংযোগ, ধর্ষণের ঘটনার উল্লেখ আছে তিন হাজার ২৭০টি। রয়েছে আরো গুরুতর অভিযোগও। তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য যথার্থভাবেই সেসব ঘটনাকে ‘মানবিক দুর্যোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রতিবেদনে চারদলীয় জোটের কিছু নেতাকে সেই সময়ের (ওই নেতাদের কেউ কেউ মন্ত্রীর চেয়ারেও অধিষ্ঠিত ছিলেন!) সহিংস ঘটনার জন্য দায়ী করে তাঁদের নাম-পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন তদন্ত প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে বলেছেন, দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এ দেশে ‘হবে’, ‘হচ্ছে’, ‘করব’, ‘করছি’ ইত্যাদি শব্দের জটাজালের এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু আছে। প্রতিকার কবে কিংবা কতটা কী হবে তা ভবিষ্যৎ জানে, কিন্তু বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন মুখোশধারীদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে তাদের পরিচয় তুলে ধরতে পেরেছেন_এটি বিলম্বে হলেও বড় কাজ হয়েছে।
    ২০০১ সালের অক্টোবর মাসের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কিভাবে নির্বিচার অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা সচেতন মহলের অজানা নয়। বরিশাল, বাগেরহাট, ভোলা, ঝালকাঠি, খুলনা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা_কোথায় ঘটেনি সহিংসতা? এমন একটি জনপদও বাকি ছিল না, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হননি, যেখানে তাঁদের ঘরবাড়ি, মন্দির, প্রতিমা ভাঙেনি। নির্বাচনের তাণ্ডবতা কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মধ্যে সীমিত থাকলেও একটি খোঁড়া যুক্তি খুঁজে পাওয়া যেত। যাঁরা গরিব, নিজেদের ভিটামাটিও নেই, অন্যের বাড়িতে আশ্রিত, যাঁরা দুই বেলা দু’মুঠো অন্ন জোটাতে পারেন না, তাঁদের আবার রাজনীতি কী? কিন্তু এসব মূঢ়-ম্লান মুখই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছিলেন। ওই সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং পরে একটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে লালমোহন, রামশীলসহ কয়েকটি জনপদে বিপন্ন মানবতার যে চিত্র দেখেছি, তা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। তখন একটি প্রশ্নই সারাক্ষণ তাড়া করছিল, এই আমাদের দেশ! গফরগাঁওয়ের জ্যোৎস্না রানী, মনি বাইন, আগৈলঝাড়ার সাবিত্রী, মধু, শেফালী সরকার, ভোলার শেফালী রানী, রীতা রানী, চিলতামারীর হাসিনা, মধুরানী দাশ, চম্পা, জয়পুরহাটের সুজাতা, রেনুকা অধিকারী, রাউজানের প্রভা দাশ, মিরসরাইয়ের সম্বি, কুটন দাশ, চন্দনাইশের বনিতাসহ অগণিত নারী ওই দুঃসময়ের দুঃসহ স্মারক। আর বেশির ভাগ পুরুষই হয় নির্যাতিত, না হয় ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন এবং অভিযোগ আছে, যাঁদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত দেশত্যাগ করতেও বাধ্য হন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তরা কিভাবে লালিত হয়, এসব তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। সাম্প্রদায়িকতাকে নিন্দা করলে, এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তা মানবতার পক্ষেই যায়_এ ধারণাটাও তখন ভেঙে গিয়েছিল।
    বাংলাদেশে একসময় ভয়ানক কিছু রোগের আধিপত্য ছিল। যেমন_বসন্ত, পোলিও অথবা যক্ষ্মা। এর কিছু নির্মূল হয়েছে, কিছু নির্মূলের পথে। এসব ভয়ংকর রোগের তালিকায় আছে আরেকটি অনিরাময়যোগ্য রোগ, যার নাম সাম্প্রদায়িকতা। কোনো সরকার যদি এ রোগ নির্মূলের সহায়ক শক্তি না হয়ে জীবাণু ছড়ানোর বাহন হয়, তবে এর পরিণাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে, এর দৃষ্টান্ত হতে পারে ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জঙ্গিবাদের কারণে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা অতীতে বহুবার হয়েছে কলিমালিপ্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যদি একজনকে রেসিস্ট হিসেবে (বর্ণবিদ্বেষী) অভিযুক্ত করা হয়, তাহলে সে লজ্জায় অধোবদন হয়। অনস্বীকার্য যে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ অসাম্প্রদায়িক এবং এর সবচেয়ে বড় প্রমাণও একাত্তরেই আমরা পেয়েছি; কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির হিংসা-বিদ্বেষের শানিত ছুরিতে ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত হয়েছে কয়েকবার। আমরা সেই বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই, যে বাংলাদেশে শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জন্য যা কিছু অকল্যাণকর, তা কবর দিয়ে অভ্যুদয় ঘটেছিল বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের। একজন নাগরিকের পরিচয় তার রাষ্ট্রসত্তায়, কোন ধর্মে সে জন্মগ্রহণ করেছে তাতে নয়। এ বিষয়টির মীমাংসা হয়ে গেছে একাত্তরেই। কিন্তু ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশ আবার পড়ে মধ্যযুগের পচা দুর্গন্ধময় অন্ধগলিতে। হিন্দু, বৌদ্ধ, এমনকি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনও নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হন নির্বিচারে। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে গণমাধ্যম, বিশেষ করে পত্রপত্রিকায় নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি মূর্ত হয়ে উঠেছিল বলেই অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি তাঁদের। তা না হলে তথাকথিত বিজয়ের পর বিজয়োল্লাসীদের উন্মত্ততা এ জনপদের আরো অনেককেই হয়তো নিশ্চিহ্ন করে দিত।
    ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর নির্যাতন দূর-অতীত ও সাম্প্রতিককালের সব মাত্রা অতিক্রম করে যায় পরিমাপে-বিস্তৃতিতে। ঘটনাগুলো স্থানিক বা বিচ্ছিন্ন ছিল না। প্রায় গোটা দেশই মানুষ নামধারী নরপশুদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র কিংবা চারণভূমি হয়ে উঠেছিল। তিল তিল করে দীর্ঘ সময়ের পথ ধরে যে মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক সমসমাজ গড়ার অনলস চেষ্টা, ধর্ম-সম্প্রদায়-জনগোষ্ঠী অনপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ, জাতি ধর্ম বর্ণ গোষ্ঠী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার সব অর্জন, আমাদের সব সাফল্য, পরম যত্নে লালিত স্বপ্নগুলো একেবারেই বিলীন করার পথ যারা প্রশস্ত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনোই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি! ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে-পরে তখনকার সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা যেসব বিষয়কে ‘মিডিয়ার অতিরঞ্জন’, কিছুসংখ্যক মানুষের ‘গণ্ডগোল’_এসব বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন এত দিন সরকার পদক্ষেপ নিল না_এ প্রশ্নও উঠবেই।
    রাষ্ট্রশক্তি যদি তার চরিত্র ঠিক রাখে, তবে উদ্ধত ক্ষমতামদমত্ত, বলবান কিংবা জ্ঞানহীন কুচক্রী মানুষ নামের অপশক্তি কি বেশি দূর যেতে পারে? রাষ্ট্র কাঠামোর কিংবা দেশ চালানোর শাখা-উপশাখায় যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা যদি নিষ্ঠ থাকেন, দায়বদ্ধ থাকেন, জবাবদিহিতার পাট না চুকিয়ে ফেলেন, তাহলে মানুষের সব অধিকার রক্ষা পাবে, মানুষ বাঁচবে, শঙ্কামুক্ত থাকবে এবং সে রকম উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আর সৃষ্টি হবে না। এ দেশে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের যে পর্যন্ত না সুষ্ঠু বিচার হবে, সে পর্যন্ত কখনো লর্ড হার্ডিঞ্জ, কখনো রামশীল, কখনো আগৈলঝাড়া কিংবা অন্য কোনো জনপদ আতঙ্কজনক বার্তা নিয়ে সংবাদ শিরোনাম হবেই। একটা কথা তো সত্য, প্রবলের স্বার্থ থেকে উৎপত্তি ব্যাধি ক্যান্সার বিষের মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এ দেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষ যে অদৃশ্য শিকলে বাঁধা, তা তাদেরই ছিঁড়তে হবে। তবে রাষ্ট্রশক্তি তার দায় এড়াতে পারে না। কেউই আইনের ঊধর্ে্ব নন। অন্যায়কে অবশ্যই অন্যায়ের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। অন্যায়কারীর দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, সমাজ ও আইনের দৃষ্টিতে সে বা তারা শুধুই অন্যায়কারী এবং তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো রাষ্ট্রের অবশ্যই দায় রয়েছে। বিলম্ব অনেক হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করব, রাষ্ট্রশক্তি আর বিলম্ব না করে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পথ প্রশস্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন মোতাবেক এসব ঘটনার জন্য অভিযুক্তদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আমাদের ভবিষ্যৎ হচ্ছে বাংলাদেশ। সব ধর্মের, সব মানুষের সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার দেশ, বাংলাদেশ। রাষ্ট্র হোক সবার অর্থাৎ জনগণের, কিন্তু রাষ্ট্র কোনোভাবেই যেন দুর্বৃত্তদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল না হয়।

    লিন্ক : ২০০১-এর সহিংসতা : প্রমাণ মিলল এবার বিচার হবে তো?

  2. নুর নবী দুলাল - ৩ মে ২০১১ (৪:১১ অপরাহ্ণ)

    যে হারে হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, অদুর ভবিষ্যতে মানব বৈচিত্রতা হারিয়ে আমরা অভাগা হয়ে যাব মনে হচ্ছে!!!

  3. মাসুদ করিম - ১৪ জুন ২০১১ (৬:৩৪ অপরাহ্ণ)

    সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অর্ন্তভুক্ত করার অর্থই হল দেশের ৯৭ শতাংশ মুসলমানকে ৩ শতাংশ অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গে সমান প্রতিপন্ন করা।

    মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এবং প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা একথা বলেন।

    খবরের লিন্ক এখানে

    আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ এই তথ্য কোথায় পেল, আমরা জানি না — কিন্তু যদি এই তথ্য সত্য হয় তাহলে তো বুঝতে হবে গত দশ বছরে ৬ শতাংশের মতো কমে গেছে বড় সংখ্যলঘুর সংখ্যা। শেখ হাসিনার খুব পছন্দের এই সংগঠন ঠিক তথ্য পরিবেশন করেছে না কি সংখ্যলঘুদের সংখ্যা কত হওয়া উচিত সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করছে? ওলামা আওয়ামী লীগ হলেই কি নির্বিষ ওলামা হয়? ওলামা আওয়ামী লীগ হলেই কি চোখ উপড়ানো ভুলে যায়?

  4. মাসুদ করিম - ৭ জানুয়ারি ২০১৪ (১:০৫ পূর্বাহ্ণ)

  5. মাসুদ করিম - ৭ জানুয়ারি ২০১৪ (৪:৪৩ অপরাহ্ণ)

    সুধাংশু তুই পালা

  6. মাসুদ করিম - ২২ নভেম্বর ২০১৬ (১২:৩৮ অপরাহ্ণ)

    তিন দশক পরে দেশে কোনও হিন্দু থাকবে না!

    ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দু’তিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বি কোনও মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    এই গবেষণাটি আজ শনিবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

    ড. বারকাতের গবেষণায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়কালে প্রতিদিন গড়ে নিরুদ্দেশ হওয়া হিন্দুদের সংখ্যা সমান নয়, যেমন-১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ পাকিস্তানের শেষ ৭ বছর প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৭০৫ জন হিন্দু। ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৫২১ জন। ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৪৩৮ জন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রতিদিন ৭৬৭ জন হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আর ২০০১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৬৭৪ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন।

    এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল বারকাত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এটি একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার যে এই দেশে জন্ম নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। তিনি বলেন, যেভাবে হিন্দুরা হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দুতিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোনও মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    ড. বারকাত তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, অর্পিত সম্পত্তি নামে শত্রু সম্পত্তি আইন কার্যকর থাকার ফলে হিন্দু হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষ অনিচ্ছায় দেশান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন।

    তার গবেষণায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সামন্ত-সেনা শাসকরা জন্ম সূত্রেই ছিলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালি বিরোধী। যে কোনও কায়দায় ব্যাপক হিন্দু জনগোষ্ঠীকে সম্পদচ্যুত, ভূমিচ্যুত, দেশচ্যুত করা গেলে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করে শাসন করা সোজা হবে। এ ভাবনা থেকেই পাকিস্তানি সেনা শাসকরা ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে শত্রু সম্পত্তি আইন জারি করে।

    আবুল বারকাতের গবেষণায় দেখা গেছে, শত্রু সম্পত্তি আইনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মূল মালিকানার ২৬ লাখ একর বেদখল বা ভূমিচ্যুত করা হয়েছে। এই ২৬ লাখ একরের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই কৃষি জমি, ২৯ শতাংশ বসতভিটা, ৪ শতাংশ বাগান, ৩ শতাংশ পতিত, ১ শতাংশ পুকুর ও ১৯ শতাংশ অন্যান্য জমি বেদখল হয়েছে।

    আবুল বারকাত তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, শত্রু অর্পিত সম্পত্তি আইনে ভূমি-জলা ও স্থানান্তরযোগ্য সম্পদ হারানোর আর্থিক ক্ষতি সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা (২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজার দর হিসাবে)।

    গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৪০ বছরে (১৯৬৫-২০০৬) বিভিন্ন সরকারের আমলে শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি আইনে হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষের ক্ষতির পরিমাণ ও মাত্রা ছিল বিভিন্ন ধরনের। এই আইনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ৬০ শতাংশ ও মোট ভূমিচ্যুতির ৭৫ শতাংশ হয়েছে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ২০ দশমিক ৬ শতাংশ ও মোট ভূমিচ্যুতির ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘটেছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি আইনে যেসব হিন্দুধর্মাবলম্বী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ৭২ শতাংশ এবং মোট ভূমিচ্যুতির ৮৮ শতাংশই ঘটেছে সেনাশাসন-স্বৈরশাসনামলের ২১ বছরে। অর্থাৎ ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সাল এবং ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ সাল।

    ড. বারকাত তার গবেষণায় দাবি করেছেন, হিন্দু সম্প্রত্তি বেদখল করতে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ভূমি অফিস সবচেয়ে দায়ী। গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্পদ দখল হয়েছে প্রধানত ৫ ভাবে। প্রথমত- স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুমি অফিসের সঙ্গে যোগসাজশে উদ্দেশ্য সাধন করেছেন (৭২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)। দ্বিতীয়ত-ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরাই অবৈধ দখল করেছেন (৪৬ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)। তৃতীয়ত- স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন ধরনের বল প্রয়োগ করেছেন, জোরপূর্বক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন, দেশত্যাগে বাধ্য করেছেন (৩২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)। চতুর্থ কারণ হলো, প্রকৃত মালিক/ উত্তরাধিকারীদের একজনের মৃত্যু অথবা দেশত্যাগ (৩৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য) এবং পঞ্চম কারণ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল জাল দলিল-দস্তাবেজ, কাগজপত্র তৈরি করে ভূসম্পত্তি দখল করেছেন (১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)।

    ড. বারকাত তার গবেষণায় বলেছেন, ‘শত্রু/অর্পিত সম্পত্তি আইন’ বিষয়টি কোনও অর্থেই হিন্দু বনাম মুসলমান সমস্যা নয়। বরং বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে বলপূর্বক অন্যের সম্পত্তি দখল করার একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া মাত্র। যে প্রক্রিয়ায় লুটপাটের ভাগিদার হয় গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যাক্তি/শ্রেনি/ গোষ্ঠী।

    তবে ড. বারকাতের গবেষণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পিযুষ কান্তি ভট্টাচার্য। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভারতে অনেক হিন্দু বেড়াতে যায়। কিন্তু সেখানে বসবাস করতে যাবে, এমন মনোভাব অনেকেরই নেই।’

    এ কারণে অধ্যাপক আবুল বারকাতের ওই গবেষণার সঙ্গে আমি একমত নই। তিনি বলেন, ‘হয়তো কোনও হিন্দু মনে করেছে, সেখানে তাদের বসবাস করা অসম্ভব। তবে সব হিন্দু কিন্তু এমনটি মনে করে না। এই দেশে বহু হিন্দু আছে, যারা এই দেশ ছেড়ে কখনই যাবে না।’

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.