অমর্ত্য সেন ভারতীয়দের ইংরেজ উত্তরাধিকারের ভালোদিক নিয়ে একটি বই লিখেছেন The Argumentative Indian। পরে বইটির বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছে ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’ এবং বাংলা অনুবাদটি তিনি অনুমোদন করেছেন। ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ দুটোর একটাও আমি পড়িনি। এ উপমহাদেশের অন্যদের কথা জানি না, তবে আমাদের দেশের মানুষের যে তর্কে মতি আছে তা জানি; এবং একে ঠিক ‘তর্কপ্রিয়’ও বলব না, তারচেয়ে ‘তর্কগ্রস্ত’ বলার দিকেই আমার পক্ষপাত থাকবে। (Argumentative: A person who is argumentative likes arguing or often starts arguing. Argument: A conversation or discussion in which two or more people disagree , often angrily.) অভিধানে উল্লেখিত উপরের অর্থেই আমাদের দেশের মানুষ Argumentative, এবং অভিধান বর্ণিত অর্থেই তারা Argument করে থাকেন। কিন্তু আমরা Argumentative-এর পাশাপাশি Vindictive (Vindictive: trying to harm or upset somebody or showing that you want to, because you think that they have harmed you.)-ও, জানি না প্রতিশোধপরায়ণতা আমাদের মধ্যে উপনিবেশবাহিত, না কি আদি-অকৃত্রিম মন্ত্রেই আমরা প্রতিশোধপরায়ণতায় দীক্ষিত।

এই কথাগুলো সব বললাম বাংলার নেতা ও ত্রাতা শেখ মুজিবের প্রতি আমাদের সাধারণ মনোভাবের দৈন্যতা ও তাকে হেয় করবার তৎপরতার দিকে লক্ষ্য রেখেই। আমাদের সাধারণ মনোভাব তিনি দেশ স্বাধীন করেছেন ঠিক কিন্তু তিনি সারাক্ষণ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত ভুল করেছেন, এবং সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন ‘বাকশাল’ গঠন করে তাই তার ওপর ১৫ আগস্ট হামলা চালানো হয় এবং তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ছিনিয়ে আনা হয়।

১৫ আগস্ট ২০০৯-এর সমকালে আবদুল গাফফার চৌধুরীর কলাম কালের আয়নায় পনেরো আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডটি যদি সংঘটিত না হতো পড়ার পর আমি এখানে কলামটি থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে দিলাম এই জন্য যে আমরা তাকে ও তার প্রবর্তিত বাকশালকে প্রতিনিয়ত হেয় করেছি এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছি, আমাদের ভাবনায় এই বেদনাবোধ যেন জাগ্রত হয় এবং আমরা যেন তাকে ও তার কাজকে গণ্ডিবদ্ধভাবে না দেখি, তার উচ্চতায় আমাদের জাতিসত্তার প্রবলতম সংগ্রামী মানুষটিকে যেন আর অশ্রদ্ধা না করি।

পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডটি যদি না ঘটত এবং বঙ্গবন্ধু তার বাকশাল শাসনব্যবস্থা চালু করতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা আজ কী দাঁড়াত সে সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে সুষ্ঠু চিন্তাভাবনার দরকারআছে।…ব্রিটিশ আমলের আমলাতন্ত্রের হাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বন্দি ছিল। নির্বাচিত জেলা গভর্নর প্রথা সেই বন্দি অবস্থা থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করত। এজন্যই এই গণতন্ত্রের নাম দেওয়া হয়েছিল শোষিতের গণতন্ত্র।

শেখ মুজিবের বাকশাল ব্যবস্থায় নির্বাচিত জেলা গভর্নরদের অধীনে আমলাতন্ত্রকে ন্যস্ত করা হয়েছিল। ফলে দেশের সিভিল ব্যুরোক্রেসি ভয়ানকভাবে ক্ষুব্ধ হয় এবং তাদের বহু যুগের আধিপত্য ধ্বংস হতে বসেছে জেনে বঙ্গবন্ধুবিরোধী চক্রান্তে শামিল হয়।

আইনজীবীদের মধ্যে ব্যারিস্টার, অ্যাডভোকেট, মোক্তার এই তিন শ্রেণী বিভক্তি লোপ করে সবাইকে অ্যাডভোকেট শ্রেণীভুক্ত করা হয়। তাতে ব্যারিস্টার ও অ্যাডভোকেট শ্রেণী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিল। আমার মনে আছে, তখনকার বিখ্যাত আইনজীবি মির্জা গোলাম হাফিজ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আইনের পেশাই ছেড়ে দেব। শেখ মুজিব কি চান মোক্তার –মুহুরিদের পঙক্তিতে আমাদের নিয়ে বসাতে?’ আমার জানামতে, মেখ মুজিব তা চাননি। তিনি অ্যাডভোকেটদের মোক্তার পর্যায়ে নামাতে চাননি, চেয়েছিলেন মোক্তারদের জন্য ট্রেনিংয়ের শর্ট কোর্স প্রবর্তন করে অ্যাডভোকেট পর্যায়ে উন্নীত করতে।

আমার মনে আছে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরী আমাকে এক ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন, জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়ার আইনটি যখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য তার কাছে আসে, তখন আওয়ামী লীগেরই দু’জন মন্ত্রী তাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তিনি যেন এই আইনে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর কয়েকদিন বিলম্বিত করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তারা অনেক জমির মালিক এবং আইনটি পাস হওয়ার আগে এ জমির মালিকানা পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে হস্তান্তর করে বেনামে তার মালিকানা অক্ষুন্ন রাখতে চান।

বাকশাল পদ্ধতিতে সমাজের মাথাওয়ালাদের সুযোগ ও স্বাধীনতা প্রয়োজনে খর্ব করে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে সুদূর অতীত থেকে অনুপস্থিত গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারগুলো এই প্রথমবারের মতো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ফলে বাকশালের বিরুদ্ধে যে বিরাট চিৎকার শুরু হয়েছিল, তা সমাজের উপরতলার শিক্ষিত ও সুবিধাভোগী শ্রেণীগুলোর চিৎকার। তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর চিৎকার ছিল না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে ছুটে গেছেন। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রুতা করা সত্ত্বেও বেইজিংয়ের দিকে মৈত্রীর হাত বাড়িয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে শেখ মুজিবের টি-ডিপ্লোমেসি নামে খ্যাত মৈত্রীর হাত বাড়ানোর নীতি অধিকাংশ আরব দেশকে এই বলে আশ্বস্থ করেছিল যে, তিনি সংগ্রামী আরব স্বার্থের বন্ধু। পাকিস্তানের ভুট্টোকেও তিনি বিপজ্জনক ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন শুধু এই দেশটির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তখনকার দিল্লি-মস্কো জোটের সমর্থন ও সাহায্যপ্রাপ্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও তিনি মার্কিন নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের আরও বৈরিতা সৃষ্টির মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। ভারতের ইন্দিরা সরকারের সঙ্গে তিনি যে মৈত্রী গড়ে তুলেছিলেন তা ছিল কিংবদন্তির মৈত্রীতুল্য। একটি বড় এবং শক্তিশালী প্রতিবেশীর দ্বারা তিন দিক থেকে পরিবেষ্টিত থাকা অবস্থায় কীভাবে একটি ছোট দেশ তার আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে বড় দেশটির সঙ্গে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে তার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

বঙ্গবন্ধু কি ভারতের কাছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বন্ধক রেখেছিলেন? এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনায় যাওয়ার এখন আর কোনো প্রয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ব্রিটেনের লর্ডসভার মানবতাবাদী সদস্য প্রয়াত লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব তার দেশকে একবার নয়, দু’বার স্বাধীন করেছেন। একবার পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আরেকবার ভারতীয় সৈন্যদের দেশ স্বাধীন হওয়ার তিন মাস না যেতেই ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে। শেখ মুজিব পাকিস্তানি কারাগার থেকে দেশে ফিরতে না পারলে ভারতের সৈন্য বাংলাদেশ থেকে দ্রুত প্রত্যাহার হতো না।’

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সিন্ধু অববাহিকায় পানি ভাগ নিয়ে বিবাদের মীমাংসা করতে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আইএমএফকে সালিশ ও সাহায্যদাতা হতে হয়েছে, সেখানে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সমস্যায় মুজিব সরকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনাতেই ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের এক সাংবাদিক দিল্লির এক ইংরেজি দৈনিকে কিছুকাল আগে লিখেছেন, শেখ মুজিব আজ বেঁচে থাকলে এবং তার নীতি দ্বারা বাংলাদেশ চালিত হলে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারতের মৈত্রী আজ বিশ্বে এক উদাহরণ সৃষ্টি করত এবং দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা, সীমান্ত-সংঘর্ষ দূর অতীতের দুঃস্বপ্নে পরিণত হতো।

মাসুদ করিম

লেখক। যদিও তার মৃত্যু হয়েছে। পাঠক। যেহেতু সে পুনর্জন্ম ঘটাতে পারে। সমালোচক। কারণ জীবন ধারন তাই করে তোলে আমাদের। আমার টুইট অনুসরণ করুন, আমার টুইট আমাকে বুঝতে অবদান রাখে। নিচের আইকনগুলো দিতে পারে আমার সাথে যোগাযোগের, আমাকে পাঠের ও আমাকে অনুসরণের একগুচ্ছ মাধ্যম।

১৩ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.