"সমকামিতা অপরাধ নয়", দিল্লী হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

গত ২ জুলাই ২০০৯ ভারতের দিল্লী হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ যুগান্তকারী এক রায়ের মাধ্যমে 'প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে সমকামি সম্পর্ক' ফৌজদারী অপরাধের তালিকাভূক্ত হবে না বলে ঘোষণা করেছে। বিচারপতি এস মুরলিধর এবং বিচারপতি অজিত প্রকাশ সাহার দেয়া সুলিখিত এই রায়টির পুরো কপি এখান থেকে ডাউনলোড করে নেয়া যাবে পোস্টে প্রদত্ত লিন্ক থেকে। ভারতীয় দন্ডবিধি (১৮৬০) এর ৩৭৭ ধারার বিধান অনুযায়ী যে কোন ধরণের সমকামি সম্পর্ক এত দিন পর্যন্ত ‍"অস্বাভাবিক এবং অনৈতিক" ধরে নিয়ে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো [...]

গত ২ জুলাই ২০০৯ ভারতের দিল্লী হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ যুগান্তকারী এক রায়ের মাধ্যমে ‘প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমকামি সম্পর্ক’ ফৌজদারী অপরাধের তালিকাভুক্ত হবে না বলে ঘোষণা করেছে। বিচারপতি এস মুরলিধর এবং বিচারপতি অজিত প্রকাশ সাহার দেয়া সুলিখিত এই রায়টির পুরো কপি এখান থেকে ডাউনলোড করে নেয়া যাবে। ভারতীয় দণ্ডবিধি (১৮৬০) এর ৩৭৭ ধারার বিধান অনুযায়ী যে-কোনো ধরণের সমকামি সম্পর্ক এত দিন পর্যন্ত ‍”অস্বাভাবিক এবং অনৈতিক” ধরে নিয়ে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। ১৪৮ বছরের পুরনো বিধানটি এরকম:

Section 377: Unnatural offences: Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal, shall be punished with imprisonment for life, or with imprisonment of either description for term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine.

Explanation: Penetration is sufficient to constitute the carnal intercourse necessary to the offense described in this section

নাজ ফাউন্ডেশনের দায়ের করা এই জনস্বার্থমূলক মামলাটির রায়ে আদালত সমকামিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির এই ধারাটির অপপ্রয়োগকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী, গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং অসাংবিধানিক বলে অভিমত দিয়েছে। আদালতের মতে এই প্রয়োগ ভারত সংবিধান স্বীকৃত কয়েকটি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী, যেগুলো হল: আইনের দৃষ্টিতে সমতা (অনুছ্ছেদ ১৪), বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা (অনুচ্ছেদ ১৫), জীবনধারণ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১)। [ভারতীয় সংবিধানটি এখান থেকে ডাউনলোড করা যাবে]। রায়টির অব্যবহিত পরেই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রায়টিকে স্থগিত করার জন্য সুপ্রীম কোর্টের কাছে আবেদন করা হয় যা মঞ্জুর হয়নি

রায়টির সম্বন্ধে আরও জানতে নিচের কয়েকটি ব্লগ পড়ে দেখা যেতে পারে:

— বিক্রম রাঘবন – Navigating the Noteworthy and the Nebulous in Naz Foundation – পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩
— নিবেদিতা মেনন – The Day After the Judgement [এখানে]
— রাহুল সিদ্ধার্থন – Is 377 now 404? [এখানে]

বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া

১)
ভারতের ২৩ টি শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সর্বমোট ১৮০ জন স্বাক্ষর প্রদানকারী শিক্ষক, অধ্যাপক এবং গবেষক এই রায়ের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানানোর পাশাপাশি একে সাধুবাদ জানিয়েছেন। শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল সমাজের এতদিনকার অস্বাভাবিক নীরবতার কথা উল্লেখ করে (“We in the academic community have had a hitherto silent engagement with the pain, harassment, fear and discrimination that comes with being non-heterosexual/queer”) স্বাক্ষরকারীগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন:

But sexual preference and identification is only one part of people’s identities. We believe that a modern democracy must respect diversity regardless of whether consensus exists in society on the desirability of each such practice, provided such practices respect the personhood of others. There need not be consensus in society, for instance, on either meat-eating or vegetarianism as desirable, provided both groups are free to follow their dietary preference.

২)
ইন্টারন্যাশনাল এইডস সোসাইটি সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংগঠনসমূহ এই রায়কে সাধুবাদ জানিয়ে ভারত সরকারের প্রতি এর সঠিক বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।

৩)
সম্ভবত প্রথমবারের মত ভারতের সকল ধর্মীয় গ্রুপ এই রায়টির বিরুদ্ধে অবস্থানের দিক থেকে একাত্ম হতে পেরেছে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: জামায়াতে ইসলামী, আর্য সমাজ, শিরমনি গুরদুয়ারা প্রাবন্ধিক কমিটি, ওয়ার্লড ফেলোশিপ অফ রিলিজিয়ন, ক্যাথলিক বিশপ কনফারেন্স, দারুল উলুম দেওবান্দ, মুসলিম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড, চার্চ অফ সাউথ ইন্ডিয়া, সর্বধর্ম সদ্ভাব ফোরাম, এবং বিভিন্ন জৈন বৌদ্ধ শিখ রামকৃষ্ণ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ। রায়টির সমালোচনায় তাদের অবস্থান হল – (ক) সমকামিতা ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী, (খ) সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী, (গ) ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী, এবং (ঘ) প্রকৃতি এবং স্বাভাবিকতার পরিপন্থী। এখানে এবং এখানে দেখুন।

৪)
পাশাপাশি, ভারতের এসইউসিআই (Socialist Unity Centre of India) দিল্লী হাইকোর্টের রায়টির তীব্র সমালোচনা করে রায়টি বাতিল করার এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। [এখানে]। এসইউসিআই এর পার্টি মুখপত্রে ছাপানো প্রতিবাদটি এরকম:

Comrade Nihar Mukherjee, General Secretary, SUCI, in course of a statement issued on 3 July, 2009, said that this ruling is a transgression on the part of the judiciary to extend to a sphere which is always governed and guided by social opinion, social interest and socio-cultural ethical necessities. This judgment, Comrade Mukherjee observed, will simply open the floodgate of degraded degenerated imperialist culture that among other things instigates perversion and sexual promiscuity with the vile objective of destroying the very moral backbone of the people particularly the youth. This nefarious design of crippling the youth from within is being assiduously pursued by the ruling capitalist class with the sinister motive to disturb growth and development of revolutionary movement based on the edifice of higher ethics and culture in the country, pointed out Comrade Mukherjee. Comrade Mukherjee urged the countrymen particularly the youth not to fall prey to this heinous conspiracy of the ruling class and boldly come out to foil the same.

৫)
অন্যদিকে, মার্কসীয় ভাবধারার অপর এক সংগঠন প্রগতি এই রায়কে সাধুবাদ জানিয়েছে এবং সুবিচার আর সমতার পথে একে একটি মূল্যবান পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। এখানে দেখুন। সেইসাথে সংগঠনটি মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে সমকামিতা এবং সাম্যবাদের রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আলোচনা এবং লেখার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। ওয়ার্কার্স ওয়ার্লড এ ছাপানো এই লেখাগুলোর তালিকাসহ লিন্ক পাওয়া যাবে এখানে

৬)
এদিকে বাংলাদেশে সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রায়টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একে “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপ্রযোজ্য” বলে অভিহিত করেছেন। (লিন্ক সংযোজন করা হবে)।

উল্লেখ করা জরুরী

১।
এই রায়টির মাধ্যমে সমকামী সম্পর্ককে ফৌজদারী আওতা বহির্ভূত করা হলেও ভারতের প্রচলিত অন্যান্য আইনে এ জাতীয় সম্পর্ক এখনো “unbecoming conduct” অথবা “disgraceful conduct of a cruel, indecent or unnatural kind” বলে বিবেচিত। যেমন: আর্মি এ্যাক্ট ১৯৫০ (ধারা ৪৫ এবং ৪৬), এয়ার ফোর্স এ্যাক্ট ১৯৫০, নেভি এ্যাক্ট ১৯৫৭। দিল্লী হাইকোর্টের রায় এই সব আইনের ওপর কি প্রভাব ফেলতে পারে তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

২।
বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারী আইন ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। সে কারণে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতেও (The Penal Code 1860) সংশ্লিষ্ট বিধানটি ভারতের দণ্ডবিধির মতই। অর্থাৎ, বাংলাদেশেও ধারা ৩৭৭ এবং তার প্রয়োগ বর্তমান। [এখানে দেখুন]।

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.