নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নাই

পত্রিকায় দেখলাম, তফসিল ঘোষণায় আনন্দ প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ। কোন কোন পত্রিকায় দেখলাম, বামপন্থীরাও এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। এত আনন্দ আর স্বস্তি কেন, বুঝা যাচ্ছে না। তারা কি বুঝে ফেলেছে যে, তারা ক্ষমতায় যাবে এবার? বিএনপি’র বিষয়টা ভিন্ন। তারা জনগনের কাছে আস্থার সংকটে আছে। তাই তাদের কথাবার্তা খানিকটা সংশয় যুক্ত থাকবেই।

কিন্ত একটা বিষয় বুঝতে পারছি না যা, তা হলো একটা দেশে জরুরি অবস্থা জারী থাকবে, আবার সেখানে সকলের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহনে একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, এটা কিভাবে সম্ভব। এটা কেমন কথা? আর একটা বিষয় হল, জরুরী আইন যখন বলবৎ থাকে, তা পূর্ন মাত্রাতেই থাকে। কিন্ত এই আইন শিথিল করা, পর্যায়ক্রমে তুলে নেয়া বা সহনীয় পর্যায়ে রাখা, এই ধরনের আজগুবি আইনি তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা যারা দিচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যটা বোঝা যায়, কিন্ত প্রগতিশীল দলগুলো কিভাবে এটাকে হজম করে যাচ্ছে, দিনের পর দিন। কেন তারা বলতে পারছে না যে, আগে জরুরী আইন তোল, তারপর নির্বাচন নিয়ে ভাবা যাবে। কেমন জানি একটা নতজানু নীতি নিয়ে আমরা চলছি। বৈধতাহীন একটা সরকারকে এত ভয় পেতে, আমাদের ইতিহাসে আর দেখা যায় নি। এই দেউলিয়াত্ব কেন, এই প্রশ্ন মনে আসে, বারবার।

সংবিধানে জরুরি আইন শিথিল করার বিষয়ে, কোন বিধান নাই। বলা আছে, আর একটা ঘোষনা দিয়ে, এটা তুলে ফেলা যায়। এর মাঝামাঝি কিছু তো নাই। ফলে শিথিল না হলে, তার বিরুদ্ধে কারো কিছু করার থাকবে না। ফলে এই ঘোষনাও আসলে একটা প্রতারণা জনগণের সাথে।

জরুরী অবস্থা বহাল রাখার দু’টি শর্ত আছে সংবিধানেঃ

ক) দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া

খ) অর্থনৈতিক জীবন হুমকির সম্মুখীন হওয়া

অর্থাৎ এই দুই ঝুঁকি না থাকলে, ভিতর বা বাহির যেখান থেকেই কোন  হুমকি আসুক না কেন জরুরী আইন বলবৎ করা যাবে না। কেন যাবে না, তার কারন হল, একটা আধুনিক সভ্য সমাজে মানুষ কিছু অধিকার ভোগ করে, যেগুলো তাকে একটা বর্বর সমাজের বাসিন্দা থেকে আলাদা করে রাখে। সেই অধিকারগুলোর কিছু দেয়া আছে সংবিধানের ৩৬-৪০ এবং ৪২ অনুচ্ছেদে, যেগুলি রাষ্ট্র যদি দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আমরা  সরাসরি হাইকোর্টে গিয়ে মামলা ঠুকে দিতে পারি। এই অধিকারগুলো আরো বেশী জরুরী হয়ে পড়বে জাতীয় নির্বাচনের সময়। কিন্ত পরিহাস আমাদের, এই অধিকারগুলোই জনগণের থাকবে না নির্বাচনের সময়।  নির্বাচনের জন্য ন্যূণতম শর্তই তো একটা মুক্ত পরিবেশ থাকা। পরিবেশ যদি মুক্ত না হয়, নির্বাচন কিভাবে মুক্ত ও অবাধ হবে তা বোঝা যাচ্ছে না।

এই সরকার নিজেই বলছে, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন আগের যে কোন সময়ের তুলনায় ভাল, আর বলছে যে, বিশ্বব্যাপী মন্দা চললেও বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না। অর্থাৎ সার্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল আমাদের। ফলে কেন জরুরী অবস্থায় আমাদের পড়ে থাকতে হবে, তার কোন উত্তর সরকার আমাদের দিচ্ছে না।

এখনও পর্যন্ত অনেক রাজনৈতিক দল জানেই না তারা রেজিষ্ট্রেশন পাচ্ছে কিনা। না পেলে, তাদের বক্তব্য শোনার জন্য আইনী প্রক্রিয়ার ব্যাপার আছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গুলোর ভুল ত্রুটি থাকবেই। সে জন্যও সময়ের প্রয়োজন ছিল।

বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে, বিএনপি এখনও বলেনি, তারা নির্বাচনে যাবে। ফলে এটা নিশ্চয়ই একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয়। সীমানা নির্ধারণ বিষয়টি এখন আপীল বিভাগে ঝুলছে। এরও সুরাহা হওয়া জরুরী। এসব বিষয়ে সুরাহা না করে, তফসিল ঘোষনা করা হয়েছে, যা সরকারের অন্য কোন দূরভিসন্ধির ইংগিত দেয়। ফলে এতে খুশী হওয়ার প্রশ্ন কেমন করে আসে! আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে যেটা, তাহলো, মৌলিক অধিকার সাসপেন্ডেড রেখে, জাতীয় নির্বাচন কি সাংবিধানিক ভাবে বৈধ হবে?

সৈকত আচার্য

আইনজীবি। ব্লগার।

৩ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.