যুদ্ধাপরাধী বিচারের রাজনীতি ১

বিশ্বব্যাপী অপপ্রচার চালানোর পর শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীকে গতকাল বাংলাদেশেই ফিরে আসতে হয়েছে। অনেক আগে থেকেই যেমনটি আমাদের অনেকে ধারণা করছিলেন, ঘটনা ঠিক সেরকমই ঘটেছে- দু’জন যুদ্ধাপরাধীর (যারা একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীরও গুরুত্বপূর্ণ নেতা) পক্ষ থেকে গতকাল ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী এ দু’জন হলো যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামীর কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লা।[...]

বিশ্বব্যাপী অপপ্রচার চালানোর পর শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীকে গতকাল বাংলাদেশেই ফিরে আসতে হয়েছে। অনেক আগে থেকেই যেমনটি আমাদের অনেকে ধারণা করছিলেন, ঘটনা ঠিক সেরকমই ঘটেছে- দু’জন যুদ্ধাপরাধীর (যারা একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীরও গুরুত্বপূর্ণ নেতা) পক্ষ থেকে গতকাল ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী এ দু’জন হলো যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামীর কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লা। তাদের হয়ে আজ ১৭ আগস্ট হাইকোর্টে রিট আবেদনটি পরিচালনা করবেন বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

একই সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অঘোষিত মুখপত্র ‘আমার দেশ’-এ আজ প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে দেখা যাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এক চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, যুদ্ধাপরাধী বিচারকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে ১৯৭৩-এর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টকে পরিবর্তন করতে হবে।

এই ১৯৭৩-এর অ্যাক্টকে নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি বছরখানেক সময় ধরে এমনভাবে প্রচার চালিয়েছে যে, কারো কারো কাছে মনে হতে পারে, এ অ্যাক্ট বোধহয় ধরে-বেধে মানুষকে প্রহসনের বিচার করার আইন। পাশাপাশি, বাংলাদেশে বিশেষ বিশেষ ধারা অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকার বিষয়টিকেও এ সময়ে ব্যাপক নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে অনেকেরই মৃত্যুদণ্ডের বিধানটি নিয়ে আপত্তি রয়েছে, কিন্তু বিষয়টিকে রদ করার জোর প্রচারণা এমন এক সময় চালানো হচ্ছে, যখন আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রত্যাশা করছি; চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানটির বিরুদ্ধে প্রচারণার আড়ালে আসলে চেষ্টা চলছে ১৯৭৩-এর এই অ্যাক্টটি সম্পর্কেই জনমনে ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে দেয়ার। যাই হোক, আমার মনে হয় না যে আমাদের সবাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চিঠি পড়ে কিংবা যুদ্ধাপরাধী দু’জনের রিট আবেদন দেখে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের মতো আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবেন, বলবেন যে, ৩৯ বছর আগে কোথায় ছিল আপনাদের মানবাধিকার? আমি যে-টুকু বুঝি এবং আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী বিচারের সপক্ষে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছেন, যে-সব ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচারের জন্যে অপেক্ষা করছেন তারাও এটা বোঝেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের এসব দিকগুলির চুলচেরা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পেশাদারি বিশ্লেষণ ও যুক্তিবিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। পল্টনের ময়দানে, জনসভার মঞ্চে কিংবা পথসভায় দাঁড়িয়ে সেটি করা সম্ভব নয়। ন্যায় বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে যে-সব আইনজীবী ও ব্যারিস্টাররা এগিয়ে এসেছেন, তারা নিশ্চয়ই এসব নিয়ে অনেক ভেবেছেন। আমাদের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৌড়াদৌড়ি শেষে বাংলাদেশের হাইকোর্টের মুখাপেক্ষী হওয়া যুদ্ধাপরাধীরা এবং তাদের পক্ষ হয়ে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতাকর্মী ও ব্যারিস্টার-আইনজীবীরা খুব অল্পদিনের মধ্যেই বুঝতে পারবেন, একটি ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যে তারা যে-পথ বেছে নিয়েছিলেন, যে-ধারণাগুলি প্রচার করছিলেন, তা মোটেও সঠিক ছিল না।

এর মধ্যে অনেকেরই হয়তো চোখে পড়েছে, ‘জামায়াতের একটি অংশের মত, বিতর্কিতরা সরে যাক’– এরকম একটি সংবাদ বেরিয়েছে কয়েকদিন আগে একটি দৈনিকে। কেউ কেউ এই সংবাদে পুলকিত হতে পারেন, অথবা এমনও হতে পারে কিছু মানুষকে পুলকিত করার জন্যেই এরকম একটি সংবাদ প্রতিবেদন খুঁড়ে তোলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে মতদ্বৈততা থাকুক বা না থাকুন, মতদ্বৈততা যে আছে এমন একটি সংবাদ প্রকাশ পাওয়ার অর্থ, দোদুল্যমান মানুষদের কাছ থেকে একটু সহানুভূতি পাওয়া, পাশাপাশি সবার মধ্যে নিজেদের নিয়ে খানিকটা আলোচনার পরিসরও খুজে পাওয়া। অনেকের কাছেই এখন মনে হতে পারে, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ছবক কাজে লেগেছে, যুদ্ধাপরাধীদের দায় জামায়াতে ইসলামীর অনেকেই নিতে চায় না; জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও এখন যুদ্ধাপরাধী বিচারের কাজে সাহায্য করতে দৌড়ে আসছে। এইভাবে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে আমাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর যতটা বিকাশ, তার সবটাই সম্ভব হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক চিন্তা ও মতবাদের কাঠামো অনুসারে, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক তত্ত্বাবধানে- ওই কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে আসা এমনকি জামায়াতে ইসলামীর একজন সাধারণ শুভানুধ্যায়ীর পক্ষেও সম্ভব নয়।

জামায়াতে ইসলামীর এখন খুবই দুর্দিন। তারপরও তারা খোলা আকাশে তরবারি ঘোরাচ্ছে আর বলছে, ‘যুদ্ধাপরাধ ইস্যু বাতাসে উড়ে যাবে!’ ঠিক এইভাবে তারা ১৯৭১-এও কথা বলেছিল। শূন্য কলস বাজে বেশি, জামায়াতে ইসলামীর বাজনাও তাই বেশি, সব সময়েই বেশি। আর সে কারণেই তারা হয়তো এখনও বুঝতে পারছে না, গত ২৬ জুলাই থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন এক পর্বে উন্নীত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে এমন চারজন অভিযুক্তকে (পরে আরও একজনকে) কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে, যাদের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে সংশয় বা সন্দেহ আছে এমন মানুষ বাংলাদেশে হাতে গোণা। মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষ যে তাদের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করছে, তার কারণ এই যুদ্ধাপরাধীরা একটি রাজনৈতিক দলের নেতা বনে বসে আছে এবং যুদ্ধাপরাধীরা তারা ইস্যুটির রাজনীতিকরণ ঘটাচ্ছে।

গত ৩৯ বছরেও এইসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্যে কখনোই তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি, কারণ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধী বিচারের ইস্যুটির রাজনীতিকরণ করা হয়েছে- দালাল আইন বাতিল করা হয়েছে, এমনকি দালাল আইনে যারা শাস্তি পেয়েছিল, তাদেরও জেল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যে-সব রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং বড় বড় যুদ্ধাপরাধী সৃষ্টি করেছিল, তাদের আবার রাজনৈতিক দল করার অধিকার দেয়া হয়েছে। এইভাবে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটির রাজনীতিকরণ ঘটেছে বাংলাদেশে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটির রাজনীতিকরণ ঘটার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যুটি রাজনীতিমুক্ত একটি বিষয়। যে-কোনও যুদ্ধের সঙ্গেই রাজনীতির তুমুল যোগ রয়েছে, সে অর্থে অবশ্যই যুদ্ধাপরাধী বিচারের রাজনৈতিক দিক রয়েছে; কিন্তু এ হেন রাজনৈতিক বিষয়েরও রাজনীতিকরণ ঘটেছে- রাজনীতির মধ্যে যেমন পলিটিক্স ঢুকে পড়ে, ঠিক তেমনি ভাবে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এ ক্ষেত্রে ধাত্রীর কাজ করেছে।

যদি এরকম না ঘটতো, তা হলে আমরা আমাদের সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমগুলিতে, এমনকি আমাদের নিজেদের মুখ থেকেই শুনতাম যে, পাঁচজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছে- কিন্তু ইস্যুটিকে রাজনীতিকরণের ফলেই আমাদের শুনতে হচ্ছে, ‘পাঁচজন জামায়াত নেতার যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার শুরু হয়েছে।’ এমনকি আমাদের সাংবাদিক-রিপোর্টার বন্ধুদেরও নিরপেক্ষতা প্রমাণের স্বার্থে এরকমভাবেই লিখতে হচ্ছে। এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আমাদের আর কি-ইবা আছে?

তুলনায় যুদ্ধাপরাধীদের সৌভাগ্য আকাশসমান। কেননা ইতিহাস তাদের জন্যে যে-শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছে, তার মুখোমুখি তাদের হতে হচ্ছে অনেক-অনেক পরে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় পরাধীন ফ্রান্সে যেসব দালালরা সহায়তা করেছিল জার্মানির নাৎসী বাহিনীকে, তাদের কথা ভাবুন- ফ্রান্স পুরোপুরি নাৎসীমুক্ত হওয়ার আগেই জনতার আদালতে প্রাণ দিতে হয় ছয় হাজার দালালকে, মুক্ত হওয়ার পর বিনা বিচারেই প্রাণ দেয় আরও চার হাজার দালাল। এইসব দালালদের আত্মীয়স্বজন ও সহানুভূতিশীলরা এখনও এসব হত্যার সমালোচনা করে, এসব হত্যাকে লাল সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, অন্ধ প্রতিহিংসা এইসব অভিধায় অভিহিত করে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহ্যে পরিপুষ্ট ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ এসব হত্যাকাণ্ডের জন্যে গর্বই বোধ করে। জনতার আদালতে এভাবে দালালদের বিচার না করে হয়তো বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা ভুলই করেছিল- আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে গিয়ে তাদের আম আর ছালা দু’টোই যেতে বসেছিল। ওরিয়ানা ফাল্লাচি নামের এক চূড়ান্ত বাংলাদেশবিদ্বেষী ও পরম ভুট্টোপ্রেমী সাংবাদিক জগৎবাসীর সামনে যুদ্ধের পরপর চারজন রাজাকারকে প্রকাশ্যে হত্যা করার কয়েকটি ফটো প্রচার করার কাজে ঝাপিয়ে পড়েছিল- অপপ্রচার চালানোর জন্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের এখনও সেই ফটো কয়টিই সবচেয়ে বড় সম্বল। অথচ ওরিয়ানা ফাল্লাচির নিজের দেশ ইতালিতে কী ঘটেছিল? সেখানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাহিনীর হোতা মুসোলিনীকে কোনও বিচার ছাড়াই হত্যার পর কয়েকদিন মিলানে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে সত্যিই এরকম নিষ্ঠুর ক্ষমতাধর এক ব্যক্তির শাস্তি হয়েছে। তারপর তার লাশ কোনখানে পোড়ানো হয়েছে, কোথায় সে ছাই মিলিয়ে গেছে কেউ জানে না। মুসোলিনীরই যেখানে এই অবস্থা, সেখানে আর সব শয়তানগুলোর অবস্থা কী হয়েছিল, তা বোধকরি বলার প্রয়োজন পড়ে না। ওরিয়ানা ফাল্লাসির জীবনী বলে, তিনি নাকি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু তাঁর অস্থির অপপ্রচার থেকে মনে হয় না, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তাকে যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনিবার্য গতিপ্রবাহ সম্পর্কে কোনও শিক্ষা দিতে পেরেছে। সত্যিই, আমাদের দুর্ভাগ্য, যুদ্ধাপরাধী ফজলুল কাদের চৌধুরীকে যারা পালিয়ে যাওয়ার সময় টেকনাফের নদীতে ধরে ফেলেছিলেন, প্রচণ্ড ক্রোধ তৈরি হওয়ার পরও তারা ওই লোকটিকে বাচিয়ে রেখেছিল, বিচারের জন্যে সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিল- যে জন্যে সালাহউদ্দিন চৌধুরীর মতো আর এক যুদ্ধাপরাধী এখন চরম ঔদ্ধত্য নিয়ে এ দেশের জনগণের সামনে বলে বেড়াতে পারে, তার বাবাকে নাকি কারাগারে হত্যা করা হয়েছে!

ফ্রেঞ্চ রিপাবলিকের কথা চিন্তা করুন, ১৯৪৪ সালে কোনওরকম বিচার ছাড়াই ১০ হাজার লোক দালালকে বিনা বিচারে হত্যার পর প্রভিশনাল গভর্নমেন্ট অব দ্য ফ্রেঞ্চ রিপাবলিক উদ্যোগ নেন বিচার করার এবং দাগী পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের খুঁজে বের করে আনার। আগস্ট ১৯৪৩ থেকে কার্যকর এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে চার্লস দ্য গল বিনা বিচারে সংঘটিত ওই ১০ হাজার হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেন। দ্বিতীয় পর্বে বৈধভাবে আদালতের মাধ্যমে বিচারের জন্যে ২৬ ও ২৭ জুন, ১৯৪৪-এ নতুন এক অধ্যাদেশ জারি করেন দ্য গল। এই পর্বে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় আরও দেড় হাজার দালালকে, যাদের মধ্যে ছিলেন ডানপন্থী নেতা জোসেফ ডারনান্ড ও পিয়েরে লাভাল – গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের দু’জনকেই। অ্যাকশন ফ্রান্সেইস-এর নেতা, কবি ও সাহিত্যিক চার্লস মুররাসসহ আরও এক লাখ বিশ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তৃতীয় পর্বে বিচার করা হয় এইসব দালালদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারীদের। তারপর চতুর্থ পর্বে এসে ফ্রান্সের দালালদের প্রতি দয়া দেখান দ্য গল- সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন বাদবাকিদের প্রতি। কিন্তু চার্লস দ্য গলের যুদ্ধাপরাধী বিচারকে অনেকেই উদারতার দোষে দুষ্ট বলে সমালোচনা করেছেন আর ফ্রান্সের প্রশাসনে ওই উদার বিচারপ্রক্রিয়ার কারণেই দালালদের ভূত রয়ে গেছে বলে বার বার উচ্চকিত হয়েছেন। এসব গত শতাব্দীর আশির দশকে ফ্রান্সে আবারও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয় এবং এই পর্বে কাউকে কাউকে নতুন করে, কাউকে বা দ্বিতীয় বারের মতো কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, শাস্তি পেতে হয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন প্রশাসন ও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে, যেখান থেকে তারা বার বার নানাভাবে বিভ্রান্ত করেছেন সরকারকে। বিবিসি’র একটি ডকু-ফিকশন আছে দ্য স্টেইটমেন্ট নামে– যা দেখলে বোঝা যায় চার্চজাতীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির গুপ্ত সহায়তায় কীভাবে এখনও নিজেদের রক্ষা করে চলার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে ফ্রান্সের এইসব যুদ্ধাপরাধী দালালরা। এমনকি বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তদন্তে সহায়ক হতে পারে এমন ছোটখাটো দালাল যুদ্ধাপরাধীদের হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না কেউকেটা যুদ্ধাপরাধীরা।

ফ্রান্সের যুদ্ধাপরাধী দালালদের পক্ষে কোনও প্রকাশ্য রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তাই তারা নিজেদের রাজনৈতিক ভোল পাল্টে মূলত চার্চ ও প্রশাসনকে অবলম্বন করে চূড়ান্ত গোপনীয়তার মধ্যে দিয়ে নিজেদের রক্ষা করার অপচেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী দালালগুলো রাজনৈতিক দল করার অধিকার পেয়েছে এবং তাই গোপনীয়তারও কোনও বালাই নেই তাদের। গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কাদের মোল্লা আর দেলাওয়ার হোসেন সাঈয়েদী জাতীয় লোকরা তাদের যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী পরিচয় মুছে জামায়াত নেতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের কল্যাণে- কেননা এই ভদ্রলোকটি ধর্মবাদীদের ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল করার সাংবিধানিক অধিকার দিয়েছিলেন। আর সে কারণেই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এদের প্রাণভোমরার মতো, এই প্রাণভোমরাকে বাচানোর জন্যে তারা এখন রূপকথার রাক্ষসদের মতো দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে, হিংস্র দাঁত দেখাচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৌড়াতে দৌড়াতে লম্বা জিভ বের করে এদের অক্কা পেতে হবে, তাদের প্রাণভোমরাকে এবার গহীন পুকুরের তলদেশ থেকে তুলে আনা হয়েছে, কোনও দৈত্যই আর পারবে না সেটিকে বাঁচিয়ে রাখতে।

অন্যদিকে, তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩-এর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই যুদ্ধাপরাধী দালালরা একটি ভুল করেছিল- বহু দলীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠার নামে যখন তারা ঘরোয়া রাজনীতির টেবিলে ধর্মবাদী রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে দেনদরবার করছিল আর সামরিক জান্তা জিয়াকে দিয়ে নানা ফরমান জারি করাচ্ছিল, তখন দালাল আইনটি বাতিল করার ফরমান জারি করাতেই তারা আহ্লাদিত হয়ে উঠেছিল এবং এই আইনটিকে তখন তারা ‘আন্তর্জাতিক আইন’ হিসেবেই হয়তো বিবেচনা করেছিল (এখন অবশ্য তারা আর ‘আন্তর্জাতিক’ বলে মানতে রাজি নন, বরং আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত করার আবদার করে বেড়ানোই তাদের প্রধানতম মিশন এখন)। ফরমান জারি করে বাংলাদেশের তখন খোলনলচে পাল্টে দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, কিন্তু এ আইনকে নিষিদ্ধ করার ফরমান জারির কথা তাদের চিন্তায়ও আসেনি। এখনও তারা বলছে বটে, এ আইন করা হয়েছিল পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্যে, তাদের নিয়ে এসে বিচার করেন– কিন্তু তারা নিজেরাও জানে, এই আইনের আওতায় তারাও পড়ে, কেননা তারা তো মুক্তিযুদ্ধের সময় কেবল রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী হিসেবে কাজ করেনি, বরং পাকিস্তানীদের সহায়তাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৭১ সালে রাজাকারদের রেশন দেয়ার যে তালিকা পাওয়া গেছে, সেই তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের নাম রয়েছে; আর শুধু নাম কেন, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্য হিসেবে তাদের অনেক কুকীর্তিও রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন হিসেবে এসব বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এসব বাহিনী গড়ে উঠেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী বাহিনী হিসেবে।

তাই জামায়াতে ইসলামীর আক্রমণের মূল লক্ষ্য এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩। জামায়াতে ইসলামী এখন শেখ মুজিবকে ভালোবাসে, এতই ভালোবাসে যে তারা এখন বলে বেড়ায়, বঙ্গবন্ধু নাকি এদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রই করতে চেয়েছিলেন! জামায়াতে ইসলামী এখন আর বলে না যে একাত্তরে ভুল করি নাই’ বরং বলে, ‘আমরা এক পাকিস্তান চেয়েছিলাম, কিন্তু যুদ্ধাপরাধ করি নাই।’ কিন্তু এত কিছুর পরও তারা যুদ্ধাপরাধ বিচার করার আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে,- কেননা তারা নিজেরা খুব ভালো করেই জানে, তারাই বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের একমাত্র সমাবেশস্থল, একমাত্র মিলনমেলা।

অবিশ্রুত

সেইসব দিন স্মরণে,- যখন কলামিস্টরা ছদ্মনামে লিখতেন; এমন নয় যে তাদের সাহসের অভাব ছিল, তারপরও তারা নামটিকে অনুক্ত রাখতেন। হতে পারে তাৎক্ষণিক ঝড়-ঝাপটার হাত থেকে বাঁচতেই তারা এরকম করতেন। আবার এ-ও হতে পারে, সাহসকেও বিনয়-ভুষণে সজ্জিত করেছিলেন তারা। আমারও খুব ইচ্ছে দেখার, নামহীন গোত্রহীন হলে মানুষ তাকে কী চোখে দেখে... কাঙালের কথা বাসী হলে কাঙালকে কি মানুষ আদৌ মনে করে!

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.