কী করবেন বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনরা, জুতা যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে? জুতা যখন মিসাইলের চেয়েও তীব্র বেগে গিয়ে আঘাত হানতে চায় যতটা না জর্জ বুশের শরীরে, তারও চেয়ে বেশি পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর চোয়ালে? জুতা তো ছুরি নয়, পিস্তল নয় যে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে সনাক্ত করতে হবে। এ হেন জুতা আর জুতা নয়, রীতিমতো অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এ অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যে-ক্ষতি করা হলো, তা থেকে বেরিয়ে আসার দায়ভার তো ওবামা-হিলারিদেরই নিতে হবে। কেননা তারাই তো এখন উত্তরসূরি বুশ-রাইসের ইরাকনীতির। মুনতাজার আল-জায়িদকে এখন মেরেকেটে কোটি টুকরো করে ফেললেও কি সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রের চোয়ালের দিকে উড়তে থাকা ওই জুতার পাটিকে ফিরিয়ে আনা? সম্ভব নয়। এমনকি মার্কিন মুল্লুকেরই তুখোড় বিশ্লেষক ডেভিড সোয়ানসনকে বলতে শুনছি, একজন সাংবাদিক কেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দিকে জুতা ছুঁড়ে মারার মতো অভব্য কাজটি করতে গিয়েছিলেন তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওই কক্ষটিতে উপস্থিত আর যারা ছিল তারা কেন এরপরও সাহস পায়নি পা থেকে জুতা খুলবার। ডেভিড সোয়ানসন উল্টো জানতে চেয়েছেন, ‘কেন যে-মানুষটি আমাদের রাষ্ট্রপতির গায়ে জুতা ছুঁড়ে মারে, সেই মানুষটি আমাদের রাষ্ট্রপতির চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে?’

এই প্রশ্নের জবাব খানিকটা দিতে পারেন বাঙালিরা, বাংলাদেশের মানুষেরা। কেননা অন্যায়কারীর দিকে সরাসরি জুতা ছুঁড়ে মারার রেওয়াজ এ-দেশটিতেও আছে। অনেকেরই মনে আছে, স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ জনসভা করতে গেলে সিলেটবাসী জুতা দেখিয়েছিলেন আর সিরাজগঞ্জের জনগণ শুধু জুতা দেখিয়ে বা ছুঁড়েই ক্ষান্ত হননি, w`M¤^i হয়ে প্রচণ্ড রোষে ছুটে গিয়েছিলেন সামরিক জান্তার দিকে। আরও একটি ঘটনাও অনেকের মনে আছে, জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন বায়তুল মোকাররমে। হয়তো চিন্তা করেছিলেন, জনগণ সব ভুলে গেছে। কিন্তু না, গণরোষের শিকার হয়েছিলেন তিনি, এবং শোনা যায় তার মাথায়ও দু’চারটে জুতা-স্যান্ডেল বসিয়ে দিয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ মানুষ।

চারপাশে যখন মিথ্যার বোঝা জমে ওঠে, একেবারে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে যখন মিথ্যুকেরা অম্লান বদনে প্রচণ্ড আস্থার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে থাকেন, তখন সুন্দর ও সত্য কদর্য হয়ে প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর ‘কিংবদন্তীর কথা বলছি’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের কণ্ঠস্বর কর্কশ/ কেননা বিকৃতির প্রতি ঘৃণা মানুষকে অসুন্দর করে দেয়।’ ইরাকে সাংবাদিক মুনতাজার আল-জায়িদী যে এই অভব্য কাজটি করতে গেলেন, তার কারণ মিথ্যা ও বিকৃতির এত সুললিত ও অনায়াস উল্লাসকে তিনি মেনে নিতে পারেননি।

মুনতাজারের এই জুতাবিক্ষোভ জনগণকে উল্লসিত করেছে। মানুষকে মনোযোগ দিয়ে ফিরে তাকাতে বাধ্য করেছে চারপাশের মিথ্যা ও অন্যায়ের দিকে। যেমন, নিজেদের দিকে ফিরে তাকিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশে এই মিথ্যা ও অন্যায়ের নদী বইছে নির্বাচনকে ঘিরে। প্রার্থীরা চাইছেন যেনতেন উপায়ে মিথ্যাকে অবলম্বন করে জনগণকে প্রতারিত করে ভোটে জিততে।

এই নির্বাচনে সবচেয়ে সুন্দরভাবে মিথ্যা কথা বলতে দেখছি আমরা মতিউর রহমান নিজামীদের। এরকম মিথ্যার কয়েকটি নমুনার কথা বলি :

এক. নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ উপলক্ষে সাংবাদিক সম্মেলনে মতিউর রহমান নিজামী বলেছেন, ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন আছে, অতএব বাংলাদেশে হলেও কোনও ক্ষতি নেই।

দুই. বিজয় দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীও ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘৬০-এর দশকে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টি (কপ) গঠন করে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, পিডিপিসহ সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছিল। তারাই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধ।’

তিন. নিজামী আরেকটি সভায় দাবি করেছেন, জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব সঠিক ছিল এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিনও এর সমর্থক ছিলেন। তাঁরা দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন বলেই তাঁদের শাসনামলে ওআইসি-তে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছিল। তা ছাড়া বাংলাদেশে ফিরে এসে, নিজামীর ভাষায়, জাতির স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান সঙ্গে সঙ্গেই উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামী রাষ্ট্র।

চার. এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তাত্ত্বিক নেতা গোলাম আযম একটি প্রচারপুস্তিকা বের করেছেন, যার শিরোনাম, ‘শেখ মুজিবুর রহমান কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধীর তালিকাভুক্ত করেননি, তা হলে ৩৭ বছর পর এ ইস্যু নিয়ে মাতামাতির আসল গরজ কী?’ এতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কাশ্মীরের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন, সেনাবাহিনীর লোকই যুদ্ধাপরাধী বলে গণ্য। বেসামরিক লোককে যুদ্ধাপরাধী বলা হয় না এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভয় থেকে যারা তখন স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তাদের যুদ্ধাপরাধী বা স্বাধীনতাবিরোধী বলা যৌক্তিক নয়।’

মিথ্যা বলতে জামায়াতে ইসলামী বরাবরই দক্ষ, এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা তার চূড়ান্ত উৎকর্ষ দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধাপরাধীর এই খণ্ডিত সংজ্ঞাকে তারা প্রচারণায় নিয়ে এসেছেন জোরেশোরে, যাতে নিজেদের অপরাধ আড়াল করা যায়। কিন্তু তারপরও খোলাসা করছে না জামায়াত, সেই সামরিক যুদ্ধাপরাধীই বা কারা ছিল। কেননা ঝোপ বুঝে কোপ মারবে তারা, সময়সুযোগ মতো ভবিষ্যতে হয়তো বলবে, মিত্র বাহিনীর ভারতীয় সেনাসদস্যরাই যুদ্ধাপরাধী ছিল! তা ছাড়া এতদিনে তারা বুঝে গেছে, বাংলাদেশের ইতিহাস শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের গৌরবগাথা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে বলা সম্ভব নয়। তাই তারা বরং শেখ মুজিবুর রহমানকেই জামায়াতপন্থী বানানোর জন্যে, দ্বিজাতিতত্ত্বপন্থী বানানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছেন। আর চাইছে ব্লাসফেমি আইন বাঙালির মাথার ওপর চাপিয়ে দিতে।

একটু চিন্তা করা যাক, ব্লাসফেমি আইনের কী প্রয়োজন বাংলাদেশে? ধর্মকে রক্ষা করার জন্যে? কে আক্রমণ করেছে ধর্মকে সেখানে? বরং আমরা তো দেখেছি ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করছে, সেই সব রাজনৈতিক দলগুলিই বার বার ধর্মকে নষ্ট করছে বাংলাদেশে। ধর্মজ রাজনৈতিক দলগুলি, যারা ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যে দিনরাত জপ করে, সেইসব দলগুলি তো কেবল নিজের ধর্মই নয়, দেশের আর সব ধর্মগুলিকেও উৎখাত করতে চলেছে প্রায়।

কিন্তু তারা মিথ্যার পূজারী। তাই নিজামী অনায়াসে বলতে পারেন, ব্লাসফেমি আইন আছে ব্রিটেনে। কথার কথা, ধরে নেয়া যাক, ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন আছে ; কিন্তু ব্রিটেনে আছে বলেই কি বাংলাদেশে তা চালু করতে হবে? ঔপনিবেশিকতার এই এক গুণ, মানুষের মধ্যে এমনই এক দাসমনোভাব সে সৃষ্টি করে যে তা আর দূর হতে চায় না, বরং উপনিবেশকে শাসন করার জন্যে সাম্রাজ্যবাদ যে অন্যায় ও অমানবিক আইন ও প্রথাগুলি চালু করে, দাসমনোবৃত্তি গঠন করার জন্যে যে শিক্ষা ও সংস্কৃতিগুলি চালু করে, সেগুলিকেই উপনিবেশের শাসিতরা শ্রেষ্ঠ মনে করতে থাকে, ব্লাসফেমিকেও একইভাবে উৎকৃষ্ট একটি আইন বলে মনে করে থাকে এরা।

কিন্তু ব্রিটেনের ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সবাই জানেন, ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে বিশেষ এক পরিপ্রেক্ষিতে। চার্চ ও রাজার মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব ক্রমান্বয়ে তীব্র হয়ে উঠতে থাকে এবং একসময় চার্চ তার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার কুটিল চিন্তা থেকে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করে, যাতে রাজা-বাদশাদেরও ধর্মের নামে চার্চের কর্তৃত্বের অধীনে রাখা সম্ভব হয়। আর রাজাবাদশাদেরও এ আইনের মাহাত্ম্য বুঝতে দেরি হয় না, উল্টো রাজনীতির খেলা খেলতে তারাও প্রচ্ছন্নভাবে কথা বলতে থাকেন ব্লাসফেমির সপক্ষে। এর পরিণতি এই যে সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্লাসফেমি আইন পরিণত হয় ইংল্যান্ডের কমন ল-তে।

কিন্তু ব্লাসফেমি আইন থাকলেও, এ আইনের প্রয়োগ ব্রিটেনে খুব কমই হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে শেষ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় সেই ১৮৪৩ সালে, আর শেষ কারাদণ্ড দেয়া হয় ১৯২১ সালে। যিশুখ্রিস্টকে ‘সার্কাসের ক্লাউন’ বলার অপরাধে ওই বছরের নয় ডিসেম্বর এই কারাদণ্ড দেয়া হয় উইলিয়াম গটকে। এই আইনে শেষ বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে গত ১৯৭৭ সালে এবং ওই বিচারে অভিযুক্তকে জরিমানা করা হয়েছিল ৫০০ পাউন্ড। মধ্যযুগীয় এ আইন প্রচলিত থাকলেও এটি যে মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানচর্চার ঘোরতর প্রতিবন্ধক সেটি উপলব্ধি করতে পেরে ব্রিটেনে বার বার বিভিন্ন মানবাধিকারসংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে এই আইনকে নিরস্ত্র করা হয়েছে। এইভাবে ব্রিটেন এ আইনের অকার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে এবং তাই এ বছরের ৮ মে ব্রিটেন ও ওয়েলসের কমন ল থেকে ব্লাসফেমি আইনকে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে এবং ৮ জুলাই থেকে এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে।

অবশ্য যতদিন আইনটি ছিল, ততদিনও এর তেমন কোনও ভূমিকা ছিল না। সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিটলস-এর জন লেনন ১৯৬৬ সালে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘ক্রিস্টিয়ানিটিকে বিদায় নিতে হবে। এটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তলিয়ে যাবে। এটা নিয়ে আমি তর্ক করতেও রাজি না। কেননা আমি ঠিকই বলছি এবং আমার কথাই সত্যি প্রমাণ হবে। আমরা এখন যিশুখ্রিস্টের চেয়েও জনপ্রিয়। আমি জানি না, রক অ্যান্ড রোল না যিশু কে আগে বিদায় নেবে, কিন্তু বিদায় তাদের নিতেই হবে’ একথা শুনে অনেকে মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন, তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, তঁর প্রতি ক্ষমা চাওয়ার জন্যে আহ্বান জানানো হয়েছিল। লেনন তখন সাংবাদিক সম্মেলনে এজন্যে দুঃখপ্রকাশ করলেও সে-মন্তব্য প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর জন্যে তখন কাউকে ঘোষণা দিতে দেখা যায়নি, লেননের মাথা কেটে ফেলতে পারলে অত ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। কাউকে বলতে শোনা যায়নি, জন লেনন ব্লাসফেমিতে শাস্তির যোগ্য। ভ্যাটিকান পোপ অবশ্য তাদের ক্ষমাপ্রার্থনার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন, যে অনুরোধ কেউ রাখেনি। এতদিন পরে এই ২০০৮ সালে পোপ নিজে থেকেই জন লেননকে ওই কথা বলবার জন্যে ক্ষমা করে দেয়ার কথা জানালে সবাই তাজ্জব হয়ে গেছে, প্রশ্ন জেগেছে নতুন করে, তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েছে কে? এর বিপরীতে বাংলাদেশের দিকে তাকান, খুব সহজেই এখানে কাউকে মুরতাদ বলা যায়, হত্যা করার জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করা যায়। মাসখানেক আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মান্দার’ নাটক করার জন্যে সংস্কৃতিকর্মীদের আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, পত্রিকায় আগ্রহী হত্যাকারীর জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে!

পরিস্থিতি যেখানে এমন, সেখানে ১১ ডিসেম্বর ২০০৮ জামায়াতে ইসলামী তাদের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে ব্রিটেনে কয়েক মাস আগে কবর দেয়া ব্লাসফেমি আইনটির দুর্গন্ধযুক্ত লাশ মাটির ওপর টেনে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে, নির্বাচিত হলে এই আইনটি প্রণয়ন ও কার্যকর করা হবে। তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একই ঘোষণা দিয়েছে এবারের নির্বাচনে মহাজোট গঠন করার মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার নব্য সেনা, পরীক্ষিত একনায়ক ও ˆ¯^ivPvi হোসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার জাতীয় পার্টি। ঢাকার রাজপথে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গাতে নাকি এখন শ্লোগান শোনা যাচ্ছে, ‘হাসিনা-এরশাদ ভাইবোন।’ যে এরশাদ নিজামীর মতোই ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের রাজনৈতিক ইশতেহার হাতে করে সারা বাংলাদেশে ছুটে বেড়াচ্ছে, সেই এরশাদ কেমন করে হাসিনার ভাই বনে গেলেন, এ প্রশ্নের জবাব এখন কোনখানে পাব আমরা? সংবাদপত্রে পড়েছি, এরশাদকে নিজের এলাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে নাকি আওয়ামী লীগের সংসদসদস্যপ্রার্থীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন, কেননা তারা মনে করছেন, ˆ¯^ivPv‡ii দুর্গন্ধযুক্ত ওই মানুষটিকে নিয়ে যেতে পারলে তারা ভোটে জিতে যাবেন।

আমরা শুনেছি, মতিউর রহমান নিজামী সংবাদসম্মেলনে খুব আস্থার সঙ্গে বলেছেন, ‘ব্রিটেনেও ব্লাসফেমি আইন আছে। ওরকম একটি দেশে এ আইন থাকায় তো কোনও সমস্যা হয় না, তা হলে বাংলাদেশে সমস্যা হবে কেন?’ ‘ইরাকে অস্ত্র আছে’ণ্ড জর্জ বুশের এমন মিথ্যাচারের সঙ্গে নিজামীর এই মিথ্যাচারের কোনও তফাৎ নেই। বুশ ইরাকবাসীর ওপর হামলার জন্যে ওই মিথ্যাচার চালিয়েছিল, নিজামী বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্যে এরকম মিথ্যা কথা বলছেন।

মতিউর রহমান নিজামী একজন প্রধান সারির রাজনীতিক, অতএব তাঁর না জানার কথা নয় যে ব্লাসফেমি আইন বাতিল হয়ে গেছে। এ আইন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ এমপি ইভান হ্যারিস, যিনি এটি বাতিলের প্রস্তাবক ছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘প্রগতির পথের শেষ বাধাটি দূর হলো’; নিজামীর কি ধারণা ছিল, ইভান হ্যারিসের ওই কণ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের কানে পৌঁছায়নি? শুধু হ্যারিস কেন, আরও আগে ১৯৪৯ সালেই ব্রিটেনের আইন বিজ্ঞানী লর্ড ডেনিং ব্লাসফেমি আইনকে অতীত’ এবং ‘মৃত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এইভাবে ব্লাসফেমি ব্রিটেনে অনেক আগেই অকার্যকর হয়ে গেছে।

শুধু ব্লাসফেমি নিয়ে নয়, নিজামীরা মিথ্যাচার শুরু করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান বা তাজউদ্দিন আহমদকে নিয়েও। তাঁরা এক সময় মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন, এটা যেমন সত্য, তারা সেই রাজনীতি পরিত্যাগ করেছিলেন, সেটা আরও বেশি সত্য। কিন্তু নিজামীরা এখনও চান মুজিবুর-তাজউদ্দিনকে মুসলিম লীগার হিসেবে অভিহিত করতে! শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারীতে যে-ভাষণ দিয়েছিলেন, তা একবার মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যায়, নিজামীরা এটি নিয়েও কী বিশাল মিথ্যাচার করছেন। শেখ মুজিব ওইদিনের ভাষণে জনসংখ্যার ধর্মাবস্থানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করার পর এ কথাও বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান হওয়ার পরও বাংলাদেশে ধর্মের নামে যুদ্ধকালীন সময়ে যা করা হয়েছে তা থেকে সুস্পষ্ট ধর্মীয় রাজনীতি এখানে চলতে দেয়া যায় না। অথচ নিজামীরা শেখ মুজিবুর রহমানের ওই বক্তব্যের অংশবিশেষ প্রচার করছেন, যাতে মানুষের মনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে শেখ মুজিবও চেয়েছিলেন বাংলাদেশ একটি ইসলামী রাষ্ট্র হোক। তারা এখন বলছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভয়ে লাখ লাখ মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের যুদ্ধাপরাধী বলা যাবে না, কেননা তারা পাকিস্তানী প্রায়-উপনিবেশিকতাবাদের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন!

এইসব বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে সংগ্রাম করে আসছেন বাংলাদেশের সচেতন মানুষ। বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা সভা, বই, পত্রপত্রিকা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে, অনুষ্ঠান করে জামায়াতে ইসলামীর অসার যুক্তিগুলি খণ্ডন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের শিক্ষা হয়নি। তারা আবারও মিথ্যাচার শুরু করেছে। এ সম্পর্কে ডেভিড সোয়ানসনের লেখা থেকেই আবার উল্লেখ করতে চাই। জি-নেটের ওই লেখাটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ছয় বছর আগে তিনি যখন অ্যাক্রনে কাজ করতেন তখন বুশ একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালান। এ পরিকল্পনার খসড়া করেছিলেন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা। আর এই কর্মকর্তা না কি মনে করতেন যোগাযোগপরিবহন, শিশুপরিচর্যা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এমনকি স্বামীর হাতে নির্যাতনসমস্যার চেয়েও অনেক বড় সমস্যা হলো নারীদের বিয়ে না-হওয়ার সমস্যা। কয়েকশ প্রতিবাদকারীকে নিয়ে ডেভিন সোয়ানসনরা তখন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের অফিস ভবনে গিয়ে সেই কর্মকর্তাটিকে অবিরাম জুতাপেটা করেছিলেন। এ ওষুধে কাজ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সোয়ানসন। ওই কর্মকর্তাটি নাকি সাংবাদিকদের কাছে ওষুধ কাজে লাগার ব্যাপারে স্বীকারোক্তিও দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ চায় নির্বাচন সুষ্ঠু হোক, পরিচ্ছন্ন হোক, গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয় ঘটুক। কিন্তু যারা অবিরাম মিথ্যাচার করে চলেছেন, সম্ভব কি তাদের কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই স্তব্ধ করা? এই মিথ্যাচারীরা এতই চৌকস যে তারা গণতন্ত্রেরও সুযোগ নিতে পারে, গণতন্ত্রের অপব্যবহার করতে পারে। আর দেখাই তো যাচ্ছে, জনগণকে রাজনীতিবিদরা এখন আরও বোকা ভাবেন; তাই তাঁরা স্বৈরাচারীকে সঙ্গে নিয়েও ভোট চাইতে দ্বিধা করেন না, যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে ভোট চাইতে ইতস্তত করেন না, আবার স্বৈরাচারী ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাইতেও ইতস্তত করেন না।

জনগণকে এত বোকা ভাবার উপযুক্ত জবাব যদি ভোটের মাধ্যমেও জানিয়ে দেয়া সম্ভব না হয়, তা হলে আমাদের একটু উবু হয়ে জুতো খুলে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং জুতার পাটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুঁড়ে মারতে হবে। মুনতাজার আমাদের নতুন করে পুরানো সেই কথাটিই জানিয়ে দিয়ে গেলেন।

২১ ডিসেম্বর ২০০৮

অবিশ্রুত

সেইসব দিন স্মরণে,- যখন কলামিস্টরা ছদ্মনামে লিখতেন; এমন নয় যে তাদের সাহসের অভাব ছিল, তারপরও তারা নামটিকে অনুক্ত রাখতেন। হতে পারে তাৎক্ষণিক ঝড়-ঝাপটার হাত থেকে বাঁচতেই তারা এরকম করতেন। আবার এ-ও হতে পারে, সাহসকেও বিনয়-ভুষণে সজ্জিত করেছিলেন তারা। আমারও খুব ইচ্ছে দেখার, নামহীন গোত্রহীন হলে মানুষ তাকে কী চোখে দেখে... কাঙালের কথা বাসী হলে কাঙালকে কি মানুষ আদৌ মনে করে!

6
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
আবু নঈম মাহতাব মোর্শেদ
সদস্য

আপনার লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রণদীপম বসু
সদস্য

আমি বরাবরই আপনার লেখার একজন অনুরাগী পাঠক। ভালো লাগলো মনের কথাটা কী সুন্দর করে বলে দিলেন আপনি !

জনগণকে এত বোকা ভাবার উপযুক্ত জবাব যদি ভোটের মাধ্যমেও জানিয়ে দেয়া সম্ভব না হয়, তা হলে আমাদের একটু উবু হয়ে জুতো খুলে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং জুতার পাটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুঁড়ে মারতে হবে। মুনতাজার আমাদের নতুন করে পুরানো সেই কথাটিই জানিয়ে দিয়ে গেলেন।

ইনসিডেন্টাল ব্লগার
সদস্য

অবিশ্রুত,
রণদীপমের মত আমিও একজন অনুরাগী পাঠক।
আমার একটি অভিযোগ আছে, যা এখন বলতেই হবে। আপনার প্রতিটি পোস্ট পড়ার পর মন্তব্য করার মত আর কিছু খুঁজে পাইনা। অনুপ্রেরণাময় এই পোস্টগুলো পড়ার পর কেবলই মনে হয়, ভাবনাগুলোর সবই যেন বলে দিলেন কিছুই বাকী না রেখে। এখানে লক্ষ্য করেছি কারো কোন লেখা পছন্দ হলেও তা নিয়ে কেউ তেমন বাড়াবাড়ি করেন না। মুগ্ধতাগুলো অনুক্ত থাকে।
নিয়মটা না ভেঙ্গে পারলাম না।

মাসুদ করিম
সদস্য

নিজামী আরেকটি সভায় দাবি করেছেন, জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব সঠিক ছিল এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিনও এর সমর্থক ছিলেন। তাঁরা দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন বলেই তাঁদের শাসনামলে ওআইসি-তে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছিল। তা ছাড়া বাংলাদেশে ফিরে এসে, নিজামীর ভাষায়, জাতির স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান সঙ্গে সঙ্গেই উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামী রাষ্ট্র।

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.