লোকেরা যখন আনাইস-এর প্রশংসা করে একেবারে আসমানে তুলে দেয়, যেনবা সে একজন দেবদূতী, আমাকে তখন শয়তানিতে পেয়ে বসে। আমার মনে হয় না আমি শীতল আচরণ করছি, এটা শুধুমাত্র এই যে, আমি তার দেবীত্ব বিষয়ে শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে পড়েছি। [...]

আনাইস নিন লোকেরা যখন আনাইস-এর প্রশংসা করে একেবারে আসমানে তুলে দেয়, যেনবা সে একজন দেবদূতী, আমাকে তখন শয়তানিতে পেয়ে বসে। আমার মনে হয় না আমি শীতল আচরণ করছি, এটা শুধুমাত্র এই যে, আমি তার দেবীত্ব বিষয়ে শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে পড়েছি। সে একেবারে খাঁটি চিনি দিয়ে তৈরী নয় এবং আমি এই কথা বলতে পেরে খুশি। আনাইস-এর দুর্বলতা ও অন্ধকার দিকগুলোই আমাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে সবচেয়ে বেশি। তার সেইসব স্বর্ণালী গুণগুলোর কথা বলার বেলায় আমিই যদিও সবার আগে থাকবো, তবু আমাকে বলতে হবে যে তার অন্য দিকটাই তাকে বেশি মানবিক ও নাজুক এবং সে-কারণে আদরণীয় করেছে আমার চোখে। পারী-তে যখন আমাদের প্রথম পরিচয় হয় তখন একেবারে বিস্ফোরক না হলেও একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। আমরা প্রবলভাবে দুজন দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হই। আনাইস তখন বাঁচার জন্য রীতিমত জ্বলছিল। সে তার উচ্চ-মধ্যবিত্ত জীবন ও একজন সজ্জন কিন্তু রক্ষণশীল ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিবাহিত জীবনের ক্লান্তিতে একেবারে শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমার বউ জুন অনিয়মিতভাবে পারী-তে আসতো আমার কাছে বেড়াতে, যদিও আমাদের সম্পর্কটা ছিল তখন একেবারে তার শেষ পর্যায়ে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে দিতে, কিন্তু সেটা এতই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ছিল যে কিছুতেই টিকছিল না। আমরা দুজন দুজনকে পাগল করে তুলছিলাম। আর তখনই এল এই সুন্দরী নারী, আনাইস নিন, যে ক্রমেই আমার নতুন জীবন, আমার পারী-জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল, আর সে পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া একটি ফুলের মত আবার ধীরে ধীরে পাতা মেলছিল। আমার কাছে জুন-এর প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল, যদিও সে তার উল্টোটাই সত্যি বলে দাবী করছিল। সে আমার কাছে এলেই আমার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো, আমার কাজের ক্ষতি হতো। আনাইস-এর সঙ্গে আমি নিশ্চিত ও নিরাপদ বোধ করতাম। সে সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতো যেন আমি লেখা চালিয়ে যেতে পারি। সে সত্যি ছিল একজন অভিভাবক-দেবীর মত, আমার লেখার ব্যাপারে উৎসাহী ও সহমর্মী; তখন সেটাই আমার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল। সে খুব দয়াশীলও ছিল। আমাকে ছোটখাটো উপহারে ভরিয়ে রাখতো -- হাতখরচ, সিগারেট, খাবার এইসবের যোগান দিত। আমি লেখক হয়ে ওঠার আগেই সে জগতের কাছে আমার প্রশংসার গান গাইতো। সত্যি বলতে কী, আনাইস-ই আমার ট্রপিক অফ ক্যান্সার বইয়ের প্রথম মুদ্রণের…

উচ্চাকাঙ্ক্ষা আপনাকে গিলে খায়, একেবারে জ্যান্ত খেয়ে ফেলে। অল্পস্বল্প উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অবশ্য অনেকদূর যাওয়া যায়।[...]

উচ্চাকাঙ্ক্ষা উচ্চাকাঙ্ক্ষা আপনাকে গিলে খায়, একেবারে জ্যান্ত খেয়ে ফেলে। অল্পস্বল্প উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অবশ্য অনেকদূর যাওয়া যায়। জীবনের লড়াইয়ে শুধু একটি বিষয়ে গোঁ ধরে রাখলে চলে না, চলার পথে এতে নানাভাবে ছাড় দিতে হয়। অসাধ্য সাধন করা আমাদের কাজ নয়, যেটা আমরা সবচেয়ে ভালো পারি সেটুকু করে গেলেই হলো। আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষার দানব ও সাফল্যের সংগ্রাম দ্বারা তাড়িত ছিলাম। ঘোরতর নাস্তিক হওয়া স্বত্বেও আমি হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে প্রার্থনা করতাম "হে ঈশ্বর আমাকে লেখক বানিয়ে দাও, যেনতেন কোন লেখক নয়, একজন বড় লেখক।" আমি লিখতে শুরু করার আগে থেকেই আমার সাহিত্যিক সক্ষমতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ছিলাম। অন্তত আমার নিজের বিবেচনায় আমি তখনই বিখ্যাত সব লেখকদের সমকক্ষ ছিলাম। যখন কেউ জিজ্ঞাসা করতেন আমি কী লিখেছি তখন আমি কল্পনা থেকে একগাদা বানানো গল্পের শিরোনাম বলে যেতাম এবং সেগুলো জনপ্রিয় সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করতাম। আমি জন্মাবধিই ছিলাম বানিয়ে বলায় ওস্তাদ। এতসব কিছুর ভিতর দিয়েই আমি বিনয়ে ছাই ও ধুলোর সমান হতে পারার মূল্য শিখেছিলাম। সবারই সেই অভিজ্ঞতা হওয়া উচিৎ। নিজেকে কেউ একজন বলে স্বীকৃতি দেবার আগে আপনাকে জানতে হবে যে আপনি কেউ নন। প্রজাপতির জন্ম জীববিদ্যার জগতে একটি অন্যতম রহস্যময় ও বিস্ময়ের বিষয়। 'ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির জন্ম' কিংবা 'অশুভ থেকে শুভ-র উদয়' জাতীয় আপ্তবাক্যের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে তা। শুরুতে প্রজাপতি থাকে খুবই দীনহীন অবস্থায়। সেই গুটিপোকা প্রতি মুহূর্তে পাখা মেলে উড়াল দেবার স্বপ্নে বিভোর থাকে না। সে একটা কার্যকর ও উপকারী পোকার জীবন যাপন করে। এবং তাকে পোকা হিসাবেই মৃত্যুবরণ করতে হয়, পরীরূপে জন্ম নেওয়ার জন্য। গুটিপোকার সুতোবোনা নিজেই একটি অবিশ্বাস্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেটি প্রজাপতির উদ্ভব ও প্রথম উড্ডয়নের মতই সমান বিস্ময়জাগানিয়া। ভক্তবৃন্দ ভক্তেরা চুলের খুসকির মত, অনেকটা গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া গোছের। অবশ্য ভক্তদের মধ্য থেকে আমি দুয়েকজন ভাল বন্ধুও পেয়েছি, যদিও তাদের সংখ্যা আঙুলে গোণা যায়। তারা একসময় পঙ্গপালের মত ভিড় করে আসত। আমি যখন বিগ সুর-এ থাকতাম তখন প্রায় প্রতিদিনই সকালে উঠে দেখতাম কেউ না কেউ গাছের ডালে কিংবা বেড়ার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে আমাকে দেখার আশায়। তাদের মধ্যে কখনো কখনো পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে আসা বদ্ধ উন্মাদ যেমন থাকত,…

ন্যুয়কের্র ফিফ্‌থ্‌ অ্যাভিন্যুর গা ঘেঁষে একটি বেশ উঁচুমানের দর্জির দোকানের মালিক ছিলেন আমার বাবা। [...]

[হেনরি মিলারের 'ভাবনাগুচ্ছ' : ১] আমার বাবা ন্যুয়কের্র ফিফ্‌থ্‌ অ্যাভিন্যুর গা ঘেঁষে একটি বেশ উঁচুমানের দর্জির দোকানের মালিক ছিলেন আমার বাবা। আমার মায়ের ইচ্ছেতে বাবার ওপর গোয়েন্দাগিরি করাই আমার সেই দোকানে কাজ করতে যাবার অন্যতম কারণ ছিল। আমার বাবা ছিলেন ভয়ংকর মদ্যপায়ী, যাকে বলে একেবারে অ্যালকহলিক। আমার বাবা যখন মদের আসরে যেতেন তখন আমাকেও তঁর সঙ্গে যেতে হত কেননা তিনি এতটা মাতাল হয়ে যেতেন যে বাড়ি ফেরার পথ চিনতে পারতেন না। দর্জির দোকানটা ছিল একটা ক্লাবঘরের মত যেখানে ব্যবসার কাজে কাপড়বিক্রেতারা আসতেন এবং কাজশেষে আমার বাবাকে মদ খাওয়াতে নিয়ে যেতেন। একদিন আমি ও বাবা যখন ব্রডওয়ের একটা ভদ্রস্থ পানশালায় যাই তখন এক খচ্চর গোছের ফরাসি বেয়ারা আমার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে "তুই একটি আস্ত মাতাল বদমাশ ছাড়া আর কিছু না।" সে এমন ভঙ্গিতে কথাটা বলে যে আমার ঘাড়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তার গলা চেপে ধরি। আমি চাইছিলাম সে যা বলেছে সেটা যেন ফিরিয়ে নেয়। পানশালার লোকজন আমাকে টেনে সরিয়ে দেয় কেননা ততক্ষণে তার চোখ বেরিয়ে আসছিল প্রায়। আমি খুবই অপমানিত বোধ করছিলাম কেননা সে যা বলেছে সেটা আদতে সত্য। কিন্তু আমি এটা মানতে প্রস্তুত ছিলাম না যে আমার বাবা একজন মদ্যপ। এর পাশাপাশি, বইয়ের প্রতি, বিদ্যার প্রতি তাঁর অনাগ্রহও আমাকে খুব পীড়িত করতো। তিনি খবরের কাগজ ছাড়া আর কিছুই পড়েন নি কোনদিন। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের কোন আকর্ষণ ছিলনা তার কাছে। হয়তবা আমার বাবামার অনাগ্রহের কারণেই আমি সেই জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এটি আমাকে তাঁদের থেকে আলাদা ও দূরবর্তী করে তুলেছিল। আমি তাঁদের মত হতে চাই নি কেননা একেবারে ছোটবেলা থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তাঁরা আসলে মূর্খ। কিন্তু আমার বাবা সবসময়ই আমার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করেছেন। আমার মায়ের বিপরীতে তিনি ছিলেন দয়ালু ও সহিষ্ণু। তিনি মনের দিক থেকে একজন ভালো মানুষ ছিলেন। আমি কেন জানি সবসময় তাঁর জন্য দুঃখ অনুভব করেছি। আমার মায়ের সঙ্গে বাস করা এত কঠিন ছিল যে আমি জানি না কীভাবে তিনি তাঁর সঙ্গে থাকতে পেরেছিলেন কিংবা কেন তিনি তাকে ছেড়েছুড়ে একেবারে চলে যান নি। আমার মা এমন একজন মানুষ…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.