এই লেখাটা লিখব না লিখব না বহুদিন ভেবেছি। কাছের মানুষরা ভয় দেখিয়েছেন কাকের মতন একতাবদ্ধ সাহিত্যিক দুর্বৃত্তদের। কিন্তু বারবার মনে হয়েছে যে, লেখা উচিত। [...]

এই লেখাটা লিখব না লিখব না বহুদিন ভেবেছি। কাছের মানুষরা ভয় দেখিয়েছেন কাকের মতন একতাবদ্ধ সাহিত্যিক দুর্বৃত্তদের। কিন্তু বারবার মনে হয়েছে যে, লেখা উচিত।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার প্রথম বই কনফেশন বক্সের ভিতর। অটাম-দিনের গান প্রকাশিত হয়। বইটার মূলগল্পের কেন্দ্রে আছে একটি পরিবার, আজহারউদ্দিন আহমেদের পরিবার। আজহারউদ্দিনের স্ত্রীর নাম ফরহাত বানু। মেয়ে ঈশরাত বানু। ছেলে রঞ্জু। ঈশরাতের আরেকটি বোন আছে, তার নাম রওনক। রঞ্জুর একটি অজ্ঞাতনামা প্রেমিকা ছিল, তার ছদ্মনাম ক্রতু। রওনক বাদে এঁরা প্রত্যেকে স্মৃতিচারণ করেন। কেউ ডায়েরি লিখে। কেউ স্বগতঃভাষণে। কেউ চিঠিতে। এঁদের দৈনন্দিন জীবনে প্রেম-গ্লানি-প্রতারণা-প্রিয়বিয়োগের শোক এইসবই উপস্থিত। নিজের কাছে অবমুক্ত হবার সময় এঁরা প্রত্যেকে দেখতে পান এঁদের নিজস্ব স্খলন-পতন-ত্রুটি, এঁদের জীবনে ভালবাসা পাবার জন্যে অন্তিম হাহাকার। ব্যক্তিগত বেদনা ভুলতে আপাতঃস্বাভাবিক এইসব মানুষ প্রতিহিংসার আশ্রয়ও নেন, যেন তাতে স্থায়ী-শোক উপশমের উপায় আছে। এই বইটিতে আমার ভাষাব্যবহারের একটি উদ্দেশ্য ছিল ভাষাভাষীদের আলাদা করে দেয়া। যাতে প্রতিটি চরিত্রের জন্যে ভাষাও একটি চারিত্র হয়ে দাঁড়ায়। শুধু সাধু-চলিত নয়, পরিভাষা এবং বিদেশী শব্দও আলাদা করে বসিয়েছিলাম আমি। এক এক করে।

অদ্যাবধি আমার জানামতে বইটার দু’খানা রিভিউ হয়েছে, একটি মশিউল আলমের করা (প্রথম আলো-তে) আরেকটা সালাহ্ উদ্দিন শুভ্রের করা, সাময়িকী ডট কম-এ। প্রথম রিভিউটির কোনো কপি আমার কাছে নাই। তবে মনে আছে, মশিউল আলম লিখেছিলেন — ‘বইয়ের নামে ইংরেজি কেন? তার মানে কি লেখক বাংলা ভাল জানেন না?’ (এই সম্পাদ্য উনি শেষ অব্দি শেষ করেছেন এইমত যে, লেখকের বই পড়ে তাঁর মনে হয়েছে লেখক বাংলা ভালই জানেন।) মজার বিষয় হচ্ছে একইসময় আরেকটি বইয়ের রিভিউ হয়েছে, আমার বইয়ের রিভিউয়ের পাশেই, একইসময়-একসাথে, সে বইটির নাম ফেস বাই ফেস, লেখক মাহবুব মোর্শেদ। তাঁকে প্রশ্ন সইতে হয়নি কেন তাঁর বইয়ের নাম পুরোটাই ইংরেজিতে (এবং বলতে নেই এবইয়ের নাম ইংরেজিতেও অর্থহীন, আমি একাধিক ইংরেজিভাষীর সাথে এই ‘পান’-এর যথাযোগ্যতা নিয়ে আলাপ করেছি, তাঁরাও পাননি। তবে আমি মনে করি বইয়ের নাম বিষয়ে লেখকের সার্বভৌমত্ব আছে, তিনি রাখতেই পারেন।), তিনিও কি বাংলা জানেন না? নাকি উপযুক্ত শব্দাবলির অভাবে দ্রুত ইংরেজির সহায়তা নেয়ার অভ্যাস (মশিউল আলম এই অভ্যাসের কথা লিখেছেন প্রথমেই)? ফেস বাই ফেস-এর রিভিউয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেও এরকম কোনো প্রশ্ন শোনা যাবে না।

আমার বইয়ের রিভিউ দু’টির দু’টিতেই ‘নারী-লেখকের লেখা গদ্য’ এই দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করা হয়েছে। পুরুষের জন্যে কোনো দৃষ্টিকোণ নেই। আমি জানি না লেখক যদি কিম্পুরুষ হন, যদি ট্রান্সভেস্টাইট হন, যদি সমকামী হন, যদি হিজড়া হন — তাতে রিভিউ করবার সময় সেই দৃষ্টিকোণ বিষয়ে কথা বলবার অবকাশ আছে কি না, সেটা কতটা প্রাসঙ্গিক। আমাদের সাহিত্যালোচনায় শুরুতেই কেন এই লিঙ্গসূচক বাটখারাটা নিয়ে বসতে হয়, আমি বুঝতে পারি না। নারীর জন্যে কি এস.এস.সি/এইচ.এস.সি.-এর সিলেবাস আলাদা ছিল? নারীর জন্যে কি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিপরীক্ষায় কোটা ছিল? সেইসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়, মস্তিষ্কের ক্ষমতানিরীক্ষায় কি তাদের খাতা আলাদা করে দেখবার রেওয়াজ ছিল?

নামের প্রসঙ্গে ফেরত আসি। আমার বইয়ের নামে কনফেশনবক্সের পারিভাষিক বাংলা ব্যবহার করা যেত, তাতে লাগসই হতো না। একাধিক মানুষ একরকমের স্বগতঃভাষণ এবং স্মৃতিচারণ করে চলেছেন এবং তাতে নানান পার্সপেকটিভ (দৃষ্টিকোণ আরকী) — এই হচ্ছে বইটার লিখনপদ্ধতি। ট্রেসি শেভালিয়ে এইরকম করে ফলিং এঞ্জেলস (পতিতোন্মুখ পরীরা…) লিখেছিলেন, ‘সই’ গ্রুপের নবনীতা দেবসেনরা বারোজন লেখিকা মিলে এইরকম করে একটি উপন্যাস লিখেছেন। গল্পনির্মাণে তাতে একরকম রহস্য থাকে, আস্তে আস্তে খোসাটা খুলে আসে, শাঁস-এর স্বাদ স্পষ্ট হয়, পুরো ফলটার আকার বোঝা যায় — এই গঠনের গল্প/উপন্যাস পড়বার জন্যে ধৈর্য প্রয়োজন, প্রয়োজন শেষ পর্যন্ত বইটা পড়া, কেননা প্রতিটি চরিত্র কিছু কিছু হিন্ট এবং ক্লু দিয়ে যাবেন। যিনি রিভিউ লিখবেন, তিনি একটা বই শেষ পর্যন্ত পড়বেন সেটাই তো স্বাভাবিক। সেটাই কিনা রীতি। আমার বইয়ের নামে আরেকটি শব্দ ইংরেজি — ‘অটাম’, এর কত সুন্দর বাংলা আছে ‘শরৎ’/ ‘শারদ’। কিন্তু ভেবে দেখুন, শারদ রঙ হচ্ছে শাদা-সবুজ-নীল, আর অটাম শব্দটায় একরকম ‘স্তিমিত দিনের উদ্ধত ঘনঘটা’ রয়ে গেছে, ঋতুমালা নিঃশব্দ-চিৎকৃত রঙে রক্তিম করে জানিয়ে যায় — এসেছিলাম। অটাম-এর রঙ ইয়েলো অকার-অক্সব্লাড-রাসেট-লাইম-বার্ন্ট সিয়েনা-রাস্টি অরেঞ্জ। ঝরা এবং পচা পাতার রঙগুলি।

এবার সালাহ্ উদ্দিন শুভ্রর বুক-রিভিউয়ে ফেরত আসি। উনি শুরু করেছেন ফ্ল্যাপ থেকে। তাই সই।

সাগুফতা শারমীন তানিয়ার ‘কনফেশন বক্সের ভিতর। অটাম – দিনের গান’ গ্রন্থে দুইটা বিভ্রান্তি আছে। প্রথমটা তৈরি করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বইয়ের ফ্ল্যাপে তার বক্তব্য সেই বিভ্রান্তি তৈরি করে। তিনি কোথাও এই বইরে উপন্যাস বইলা হাজির করেন নাই। তিনি বলছেন এই বইয়ে গল্প আছে, যাপিত জীবনের গল্প। সেই গল্প কয়েক প্রজন্মের এবং এর পাঠকরাও নাকি সেই গল্পের অংশভাক হয়ে যাবে। কোন এলাকার পাঠক, মূল বিভ্রান্তি এখানে। গোমেজ বলছেন, জাপানি ছবির কথা। কাদের যাপিত জীবন নিয়া আঁকা হইলো একটা জাপানি ছবি।

বইয়ের ফ্ল্যাপে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ লিখেছিলেন —

একটা পরিবারের একাধিক প্রজন্মের কয়েকজন মানুষের, উত্তম পুরুষে রচিত বয়ানে একটা মহাসময় রূপ পরিগ্রহ করেছে ধীরে ধীরে — একটা সময়হীনতা। সেই সময়ের স্থায়ী ভাব বিষাদ… এইটুকু একটা গল্প কত কথা যে বলে এবং বলে না — সামান্য ক’খানি রেখায় আঁকা জাপানি কোনো ছবি যেন এক।

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ যে এই বইকে উপন্যাস বলেননি, এখানে বিভ্রান্তির অবকাশ কই?

কোন এলাকার পাঠক এই বই পড়তে গিয়ে এর অংশভাক হবে এই বিভ্রান্তি ফ্ল্যাপ থেকে কেন শুরু হলো তা আমি বুঝতে পারি নাই। প্রথমতঃ বইটি বাংলায় লেখা, বেশিরভাগ অংশ বাংলাদেশের-পুরাতন ঢাকার-বিক্রমপুরের-মুর্শিদাবাদের আবহে লেখা, বাকিটা প্রবাসী একটি তরুণীর জবানিতে লেখা, সেখানে কোন এলাকার পাঠক বইয়ের নায়কনায়িকার জীবনের সহভাগী হবেন সেই প্রশ্ন কেন ওঠে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এলাকাভেদে কি পাঠকের মনোভাব একটি বইয়ের গল্পের অংশভাক হয়? তার মানে, ফেনীর বিষয়ে লিখলেই ফেনীতে জন্মানো পাঠক উদ্বেল হন? তাহলে আমরা লাতিন আমেরিকার সাহিত্য পড়ে হাসি-কাঁদি কেমন করে? পাঠক কীভাবে গল্পের মানুষদের যাপিত জীবনের অংশভাক হন, সেটা যিনি জানেন না, তিনি রিভিউ লিখতে বসেছেন দেখে আমি চমৎকৃত হই। প্রথম প্যারাগ্রাফে তিনি ফ্ল্যাপ খুলেই জিজ্ঞেস করছেন — ‘কাদের যাপিত জীবন নিয়া আঁকা হইলো একটা জাপানি ছবি?’ তাই তো! কাহিনীতে জাপানি লোক ছাড়া জাপানি ছবি আঁকা হইলো কেমন করে?

মাতিস কয়েকটি কৃপণ মধুর দাগে একটা প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, সমালোচক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন — ‘কয় সেকেন্ডে শেষ করেছ, মাতিস?’ তিনি বলেছিলেন — ‘চল্লিশ বছর’। বুঝি সুব্রত অগাস্টিন সেইরকমই একটা ইঙ্গিত করেছিলেন যে, অনেকসময় হালকা দাগে একটু আভাসমাত্র দিয়ে দিব্যি একটা গল্প লেখা যায়, একটা ছবি আঁকা যায়। তাতে দীর্ঘ অধ্যবসায়কে চিনতে ভুল হয় না। রেখাই বাকিটা বলে দেয়।
শুভ্র লিখলেন —

এই বিভ্রান্তির পাশে দ্বিতীয় বিভ্রান্তি বইয়ের নামে। কনফেশন বক্সের ভিতর যাপিত জীবন পাওয়া গেলেও অটাম দিন আর গান পাওয়াটা মুশকিল। মুশকিল পাঠকের জন্য। যারা ঝুমু-ইশরাত বানু- আজহার উদ্দিনদের পড়বেন, জানবেন তাদের সম্পর্কে। এই সকল চরিত্র সম্পর্কে জানা বোঝার শেষে পাঠক কি পেলেন এবং কি বুঝলেন সেই ভার লেখক নিবেন কি না এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আমার দ্বিতীয়বই ভরযুবতী, বেড়াল ও বাকিরা প্রকাশের সময় আমি এইরকম প্রশ্ন আরো শুনেছি — ‘আচ্ছা, বিড়াল ভরযুবতী কেন? কেমন করে বুঝা যায় একটা বিলাই ভরযুবতী?’ এইবার শুভ্র জানাচ্ছেন যে, তিনি যাপিত জীবন পেয়েছেন (ইউরেকা!), কিন্তু এখন খুঁজছেন ‘অটাম-দিন’ আর ‘গান’, এবং এইরকম করে যারা একটি বইয়ের নামকরণের পদাশ্রিত নির্দেশক অব্দি খুঁজবে, তাদের জন্যে যে মুশকিল হবে এইটা জানাচ্ছেন। পাঠক কী পেলেন, কী বুঝলেন, বইটা পড়ে তাঁর কী লাভ হলো, সেই লাভ আধ্যাত্মিক নাকি ফলিত নাকি অজৈব — এইসব দায় তাহলে লেখকের (স্মৃতি প্রতারণা না করে থাকলে, দুষ্ট বুড়া নীরদ সি চৌধুরীই সম্ভবতঃ বলেছিলেন — জগতের হাটে দুইপদের লেখক, একপদ পাগল আরেকপদ ছাগল, পাগল লেখক নিজের খুশির জন্যে লেখে।)। লেখক চকখড়ি এবং একটি শ্লেট নিয়ে পাঠককে পাশে বসিয়ে বোঝাবেন, ‘দ্যাখো ভাই,

একদিন বিকেলবেলা। রোদ হেলে গেছে। অর্জুনগাছটা ভরে ঐসব দলামোচড়া দেখতে মতন ফল এসেছে। জানালার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে অনন্তকাল তাকিয়ে আছি দু’বাড়ির মাঝের একফালি জমিতে। একটা লিকলিকে নতুন আমের চারা। ভাঙা লাটাই। আমাদের ছুঁড়ে ফেলা রাজ্যের আইসক্রিমের কাঠি। দইয়ের ভাঁড়। কে যেন গান বাজাচ্ছিল। হেমন্ত কুমারের গান। — তুম পুকার লো। তুমহারা ইন্তেজার হ্যায়। খামোশী সিনেমার গান। ছমছম করা সুর।

গান শেষ হলো। অর্জুনগাছটার মগডালে মিহিদানা রঙ রোদ উঠে গেল। সন্ধ্যার বাতাস অনতিদূরের বেকারীর খাস্তা বিস্কুট-দালদার গন্ধে ভরে উঠতে লাগলো।

আমার অত ভাল লাগছিল কেন? তুম পুকার লো। কে আমাকে ডেকে নেবে? (ঠিক তার ক’দিন আগেই পল নিউম্যান আমাকে নারীতে পরিণত করেছে, অযথাই।) এইবার অযথা ভাললাগার শুরু, অযথা বেদনার শুরু, অযথা কুলকুল করে শরীর ভরে উঠবার শুরু।

রোদ নিভে এলো। আকাশ ফিরোজা হয়ে এলো। দীননাথ সেন রোডের কবরখানার তেঁতুলগাছ-চাঁপাগাছ-গাছআলুর লতা-হরেক আগাছা থেকে দীর্ঘশ্বাসের মতন গরমের দিন-মতন একটা গন্ধ ভেপে উঠলো। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে গুনগুন করতে লাগলাম — তুম পুকার লো। কে যেন আমাকে ডেকে নেবে!

এইখানে — বোধকরি লেখাটা সুরেলা হয়ে উঠছে, তা ভাই গান মানেই তো তারানা না, ‘গান তয় স্বরলিপি কই’ এই ফিউটাইল কোশ্চেনটা কোরো না।’

শুভ্র লিখেছেন —

গোমেজ যে ভাষার প্রশংসা করলেন তা আসলেই প্রশংসার যোগ্য কিন্তু তাও প্রশ্নহীন না। কারণ যিনি লিখছেন, যা লিখছেন তা আসলে কার বা কাদের ভাষায় লিখছেন সেই প্রশ্ন এই গ্রন্থের মোড়কে বেশ জ্বলজ্বলে। বিশেষ করে একবারে ইংরেজি অক্ষরে ইংরেজি শব্দ উপস্থাপনের বিষয়টা, জাপানি বিভিন্ন প্রকার শব্দ ব্যঞ্জনা এমনকি রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বেড়াল রূপ ও এই প্রশ্নকে বারবার সচল রাখে যে লেখক কার ভাষায় লিখছেন।

প্রশ্নাতীত কিছু তিনি আমাকে দেবেন না, এমনি করে কোমর বেঁধে লিখতে বসেছেন যে, কী করে তিনি ভাষার প্রশংসা করেন! তাই তিনি জানাচ্ছেন, ভাষাটা প্রশংসার যোগ্য বটে কিন্তু প্রশ্ন আছে এখানেও। প্রশ্ন হচ্ছে আমি কার ভাষায় লিখছি। (কার ভাষায় লিখছি? আমার ভাষায়। এইটাই আমার ভাষা। অবিভাজ্য-মৌলিক-স্বয়ম্প্রকাশ আমার ভাষা। অন্য কারো ভাষায় যাঁরা লেখেন তাঁরা এটা বুঝবেন না।)

এই প্রশ্ন কেন আসছে? আসছে কারণ, আবারও মোড়কে ফেরত যাই। মোড়কে নামে সেটা জ্বলজ্বলে। আর ইংরেজি অক্ষরে ইংরেজি শব্দ উপস্থাপনের বিষয়টা কী বুঝলাম না। আমার গল্প শুরুর আগে একটা পৃষ্ঠা আছে, বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ফাদার যোশেফ, তাঁর ডায়েরির পাতায় লেখা একটা কবিতা। কবিতাটা যেহেতু ফাদারের ডায়েরিতে লেখা, তাতে তারিখও আছে। সেসময় তিনি ফরহাত বানুর সাথে পরিচিত হন।

I saw her again today.
It rained a lot early morning, leaves and twigs were still shedding long teardrops —
Teardrops that dangled in the air a long time —
Under the brimming October sky
She was almost luminous, the way only shiny red apples could be…
Standing before the chapel, I showed her the Celtic cross I designed for the door, the glazed tiles shone with the last of the morning shower, I just said — “I did it”.
She didn’t say anything, smiled apparently, and reminded me of marshlands far away, skylarks and partridges.
She reminded me of wheat, of life, of the obvious biological fact that I am man, a man with birthmark and navel and laughter-lines and sketchbooks
Sketchbooks with paintings of pumpkins,
I remember woman
Prickly-pear cacti I drew in Sierra Madre,
I remember my sleepless nights
Conifers and chive flowers that grew up like a sigh …
My sister wearing sulphur yellow cabbage-roses on her hat,
I remember my whole being pouring forth from my fingertips, ejaculating my despair
The pale moons of my fingernails
She leaves at eleven
Taking a long walk through the chequered flagstones
Sterile echoes
And I remember
Strive, Abstain, Vapour of my breath, Cassock
Long willowy candles
Blue dial of my wrist watch and furrows on my forehead.

October 28, 1963

ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একজন ফাদার ঢাকার নটরডেম কলেজে পড়াতেন। দাঙ্গার সময় একটি উপদ্রুত পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি ছুরিকাহত হয়ে মারা যান। এই সত্যঘটনার ছায়াকে কেন্দ্রভাগে নিয়ে পুরো গল্পটা আপূর্যমান, অথচ আমার বই রিভিউ করতে গিয়ে মশিউল আলম বা সালাহ্‌ উদ্দিন শুভ্র এই প্রসঙ্গ একটিবারও আনেননি।

‘জাপানি বিভিন্নপ্রকার শব্দ ব্যঞ্জনা’ মানে কী? ফ্ল্যাপে পড়েছেন ‘জাপানি’, তাই শুভ্রর মনে হলো লেখাটায় জাপানি অনুষঙ্গ আছে! আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বোধ করি দু’টি জাপানি শব্দ জানি, ‘সুশি’ আর ‘হাইকু’। ‘রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বেড়াল রূপ’ মানে কী? আমার গল্পে একটি তরুণীর দু’টা বিড়াল, তাদের নাম রগড় করেই সে রেখেছে উইলভার রাইট আর অরভিল রাইট (উড়োজাহাজ আবিষ্কারক ভাইদের নামে)। আমাদের দেশে বেশিরভাগ কুকুরের নাম টমি, আর বিড়ালের নাম পুষি — তাতে কি টমি-পুষির মালিকরা কোন্ ভাষায় কথা বলে সেই প্রশ্ন ওঠে? প্রফেসর শঙ্কুর বেড়ালের নাম ছিল বোধ করি — নিউটন। সামান্য রসবোধহীন এবং রসাস্বাদনক্ষমতাহীন মানুষ রিভিউ লিখতে কেন বসেন? এই প্রশ্ন করাটা হয়তো ঠিক হয় নাই। ভাস্কর অনেক কালক্ষেপণ করে অনেক যত্নে মূর্তি গড়েন, আর উড়ুক্কু পাখি এসে সে-মূর্তির মাথায় মলত্যাগ করে যায়, অনায়াসে, প্রাকৃতিক কারণে।

তিনি লিখেছেন,

লেখকের লেখা যখন বইয়ে উঠে আসে তখন তার লেখার উৎস যতোগুলো মাধ্যম পার হয়ে আসে তখন আসলে বিশেষায়িত রূপেই তা পাঠকের সামনে হাজির হয়।

এবং লিখেছেন,

এই যে নারী লিখছেন অর্থাৎ তানিয়া লিখছেন এবং গল্প বলছেন তাতে তিনি লেখক হয়ে উঠছেন কোথায়।

বাক্য লিখবার স্ফূর্তি হয়নি, বোঝাবারও ক্ষমতা হয়নি।

এরপর লিখেছেন,

অনেকগুলো চরিত্রকে মলাটবন্দি করা লেখকের কাজ। কিন্তু তাতে চরিত্র আর লেখককে আলাদা থাকতে হয়, চরিত্র আর লেখক মিলিয়ে যে স্বর তৈরি করেন সেই স্বরের আওয়াজ পাঠক শোনে।

বাহ্, চরিত্র আর লেখক আলাদা থাকবেন আবার মিলিয়ে স্বর তৈরি করবেন, কী করে?

লিখেছেন,

লেখকের বয়ান লেখা হয়ে ওঠে হয়তো কিন্তু উপন্যাস হয় কি না।

লিখেছেন,

আর কে না জানে লেখকের চোখ দুটো কিন্তু তার ছিদ্রান্বষণের চোখের কোন লেখাজোখা নাই। ফলে এই বইয়ের ঝুমু যখন তার ঋতুস্রাবের ক্ষণে নিজেকে শারিরিকভাবে নারী হিসেবে আবিষ্কার করেন তখন মনে হতে থাকে এর আগে তিনি কি ছিলেন, অথবা মানসিকতার নারী তিনি কখন হয়ে উঠলেন। এগুলো পাঠকের প্রশ্ন, কারণ তার কাছে এই সকল অভিধা অপরিষ্কার।

‘উওম্যানহুড’ আর ‘ফিমেইল’ এই দুইটা শব্দ যে আলাদা, সেটা বললেই তো বলবেন ইংরেজি বলছে। ঝুমু নিজেকে নারী ভাবতে শুরু করেছিল পুরুষমানুষের রূপ দেখে —

ঠিক দুই বছর পরে আমি মুভি অফ দ্য উইকে পল নিউম্যানের ছবি দেখলাম। ক্যাট অন আ হট টিন রুফ। কিছু বুঝি নাই ছবিটা তখন। আমি দেখলাম কেবল বিশাল পাথুরে কপাল, তাতে চিন্তার ইলিবিলি রেখা, আমি দেখলাম পুরুষমানুষের ঘাড় আর কাঁধ আর চোয়াল। আর চোখের ভেতর সস্তা ডেকোরেটরের গ্লাসের কাঁচে যেমন থাকে… তেমনি বুদ্বুদ, হাসির বুদ্বুদ, হীন বিদ্রুপের বুদ্বুদ, হাসির জলে ধুয়ে ওঠা ভ্রুকুটি আর হাস্যরেখা — পুরুষমানুষ… উদ্ধত আর জটিল।

আমি তখনো শারীরিকভাবে নারীত্বে পৌঁছাইনি। হাঃ হাঃ পর্দার নিউম্যান আমাকে ঘুমোতেই দিল না। যেন আমি পৌঁছেছি রাজদ্বারে, অচিন দেশের সিংহদরজায়। আমি জানি যেন একটু পরেই সেই বন্ধ দরজা খুলে যাবে আর দরজার ভেতরে যা আছে তা আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আমি অপেক্ষমাণ। আমি অধীর। আর আগ্রহী।

শুভ্র যদি পাতা উল্টানোর বদলে বইটা পড়তেন, তাহলে অপরিষ্কার যা, তা কাটত। ভুল শব্দ আর বাক্যের ছড়াছড়ি করে লিখতেন না

এই যে শরীর এবং মনের দোলাচাল, তাতে দুলে দুলে ওঠা লেখক ঠিক তাল সামলাতে পারেন নাই। ফলে ভাষার কাজে তার এমন একটা সফলতাও দুলুনি চালে চলেছে।

আরো লিখেছেন,

আবার কোন এক পুরুষকে বাংলাদেশে বলেই শাস্তি দিতে না পারার আক্ষেপ এবং সেই আক্ষেপের প্রশমন যখন অন্য কোন রাষ্ট্রব্যবস্থায় হওয়ার সম্ভাবনার কথা ঝুমু উল্লেখ করেন তখন রাষ্ট্র এবং এর অন্তর্ভুক্ত জনগণ বিশেষত নারী যে অসহায়তার মুখ দর্শন করেন তা থেকে বিদেশ চলে যাবার সমাধান সবার না থাকায় এবং নিজ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অপর রাষ্ট্রের সামনে কদাকার করে তোলার চিত্রায়ণ, পাঠকের কাছে এহেন অনুভূতি লেখকের নিজস্ব বলেই মনে হতে পারে।

একটা বাঁশপাতারঙ ফুরফুরে ছোট্ট মেয়ে থাকাকালীন ঝুমুকে তার আরবি-হুজুরের কাছে যৌন নিপীড়ন সইতে হয়েছে; একটি বাঙালি মেয়ে আরবি-হুজুর/দরজি/গৃহশিক্ষক এদের কাছ থেকে নানা নিপীড়ন সয়ে বড় হয়, সয়েছে বলেই যে ভুলে গেছে তা তো নয়, সারাজীবন সেইসব মানুষকে সাজা দেবার একটা প্রতিহিংসা তার মধ্যে কাজ করাটা রীতিমত স্বাভাবিক। আমাদের দেশে আকছার হয়, কেউ বিচার চায় না, চাইলেও বিচার হয় না। পৃথিবীর আর সব দেশেও হয়, সভ্যদেশে লোকে সেটার বিচার চায় এবং পায়। সেটা শুভ্র নিজেও জানেন আশা করি। পরিণত বয়েসে একটি মেয়ে যখন প্রবাসে এসে দ্যাখে — এইসব শিশু-কিশোর নিপীড়নের সাংঘাতিক সাজা হয়, তার মনে আক্ষেপ আসতে পারে না? মনে হতে পারে না ‘ওটা যদি বাংলাদেশ না হয়ে এই দেশ হতো, আমি ঐ লোকটাকে পুলিশে দিতে পারতাম! পিডোফিলদের যে এখানে কী ভীষণ শাস্তি হয় — শিশু-সমাগম হয় এমন কোনো স্থানে তারা এজীবনে আর যেতে পারে না।’?

শুভ্র এইখানে জানাচ্ছেন, এই অনুভূতি লেখকের নিজস্ব। কেন? ঐকিক নিয়মে! ঝুমুও বিলাত থাকে। লেখকও থাকে। অতএব লেখকের ব্যক্তিগত চিহ্নাবলিই এখানে উপস্থিত, এগুলি লেখকেরই জীবনের কথা।

তিনি এই সুযোগে একটি ভুল তথ্য দিয়েছেন, ‘নারীর অবদমনের সকল স্মৃতিচিহ্নকে তিনি প্রোথিত করেছেন এই বাংলাদেশেই, ঢাকায়।’ গল্পের ঝুমুর বন্ধু লেমবে কিন্তু ধর্ষিত এবং খুন হয়েছিল লন্ডনে, অ্যাবনিপার্ক সেমেটারিতে। ঝুমুর লন্ডন-অভিবাসী গুজরাটি সহকর্মীরাও অবদমনের শিকার। শুভ্রর ভাষ্যমতে ‘নিজের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অন্য রাষ্ট্রের চোখে কদাকার’ করে তুলছে কে? আমি, কারণ কিনা আমি প্রবাসী, শুভ্রর মতে ‘বিদেশ চলে যাবার সমাধান’কামী প্রবাসী। এইখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ, এইখানে সেক্সিস্ট মনোবৃত্তির প্রকাশ — এইখানে আসলে কোনো বইয়ের রিভিউ লিখবার সম্ভাবনার সমাপ্তি।

দাদ থাকতে সমস্যা নাই, দাদের কণ্ডূতিতেও সমস্যা নাই, সমস্যা হলো দাদ-আক্রান্ত স্থান অনাবৃত করে তার চিকিৎসা করার, কারণ তাতে লোকে দ্যাখে! যেন লোকে এমনিতে কিছুই জানে না।

এই মনোভঙ্গি আমি আগেও দেখেছি। বাঙালি পুরুষের লক্ষণ নিয়ে আমি একটা লেখা ইংরেজিতে লিখেছিলাম, ফেইসবুকে, আমাকে এক লেখক জিজ্ঞেস করলেন — ‘ইংরেজিতে কেন লিখলেন? বাইরের দুনিয়াকে দেশের এই চেহারা দেখাতে চান?’ জাতিগতভাবে আমার জাতের যা দোষগুণ, তা কি এতদিন আমার হাতে অসম্বৃত হবার অপেক্ষায় ছিল? এর আগে কেউ জানতো না আমরা কেমন? আমাদের অসুখটা কোথায়? আমরাও কি দেশে বসেই পশ্চিমের অসুখগুলি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই?

আবার শুভ্রই বলছেন,

নারীর অবস্থার পরিবর্তন কখনোই কেবলমাত্র তার দুরবস্থার প্রতিচিত্রায়নে সম্ভব না। রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যবস্থার সাথে অঙ্গীভূত একটা সংকটকে কালের এবং দেরাজের ভেতর বন্দী করে রাখাটা বরঞ্চ বিপদজনক।

দুরবস্থার সামান্য আভাস চিত্রণেও যাঁর আপত্তি তিনিই আবার চাইছেন এইসব যাতনাগাথা যেন দেরাজবন্দী না থাকে। পরে যদিও বলছেন, ‘কনফেশান বক্সের ভেতর যে চিৎকার তা বাইরে আসে না। কনফেশন বক্সের ভেতর যে মানুষেরা তারা কনফেশনকেই মেনে নিচ্ছেন।’ তাহলে মেনে নেওয়ায় তাঁর আপত্তি আছে, শেষদিকে তিনিই আবার জানাচ্ছেন, ‘কনফেশনে আত্মখরচার একটা বিষয় থাকে। সেখানে কোন একটা ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিরে মাইনা নিতে হয়।’ কী কী ‘মাইনা নিতে হয়’? ঐ যা যা নারীর দুরবস্থার জন্য দায়ী, তাই তাই?

শুভ্র লিখেছেন,

এদের মাঝখানে চোরাস্রোত হয়ে বয়ে গেছে লুকোচুরি, আড়াল, হতাশা, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ, বুঝতে না পারা এবং একটা যৌনগন্ধী চাপা স্বর। বিশেষত বইয়ের ভেতরকার চিত্রায়ণে এমন কিছু ছবি তো আছেই। এই চিত্রশিল্প তখনই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে যখন আসলে মনে হয়েছে যে কোন একটি থাকলেই চলতো, ছবি অথবা লেখা। উপন্যাসকে আঁকা ছবিতে ধরার প্রচেষ্টা এতো সহজ বোধহয় না।

এই ব্লগে আমি আগেও জানিয়েছি, ইলাস্ট্রেশন আমার খুব প্রিয় বস্তু। উপন্যাসের সাথে ছবি আসতে বাধা কই সেটা বিশদ জানতে চাই। যা আপনি শারদীয় সংকলনে বা ঈদ সংকলনে উপন্যাসের পাশে দেখতে আপত্তি করেন না, সেটা বইয়ে দেখতে আপত্তি কোথায়? আর ঢেঁড়া কিংবা ফুটকিও যারা দিতে পারেন না, তাদের কাছেই ‘উপন্যাসকে ছবিতে ধরার প্রচেষ্টা’ নিয়ে আর একটু শুনতে চাই। যৌনতা বিষয়ে ‘চাপাস্বর’ কোথায় পেলেন, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না — আমার বইয়ের কোথাও এই বিষয়ে শ্যাম রাখি না কুল রাখি করিনি তো! আলিঙ্গন কিংবা চুম্বন কিংবা দুঃস্বপ্নে ভোজসভার ভিতর নাঙ্গা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা — এইসব বিষয়ে শুভ্র যৌনতা খুঁজে পেয়েছেন কেবল, আবহ নির্মাণে — টেক্সচার তৈরিতে যা জরুরি তা ছেঁটে ফেলার আমি কোনো যৌন কারণ দেখিনি।

শেষ অব্দি শুভ্র জানান যে,

পাঠক লিখতে পারেন না বলেই লেখকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই লেখক সময়-মানুষ-সমাজ-রাষ্ট্রের যে সেতু গড়ে তোলেন তা কেবল লেখকের মতো হলে চলে না। তাকে পাঠকের মতোও হতে হয়। কারণ তানিয়া পুনশ্চ শব্দযোগে জীবিত মৃত বহু মানুষকে তার গল্পের অংশভাক করেই রেখেছেন, সেই গল্পে পাঠকের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করবার কি আছে। এমন কোন সুযোগ অন্তত এই গ্রন্থে নাই।

তাঁর জ্ঞাতার্থে জানাই, পাঠক না হলে লেখক হওয়া যায় না (রিভিউ করা যায় না বললাম না, কারণ দেখাই যাচ্ছে সেটা করা হচ্ছে।)।

লেখককে পাঠকের মতন কখন হতে হয়? আমি যে জানতাম লেখক পাঠক তৈরি করেন, পাঠকের চাহিদামাফিক পণ্য হবার জন্যে সাহিত্য তৈরি হয় না।

জীবিত-মৃত বহু মানুষ আসলেই এই বইয়ের অংশভাক, নটরডেম কলেজের সেই ফাদার যিনি একটি পরিবারকে বাঁচাতে শহীদ হয়েছেন, আমার দূরসম্পর্কের নানী যার কাছ থেকে আমি পঞ্চাশের দশকের গ্রামাঞ্চলের মেয়ে দেখবার গল্প শুনেছি — এঁদের সবার স্মৃতি সজীব হয়ে এই লেখায় আছে, পাঠককে কেন চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে শুধু? চেয়ে দেখলেই বা ক্ষতি কি? যুদ্ধে যাবার যৌবনকে যিনি অনুভব করেছেন, যিনি স্মৃতির ক্যালাইডোস্কোপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারবার পুরাতন চিহ্নগুলি ফিরে দেখতে চেষ্টা করেন, এমন সব মানুষই এই গল্পের অন্তর্গত, এইটুকু মনে রেখে আমি শেষপৃষ্ঠায় লিখেছি — ‘জীবিত, মৃত এবং কল্পিত বহু মানুষ এ-গল্পের অংশ।’

শেষটায় এসে বলতে চাই, আমি দুঃখিত। আমি ‘আত্মখরচা’ এবং ‘আত্মগুঞ্জন’ এই দু’টি শব্দ জীবনে শুনিনি। মানেও জানি না। এমনকী পড়েও হৃদয়ঙ্গম করতে পারছি না। পড়েও যখন বুঝতে পারছি না, তার মানে এইবার আমারও একটি রিভিউ লিখবার বয়স এবং পরিপক্বতা হয়েছে।

অসূয়াপ্রসূত এবং বিদ্বেষপ্রণোদিত সাহিত্যসমালোচনা একটি লক্ষণবিশেষ, মূল অসুখ আরও গভীর। সালাহ্ উদ্দিন শুভ্রর এই সমালোচনা পড়ে অনেক মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন — ‘এই “হিংসিত সবুজ প্রাণী”কে তুমি কি কিছু করেছ কখনো? এই ভেনডেটার কারণ কী?’ যা পড়লে ‘ভেনডেটা’ (আবার ইংরেজি শব্দ!) মনে হয়, ব্যক্তিগত বিবাদতাড়িত মনে হয়, তা রিভিউ হতে পারে না — আর যাই হোক।

এপ্রিল ৯, ২০১১
লন্ডন ইস্ট, ইউ কে

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

বিপন্ন বিস্ময়ের অন্তর্গত খেলায় ক্লান্ত।

১৯ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.