বাসচালক ও কন্ডাক্টরের রসবোধ

সাপ্তাহিক দুটি ছুটির দিন (শুক্র ও শনি)-এর প্রথমটিতে আমি সাধারণত বাইরে কোনোরকম কাজ না রেখে বউ ছেলের সঙ্গে কাটাই। মাঝে মাঝে যে এ নিয়মে ব্যত্যয় ঘটে না তা নয়। যেমন গত সপ্তাহে বউ-ছেলেকে বিশেষ জরুরি কাজের অজুহাত দেখিয়ে বন্ধুদর্শনে উত্তরা চলে যাই এবং বিকেলটা খুবই আনন্দে কাটাই। এই আনন্দের হাত-পা-চোখ-মুখ খুলে দেখানো এ পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য যাত্রাপথের একটি দারুণ অভিজ্ঞতা বিনিময়।

অনেকেই জানেন, বেশ কিছুদিন ধরে বেভকো নামে ৫৩ আসনের একটা এসি গাড়ি চালু হয়েছে আজিমপুর-উত্তরা রুটে। আগে একদিন আমি এ গাড়ি চড়ে মহাখালী গিয়েছি। এটি দ্বিতীয়দিন। ধানমণ্ডিতে আমি যেখানটায় থাকি, সেখান থেকে এই বাসটি ধরতে কলাবাগান আসাই সুবিধাজনক। কিন্তু এবার কলাবাগান পার্কের সামনের নির্ধারিত স্থানে এসে দেখি টিকিট দেবার জন্য যে লোকটা নিয়মিত টেবিল পেতে বসে, সে নেই। অন্য কাউন্টারগুলোতে জিজ্ঞেস করলে ওরা বলল, আজ ও আসে নি। যেহেতু কাউন্টার নেই, সেহেতু আগাম টিকিট ছাড়াই হয়ত যাওয়া যেতে পারে, এটা মনে করে ননএসি কোনো গাড়ির টিকিট না নিয়ে আমি বেভকোর জন্যই অপেক্ষায় থাকলাম। কারণ এত গরমে ননএসিতে ভ্রমণ করলে আনন্দটাই মাটি হয়ে যেতে পারে।

যাই হোক, একটা সিগারেট ধরিয়ে কয়েক টান দি্তেই গাড়ি এল। চালককে হাত ইশারায় বুঝাবার চেষ্টা করলাম যে কাউন্টারে লোক নেই, কিন্তু আমি যাত্রী। গাড়ি দাঁড়াল। উঠে দেখি ৫৩টি আসনই পূর্ণ। এত গরমের মধ্যে এসি গাড়ি করে যেতে পারছি, সেটাই আরামের, আসন থাক বা না থাক। চালকের আসনের বাঁ’পাশের ইলেকট্রোপ্লেটেড রডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

গাড়িটি মানিক মিয়া এভিনিউতে পড়তেই একটা  গ্রাসহোপার উড়ে এসে বসল লুকিং গ্লাসে। কন্ডাক্টর ধরতে গেলে ওটি উড়ে এসে বসল চালকের কাঁধে। ওখান থেকে সে ঠিকই ধরে বসল। আমি বললাম, ‘প্লিজ মারবেন না পোকাটাকে, ছেড়ে দিন।’ কন্ডাক্টর বলল, ‘ঠিক আছে মারব না’। চালক কন্ডাক্টরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘জিগাইয়া দেখ তো টিকিট কাটছে কি না!’ আমি বললাম, ‘টিকিট কাটবে কী, ও তো স্টাফ!’ এবার চালক বললেন, ‘তাইলে জিগাইয়া দেখ, কার্ড দেখাইতে পারে কি না।’ এবার আমি বললাম, ‘চেনা বামুনের পৈতা লাগে না।’ ‘তাইলে তো ছেড়েই দিতে হয়’– এই বলে চালক দরজা খুলে দিলেন। কন্ডাক্টর বলল, ‘এইহানে ছাড়ন যাইব না, ঘাসে ছাড়ন লাগব। সামনে গিয়া একটু ব্রেক কইরেন।’ চালক দরজা বন্ধ করে আবার টানলেন গাড়ি। খামারবাড়ির মোড়ে গিয়ে আবার দরজা খুলে দিলে কন্ডাক্টর গাছ লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল পোকাটাকে। পোকাটা দিব্যি উড়াল দিয়ে স‌ংসদ ভবনের আওতার মধ্যে একটা আমগাছের ডালে গিয়ে বসে পড়ল। আমার স্বস্তি লাগল খুব। অন্য যাত্রীরা যারা দেখেছে ঘটনাটা তাদেরও মুখ দেখলাম প্রসন্ন।

দরজা বন্ধ করে কিছুদূর এগিয়ে এবার চালক কন্ডাক্টরকে ইংগিত করে বললেন, ‘মামলায় পড়লে কিন্তু আমি কিছু জানি না।’ কন্ডাক্টর বলল, ‘কী রকম?’ ‘বুঝস না ব্যাটা, পোকাটা তো গাড়িতে উঠছে আবদুল্লাহপুর থেইকা, এখন এতদূরে এইখানে নামাইলি, যদি হারাইয়া যায়!’, বললেন চালক। কন্ডাক্টর বলে, ‘হারাইব না।’ আমি বললাম, ‘ও তো আর বাচ্চা না যে হারিয়ে যাবে, রীতিমতো বয়স্ক লোক! এখানে কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে বিকেলের ট্রিপে হয়ত বেভকো করেই আবার চলে যাবে।’ কন্ডাক্টর বলল, ‘এখানে অনেক গাছগাছড়া আছে। আবদুল্লাপুরে তো গাড়ির প্যাঁপোঁ ছাড়া কিছু নেই।’ চালক বললেন, ‘তা অবশ্য ঠিকই কইছস।’ আমি বললাম, ‘শুধু কি গাছগাছড়া, চোর-ছ্যাঁচড় মন্ত্রী-এমপিদের আড্ডাখানা দেখবারও সুযোগ পাইব।’ ‘যাক তাইলে তো দেখি ভালাই অইছে!’, চালকের এই মন্তব্যে কন্ডাক্টর হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে বলল, ‘হ’।

এ ব্যাপারে কথা আর আগায় নি। কিন্তু ঘটনাটা দুটো কারণে আমার মনে খুব দাগ কেটে গেল। ১. চাইলেই ওরা পোকাটাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে মেরে ফেলতে পারত। কিংবা বাঁচাবার ভান করে রাস্তায়ও ছুড়ে দিতে পারত। কিন্তু সেটা ওরা করে নি। ২. ড্রাইভার-কন্ডাক্টরদের আমরা কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই বেরসিক বলে ভেবে থাকি। কিন্তু এদের মধ্যেও যে দারুণ রসবোধ আছে, এ আলাপচারিতা না শুনলে আমি বুঝতেই পারতাম না। বেঁচে থাকুক ওই গ্রাসহোপার, বেঁচে থাকুক চালক-কন্ডাক্টরের রসবোধ।

মুজিব মেহদী

ভাবি অনেক কিছু, লিখি কম, বলি আরও কম।

২৩ comments

  1. রায়হান রশিদ - ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১:৫৮ অপরাহ্ণ)

    বাহ্, দারুণ তো!

    বেঁচে থাকুক ওই গ্রাসহোপার, বেঁচে থাকুক চালক-কন্ডাক্টরের রসবোধ।

    তাই হোক।

    • মুজিব মেহদী - ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৬:৪১ অপরাহ্ণ)

      গ্রাসহোপারের বাঁচা না-বাঁচা সামান্য হলেও আমাদের বেঁচে থাকা না-থাকাকে প্রভাবিত করতে পারে।

  2. সৈকত আচার্য - ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৮:৫৮ অপরাহ্ণ)

    অনেক আগে, স্কুলে যাওয়ার সময় দেখেছি, সাধারনতঃ আমাদের দেশে একেবারে সাধারন জনগনকে পরিবহন করার জন্য যে সব কাঠ বডি বা টিন বডি’র বাস সার্ভিস শহর এলাকায় বা শহরতলীতে চলাচল করে সেসব গাড়ীর চালকের চাইতেও এসিষ্ট্যান্ট ও কন্ডাক্টরগন অনেক বেশী সরস উক্তি, টিপ্পনী বা মন্তব্য করে থাকেন ।

    এদের কাজ সাধারনতঃ বেশ একঘেঁয়ে ও অতিপরিশ্রমসাধ্য । মজুরীটাও নিতান্ত অল্প । সংসার আছে যাদের, তাদের অবস্থা আরো সংগীন। মনে আছে, অনেক গরমে, গাড়ীতে যখন তিল ধারন করার জায়গা থাকে না, দাঁড়ানো যাত্রীদের অসম্ভব ভীড় ঠেলে ঠেলে তারা যখন ভাড়া তুলতেন, দেহ তাদের শ্রান্ত, পরিশ্রান্ত ও অবসাদে ভরে যেত।

    একইভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এসিষ্ট্যান্টটি ড্রাইভারকে পথ বাতলে দিতে দিতে,
    হাঁক দিয়ে রিক্সা-সাইকেল-ঠেলা ওয়ালাকে সতর্ক করতে করতে এবং পরবর্তী ষ্টপ নিয়ে সতর্কীকরন ডাক দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে । তবু গাড়িতেই তার সময় কেটে যায় । কাটায় জীবনের একটা বড় সময় । একে কেন্দ্র করে তার হাসি কান্না বেদনার পরিচক্র গড়ে উঠে ।

    কি জানি, হয়তো একারনেই, অনেকে নিজেকে হালকা করতেই বলে উঠেনঃ

    যাত্রীঃ ও ভাই গাড়িতে কি সিট আছে?
    হেলপারঃ সিট ছাড়া কি গাড়ি আছে ভাই?

    আবার যেমন শুনেছি——

    যাত্রীঃ ও ভাই! সিট আছে?
    হেলপারঃ কি যে বলেন!! আমি পুরা ভালা মানুষ! ছিট থাকব ক্যান?

    • মুজিব মেহদী - ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৭:০০ অপরাহ্ণ)

      মন্তব্য করতে এসে মন খুলে কথা বলেছেন বলে প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই। আপনার প্রাসঙ্গিক এই মন্তব্য পোস্টটাকে সমৃদ্ধ করেছে।
      আপনার অবজারভেশন একদম সঠিক যে, এরা খুবই বিরক্তিকর ও ক্লান্তিকর পেশার সাথে যুক্ত। নিত্যবিরক্তি থেকে বাঁচতে সহজাতভাবেই হয়ত এ ধরনের রসচর্চা করে থাকেন তারা। কিন্তু এই সরল হিসেবটা সবার ক্ষেত্রে খাটে না অন্তত, খাটে মাত্র কারো কারো ক্ষেত্রে। অর্থাৎ বলতে চাই, যদি পেশার প্রকৃতিই এই রসবোধের একমাত্র কারণ হতো, তাহলে সকল বাসচালক ও কান্ডাক্টরই একরকম হতেন। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা সেরকম বলে না।
      লেখাটিতে আমি যে ঘটনাটা তুলে ধরেছি, সেটা কম ভিড়ের এসি বাসের পক্ষেই কেবল সম্ভব। খুব ভিড়ের সিটি সার্ভিসে রসের দেখা পাওয়া গেলেও ওই আর এই রসে আছে বিস্তর ফারাক। তবে সকল ক্ষেত্রেই মানুষের যেকোনোরকম পারফর্মেন্সের জন্য স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বটে।

  3. রণদীপম বসু - ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ)

    জাতিগতভাবে বাঙালির রসবোধ কিন্তু তীব্র। হয়তো নদীমাতৃক বলেই রস এমন টইটম্বুর করতে থাকে। আমাদের লোকায়ত বচন শ্লোক এগুলোতে এর দৃষ্টান্ত প্রচুর। তা ছাড়া আমরা চলতে ফিরতে আশে পাশে যাদেরকে আলাপ আলোচনা কথা বলতে দেখি বা শুনি, একটু খেয়াল করলেই বুঝা যায় এদের কথার মধ্যে আগে পিছে রসবোধ বা হিউমারের কী দুর্দান্ত ব্যবহার।
    সেদিন অর্থাৎ গত শুক্রবার একুশে টিভির জনৈক বন্ধুর সাথে আড্ডা মেরে ফিরছি। কাওরান বাজার থেকে হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেট এসে মিরপুরের ডাইরেক্ট বাসগুলো খুঁজছি। রাত সাড়ে নয় পেরিয়ে গেছে। ওখানকার একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, কর্ণফুলি কি চলে গেছে ? উত্তর করলো, এখন নি ? কবে ! গিয়া ঘুমাইতাছে !
    আমি বললাম, আর কি আসবে না ?
    আইবো না মানে ? কষ্ট কইরা রাইতটা পার কইরা দেন, সকালে কয়টা চান ? পারলে উপরেই উঠাইয়া দিবো !
    হা হা হা !

    • মুজিব মেহদী - ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৭:০৭ অপরাহ্ণ)

      অসাধারণ।
      কেউ কেউ ঠিকই এরকম টইটম্বুর রসের হাঁড়ি বগলে নিয়ে পথ চলেন। কেবল ক্ষেত্র খুঁজেন ঢেলে দেবার। আমাদের নিরস দৈনন্দিনকে এরাই জিলিপির মতো সরসতায় চুবিয়ে তোলেন। আমরা তখন হয়ত ভাবি, তেমন বেঁচে থাকা মন্দ কী!

  4. রেজাউল করিম সুমন - ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৭:৫৮ অপরাহ্ণ)

    মুজিব মেহদীর এই লেখাটা এককথায় অসাধারণ। মন্তব্যগুলিও ভালো লাগল।

    গত শুক্রবার রণদীপম বসু ফার্মগেটে এসে মিরপুরের বাস ধরেছেন জেনে সত্যিই খুব আফসোস হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হতে পারত!

    সামনাসামনি আলাপ অবশ্য মুজিব মেহদীর সঙ্গেও হওয়া দরকার। বেভকো বাসে চেপে দু’জনে গল্প করতে করতে যাব, আর মনে মনে খুব আশা করে থাকব — আরেকটা ঘাসফড়িং এসে বসবে চালকের কাঁধে! …

    • মুজিব মেহদী - ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৭:১৮ অপরাহ্ণ)

      এরকম ভার্চুয়াল আলাপ-সালাপের ভিতর দিয়ে পরস্পরে ক্রমশ এমন এক নৈকট্য স্থাপিত হয় যে, মাঝে মাঝে আমাদের ভুলে যেতে হয় বা ভুলে যাই যে কারো কারো সাথে আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয়টুকু নেই।
      বেভকো বাসে যেতে যেতে না হোক, ফুটপাতে চা খেতে-খেতেই হয়ত কখনো সরাসরি আলাপ-পরিচয় হয়ে যাবে আমাদের। হয়ত পাশের কাঁঠালিচাপা গাছ থেকে ঘাসফড়িং না হলেও কোনো সুদর্শন পোকা এসে সদম্ভে দাঁড়াবে আমাদের মাঝখানে। আমরা কি পারব তখন ওই সুদর্শনের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে নির্বিঘ্নে নিজেদের কথাটুকু সারতে? পারব না। কারণ সচেতন প্রাণীর কাছে সকল অস্তিত্বই অর্থময়।
      আমরা তো বোধকরি সচেতনই।

      • রেজাউল করিম সুমন - ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৪:০২ অপরাহ্ণ)

        পর পর দুই দিন ট্রেন ফেল করে শেষমেশ চট্টগ্রামে ফিরতে পেরেছি! এ যাত্রায় আর আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ মিলল না। অবশ্য আপনার লেখার সঙ্গে পরিচয় আছে অনেকদিন ধরেই। পরের বার নিশ্চয়ই সামনাসামনি কথা হবে আমাদের। কিছু কথা জমা থাকল আমাদের সম্ভাব্য সঙ্গী সুদর্শন পোকার জন্যও।

        গতকাল হঠাৎই চোখে পড়ল অরুণ মিত্রের “ঘাসফড়িং”। আগেও পড়া; কিন্তু আপনার এই লেখার অনুষঙ্গে যেন নতুন লাগল কবিতাটি।
        . . .

        একটা ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে আমার গলায় গলায় ভাব হয়েছে,
        ভাব না ক’রে পারতামই না আমরা।
        ঝিরঝির বৃষ্টির পর আমি ভিজে ঘাসে পা দিয়েছি
        অমনি শুরু হয়ে গেল আমাদের নতুন আত্মীয়তা।
        সবুজ মাথা তুলে কত খেলা দেখাল ঘাসফড়িং,
        তার কাছ থেকে চ’লে আসার সময় আমার কী মনখারাপ
        ব’লে এলাম আমি আবার আসব,
        আমার ঘরের দরজা এখন সবুজে সবুজ।

        এই আবার ঝিরঝির বৃষ্টি
        আমি কথা দিয়ে এসেছি
        ভিজে ঘাসের ওপর আমাকে যেতেই হবে আবার।

        • মুজিব মেহদী - ২৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (২:৫২ অপরাহ্ণ)

          ঘাসফড়িংয়ের প্রতি কতটা প্রেম বোধ করলে এরকম কবিতা লেখা যায় ভাবুন তো একবার! আমরা হয়ত এতটা ভালোবাসতে পারি না।

          দিনদশেক আগে ফারুক ওয়াসিফের সঙ্গে চলতিপথে একটু কথা হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, উনি নির্মাণ সম্পর্কে আলাপের একপর্যায়ে জানিয়েছিলেন, আপনি ঢাকায় এসেছেন বা আসছেন। সেই তখন থেকেই কি ঢাকায় ছিলেন আপনি?

          পরেরবার দেখা হবে ভেবে রাখলাম।

  5. সৈয়দ তাজরুল হোসেন - ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১:৫২ পূর্বাহ্ণ)

    অনেক সিরিয়াস পোষ্টের মাঝে একাধারে মজার এবং সরস এই পোষ্টটির জন্য মুজিব মেহেদীকে ধন্যবাদ ।

    • মুজিব মেহদী - ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৭:২৪ অপরাহ্ণ)

      জীবনের এতটা কাল তো গাম্ভীর্য নিয়েই পথ চলা হলো, এখনো তাই চলি। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, হালকাচালের কিছু কথাবার্তাও বুঝি বলা-শোনা দরকার। শতভাগ কাঠখোট্টামির কোনো মানে হয় না, কারোর জন্যেই না। জীবন তো কেবল ওরকম না, হয়ত এরকমও।

  6. পার্থ সরকার - ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ)

    কোথাও পড়েছিলাম অথবা শুনেছিলাম। ঠিক মনে নেই। ঘটনাটা এরকম: শহর এলাকার লোকাল বাস। কোন এক স্টেশনে গাড়ি থামা মাত্রই হেলপার ছুটে যাচ্ছে উপস্থিত জনতার কাছে এবং দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেককে নির্দিষ্ট করে তার গাডির গন্তব্য বলে যাত্রী আকর্ষনের চেষ্টা করছে। খুবই পরিচিত এবং সাধারণ পদ্ধতি।

    গাড়ির অপেক্ষায় অথবা গল্পচ্ছলে দাঁড়িয়েছিল একটি ছেলে ও একটি মেয়ে, রাস্তার পাশেই। তারা এমনই আলাপে মশগুল তাদের কাছ দিয়ে, পাশ দিয়ে মানুষ রিঙ্া গাড়ি যাচ্ছে আসছে, তারা খবর রাখে না।

    ওখানেই হঠাৎ এসে দাঁড়াল একটি বাস। হেলপার দৌড়ে নেমে ছুটে এল মেয়েটির দিকে। সরাসরি মেয়েটির চোখের উপর চোখ রেখে তার মুখ বরাবর আঙুল তাক করে চিৎকার করতে লাগল, দুই নম্বর দুই নম্বর দুই নম্বর…… মেয়েটি লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে পারলে বাঁচে আর তার বন্ধু ছেলেটি ঐ শালা বলে তেড়ে গেল হেলপারের দিকে।
    আসলে বাসটি ছিল দুই নম্বর রুটের, হেলপার তাই সারা শহরের লোককে দুই নম্বর দুই নম্বর বলতে বলতে শহর ঘুরছিল।

    ——————————————————————————–
    To download Unicode Bangla fonts from the http://www.ekushey.org/projects/otf_bangla_fonts/.

    • মুজিব মেহদী - ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৪:৩০ অপরাহ্ণ)

      ছেলেটার সাথে পথের উপরে দাঁড়িয়ে আলাপচারিতায় মগ্ন থাকলেও মনে হয় মেয়েটার মধ্যে খানিকটা অপরাধবোধও কাজ করছিল। তা নইলে কন্ডাক্টরের মুখে ‌’দুই নম্বর’ কথাটা শুনেই সাতপাঁচ না ভেবে তার অতটা লজ্জা পাওয়ার কথা না। আর প্রেমিক ছেলেরা বরাবরই এরকম হয়, প্রেমিকার অসম্মান করে কাউকে পাড় পেয়ে যেতে দিতে চায় না। পেরে না উঠলেও প্রতিবাদ করে ও মাঝেমাঝে মার খায়। এটা ছাড়া তাদের গতিও থাকে না, কারণ প্রেমিকের বীরত্বহীনতা প্রেমিকারা পছন্দ করে না।

      আপনার ইনপুটের জন্য ধন্যবাদ পার্থ সরকার।

  7. হারুন রশীদ - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৩:০২ পূর্বাহ্ণ)

    খুব মজা লাগলো পড়ে। চট্টগ্রামে বাসের কন্ডাক্টরের একটা জনপ্রিয় ডায়লগ হলো – “ওইইই……. বাঁয়ে প্লাষ্টিক, আস্তে যাও…….”
    প্রথম প্রথম বুঝতাম না। একদিন খেয়াল করলাম যখনই পাশ দিয়ে কোন কার বা মাইক্রোবাস জাতীয় বাহন যাচ্ছে সাথে সাথে এই চিৎকার। মানে ওগুলা এত নরম যে বাসের সাথে ধাক্কা খেলে প্লাষ্টিকের মতো চেপটা হয়ে যাবে। তাই চালকের উদ্দেশ্যে হুশিয়ারী।

    • মুজিব মেহদী - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১:৪৮ অপরাহ্ণ)

      এ ডায়ালগ আর জীবনেও শুনিনি, একেবারেই চট্টগ্রাম স্পেশাল। ধন্যবাদ হারুন রশীদ।

      “ওইইই……. বাঁয়ে প্লাষ্টিক, আস্তে যাও…….”

  8. পার্থ সরকার - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১০:০৮ পূর্বাহ্ণ)

    এটাও শোনা ঘটনা: ঘটনাস্থল কলকাতা। চট্টগ্রাম থেকে কয়েকজন সংস্কৃতি কমর্ী কলকাতা গেছেন কোন এক উপলক্ষে। মনের আনন্দে কলকাতা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা, বিভিন্ন রুটের বাসে চড়ে কলকাতার এ মাথা থেকে ও মাথা, এর আত্মীয়ের বাসা ওর পরিচিতের বাসা, কলেজ স্ট্রীট, নন্দন, শিশির মঞ্চ ইত্যাদি যাতায়ত চলছে।
    একদিন দলেরই একজন, চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সংস্কৃতিকমর্ী। ধরি তার নামের আদ্যক্ষর “ক”। তার শখ হলো বিনা টিকিটে কলকাতার বাসে চড়ে একটি গল্পের জম্ম দেবেন। তিনি ফসর্া চেহারার গম্ভীর লোক, একটি পুরানো টিকিট হাতে ধরে রেখে গম্ভীর হয়ে সাংস্কৃতিক আলাপচারিতার মগ্ন পাশের জনের সাথে। কন্ডাক্টর লোকটি বারবার ঘুরে ফিরে তার পাশ দিয়ে চলে যায়, তার কাছে আর ভাড়া চায় না। একেতো গম্ভীর লোক, হাতে আবার টিকিট।
    গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পৌঁছাতেই “ক” সাহেবের আত্মবিশ্বাস গেল বেড়ে, বন্ধু সহযাত্রীদের দিকে এমনভাবে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছেন যেন তিনি বিজয়ের দারপ্রান্তে। হঠাৎ গান ধরলেন, একটি পরিচিত গানের সুরে নিজের কথা। “আজিয়া ভারা দিতাম ন, ভারা নদি, নামি যাইয়মগই। (আজ ভাড়া দেব না, ভাড়া না দিয়ে নেমে যাব) বিভিন্ন সুর ও লয়ে ঐ স্বরচিত কলিটিই বার বার ভাজতে ভাজতে সহযাত্রীদের তিনি বিপুল আনন্দ দান করছিলেন, কলকাতার বাস কন্ডাক্টর এই বিদঘুটে ভাষার (?) বিন্দুবিসর্গ ধরতে পারবে না, এমনই স্থির বিশ্বাস “ক” এর। গান শুনে কন্ডাক্টর দুয়েকবার তাকালো তার দিকে। কন্ডাক্টরের অসহায় তাকানো দেখে “ক” এর গান ও হাসি গেল বেড়ে।
    অবিলম্বেই অকুস্থলে এসে পড়ল বাস। সবাই নামছে। প্রথম কয়েকজন নেমে গেল তাদের দলের। মাঝখানে “ক”। তার পেছনে আরো কয়েকজন।
    কন্ডাক্টর লক্ষ্য করছিল সবাইকে। “ক” মুচকি হেসে নামতে যাবে এমন সময়ই কন্ডাক্টর পাকড়াও করলো তাকে। বলল, বদ্দা ভারাউন দি যন। (দাদা, ভাড়াটা দিয়ে যান)।

    ——————————————————————————–
    To download Unicode Bangla fonts from the http://www.ekushey.org/projects/otf_bangla_fonts/.

    • মুজিব মেহদী - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১:৫৭ অপরাহ্ণ)

      চট্টগ্রামে জন্ম এমন মানুষ কলকাতায় আছেন, সংখ্যায় একেবারে কমও হয়ত নয়, কিন্তু তাই বলে বাস কন্ডাক্টরও থাকবেন এ কি আর উনি ভুলেও ভেবেছেন? ভাবলে এতটা আত্মবিশ্বাসী তিনি হতে পারতেন না হয়ত।
      যাই বলেন, এই কন্ডাক্টর লোকটাকে আমার ভালোই লাগল। আনন্দফুর্তির মাঝখানে সে বাধ সাধে নি। একইসঙ্গে সে তার রসবোধ এবং দায়িত্বজ্ঞানকে প্রমাণ করেছে।
      আপনার গল্পে খুবই মজা পেলাম।

      বদ্দা ভারাউন দি যন।

  9. আরিফুর রহমান - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (১২:১০ অপরাহ্ণ)

    চলতি পথের রস নিজে আস্বাদন করে তার পরে সিরিঞ্জে করে জমিয়ে এনে ব্লগের শিরায় ঢেলে দেবার জন্য লেখকেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য।

    • মুজিব মেহদী - ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (৪:৫৪ অপরাহ্ণ)

      আপনার বাক্যটি রসে এতই টইটম্বুর হয়েছে যে, এতবার করে পড়েও তা কমছে না। আপনি দেখি রীতিমতো রসের আড়তদার!

      • ফজলুল কবিরী - ২৪ ডিসেম্বর ২০০৯ (৮:১১ অপরাহ্ণ)

        পার্থ সরকার এর সরস মন্তব্যটা আমার প্রাণ ভিজিয়ে দিল। আর আপনার লেখাটা বোধকরি লেখনির গুণেই অনেকবেশি উপভোগ্য। খুব আরামবোধ করছি এই মুহূর্তে।

        • মুয়িন পার্ভেজ - ২৪ ডিসেম্বর ২০০৯ (১০:২০ অপরাহ্ণ)

          প্রথম যেদিন এ-লেখা পড়ি, সেদিনই মন ভ’রে ওঠে এক অনির্বচনীয় আনন্দে। আমাদের জীবিকাজটিল জীবনের নৈমিত্তিক ও আপাততুচ্ছ ঘটনারাজির মধ্যেও যে কত বিচিত্র রসের উপাদান ছড়িয়ে আছে, তা চমৎকারভাবে পরিবেশিত হয়েছে মুজিব মেহদীর লেখাটিতে। ‘মুক্তাঙ্গন’-এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় গাঢ়ও হয়ে ওঠে এ-লেখার হাত ধ’রেই। তবে একটু মনখারাপের কাঁটাও বিঁধে রইল যেন কোথাও — খটকা লাগে ‘গ্রাসহোপার’ শব্দটি দেখে; সুন্দর একটি বাংলা প্রতিশব্দ থাকতে কেন এই বিভাষায়ন?

          হাফিজ রশিদ খান-সম্পাদিত ছোটকাগজ পুষ্পকরথ-এ ‘মাসুদ খানের গোধূলিব্যঞ্জন’ লেখাটি প’ড়েই আমি মুজিব মেহদীর ভক্ত হয়ে গেছি; এমন লেখা বোধহয় বছর-বছর আশা করা যায় না। শব্দই কবির ব্রহ্মাস্ত্র, আর এই অস্ত্রের ধার পরখ ক’রে নিতে কবির আঙুলই যে অব্যর্থ, তা আরেকবার প্রমাণ করেছে স্বাদু গদ্যের এ-রচনা। কবিমনের আন্তর উপলব্ধি ও প্রাবন্ধিকী বিশ্লেষণদক্ষতার জোড়কলমে লেখাটি অনবদ্য হয়ে উঠেছে। ‘রসাত্মক বাক্যই কাব্য’ — কথাটি আবার মনে পড়ল মুজিব মেহদীর এই দুই বিপরীতধর্মী লেখার সূত্রেই।

          ব্লগের পাতালপুরী থেকে সরস রচনাটি তুলে আনার জন্য ফজলুল কবিরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

  10. আহমদ জসিম - ৯ আগস্ট ২০১৫ (২:৩০ পূর্বাহ্ণ)

    অসাধারণ লেখা, খুব ভাললাগলো!

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.