‘রিমঝিম’ ও শওকত ওসমান চৌধুরী

সাহিত্যচর্চায় ও প্রকাশনায় প্রতিভা ও সুরুচির স্বাক্ষর রেখেও শওকত ওসমান চৌধুরী যবনিকার আড়ালেই থেকে গেলেন আজীবন। [...]

rimjhim-coverরিমঝিম একটি কৈশোরক সংকলন; সম্পাদক ও প্রকাশক : শওকত ওসমান চৌধুরী, প্রকাশকাল : শ্রাবণ ১৩৭৭। সিগনেট প্রেস লি.-এ মুদ্রিত এই বর্ষাযাপিত সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯, শেরে বাঙলা ছাত্রাবাস, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম থেকে। বৃষ্টিস্নাত শিউলিফুলে খচিত মনোরম প্রচ্ছদটি এঁকেছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী সবিহ্-উল আলম। মূল্য : পঞ্চাশ পয়সা। সে-সময়ের (১৯৭০) প্রেক্ষিতে এরকম রুচিশীল ও সুচিন্তিত সাহিত্যসংকলনের প্রকাশ অভিনন্দনযোগ্য, বলা যায়।
সূচিপত্রে চোখ বোলালেই বোঝা যাবে, ষাট-সত্তরের দশকে বিকাশমান এমনকী প্রখ্যাত অনেকেরই রচনা পরম যত্নে ধারণ করে আছে প্রায় তিন ফর্মার এই সংকলন―চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হলেও এটি আঞ্চলিকতা বা গোষ্ঠীবদ্ধতার চর্চা করেনি; লেখকতালিকা দেখা যাক : নজরুল আব্বাস, দিলওয়ার, শেখ তোফাজ্জল হোসেন, সালেহ আহমদ, আলী ইমাম, শাহাদত হোসেন বুলবুল, মসউদ-উশ-শহীদ, মোসতাফা মহিউদ্দীন খসরু, খালেক বিন জয়েনউদ্দিন, মোরশেদ শফিউল হাসান, সিরাজুল উসলাম, প্রণত বড়ুয়া, বখতেয়ার হোসেন, আবদুল হাদী, শফিকুল ইসলাম, শামসুল করিম কয়েস, ইফতেখার হোসেন, ওয়াহিদুজ্জামান, মাহমুদ হক, রণজিৎ বরণ দেব, রোকেয়া খাতুন রুবী, শওকত ওসমান চৌধুরী, হাফিজউদ্দিন আহমদ, আলী আহসান কাজল, তানজিমা হক, মাসুদুজ্জামান।

rimjhim01ভূজপুর ন্যাশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন বাংলার শিক্ষক ও গবেষক চৌধুরী আহমদ ছফাকে (১৯৩০-২০০৮) একটি স্বাক্ষরিত রিমঝিম উপহার দিয়েছিলেন সম্পাদক শওকত ওসমান চৌধুরী। তিনি ছিলেন চৌধুরী আহমদ ছফার ছাত্র ও জ্ঞাতিসূত্রে ভ্রাতুষ্পুত্র। পরলোকগত মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী ও নুরনাহার বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তান শওকত ওসমান চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামের ভূজপুর থানার আজিমপুর গ্রামে। চৌধুরী আহমদ ছফার মুখেই শুনেছি, ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র শওকত ওসমান চৌধুরী বাংলাদেশ ব্যাংক-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উচ্চতর পদে কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এবং ঢাকানিবাসী। ছাত্রাবস্থায় সাহিত্যচর্চায় যুক্ত থাকলেও পরবর্তীকালে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান লেখালেখির জগৎ থেকে, অন্তত তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে দেখা যায় না কোথাও। নিজ গ্রামের সঙ্গেও বোধহয় তাঁর যোগাযোগ নেই দীর্ঘদিন ধরে। ভূজপুরেরই সন্তান অধ্যাপক রণজিৎ বরণ দেব ছিলেন শওকত ওসমান চৌধুরীর সহপাঠী; রিমঝিম-এ তাঁর একটি ছড়া তো আছেই, প্রকাশনা-সহযোগীদের মধ্যেও তিনি অন্যতম।
আজিমপুর গ্রামের একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক-ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। কালান্তরসাহিত্যে ফটিকছড়ির এক বিস্মৃত অধ্যায় (২০০১) গবেষণাগ্রন্থ ও বিষণ্ন বিকেল (২০০৬) কাব্যের স্রষ্টা চৌধুরী আহমদ ছফা ছাড়াও কবি ও জমিদার কাজী হাসমত আলী (জন্ম : ১৮৩২) বিদ্বৎসমাজে সুপ্রসিদ্ধ; তাঁর প্রকাশিত কাহিনিকাব্য চিনফগপুর সাহা (রচনাকাল : ১৮৫০) আবিষ্কার করেন চৌধুরী আহমদ ছফা, ১৯৯২ সালে। কাব্যের শুরুতে বর্ণিত কবির সবিস্তার আত্মপরিচিতি উত্তর-চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)-সংকলিত ও ড. আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯)-সম্পাদিত পুথি পরিচিতি-তে (১৯৫৮) চিনফগপুর সাহা-র খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি ‘কয়মুচ রাজার কেচ্ছা’ ও ‘মলয়া মাহমুদ’ নামে অভিহিত হয়েছে। এই পুথির একটি অপ্রকাশিত কিন্তু সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি আবদুল হক চৌধুরী (১৯২২-১৯৯৪) সংগ্রহ করেন কাজী হাসমত আলীর কন্যা জকিয়তুন্নেসার পৌত্র আবদুল বারী চৌধুরীর কাছ থেকে। আলেফ লায়লা (রচনাকাল : ১৮৫৯) নামে কাজী হাসমত আলীর আরেকটি অপ্রকাশিত পুথির পাণ্ডুলিপির ফটোকপিও ড. মঈনুদ্দিন খানের সংগ্রহে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন গবেষক আবদুল হক চৌধুরী। চট্টগ্রামের ডেপুটি কালেক্টর নাসিরুদ্দিন খান বাহাদুরের (১৮০৯-১৮৬৭) অনুরোধে কবি আলেফ লায়লা রচনা করেন। আহাদিসুল খাওয়ানিন (১৮৭১) গ্রন্থের রচয়িতা ইতিহাসবিদ হামিদুল্লাহ খান বাহাদুরের (১৮০৫-১৮৮০) সঙ্গে সুপণ্ডিত কবি কাজী হাসমত আলীর ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পত্রযোগাযোগ। বঙ্কিমধারার গদ্যশৈলীতে আকৃষ্ট কবি সৈয়দ আবদুল ওয়ারেস ফকিরের (১৮৬৮-১৯২৮) গদ্যেপদ্যে রচিত নীতিদর্পণ (১৯২২) বইটি ইংরেজ আমলে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য পাঠ্যরূপে নির্দিষ্ট ছিল। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করেন কথাসাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১)। কাজী হাসমত আলী, সৈয়দ আবদুল ওয়ারেস ফকির, চৌধুরী আহমদ ছফা ও শওকত ওসমান চৌধুরী―এঁরা সবাই হাজি ছাদুল্লাহ্‌র বংশধর যিনি দিল্লি-প্রত্যাগত এবং সম্রাট-প্রদত্ত সনদপত্রসহ ‘বিংশ দ্রোণ’ নিষ্কর জমির মালিক। এসব বিবরণ কিঞ্চিৎ প্রলম্বিত মনে হলেও মূলত এ-কথাই বলতে চাইছি যে, লেখালেখির প্রণোদনা কৈশোরেই শওকত ওসমান চৌধুরী নিজ গ্রামপ্রতিবেশ এবং বিশেষভাবে চৌধুরী আহমদ ছফার সান্নিধ্যে পেয়েছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, সাহিত্যচর্চায় ও প্রকাশনায় প্রতিভা ও সুরুচির স্বাক্ষর রেখেও শওকত ওসমান চৌধুরী যবনিকার আড়ালেই থেকে গেলেন আজীবন।
আঠারোটি ছড়া-কবিতা ও আটটি ছোটগল্প-প্রবন্ধ দিয়ে সাজানো হয়েছে রিমঝিম-এর পাতা। ১৫ আশ্বিন, ১৩৭৭ তারিখে মুদ্রিত ভূমিকায় সম্পাদক আক্ষেপ করেই বলছেন :

কিশোরদের জন্যে ভালো সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন―একথা আমরা অনেকেই মানি। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এ নিয়ে তেমন ঔৎসুক্য প্রকাশ করি না। তাই অনেকটা অবহেলিতভাবেই আমাদের কিশোর সাহিত্য গড়ে উঠছে যেন।

তিনটি ছড়া তুলে দিচ্ছি উৎসাহী পাঠকদের জন্য :

ছাত্র বটে

শ ফি কু ল   ই স লা ম

ফাস্ট কেলাস কামরাটাতে হঠাৎ করে ঢুকে,
জুলফিটাতে হাত বুলিয়ে আয়েশ করে বসেন।
হিপ্পী চুলে বুরুশ লাগান পপ মিউজিক মুখে,
যখন তখন বেল বটমে সানগ্লাসটা ঘষেন।

ট্রেন থামতেই জেম্‌স বণ্ড বেল্ট কোমরে নেন এঁটে
চেকার এসে মোলাম সুরে টিকিট চাওয়া মাত্র,
গোল্ড ফ্লেকের ধোঁয়া ছেড়ে পড়েন রাগে ফেটে
“হোয়াট ননসেন্স! টিকিট কিসের? দেখছেন না ছাত্র!’’

[পৃ. ২৪]

বিষ্টিতে গয়া ভাই

রো কে য়া   খা তু ন   রু বী

ব্যাঙ ডাকে ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ
বিষ্টি তো ঝম ঝম,
দ্বারে দেখি গয়া ভাই
খায় বসে চমচম।
চুপচাপ ঘর দোর
নেই লোক গম গম,
আঁখি তার ঢুলু ঢুলু
ভয়ে গা-টা ছমছম।
মনে মনে স্বপ্‌নেতে
হেঁটে যায় দমদম।

[পৃ. ৩০]

ছড়া

(কোন এক শহুরে খুকুর জন্যে)

শ ও ক ত   ও স মা ন   চৌ ধু রী

আকাশগাঙে পাল ওড়ালো
শাদা মেঘের নাও,
বায়না খুকুর মেঘের নায়ে
যাবেই সোনার গাঁও।

সোনার গাঁয়ে যাস্ নে খুকু―
নেই যে সোনার গাঁ
নোংরা ভারী; সেথায় গিয়ে
রাখবি কোথায় পা।

বানের জলে ধানের জমি
শুধুই ভেসেছে,
জানিস খুকু, সোনার গাঁয়ে
বর্গী এসেছে!

[পৃ. ৩১]

রিমঝিম-এর মুদ্রণব্যয় মেটানোর জন্য কিছু বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেগুলো আলাদাভাবে ঠাঁই পেয়েছে সংকলনের শেষের কয়েকটি পৃষ্ঠায়―কোনও লেখার মাঝখানে বা শেষে নয়। মুদ্রণসৌকর্যের প্রতি একজন অসহায় সম্পাদকের সচেতনতার সাক্ষ্যও বহন করে এই সংকলন।

তথ্যঋণ :

১। মাহবুব-উল আলম, ‘কাযী শেহাবউদ্দীন পরিবার’, চট্টগ্রামের ইতিহাস : কতিপয় বিশিষ্ট পরিবার, মে ১৯৬৬, নয়ালোক প্রকাশনী, চট্টগ্রাম।
২। আবদুল হক চৌধুরী, ‘কাজী হাসমত আলী চৌধুরী রচিত দুটি অপ্রকাশিত কাব্য’, প্রবন্ধ বিচিত্রা : ইতিহাস ও সাহিত্য, জুন ১৯৯৫, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ. ৩৩১-৩৪৮।
৩। চৌধুরী আহমদ ছফা, কালান্তরসাহিত্যে ফটিকছড়ির এক বিস্মৃত অধ্যায়, ফেব্রুয়ারি ২০০১, চট্টগ্রাম।
৪। মুহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী, ‘হামিদুল্লাহ খাঁ’র পদবন্ধী পত্র’, মাসিক ফটিকছড়ি, বর্ষ ১০, সংখ্যা ১-২, মার্চ-এপ্রিল ২০০১, চট্টগ্রাম, পৃ. ২৪।

মুয়িন পারভেজ

জন্ম চট্টগ্রামে। লিখে সময় কাটি, পড়ে জোড়া লাগিয়ে দিই আবার। ভালোবাসি মেঘবৃষ্টিজ্যোৎস্না আর ঝরনাকলম। প্রকাশিত কাব্য : ‘মর্গে ও নিসর্গে’ (ঐতিহ্য, ২০১১)।

আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
অবগত করুন
  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.