পৃথিবীর পথে বাংলাদেশ : নিউজিল্যান্ড পর্ব

প্রিয় পাঠক, আমার লেখায় অতি মাত্রায় ভুল থাকে, মার্জনা করবেন। আমার পোস্টের পর অনেকের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েই আমি লেখাটাকে বাড়ানোর সাহস পেয়েছি। মূলত আমি গল্প শুনতে ভালবাসি। যাঁদের মন্তব্যের আমি উত্তর দিতে পারিনি, তাঁদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। মুক্তাঙ্গন-এর যাঁরা আমার আগের লেখায় মন্তব্য করেছেন তাঁদের প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম ভালবাসা। অবিশ্বাস্য সব মন্তব্য করেছেন অনেকে, আমি তাঁদের প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাব, যতটা পারি।

আর আমার এই লেখাটা সেই অচেনা বন্ধু নির্জন সৈকতকে উৎসর্গ করছি। যার কথা আছে অল্প করে।

+++++++++++++++

অকল্যান্ডভ্রমণ পরিক্রমায় আমার নিউজিল্যান্ড আসতে বেশ খানিকটা সময় এবং কাঠখড় পোড়াতে হলো। মেক্সিকো থেকে এখানে আসার জন্য আমি কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হয় আমাকে আমেরিকা হয়ে আসতে হবে, নয়তো ইউরোপ। আমার ফিরতি টিকেট সাও পাওলো থেকে দুবাই হয়ে ব্যাংকক। তবে সমস্যা হলো, আমার থাই ভিসা শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে এবং সপ্তাহখানেক আগে থাই এম্বেসিতে ভিসার জন্য আবেদন করেও কোনো ফল পাচ্ছিলাম না।

অফিসারের বলে দেয়া সময় মতো ফোন করলে সুন্দর করে বলতেন, আমার কাগজ “অন প্রসেস”। আমি আর কিছু বলার আগেই তাঁর লাইনটা কেটে যেত কেন যেন। আমি কী পরিমাণ অসহায় বোধ করতাম তা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। শেষমেশ ভাগ্য প্রসন্ন হলো। মেক্সিকোতে খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশীদের সাহায্য না পেলে সে-যাত্রায় আমাকে হয়তো পথেই বসে থাকতে হতো। অন্য কিছু করার থাকত না।

ঈদের আনন্দ আমার পরিচিত দশ বাংলাদেশীর চোখে-মুখে। আমি এখন তাদেরই একজন। না পারতে আমাকে আরো বেশ কটা দিন থাকতে হলো তাদের সাথে। আমার ভাগ্যবীণা বেজে উঠল ঈদের ঠিক পরের দিন। অবশেষে আমি থাই এম্বেসি থেকে ভিসাটা পেয়ে গেলাম! দেরি না করে আবার চলে এলাম ব্রাজিলে। থাকতে হবে মাত্র কিছুটা সময়। তাই আর এয়ারপোর্ট থেকে বের না হয়ে অভ্যাসবশত হাঁটতে লাগলাম বাংলাদেশের খোঁজে। কাস্টম থেকে যে-গেটে আমাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল সেটার যাত্রীরা ডালাস-গামী। আমি তাদের মাঝে আমাদেরই মতো দেখতে একজনকে খুঁজে পেলাম। ফ্লাইটের তখনও দেরি আছে। ল্যাপটপে মুখ গোঁজা ভদ্রলোকের সাথে আমাদের ল্যাপটপের কানেকশন-জনিত সমস্যা সমাধানের অছিলায় পরিচিত হতে চাইলাম। আশাহত হলাম। ভদ্রলোক আমার দেশের তো ননই, এমনকী এশিয়ারই নন। গায়ানায় থাকেন । চলে এলাম আমার জায়গায়।

ল্যাপটপে লেখার ভান করে আমি আমাদের মতো কাউকে খুঁজি। একসময় পেয়েও গেলাম! আমি যে-ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছি তারই খোঁজ নিচ্ছেন দাড়ি-টুপিঅলা এক ভদ্রলোক। সঙ্গে আছে তাঁর পরিবার। বেশ খুশি মনে এগিয়ে গেলাম তাঁদের কথোপকথন শোনার জন্য। ওহ! ইনি তো পাকিস্তানি! কেন জানি না একরকম পালিয়ে এলাম। ঘণ্টাখানেক বসে বসে মানুষ গোনা ছাড়া আর কিছু করার না পেয়ে হাঁটা শুরু করলাম। বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল।

এবার ছোট একটা দলের দেখা পেয়ে এগিয়ে গেলাম। মনে হলো ভারতেরই হবে। হ্যাঁ, তা-ই। বন্ধুবৎসল তিন ভদ্রলোক তিন কারণে ব্রাজিলে এসেছেন। বেশ অবাক লাগল শুনে, তাঁদের একজন এখানে এসেছেন কম্পানি পরিদর্শনে। নকিয়া কম্পানির জন্য তাঁরা কিছু প্লাস্টিক বেইজড প্রডাক্ট তৈরি করেন। আর ওই একই কম্পানি ব্রাজিলেও প্ল্যান্ট বসানোর জন্য এক্সপার্ট হিসেবে তাঁকে আসতে বলেছেন। আমি সেই কাজের পরিধি জানার চেষ্টা করে বুঝতে পারলাম এখনও ওটা কুটিরশিল্পের পর্যায়ে আছে। অবশ্য পুরো বিষয়টা বোঝার ক্ষেত্রে আমার অপারগতাও ছিল হয়তো। তাঁর কথাটা আমি পুরো না বুঝেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমন কিছু কি আমরা করতে পারি না? তাঁর মতে, এতে যেমন বেশি ইনিশিয়াল ইনভেস্টমেন্টের দরকার হয় না তেমনি প্রয়োজন হয় না বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের। দরকার শুধু কম খরচের জনশক্তির জোগান দেয়া। (প্রিয় পাঠক, দুঃখজনক হলেও সত্য, আমি তাঁর কর্মপ্রণালীর বিবরণ খুব একটা বুঝতে পারিনি, তাই ঠিকমতো বর্ণনা করতে পারছি না সেটা ঠিক কী ধরনের শিল্প।) খানিক বাদে পাকিস্তানি ভদ্রলোকও যোগ দিলেন আমাদের আড্ডায়। আমি একটা দারুণ বিষয় খেয়াল করলাম। তাঁরা আমার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করেন। কেন জানি না তাঁদের ধারণা আমরা সবাই হিন্দিতে কথা বলি। আমাকে এমনটাও অনেকে জিজ্ঞেস করেছেন, আমাদের জাতীয় ভাষা কী। আর আমরা যে হিন্দি বলি না তা জেনে তাঁরা বেশ মর্মাহত। তবে একটা বিষয়ে আমার বেশ গর্ববোধ হলো। যখন সবাই কে-কী-কেন-কী করা নিয়ে ব্যস্ত তখন আমার কর্মকাণ্ডের কথা শুনে তাঁরা ভীষণ অবাক। তাঁরা চিন্তাও করতে পারেন না যে আমরাও এমনটা করতে পারি।

লম্বা আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার সময় হয়ে এল। আমি ব্যাংককে এসে নিউ জিল্যান্ডে যাবার জোগাড়যন্ত্র শুরু করলাম। প্রথম ভুলটা করলাম হংকং হয়ে অকল্যান্ড যাবার টিকেট কেটে। পরের দিন সকালে আমার ফ্লাইট। আমি সন্ধ্যায় জানতে পারলাম, হংকং হয়ে যাবার জন্য ট্রানজিট ভিসা লাগবে। বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করব। সেই সন্ধ্যায় আবার টিকেট বদলাতে গিয়ে বেশ কিছু টাকা বেহুদা খরচ হয়ে গেল। একে তো প্রায় কপর্দকশূন্য দশা, তার উপর আবার অযথা খরচ! শেষমেশ সব ঝামেলা চুকিয়ে মালয়শিয়ান এয়ারলাইনে করে অকল্যান্ডে এলাম।

আমাকে নেয়ার জন্য আমার এক বন্ধুর বড় ভাই ড. ফকরুল আলম এসেছিলেন এয়ারপোর্টে। আমি খুবই ভাগ্যবান যে যখন যেখানেই গেছি কেউ কেউ না কেউ আমাকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছেন! কিছু টাকা বাঁচে, কোথায় উঠব তারও একটা সন্ধান মেলে। আগের মতোই বোর্ডিং হয়ে বের হবার সাথে সাথে পুলিশের নেক-নজরে পড়ে গেলাম। আমার ইম্বার্কেশন ফর্মটা নিয়েই তার যত কৌতূহল। অতি সাধারণ কিছু কথা জিজ্ঞেস করার পর আমার স্থানীয় কন্টাক্ট অ্যাড্রেসে যোগাযোগ করল আমার সামনেই। কিছুটা চিন্তায় ছিলাম, কী হয় কী হয়। না, কিছুই হলো না। স্বাগত জানালেন!

Spirit of Resolution

স্পিরিট ওফ রেজ্যুলুশন

Christ Church

ক্রাইস্ট চার্চ

এর চেয়ে কোনো সস্তা থাকার ব্যবস্থা করার উপায় ছিল না অকল্যান্ড শহরে। অনেক খুঁজেপেতে কুইন স্ট্রিটের এই হোস্টেলে উঠলাম। প্রতি রাতের ভাড়া ২৪ ডলার করে। তাও একই রুমে ৮ জনের থাকার ব্যবস্থা! ভ্রমণ পরিক্রমায় নানা পদের জায়গায় থাকার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছে। তবে এবারের এই অভিঞ্জতা একেবারে নতুন। আমি আগে এমন কোনো জায়গায় সত্যিই থাকিনি। এটা ভালো না খারাপ, তার চেয়েও বড় কথা — এটা আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।

স্থানীয় বাংলাদেশীদের সঙ্গে দেখা হতে খুব একটা বেশি সময় লাগল না। অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটা সংগঠন আছে: বাংলাদেশ-নিউ জিল্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ এসোসিয়েশন। ছোট হলেও দেখে ভালো লাগার মতো তাঁদের বসার একটা জায়গা আছে। আছে বাংলা পত্রিকা আর বাংলা রেডিও — “একতার”। তাঁদের কাছেই জানতে পারলাম, প্রায় ৬০০ বাংলাদেশী আছেন এখানে। তবে কেউই মূল শহরে থাকেন না। আরো একটা বিষয় জানতে পারলাম: “দেশ থেকে এতো দূরে এসেও আমরা সবাই একসাথে হতে পারিনি। দল আছে, মত আছে, আছে মতভেদ।” আমি বাংলাদেশ পেলাম, প্রশান্ত মহাসাগরের পারে। কিছু বিজয়ী মানুষের কোলাহলে, সামাজিক ব্যবধানের আরেক রূপে।

আমার সাথে অনেকেই যোগযোগ করার চেষ্টা করেছেন, যোগাযোগও করেছেন। আর এ তো সত্যিই যে, তাঁদের সাহায্য ছাড়া আমার পক্ষে টেকা দায় হয়ে যেত। তাঁরা আমাকে এই বলে অভয় দিযেছিলেন যে যখন যা লাগে তা-ই যেন বিনা দ্বিধায় চেয়ে বসি। আমাকে নিয়ে এ-পাড়া ও-পাড়া, এ-দ্বীপ ও-দ্বীপ ঘুরে নিজের বাসায় পেল্লায় সাইজের ডিশে খেতে দিযেছেন (এবং দিতে চেয়েছেন আরো অনেকে)। আমি বেশ ক’জনকে দেখেছি যাঁরা নিজের দেশটাকে নিয়ে এসেছেন এই দ্বীপরাষ্ট্রের গলিতে। বিশেষ করে আমার পরম বন্ধু সাকিবের ছোট্ট ঘরে হট্টগোল করার সুযোগের কথা আমি অনেক দিন মনে রাখবো। আমাদের ধর্ম-পরিচয়-অভ্যাস সবই প্রায় এক, তবে কোথায় যেন একটা “কিছু” আছে। আমি জানি না সেটা কী; কিন্তু এটা সত্য যে, আছে কিছু একটা।

যাত্রাপথে অনেক মানুষের সঙ্গেই কথা বা সময় কাটাবার সুযোগ হয়েছিল। আর এও তো সত্যি যে, তাঁরা আমাকে নানা জায়গায় নিযে গেছেন, নানা জায়গায় যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা এটা দেখে অবাকই হয়েছেন যে আমি শুধু মানুষ দেখার তাড়নায় মশগুল! তাঁরা ব্যাপারটা মেনে নিলেও কেন যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। তাঁদের অতি-পরিতৃপ্ত চোখের ভাষায় সে-দেশ দেখতে আমার ভালো লাগত। তাঁরা আজ কত সুখী। “আচ্ছা ইমরান, তুমি কিন্তু অবশ্যই কুইন্সল্যান্ডে যাবে, বুঝলে, এটা দেখলে সারা নিউজিল্যান্ডে আর দেখার কিছু নাই।” তার বলার সে-ভাষা চাহনিতে ঠিকরে আসত! আমার কষ্ট হতো; কেউ আমাকে বাংলাদেশের গল্প করতে বলে না। জানতে চায় না “আমরা কোথায় যেতে পারি পরের বার দেশে গেলে”। আমি প্রতিবারই শিউরে উঠতাম খানিক বদলে যাওয়া মানুষগুলোর পরম আতিথেয়তায়। তাঁরা আমার জন্য যা করেছেন তার যোগ্য আমি ছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঝানু অ্যাকাউন্টেন্ট, বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ, সবাই আমার সাফল্য কামনায় যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তার প্রতিদান দেয়ার জন্য কেবল একটাই সম্বল ছিল আমার কাছে — বাংলাদেশের কিছু গল্প! নতুন কিছু নয়।

the Path!

পথ!

ভেবে রেখেছিলাম অকল্যান্ড থেকে ক্রাইস্ট চার্চে যাব আমার সাইকেলে করে। আমার কাছে ছিল মাত্র ৩৫০ টাকা। বিশ্বাস করাই কিঞ্চিৎ কষ্টের! আরো একটা দিন কীভাবে কাটাবো এখানে, ভাবতেই ভয় হতো। এক রাত বেশি থাকা মানেই আরো কিছু টাকা বেরিয়ে যাওয়া। আমি দিন গুনে গেলাম। হঠাৎই অকল্যান্ড থেকে ক্রাইস্ট চার্চে যাবার একটা সুযোগ করে দিলেন ক্যাপ্টেন মাহমুদ সাহেব। তিনি স্থানীয় এক মেরিন শিপের ক্যাপ্টেন। এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। অবশ্য আমার পুরো পরিকল্পনা বেশ বদলে গেল এতে। আমি সমুদ্র ভ্রমণের আমেজে মশগুল হয়ে রইলাম।

সব ঠিক মতোই চলছিল, কেবল আমার সাইকেলটাই শেষকালে বিগড়ে গেল। একটা প্যাডেল কাজ করছে না। দেশেও আমার সাইকেলের এই একই সমস্যা। তবে প্রতিটি প্রতিরোধের ক্লান্তি আমাকে সাফল্য পেতে সাহায্য করেছে অতীতে। তাই সাইকেল সারাতে কষ্ট হলেও মনের মাঝে বল পেলাম। কিন্তু সেই সঙ্গে ভাবছিলাম, এতটা পথ পাড়ি দিতে পারবো তো? পকেটের অবস্থা এতটাই করুণ যে রওনা দেয়ার আগে মেইল করেছিলাম আমার কিছু বন্ধুর আছে। এবারের এই যাত্রাপথ বেশ অনেকটা বন্ধুর ছিল আমার জন্য। জাহাজে চড়ার আগেও জানতাম না যাত্রা শুরু করার পর আমার কী হবে। আমার কাছে পুরো ১০০ টাকাও নেই, তা নিয়েই আমাকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে! কোথায় থাকব, কী খাব, কিছুই জানি না। আমি সর্বান্তঃকরণে অপেক্ষা করতে লাগলাম একটা মেইলের জন্য। যদি কিছু টাকার অনুদান মেলে! হাহ্! অপেক্ষা।

টাসমান সী-তে আমাদের জাহাজ “স্পিরিট অব রেজল্যুশান” বেশ দুলছিল। তাই প্রথম সমুদ্রযাত্রা আমার জন্য বিভীষিকাময় হয়ে উঠল। চলতে শুরু করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সী-সিক হয়ে গেলাম। ক্যাপ্টেন মাহমুদ সাহেবের আন্তরিক পরিচর্যা না পেলে সে-যাত্রায় আমার পরিত্রাণ পাবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও ছিল না । প্রথম দিন কোনো কিছুই খেতে পারলাম না। দ্বিতীয় দিনে প্রশান্ত মহাসাগর আমার প্রতি কিছুটা সদয় হলো। প্রকৃতির সৌন্দর্যলীলা উপভোগের সুযোগ পেলাম।

এটা কেমন তার বর্ননা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না তবে এটা ঠিক আমি এমন কিছু একটা দেখেছিলাম যেবার ঢাকা থেকে আমাদের নিজেদের নৌকা “দইজ্জা গরম”- এ করে সেন্ট মার্টিন্স এ গিয়েছিলাম। প্রশান্তের জল আমাদের মত নয়, এটা নীল। ডলফিন? হ্যাঁ আমরাও কক্সবাজার থেকে উত্তরের টিলাগুলোকে বামে রেখে রেখে যখন এগিয়ে যাচ্ছিলাম তখন প্রথমটায় ভিমরি খেয়েছিলাম ডলফিন দেখে। তবে জলের রং ছিল হালকা সবুজ।
আমি প্রশান্তর সৌন্দর্যে শান্তি পেলাম এই ভেবে- এ সৌন্দর্য আমার কাছে একেবারে নতুন নয়। আমার দেখা বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এর আছড়ে পড়ার শব্দ এই জাহাজের মত না হলেও ভীনগ্রহী নয়। আমার অনুভবে মহাসাগর প্রশান্ত লজ্জিত হবে না, কেননা হেঁট হয়ে থাকা ছোট একটা মানচিত্রে বড় হওয়া এই আমার আমি চেতন এবং অবচেতন মনে দেশটাকে খুঁজি সব সময়। এটা আমার দোষ, ভুল না। আমি নিজের মনে নিজেই তা মেনে নিই।

i have seen it or something like it in Bangladesh

বাংলাদেশেও এমন কিছু দেখেছি নিশ্চিত

মহাসাগর শীতল বাতাস বইয়ে দিয়ে নিজের তেজ কমিয়ে নিয়েছিল আমাকে দেখবার সুযোগ দিয়ে। সীমানা কতো বড় হয় আমার জানা ছিলনা। পরিমিতির হিসেবে হরতাল হল আমার মনে। আমি গুলিয়ে ফেললাম! বিধাতা আমার দৃষ্টি বাড়িয়ে দাও – দেখতে দাও আরও কিছু। হ্যাঁ, আমার হিংসুটে মনে একটা কথায় আটকে গেল – প্রশান্ত মহান এবং সত্যিই বিশাল!

পরদিন সকালে ভূমিতে পা দিয়ে প্রথম মনে হলো সারা পৃথিবীর আজ অসুখ করেছে। মনে হল যেন এত নড়াচড়া এর আগে তাকে করতে দেখিনি কখনো। আমি বুঝে নিলাম আমার জাহাজ ভ্রমণের দুলুনি এখনও যায়নি। সেদিন থেকে গেলাম ক্রাইস্ট চার্চে তবে মাহমুদ সাহেব এবং সাখু ভাইয়ের সাথে শহর দেখা হল। খুঁজে পেলাম বিদেশ মানচিত্রে আরেক বাংলাদেশ – “টেস্ট অব বেঙ্গল” এর বাংলা খাবার। অনেক দিন বাদে বাংলা খাতির পেলাম ভদ্রলোকের কাছ থেকে। আর কোন বাংলা দোকান এখানে আছে কিনা আমার আর জানা হলো না। চলে এলাম হোস্টেলে।

সকালে মেইল চেক করে দেখলাম আমার ডাকে সারা দিয়েছে যে জন তিনি আমাকে চেনেনও না। সুদূর আমেরিকা থেকে আমার সারভাইভ করার জন্য বিশাল এক উপহার অপেক্ষা করছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি ট্রান্সফারের জানালায়। এযাত্রায় উৎরে গেলাম মনে হয়। আমার এই বন্ধুর দেখা পেলাম সত্যিই এক বাজে সময়ে। পরিচয় পর্বটা হয়েছিল কেমন জানি ভাবে। আমার আকুলমন “বলাকা” কবিতা পড়ার জন্য আকুপাকু করছিল যখন, আমি হেনতেন সবাইকে মেইল করে উত্তর না পেয়ে “আমারব্লগে” পোস্টটা দিলাম। খানিক বাদে মেইল পেলাম স্পস্ট বাংলা লেখা কবিতাটি আর প্রেরকের নাম নির্জন সৈকত! হেয়ালিপূর্ন লেখায় ভালবাসার আবেশ জড়ানো ক’টা লাইন আমি পড়েছিলাম মেক্সিকোতে বসে। কত বার? অনেক বার, অনেক অনেক বার। কখনও কবিতার গন্ধ শোঁকার জন্য কখনও বা তার সাধুবাদে কাবু হবার জন্য। ধন্যবাদ বন্ধু! খুবই বিশ্রি রকম হাহাকারের মাতমে আপনার সম্প্রদান ছিল তেমন কিছু যার প্রতিলিপি লেখা কিংবা পরিশোধ করার সার্মথ আমার না হলেও চেষ্টা করব প্রতিবার। সাহস দেবার জন্য সাধুবাদ! জয় হোক।

খাবার কেনা হলো সে টাকায়। আমি যাবার প্রস্তুতি নিলাম দু’স্লাইস রুটি খেয়ে। সমস্যা হলো মূল শহর গুলো থেকে বের হওয়াটা একটা ঝামেলা। কেননা তাদের মোটরওয়ে গুলোতে সাইকেল চালানো নিষেধ। শহর থেকে বেরুতে বেরুতেই বেশ সময় চলে গেল। যখন হাইওয়েতে উঠে গেলাম আর কোন চিন্তা থাকলো না। জানি আমি এই পথই আমাকে নিয়ে যাবে একেবারে শেষ সীমায়। শুধু চালিয়ে যাওয়া।

My tent

তাঁবু: ঘরের বাইরে ঘর

এদেশ সম্পর্কে আমাদের সবারই কম বেশি জানা আছে। একে তো দুধের জন্য, আর হলো অস্বাভাবিক সৌন্দর্য্য এ জন্য। ক্যালেন্ডারের পাতায় তাদের অতি প্রাকৃত সৌন্দর্যের আখ্যান সেই ছোট বেলায় দেখা ছবির প্রতিলিপির খোঁজ আমার মাঝে এখনও। হোস্টেল থেকে বের হবার সময় ইনফো ডেস্ক থেকে জানতে পারলাম শহরতলী থেকে কিছুটা বের হবার সাথে সাথে আমি আসল নিউজিল্যান্ড দেখতে পাব।
কথাটা একেবারেই সত্যি। আমি বেশ আশাহত হয়েছিলাম অকল্যান্ড শহর দেখে। আমি কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাচ্ছিলাম না আসলে। না চোখে পড়ার মত আর্কিটেকচার, না অতি আধুনিক কোন কিছু। না পুরাতন, না নতুন। কেমন জানি ব্যাপারটা। তবে এটাও সত্য বৃটিশদের ফার্ম হাউজ নামে পরিচিত এদেশের সবই আছে শহরের বাইরে। ছিমছাম, গোছান মনে হয় রাস্তার পাশের প্রতিটি ঘাস। এবং বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে যখন কোন ফার্ম হাউজ চোখে পড়ে তখন ঠিক লিটল হাউজ অন দি প্রেইরির কথা মনে পড়ে যায়।

স্ট্রবেরির বাগান আছে পথের পাশেই আগেই শুনেছিলাম; দোকান থেকে ঝুড়ি নিয়ে বাগানে গিয়ে ফল ওঠাতে হয় নিজেকেই এবং সে সময় যে যতগুলো খেতে পারে তার দাম দিতে হয় না। ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত। পথের সাথে পথ এসেছে আমাদের নদীর মত। ফারাক একটাই আমাদের গুলো একটু কম পরিস্কার আর এখানের সব কিছুতে একটু বাড়াবাড়ি।

প্রথম দিনের আবহাওয়া ছিল মনে রাখার মত ভাল। একা আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম জগতের পেট চিঁড়ে সোজা সামনের দিকে। দু’পাশে সবুজের নদী, উপরে নীল আকাশ আর আমার সামনে ৩০ ফুট চওড়া কালো পিচ মোড়া পথ! তবে হাওয়ায় দম আছে। কখনও আটকে রাখে একই জায়গায় আবার কখনও বাতাসে ভর দিয়ে এগিযে যাই। আমার শরীর বাতাসের অংশ হয়ে পড়ে। আমার মনে পরে প্রিয় বই “দ্যা এ্যলকেমিস্ট” এর সেই ক’টা লাইন। মরুদ্যানে ধরা পরা বৃদ্ধ এ্যলকেমি আর মেষ পালক সাদিয়াগোকে যখন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল যে তাদের কথা প্রকৃতি শোনে। তার আকুল আবেদনে বাতাস সায় দিয়েছিল, সায় দিয়েছিল মরু, এবং পরাক্রমি সূর্য! বিশ্বাসের অপর নাম সাফল্য। আমার মাঝে জগত এসে ভর করত। আমি হাঁটার মত করে এগিয়ে যেতাম। খুবই ধীরে। পায়ের বদলে পথ আঁকড়ে আছে আমার সাইকেলের চাকা। মাঝে মাঝে আমার ডান হাঁটুতে কট কট শব্দ হচ্ছে। আমি থেমে যাচ্ছি। তবে এক বারে নয়। কেমন এক ভাবলেশহীন অবস্থা।

Alps and the pacific

একদিকে আল্পস অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগর

প্রথম দিনের ইতি টানলাম সুন্দরম এক গাছ ঘেরা জায়গায়। থাকার জায়গা বলতে আমার তাঁবু আর খাবার বলতে রুটি আর বাটার। সন্ধা থেকে শুরু হতো আমার রাত্রিবাস। এখানে সন্ধ্যা নামে আমাদের রাতের প্রথম প্রহরে তবে সবাই ঘরে ফেরে ঠান্ডা বাতাসে কাবু হবার আগেই। আমিও তাঁবুর দরজাটাকে একটু ফাঁক করে রেখে বাতাসের ঝালরটাকে আটকে মৃদু ভাবটাকে উপভোগ করি। বই পড়ে সময়কে পরাজিত করার চেষ্টা করি। সময় যেন থেমে থাকে নিজের মত করে। চারপাশ নিশ্চুপ। আমি আমার বড় করে শ্বাস টানার শব্দ পাই। নিজের কাছেই জানতে চাই আর কতটা পথ পেরুলে তবে নিজেকে চেনা যায়! আর কতটা পথ পেরুলে তবে জীবন চেনা যায়! ব্যাগ থেকে সব কিছু বের করে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখি তাঁবুর দেয়ালে আর মেঝে জুড়ে। আমার বসত এই ছোট তাঁবুটাই আমার ঢাকার ঘর। শুধু রাস্তায় রিকশার শব্দ নেই। নাইট গার্ডের কান ফাটানো বাঁশি নেই। সবই আছে শুধু আমার ঢাকা নেই এখানে। তবুও আমি তাকে নিজ রূপদান করার অক্লান্ত চেষ্টা করি। পিঠের ব্যাগটাকে বালিশ আর রাত জেগে বই পড়ার জন্য মাথার কাছে যে বেড ল্যাম্পটা ছিল তার জায়গা নিয়েছে আমার জেনন হেড ল্যাম্পটা। প্রতিদিন রাস্তায় যা পড়ে থাকত পড়ার মত কিছু তাই আমার রাতের পড়ার বই। পর দিন সকালে তাকে অবহেলায় ফেলে দিতাম বাড়তি বোঝাটা কমাবার জন্য।

সকাল হয়। স্লিপিংব্যাগের উষ্নতা আমাকে ছোট বেলায় স্কুলে যাবার কথা মনে করিয়ে দেয়। কত দিন আমার মায়ের বকা শুনি না। কত কাল ধরে তার হাত আমার কপালে পড়েনি স্কুলে যাবার অনুরোধে। আমি আজ অনেক বড় হয়ে গেছি – আমাকে ডাকার জন্য কারও প্রয়োজন হয়না। শুধু সকালের শীত আর কুয়াশা জড়ানো সকাল আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমার শৈশব। অতি কষ্টে লেপ থেকে বের হয়ে স্কুলে যাবার যন্ত্রণা আমায় স্মরণ করিয়ে দেয় সে কষ্টে যে সুখ ছিল তার আরেক প্রকাশ এই পরিবেশ। কখনই ভাল লাগতো না তাঁবু থেকে বেরুতে, আরেকটুখানি সময় থাকলে বা কি হয়? আমিই উত্তর দেই, সকালের সুর্যটাকে হারিয়ে ফেললে বাকিটা পথ পেরুতে আরও কষ্ট। সেই কথাই বাজতে থাকে মনে। রাতে বানিয়ে রাখা পি-নাট বাটার আর রুটিতেই প্রাতরাশ সারি স্লিপিং ব্যাগের উষ্নতায়। কর্কশ ভাবে ঘড়ি বেজে ওঠে – উপায় নেই এখন ৬টা! আমার দিন শুরু।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁবুটাকে গুটিয়ে সব মালপত্র সাইকেল এ চাপিয়ে পানি ভরে নেই আমার বোতলগুলোতে। দেখতে দেখতে সকাল ৭ যে কখন বেজে যায় বুঝতেই পারতাম না। সকালে প্রথম ধাক্কাটা হতো বাতাস। বেশ ঠান্ডাতো বটেই তার উপর হলো এর তেজ। মাথা কান ঢেকে যখন আবার চালান শুরু করতাম ফসলের জমিতে কেবল দু’এক জন করে যারা আসছে, তারা আমাকে দেখে তাকিয়ে থাকতো। তাদের আর দোষ কি এমন আগা মাথা মোড়া অবস্থায় সাইকেল চালাতে কাউকে তারা দেখেনি। কিন্তু এ থেকে আমার আর কিছুই করার ছিল না। আমি এর চেয়ে বেশি ঠান্ডায় আরও বেশি দিন ছিলাম কিন্তু তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হোতো আগে থেকে। আর এখানে – আমি কখনই জানবো না আবহাওয়া খারাপ হবে কখন। কথায় আছে এখানে এক ঘন্টা অপেক্ষা করলে সব ঋতুই নাকি দেখা যায়।

সকাল ৮টার দিকে সূর্যের দেখা মিলতো। তখন আমার পায়ের ও তেজ বাড়তো। কখনও বা উঠতি পথে আটকে যেত আমার পা। আমি যে কত দুর্বল তার প্রতিফলন পেয়েছি প্রতি বার। যে বার প্রথম পাহাড়ে গেলাম সে বার তো আমার অবস্থা মৃতপ্রায়। গেল বারও বেশ কষ্ট হয়েছিল, আমাকে ঠান্ডা থেকে বাঁচাবার জন্য সবার কি আপ্রান চেষ্টা। তবে মাঝ পথে আটকে যাবার মত কোন ঘটনা ঘটেনি কখনও। আমার দূর্বলতা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে প্রতিটি বার, শেষ দেখার তাড়ায়। তাই প্রতিটি শেষ আমার চেনা।

এদিকের রাস্তাগুলোতে গতিসীমা দেয়া থাকে ১০০ কিমি। তাই পথে আমার চেয়ে ধীর গতির কিছুই নেই। পথ কখনও আঁকাবাকা কখনও মসৃণ ভাবে চড়াই-উৎরাই। সবই যেন মাপমত। সাউথ আইল্যান্ড এ আছে বিখ্যাত সাউদার্ন আল্পস আর একপাশে প্রশান্ত মহাসাগর। পর্বতের কারনে বেশির ভাগ স্টেট হাইওয়েগুলো তার কোন না কোন অংশে এর ছাপ পেয়েছে। এতে ভ্রমণে আসে বাড়তি আনন্দ। এই মহাসড়কের নাম প্যাসিফিক এ্যলপাইন ট্রায়েঙ্গেল। পরিকল্পনা করে প্রশান্ত মহাসাগরের একেবারে পাড় ঘেঁসে তৈরি হয়েছে এই মহাসড়ক এবং তার সাথে লাগোয়া রেল লাইন।

প্রশান্ত মহাসাগরের পাড় ঘেঁসে এগুতে গিয়ে সমস্যা হলো যে শুধুই থামতে ইচ্ছে করে। একবার থেমে হালকা খেয়ে আবার শুরু করার পর কেন জানি পা আর চলতে চাইতো না। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা আবার কখনও থেমে মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকবো। তবে সত্যটা ছিল যতই ইচ্ছে থাকুক বেশিক্ষণ অপেক্ষার কোন সুযোগ ছিলনা।

সাইকেল চালাতাম আর উত্তর পশ্চিম দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পার্বত্য অঞ্চলের দিন হলো সকাল ৬টা থেকে বড়োজোড় দুপুর ২টা। তাই বেলা ১১টা থেকে ছোপ ছোপ মেঘ মাঝে মাঝেই সূর্যের তেজ খানিকটা কমিয়ে দিত। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতাম। আমার ঘড়িতে ব্যরোম্যট্রিক চাপ দেখা যায়। সময়ই আমাকে বলে দিত এখন বৃষ্টি হবে। বাঁচোয়া এই যে এখানের বৃষ্টি আমাদের মত অবিরাম নয়। প্রথম এক পশলা বৃষ্টি হবার পর পিছনের মেঘগুলোকে আরো কালো হতে দেখা যেত যা আমাকে ভয় পাইয়ে দিত প্রতি দিন। মেঘ-বৃষ্টি-ঝড়ের দেশের মানুষ হয়েও হাড় কাঁপানো শীত আর কামড়ে ধরা বাতাসের মাঝে বৃষ্টি – মোটেও সুখের নয়। আমার সো কল্ড অল ওয়েদার টু’ওয়ে ব্রেথেবল ওয়াটার প্রুফ টিম্বারল্যান্ড জ্যাকেটের প্রতিটি বুনন দিয়ে বাতাস হানতো আমার বুকের খাঁচায়। আমি কুঁকড়ে যেতাম। পা চালাতে থাকতাম আরও জোরে। থামার কোনই কারণ নেই। একবার থেমে গেলেই এই শীতে জমে যাব আমি। আর তার পরের ব্যপারটা ভাবার আগেই দমকা হাওয়া হেঁচকা টানে আমাকে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে এল পাশের ঘাসের জঙ্গলে। আরও সাবধান হয়ে গেলাম।

দুপুর বেলা চেষ্টা করতাম গরম কিছু খাবার। তাই সকাল থেকেই সময়টা মেনে চালাতে হতো। কখনও বিফ পাই বা স্যান্ডউইচ এই ছিল মেনু আর এগুলোই ছিল সবচেয়ে কম দামের। দুনিয়ার খুব বেশি জায়গায় সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা আমার নেই, তবে এটা মনে হয় সত্য যে – নিউজিল্যান্ড সম্ভবত সাইকেল চালানোর জন্যই তৈরি। সাগর-মহাসাগর, পবর্ত-নদী, বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মাঝ দিয়ে অপার সৌন্দর্য ঘেরা রাস্তায় নিঃসংকোচে ভ্রমণের মজা আমি বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও পেয়েছি বলে আমার জানা নেই।

আমার প্রিয় সাইকেল

প্রিয় সাইকেল

তবে এটা সত্য সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আমার লেখায় যেমন আসবে না তেমনি আমার ছবিতেও ধরা পরার সম্ভাবনা খুবই কম। সারা জীবনই অপ্রতুল জ্ঞান নিয়ে বেড়ে ওঠা আমার এই অনুশোচনা যে ‘হ্যাঁ এটা সত্যি সুন্দর তবে আমাদের দেশের শ্রীমঙ্গল হয়ে জৈন্তাপুর যাবার সময় বড়চতুল বলে যে গ্রাম পড়ে আর সে গ্রামের পিছনে যে পাহাড়ের অবয়ব দেখা যায় স্পষ্ট তার সৌন্দর্যের কাছে এসব কিছুই লাগেনা।’ সেই সৌন্দর্যই আমার পাপড়ি জুড়ে থাকে। এটা ঠিক ঐ পাহাড়ের নাম আল্পস নয়, এই নদীর নাম ওয়াইকারা নয়, মেষ-ঘোড়া-হরিণ চরে না আমাদের জমিতে; তবে ঐ যে অপার-অপলক ভাল লাগার জমিন জুড়ে ডলে দেয়া সবুজ রং এর ঘাস-ধানের কচি শীষ তার বিভিষিকাময় ভাল লাগার অনুভূতি এর থেকে একে বারেই কি কম? সারি নদীর রং আর পানির ধরণ কি এক বারেই আলাদা? আমার তা মনে হয় না। বরং অবহেলা অযত্নে প্রেমের বাহার ছড়ানোর মদ গুণও আছে যে তার, সে খেয়াল কি আমাদের আছে?

আছে আমাদেরও আছে, শুধু দেখে যাবার চোখটা আমাদের নষ্ট হয়ে গেছে কেন যেন। তাই বাংলাদেশ মনে হয় মহাদেবের মতোই বলে:

বহু দিন ভালোবাসাহীন
বহু দিন উথালপাথাল
বহু দিন পড়েনি কোনো হাত কপালে
বহু দিন ভালোবাসাহীন!

‍‍‍‍‍‍+++++++++++++ ‍‍‍‍

নিউ জিল্যান্ড পর্ব (১৬ নভেম্বর ২০০৮ নিউক্যাসেল, অস্ট্রেলিয়া)

[পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মরণব্যাধি AIDS এবং HIV বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রিয় সাইকেলকে সঙ্গী করে আমার ভ্রমণ ও পথচলা। এ সম্পর্কে আরো জানতে দেখুন: www.muntasirmamun.com । ইমেইল: muntasir@gmail.com ]

মুনতাসির

আমি পাহাড়ে চড়ি, সাগরে ডুবি, পৃথিবী আমার প্রেম।

7
আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
সাম্প্রতিকতম সবচেয়ে পুরোনো সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত
অবগত করুন
ইমতিয়ার শামীম
সদস্য

আবারও আপনার দেখা পেয়ে এবং লেখা পেয়ে ভাল লাগল। আপনার সাইকেল সচল থাকুক, কলমও সচল থাকুক।

রায়হান রশিদ
সদস্য

কল্পনা করার চেষ্টা করছি দিন শেষে ভিন্ দেশের অচেনা আকাশের নীচে তাঁবুতে অস্থায়ী নীড় বাঁধতে আপনার আসলে কেমন লেগেছিল। তাঁবু টানানো হয়ে গেছে; প্রিয় সাইকেল তাঁবুর বাইরে হাতের নাগালেই নিরাপদে নোঙর করা। ব্যাগ থেকে একে একে জিনিস বের করছেন তাঁবুর ভেতরে সাজানোর জন্য; খুব সাধারণ আটপৌরে জিনিস সব, কিন্তু তা দিয়েই ঘরের বাইরে আপনার শখের ঘর বাঁধা। কাজ শেষ হলে দমকা ঠান্ডা বাতাসকে ঠকিয়ে দিয়ে তাঁবুর চেইন টেনে ভেতরে বসলেন; জ্বালিয়ে দিলেন জেনন ল্যাম্প। বাইরে তখন শন্ শন্ হাওয়া, অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক। তাঁবুর ভেতরে বসে আকাশ পাতাল ভাবছেন আপনি, সারাদিন যা দেখেছেন, করেছেন, অচেনা রাস্তা, নতুন পরিচিত মানুষজন –… বাকিটুকু পড়ুন »

সৈকত আচার্য
সদস্য

বেশ কিছুদিন ব্যাক্তিগত কাজে, চাপের মুখে আছি। ব্লগে সময় দিতে পারিনি, মোটেই। তারপরেও ব্লগে চোখ না বুলিয়ে, অন্য কাজে মন দেয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। আজ একটু ফুরসত পেয়ে, ব্লগে ঢুকে চিন্তা করছি, কোন পোস্ট আগে পড়বো। নির্বাচন করলাম, মুনতাসিরের ভ্রমন কাহিনী।

সব থেকে উপভোগ করেছি, আপনার বর্ননা। সেই সাথে, নিজ দেশকে মনে করার প্রতিমূহূর্তের কষ্টও মনে মনে আপনার সাথে ভাগাভাগি করেছি, নিজেরই অজান্তে। নিজেও সাইকেল চালাতাম, এক সময়। মনে হয়েছে, আমরা পাঠকরাও বুঝি, আপনার সাথে সাইকেলে সহযাত্রী হয়েছি। আপনার পিছু নিয়েছি সবাই। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খাওয়ার মতো, মনটা বেশ ফুরফুরে ও চাঙা হয়ে উঠলো…।

masuk ahmed
অতিথি
masuk ahmed

the game is on… brother.. too good… looks like i was with you in the whole journey.. waiting for the next part

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.