এইডস : নীরব ঘাতক

প্রতি বছরের মতো ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বরও বিশ্বজুড়ে উদ্‌যাপিত হচ্ছে বিশ্ব এইডস দিবস হিসেবে। ১৯৮১ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৩৬ মিলিয়ন মানুষ ঘাতক-ব্যাধি এইডস-এ মারা গেছে; প্রায় ৩৫.৩ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্ত। অ্যান্টিরেট্রোভাল ট্রিটমেন্ট আবিষ্কৃত হলেও এইডস-এ প্রতি বছর ২ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, যার মধ্যে ২৭০,০০০ হচ্ছে শিশু। [. . .]

A-4প্রতি বছরের মতো ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বরও বিশ্বজুড়ে উদ্‌যাপিত হচ্ছে বিশ্ব এইডস দিবস হিসেবে। ১৯৮১ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৩৬ মিলিয়ন মানুষ ঘাতক-ব্যাধি এইডস-এ মারা গেছে; প্রায় ৩৫.৩ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্ত। অ্যান্টিরেট্রোভাল ট্রিটমেন্ট আবিষ্কৃত হলেও এইডস-এ প্রতি বছর ২ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, যার মধ্যে ২৭০,০০০ হচ্ছে শিশু।

১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইঞ্জেকশন দিয়ে কয়েকজন নেশাসক্ত হাসপাতালে আসেন দুর্লভ ধরণের নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে। এই নিউমোনিয়া তাদেরই হয়, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে যায়। এর কিছু পরে সচরাচর হয় না এমন ত্বকের রোগ কাপোসিস সারকোমা নিয়ে আসেন অনেক সমকামী। মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ বিভাগ সচকিত হয় ব্যাপক সংখ্যক মানুষের এই দু’টো রোগের প্রাদুর্ভাবে। প্রথমদিকে এই বিভাগ এই অদ্ভুত অসুখের নাম দিয়েছিল ফোরএইচ (হাইতিয়ান, হোমোসেক্সুয়াল, হেমোফিলিক এবং হেরোইন ইউজারস)। প্রথমদিকে একে সমকামীদের অসুখ ভাবা হত, কিন্তু পরে দেখা গেল জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন এতে। ১৯৮২ সালের জুলাই মাসে ফোরএইচ নাম বদলে অসুখটির নাম হয় — অ্যাকোয়ার্ড ইমিউন ডেফিশিয়েন্সি সিনড্রোম অর্থাৎ প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধের অভাব। যে ভাইরাসটি এই অভাবের জন্য দায়ী তাকে বলে হিভ বা এইচআইভি, হিউম্যান ইমিউনোডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস। ইউএনএইডসের ২০১০ সালের হিসাব মতে ২০১০ পর্যন্ত ৩৪ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছে। বলা হচ্ছে দু’টি বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে এইডস তার চাইতে বেশি মানুষকে মেরেছে।

A-8এইডস শুধু যে অসুখ হিসেবে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয় তাই নয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণেও মানুষের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে এইডসকে সমকামীদের এবং অমিত যৌনাচারের সাথে সম্পর্কিত অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করায় বৈষম্য সমস্যাটি প্রকট হয়। দেখা গেছে এইডস জনিত কারণে যে নির্যাতন ইত্যাদি হয়, সেই আতঙ্কে অনেকে এইডস পরীক্ষা করানো থেকেও বিরত থাকে। এইডসের কলঙ্ক কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় :

● যে কোনো ভয়ানক ছোঁয়াচে অসুখের ভয়।

● এইচআইভি/এইডসকে কোনো সামাজিক জীবনাচরণ বা দলের সাথে সম্পৃক্ত করে দেখা।

● যারা এইচআইভি/ এইডস বা এইআইভি পজিটিভদের সাথে সম্পৃক্ত তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা।

ইউএনএইডসের হিসাব মতে ২০১১ সালে সারাবিশ্বে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪.২ মিলিয়ন। এর মধ্যে অর্ধেক নারী। দেখা যায় যে, পুরুষের দ্বারা বা রক্ত সঞ্চালন ইত্যাদির মাধ্যমে আক্রান্ত হলেও নারীকেই বহন করতে হয় ফলাফল। এইচআইভি/এইডস সংক্রান্ত কলঙ্ক এবং বৈষম্যের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে ভেদাভেদ দেখা যায়। ক্ষতিকর লিঙ্গ বৈষম্যমূলক রীতি নানা দেশে বলবৎ থাকার কারণে নারী ও মেয়েরা নিজেদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাই দেখা যায় এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত নারী ও মেয়েরা ঘরে ও বাইরে কর্ম, শিক্ষা, সম্পত্তি, বিয়ে ইত্যাদিতে প্রবল বৈষম্যের শিকার হয়। তারা বৈষম্যের শিকার হলে তা থেকে উত্তরণের জন্য তেমন সহায়ক ব্যবস্থাও পায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তানজানিয়াতে এইডস আক্রান্ত নারী-পুরুষের হার ৬৩.১% বনাম ৪৯.৬% (২০০৯)। সেখানকার এইআইচভি পজিটিভ নারীরা অভিযোগ করেছেন কলঙ্কিত এবং বৈষম্যের শিকার হবার। তাঁরা কনডম ব্যবহার করতে চাইলে লিঙ্গ-ভিত্তিক নির্যাতন বাড়ে, নিজে থেকে এইচআইভি পরীক্ষা করাতে বা এটি নিয়ে কাথা বলতে চাইলে, বিবাহ বহির্ভূত বা অন্তর্গত দৈহিক মিলনে অনিচ্ছুক হলেও নির্যাতিত হতে হয় তাঁদের। শুধু তাই নয়, এর ফলে নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বৈষম্যেরও শিকার হয়। তাঁদের বলা হয় গর্ভধারণ না করতে, তাঁরা বলপূর্বক গর্ভপাত বা বন্ধ্যাকরণের শিকার হয়। যাতে নারীর নিজের শরীরের ওপর যে অধিকার তা ক্ষুণ্ন হয়। এইআইচভি পজিটিভ গর্ভবতীরা প্রত্যাখ্যাত হয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে। সন্তান প্রসবকালীন সময়ে রক্তপাত হবার কারণে রক্ত সঞ্চালনের সময় এইচআইভি আক্রান্ত হলেও নারী হেয় প্রতিপন্ন হয়। অপরপক্ষে সন্তানকে মাতৃদুগ্ধ পান না করিয়ে কখনো কখনো বাইরের দুধ পান করানো হয় যা অপরিষ্কার পানি দিয়ে তৈরি হয় অনেক সময়। এর ফলে শিশু মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে। প্রান্তিক এইআইচভি পজিটিভ নারীরা শিকার হয় ভয়াবহ আক্রমণের; যেমন বলা যায় ২০০৯-এ ৬০% বাংলাদেশী যৌনকর্মীরা পুলিশের বা অন্য পুরুষদের দ্বারা ধর্ষিত হবার অভিযোগ করেছে ।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীর জীবনে এইচআইভি/এইডস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সাব-সাহারান আফ্রিকাতে ৫৯% মানুষ এ অঞ্চলে এইচআইভি আক্রান্ত তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। এখানে ১৫-২৪ বছরের নারীরা পুরুষের চাইতে আট গুণ বেশি এইচআইভি আক্রান্ত। নারীরা এইচআইভি পরীক্ষা করতে চায় না বা এইচআইভি আক্রান্ত হবার খবরটি চেপে যায় জীবনসঙ্গীর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, পরিত্যাজ্য হওয়া, নির্যাতন, অর্থনৈতিক সহায়তা হারাবার আশঙ্কায়। অন্যদিকে এশিয়াতে ১৯৯০ পর্যন্ত ২০% আর ২০০২-এ ৩৪% নারীরা পুরুষের চাইতে বেশি এইচআইভি আক্রান্ত। যা ২০১২ সালে ছিল ৩৫% । হিসেবে দেখা গেছে ৫০ মিলিয়ন এশিয় নারী তাদের একান্ত সঙ্গী যারা অর্থের বিনিময়ে যৌন কর্ম করে, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ গ্রহণ করে বা অনিরাপদভাবে পুরুষে পুরুষে যৌনকর্মে নিযোজিত হয় তাদের থেকে এইচআইভি আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকে। সমগ্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যৌনকর্ম এইচআইভির একটি প্রধান কারণ। মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী এ অঞ্চলের দেশগুলোতে মাত্র যৌনকর্মীদের মাত্র ৪০% এইচআইভি প্রতিরোধ সেবা পায়। পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ার এইচআইভি আক্রান্ত প্রাপ্ত বয়স্কদের (৩০-৪০%)-এর মধ্যে প্রায় ৩৫% নারী। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে এইচআইভির প্রধান কারণ যৌন কর্ম এবং ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ গ্রহণ। আনুমানিক ৩৫% নারী এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছেন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ গ্রহণ করে এবং ৫০% ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ গ্রহণ করে এমন সঙ্গী থেকে আক্রান্ত হয়েছেন এবং অল্প বয়স্ক পুরুষের চাইতে অল্প বয়স্কা নারীদের এইচআইভি আক্রান্ত হবার আশঙ্কা দুই গুণ। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নতুন এইচআইভি আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেক নারী। এখানে অল্প বয়স্ক পুরুষের চাইতে অল্প বয়স্কা নারীরা আড়াই গুণ হারে আক্রান্ত হয়। লাতিন আমেরিকার প্রাপ্ত বয়স্ক যারা এইচআইভি আক্রান্ত তাদের মধ্যে ৩৬% নারী। এই মহামারী মূলত পুরুষে-পুরুষে যৌনকর্মে লিপ্ত হয় যারা তাদের হয়, ২২% পুরুষ যারা সমকামী যৌনকর্ম করে তারা আবার নারী-পুরুষ যৌনকর্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় এইচআইভি । ২০০৯ সালে দেখা গেছে আফ্রো-আমেরিকানদের মধ্যে নতুন করে যারা সংক্রমিত হয় তাদের ৩০% নারী। বেশিরভাগ (৮৫%) আফ্রো-আমেরিকান নারী যারা এইচআইভি আক্রান্ত, তারা বিপরীত লিঙ্গের সাথে যৌন মিলনের সময় সংক্রমিত হয়েছে। শ্বেতকায়া আমেরিকান নারীদের চাইতে তারা ১৫ গুণ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় ২০১০ সালের ইউনিভার্সাল আক্সেস রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ণ বয়স্কদের মধ্যে ৪১% নারী। এ অঞ্চলে এইচআইভির সংক্রমণের হার কম হলেও জিবুতি ও সোমালিয়া ব্যতিক্রম। এই দুই দেশে মহামারী ছড়িয়েছে বিপরীত লিঙ্গের সাথে যৌন মিলনে এবং এই দুই অঞ্চলের যারা এইচআইভি আক্রান্ত তাদের মধ্যে ৫০% নারী। এ অঞ্চলের বেশিরভাগ নারী সংক্রমিত হন স্বামী অথবা সঙ্গীর দ্বারা, যারা ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ করে এবং নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয় (সৌদি আরব ৯৭%, ইরান ৭৬%)।   মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে নারী ও মেয়েদের উপর এইচআইভির প্রভাব নির্ণয় করা দুষ্কর।

A-10নারীর এইচআইভি সংক্রমিত হবার ঝুঁকি পুরুষের চাইতে অনেক বেশি। ১৯৯০ দশকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে গবেষণায় দেখা যায় যে, নারীর থেকে পুরুষে যৌনরোগ সহজে ছড়ায় না, যত সহজে পুরুষের থেকে নারীর শরীরে ছড়ায়। এর কারণ হল মিলনের সময় নারীর মিউকাস মেমব্রেনের অনেকাংশ সংক্রমিত বীর্যের সংস্পর্শে আসে। এছাড়া পায়ুকামে নারী-পুরুষ উভয়েরই সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা থাকে একইভাবে, কারণ মলদ্বারের চামড়া নরম থাকে এবং অতি সহজেই ছিন্ন হতে পারে। অবশ্য উগান্ডার এক গবেষণায় বলা হয় যে রক্তের প্লাজমাতে কতখানি ভাইরাল পার্টিকল আছে, তার ওপর নির্ভর করে এইচআইভি সংক্রমণের সম্ভাবনা। যে কোনো রকম যৌন রোগ এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় দশ গুণ। আর যেহেতু নারীদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ যৌনরোগ কোনো রকম উপসর্গ দেখায় না, তারা এইচআইভি আক্রান্ত হয় সহজেই। এক গবেষণায় দেখা গেছে এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের শিশুদের মৃত্যু ঝুঁকি থাকে। এইচআইভি আক্রান্ত মায়েরা শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান না করালে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমে এটা ঠিক, কিন্তু এই কৌশলের ফলে মা সামাজিক সমস্যায় পড়ে এইডস রোগী বলে চিহ্নিত হয়ে। উন্নয়নশীল দেশের সামাজিক নিয়মকানুন অনেক সময় নারীদের এইচআইভির ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সাব-সাহারান আফ্রিকাতে দেখা যায় বিয়ের সময় নারী পুরুষের বয়সের পার্থক্য থাকে অনেক। এক্ষেত্রে পুরুষটি যৌন অভিজ্ঞ থাকে এবং তার যৌনসঙ্গী একের অধিক হয়। সেক্ষেত্রে স্ত্রীর এইচআইভি আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বাড়ে। এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত হলে যেহেতু সামাজিক সমস্যায় পড়তে হয়, তাই বহু আক্রান্ত পুরুষেরা স্ত্রীকে বলে না এবং তাকে আক্রান্ত করে। অন্যদিকে আক্রান্ত স্ত্রীকে পরিত্যাগ করবার নজির আছে অসংখ্য। পরিবারের কেউ এইডস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেও নারীকে বহন করতে হয় দায়ভার এবং যারা বেঁচে থাকে তাদের দায়দায়িত্ব।

প্রায় সমস্ত সমাজেই পৌরুষের সাথে পুরুষত্বের একটি যোগ আছে। কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, চিলি, কোস্টারিকা, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপাইন এবং জিম্বাবুয়েতে ইউএনএইডস পরিচালিত একটি গবেষণার রিপোর্টে দেখা গেছে যে, যুবকরা যৌনতাকে দেখে সাফল্যের মাত্রা হিসেবে এবং কোনো কিছু না জানাকে যেহেতু অজ্ঞতা ধরা হয় তাই তারা এইচআইভি/ এইডস সম্পর্কিত তথ্য জানতে আগ্রহী হয় না। এভাবে তারা যৌনসঙ্গীদের বিপদের মুখে ফেলে। ব্রাজিল, ভারত, মরিশাস এবং থাইল্যান্ডে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে এসব দেশে কম বয়সী নারীরা নিজেদের শরীর, গর্ভনিরোধ এবং যৌনরোগ সম্পর্কে খুবই কম জানে। সমস্যা হল তা জানার জন্য খোঁজ নিতে গেলে মন্দ মেয়েলোক বলে আখ্যা রটার সম্ভাবনা থাকে। বহু নারীর জন্য বিবাহিত হওয়াটাই ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা সমাজে পুরুষের প্রাক-বিবাহ এবং বিবাহ-বহির্ভুত সম্পর্ক ঘটতে পারে এবং এক্ষেত্রে সেসব পুরুষের স্ত্রীরা সংক্রমিত হবার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই নারীরা বিশ্বস্ত থাকলেও সংক্রমণের বিপদ থেকে মুক্ত নন। এইচআইভি সংক্রমিত হলে তৃতীয় বিশ্বের মানুষরা চিকিৎসা সেবা পান না আর্থিকভাবে দুর্বল বলে, এর ভেতর নারীরা আর্থিকভাবে আরও বেশি দুর্বল বলে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন। থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে দরিদ্র নারীরা যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হন, ফলে তারা থাকেন মারাত্মক ঝুঁকিতে।

নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে এইচআইভি/এইডস একটি প্রভাবক বলা যায়। গুয়াতেমালা, ভারত, জ্যামাইকা এবং পাপুয়া নিউগিনিতে দেখা গেছে নিরাপদ যৌন সম্পর্কের জন্য কনডম ব্যবহার করতে চাইলে নারীরা নিগৃহীত হন; জোরপূর্বক যৌনমিলনের সময়ে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের সময়েও নারীরা ধর্ষণের শিকার হন — তাঁদের সংক্রমণও বাড়ে।

যারা সংক্রমিত হয়, তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ বৈষম্য দেখা যায়। ইউএনএডসের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সংক্রমিত পুরুষকে জিজ্ঞেস করা হয় না কিভাবে সে সংক্রমিত হল এবং তাকে সেবা দেয়া হয়, অপরপক্ষে  নারীকে শুধু যে জিজ্ঞেস করা হয় কিভাবে হল তাই নয়, তাকে নিন্মমানের সেবা দেয়া হয়। পুরুষ অনেক সময় সংক্রমিত নারীকে ফেলে যায়, কিন্তু নারীকে সংক্রমিত পুরুষের এবং পুরো পরিবারের ভার বহন করতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে নারী-কন্ডোম এইচআইভি ঠেকাতে ফলপ্রসূ, কিন্তু এর মূল্য সাধারণ নারীদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

নারীদের ভেতর সবচাইতে বেশি এইডস সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকেন নারী যৌনকর্মীরা। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এনং রুশ ফেডারেশনে প্রাথমিকভাবে নারীদের মাধ্যমেই এইচআইভি ছড়ায়, যার মাত্রা ৬৫%। এমনকি যে সব দেশে এইচআইভি মহামারী আকার ধারণ করেছে, সেখানেও যৌনকর্মীরাই সংক্রমণের শিকার হন, যেমন- সাব-সাহারান আফ্রিকাতে ইয়ায়োন্দে, ক্যামেরুনে ৩০% আর কেনিয়ার কিসুমুতে ৭৫% যৌনকর্মীরা এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছে। যৌনকর্মীদের বেশি পরিমানে এইচআইভি ছড়াবার কারণ কয়েকটি, যৌনকর্মীরা অনেক সময় ভাসমান থাকে তাই স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে না। তারা আইন, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এমনকি ভাষাগত বাধার সম্মুখীন হয় সেবা বা তথ্য সুবিধা পেতে। এছাড়া নির্যাতন তো আছেই যা তাদেরকে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলে। বেশিরভাগ সমাজেই পেশাদার যৌনকর্মকে যেহেতু হেয়ভাবে দেখা হয়, তাই ধরেই নেয়া হয় যৌনকর্মীদের সাথে যে কোনো আচরণ করা যায়। তারা অনেক সময় ধর্ষিত হন, যার ফলে এইচআইভি ছড়ায় তাদের ভেতর। বাংলাদেশ, ভারত ও নামিবিয়াতে ইউএনএইডসের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই যৌনকর্মীদের নির্যাতনে এগিয়ে আছেন। ভারতে দেখা গেছে যৌনকর্মীরা স্বাস্থ্যসেবা নিতে গেলে তাদেরকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং স্বাস্থ্যসদনে তাদেরকে এমনভাবে বসানো হয় যেন তাদের পেশা বোঝা যায়। অনেক যৌনকর্মী এজন্যই স্বাস্থ্যসেবা নিতে চায় না। যৌনকর্মকে পৃথিবীর বহু দেশে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি বলে তারা শ্রমিক আইন থেকেও বঞ্চিত হয়।

A-5তাহলে আমরা মোটামুটি দেখতে পেলাম নারীরা কিভাবে সংক্রমিত হয় এবং সংক্রমিত না হয়েও ফলভোগ করে। জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে দেখা যায় নারীর উন্নয়নে যথেষ্ট বিনিয়োগ না হওয়া, জেন্ডার সাম্যের উপকারিতা উপলব্ধি না করা ইত্যাদির ফলে নারীরা অধিকতর দারিদ্র্য এবং জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হয়। যা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করার গতিকে ধীর করে। কেননা আগের অর্থনৈতিক বিপর্যয়গুলোতে দেখা যায় নারী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারায় বা তাদের আয় এত কমে যায় যে তারা যৌন শোষণ বা পাচারের শিকার হয়। যা এইচআইভি ছড়ায় বিশেষ করে মধ্য আয়ের দেশগুলিতে, যেখানে আগের থেকেই এ রোগের প্রকোপ রয়েছে যা শুধু এমডিজির যা কিছু অর্জনে ভরাডুবি আনতে পারে তাই নয়, এমডিজির ষষ্ঠ লক্ষ্য – ‘এইচআইভি/ ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ’ অর্জন ব্যর্থ হতে পারে।

বাংলাদেশে এইচআইভি/ এইডসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় ১৯৮৯ সালে। রোগের অস্তিত্ব পাবার চার বছর আগেই বাংলাদেশে সরকার অনেকগুলো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়।বিশেষ লক্ষ্য ছিলযারা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নেশা করে, সমকামী পুরুষদের এবং নারী যৌনকর্মীদের এবং সেই সাথে প্রবাসী শ্রমিকরাও। আইসিডিডিআরবি-র সূত্র মতে ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্য দাঁড়ায় ৭,৫০০। তবে ইউএনএইডসের তথ্য মতে ১১,০০-র কিছু উপরে। ২০১১ সালের মার্চে আইপিপিএফ-এর একটি নিরীক্ষাপত্রে দেখা যায় যে বাংলাদেশে নারী এইচআইভি/ এইডস আক্রান্তের সংখ্যা ১৯০০ জন। আমাদের জনসংখ্যার আয়তনের তুলনায় এইচআইভি/ এইডস আক্রান্তের সংখ্যা কম বলে আনন্দিত হবার কিছু নেই। মনে রাখতে হবে যে আমাদের চার পাশে আছে ভারত এবং এ দেশটি ২০১১ সালের হিসেব মতে ৩য় বৃহত্তম এইচআইভি/ এইডস আক্রান্তের দেশ। সীমান্ত এলাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পড়ছেও। বাংলাদেশের নারীরা সাধারণতঃ সংক্রমিত হন স্বামীর দ্বারা এবং পেশাদার যৌনকর্মীরা তাদের খদ্দেরদের দ্বারা। আমাদের দেশের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরীদেরই এইডস সর্ম্পকে কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ কন্যাশিশুরই কিশোরী বয়সে বিয়ে হয়। শতকরা ৪৭ ভাগ নারী সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, যার অধিকাংশই ঘটে কিশোরী বয়সে। এসবের ফলে নারী এইচআইভি আক্রান্ত হয়। ২০০৫ সালে ICDDRB কর্তৃক প্রকাশিত Working Paper on 165 গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে যেসব নারী যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত তাদের শতকরা ৫৫ ভাগেরই বয়স ২৪ বছরের নিচে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, গার্মেন্টসে কর্মরত কন্যাশিশুদের শতকরা ৮১ ভাগ এইডস যে একটি বিশেষ ধরণের রোগ তা জানে এবং এটি আক্রান্ত হয় একই সিরিঞ্জ, কাঁচি, ব্লেড বা রক্তের মাধ্যমে এ তথ্যটুকু কেবল জানে। শতকরা ১০ ভাগ কন্যাশিশু জানে এটি একটি যৌনবাহিত রোগও বটে। এইডস সর্ম্পকে অজ্ঞানতার কারণেই কন্যাশিশুদের মধ্যে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এবং আশঙ্কাও বেশি। যেহেতু নারীরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, তাই কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

A-7

● ৫ বছর বয়স সীমা ধরে (১০-১৪, ১৫-১৯, ২০-২৪) কিভাবে নারী ও কন্যাশিশুদের মধ্যে এইচআইভি/ এইডস প্রভাব ফেলে, এ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নারী ও বালিকাদের মানবাধিকার এবং স্বাস্থ্যর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।

● বিশ্লেষণ করতে হবে সাংস্কৃতিক বিষয়াবলী, কলঙ্কের সাথে বৈষম্য, দারিদ্র্য, সামাজিক ও আইনী প্রতিবন্ধকতা যা নারী ও মেয়েশিশুদের মানবাধিকার চর্চায় বাধাদান করে এবং তাদেরকে এইচআইভি/ এইডস এবং তার পরিণতির ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

● সরকার জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নারী, এইচআইভি, সিডও, জেন্ডার সাম্যের ক্ষেত্রে, সেসব মনিটর করতে হবে। প্রয়োজনে সেসব তথ্য ব্যবহার করতে হবে।

● বিনামূল্যে যেসব আইনগত এবং সেবা সুবিধা প্রাপ্য, তা যেন মেয়েরা পায় সেদিকে লক্ষ্ রাখতে হবে।

● নারীদের, বিশেষ করে অল্প বয়সী নারীদের যৌন অধিকার দাবী করতে সক্ষম করে তুলতে হবে।

● যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা, এইচআইভি এবং যক্ষ্মার একটি একীভূত ন্যুনতম সেবা দিতে হবে।

● পূর্ণ ও অল্প বয়স্ক পুরুষদের শিক্ষা দিতে হবে নারীর যৌন অধিকার বিষয়ে।

A-9

প্রতি মুর্হর্তেই মনে রাখতে হবে, এইচআইভি পজিটিভ হবার দায় একা নারীর নয়। নারী বাঁচলে একটি পরিবার বাঁচে।

 

তথ্যসূত্র :

http://en.wikipedia.org/wiki/HIV/AIDS_in_Bangladesh#cite_note-usaid-1

http://www.undp.org/content/undp/en/home/mdgoverview/mdg_goals/mdg6/

http://www.unicef.org/infobycountry/bangladesh_bangladesh_statistics.html

http://www.who.int/gender/hiv_aids/en/

http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmedhealth/PMH0001620/

http://www.unaids.org/en/

http://en.wikipedia.org/wiki/HIV/AIDS

http://www.genderandaids.org/

http://www.womenandaids.net/Resource-Centre/Countries/Bangladesh.aspx

অদিতি কবির

বই পড়তে যত ভাল লাগে, লিখতে তার চেয়ে বেশি আলসেমি লাগে। একাডেমিক পড়াশোনা আর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ তালগোল পাকিয়ে গেছে।

আলোচনা শুরু করুন কিংবা চলমান আলোচনায় অংশ নিন ~

মন্তব্য করতে হলে মুক্তাঙ্গনে লগ্-ইন করুন
avatar
  সাবস্ক্রাইব করুন  
অবগত করুন
  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.