প্রেম এবং অন্যান্য বাঁদর বিষয়ক

তখন আষাঢ়মাস। হিন্দোল সংগীত একাডেমিতে যাই, নালার জল উপচে স্থানে স্থানে কাদা, সোনারং বিকেলবেলার শেষ চিহ্ন ধরে রাখে গানের ইস্কুলের জানালার কলাবতী ফুল [...]

তখন আষাঢ়মাস। হিন্দোল সংগীত একাডেমিতে যাই, নালার জল উপচে স্থানে স্থানে কাদা, সোনারং বিকেলবেলার শেষ চিহ্ন ধরে রাখে গানের ইস্কুলের জানালার কলাবতী ফুল — তার ছিটকাপুড়ে দলমণ্ডলে, আমরা দুলে দুলে গান শিখি — “পলাশফুলের গেলাস ভরি পিয়াবো অমিয়া তোমারে পিয়া”, রীতিমত শৃঙ্গাররসপ্লাবিত নজরুলগীতি। আমাদের হেলদোল নেই। শুধু মন খাঁখাঁ করে বিকেলের কার্টুন দেখতে পেলাম না বলে, বিকেলে খেলতে পেলাম না বলে। আড়চোখে দেখি বিশাল হাতখোঁপা করে সেলাই হাতে করে পান মুখে নিয়ে কবি গোলাম মুস্তাফার মেয়ে গান শুনছেন। ভয়ে ভয়ে পার হই ওস্তাদ আখতার সাদমানীর ক্লাসের সামনে দিয়ে, তিনি হেঁকে বলেন — সাগুফতা আবার কেমন নাম… একরকমের মন খারাপ বিজড়িত ভয় গুলানো কান্না পেয়ে বসে আমাকে। এর তো জবাব জানি না। খালিদ হোসেন স্যারের ক্লাসে কথা বলা নিষেধ — এদিকে ‘দোল ফাগুনের দোল লেগেছে’র শেষ লাইন কি না, ‘মন ছুটে যায় দূর গোকূলে/ বৃন্দাবনের প্রেম যমুনায়’, প্রেম শব্দটা গাইতে গিয়ে আমাদের যে কেন এত হাসি পেত!

প্রেম শব্দটা ছাপার অক্ষরে বেশ ক’বার কোথায় পাই? বুদ্ধদেব গুহর ‘মাধুকরী’ তখন ছাপা হচ্ছে দেশ পত্রিকায়। সেখানে এক পাঠকের চিঠি এসেছে — “কাল মেরা ঈশ্‌ক্‌কে আন্দাজ বদল যায়েগা” নিয়ে প্রশ্ন করছেন তিনি, লেখকও জবাব দিচ্ছেন। সরল উচ্চারণে পড়ছি — ঈশ্‌ক্‌কে আন্দাজ বদল যায়েগা। তার মানে ঈশ্‌ক্‌ও আরেকটি বাজে শব্দ। যেমন বাজে শব্দ পেয়ার — মুহাব্বত। তারাপদ রায় সম্ভবতঃ লিখছেন ‘বিদ্যেবুদ্ধি’, আর নিধুবাবু ছদ্মনামে কৌতুক বের হচ্ছে, নাম রাখা হয়েছে ‘টপ্পা’। কী সুন্দর সেই ম্যাগাজিনের ইলাস্ট্রেশন। কী অদ্ভুত সেই কাগজের স্পর্শ। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ যদ্দিনে বের হওয়া শুরু হয়েছে, ততদিনে আমি ইলাস্ট্রেশনের ক্রীতদাসীপ্রায়। কী সব গল্প বের হতো, নাম মনে আছে আমার এখনো, ‘মধুবাতা ঋতায়তে’, ‘দাক্ষায়ণীর দিন’, ‘মৎস্যগন্ধা’, ‘হেমন্তের সাপ’ — আর কী যে তাদের ইলাস্ট্রেশন। আমার ঈশ্বর তখন সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, বিমল দাস, দেবাশিস দেব। আর আমার আরেক ঈশ্বর অহিভূষণ মালিক, অকালপ্রয়াত।

বিমল দাসের সাথে জড়িত বনফুলের ‘মায়াকানন’ রূপকথার স্মৃতি। আমি বিশ্বাস করতাম সত্যিই পরীরা চরু খায়, আমার নিজের নাম কেন মঞ্জরী না, কেন রত্নাবলী না… বিমল দাসের ড্রয়িং-এর মতন করে কেন শুদ্ধসুরের সাথে আমার বিয়ে হবে না।

মলাটের ছবি দেখে ছোটচাচার কাছে আবদার করেছিলাম ‘মেঘদূতম’ এনে দাও… বই এসে হাতে পৌঁছাল, ‘ক্ষীরের পুতুল’ সমেত, পাতায় পাতায় অপরূপ সব ছবি। আর বহু-অপেক্ষিত ‘মেঘদূতম’-এ কোনো সেইরকম ছবি নেই, ছোট্ট শেওলা সবুজ বই, তাতে একপাতা সংস্কৃত, আরেকপাতা বাংলা। শেষপাতাগুলিতে নোটস দেয়া, টীকাগুলি রীতিমত আমার জন্যে অস্বাস্থ্যকর। আমি আর আমার আরেক অকালক্ব বন্ধু শ্রাবন্তী ঘোষ (এখন দত্ত) মিলে ঠিক করলাম, সংস্কৃততে কিছু ‘বাজে শব্দ’ শিখি না কেন। কিন্তু কে বলে দেবে কোন্ শব্দের মানে কী। দু’জনে একদুপুরে ফন্দি করে বের করলাম, বাংলাতে যেখানটায় ‘বাজে শব্দ’ আসছে, ঠিক সেই শব্দ গুনে গুনে পাশের পাতার সংস্কৃততে যে শব্দ আসবে, সেটাই নির্ঘাত বাজে শব্দ। অতএব, প্রেম-এর সাথে ধারাপাত গুনে পাশের পাতায় এলো ‘প্যাহমিব জনাঃ’ এইজাতীয় কিছু। আমরাও মুখস্থ করে ফেললাম ‘প্যাহমিব জনা’।

‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ছুটি’ পড়ে শেষ করতেই আব্বা একদিন ডেকে বললেন — “‘মাল্যদান’ পড়, সহজ শব্দে লেখা।” আব্বা তো ‘মাল্যদান’ পড়তে বললেন — এদিকে আম্মার দুই চোখের একোণ সেকোণে ঝিলিক দিচ্ছে মানা এবং সেই চোখ যথারীতি আব্বার দিকে ফেরানো। ‘মাল্যদান’ পড়া হলো। তাহলে গল্পগুচ্ছেও ‘ঈশোক’ আছে!

এইবার সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের তুমুল বর্ণে আঁকা ‘ঋভুর শ্রাবণ’ খুলে দেখি — অনুচ্চারিত প্রেম, শ্রাবণমাসের আকাশ ভাসিয়ে প্রেম চলেছে নিশূন্যিপুর। এইবার তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ পড়া শুরু, ধূলি-ওড়া বীরভূমের মাটিতে কৈশোরপ্রেম, ঐ যে কত দিকে প্রেম তার অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলে ‘হও’ আর তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। বিচিত্রার পিছনের দিকের পাতায় অ্যান্ডি গীব মরেই গেল প্রেমের জন্যে। টুকটুকে জাফর ইকবালের বিফল প্রেম স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খেজুরপাটী-বেণী করছে আমার ছোটখালা, অ্যাগনেথা আর তার জাম্বুবানমার্কা স্বামীর মৃত প্রেমের জন্যে শোক করে ছোটমামা সেই কবে গুটিয়ে ফেলেছেন অ্যাবা-র পোস্টার। রাত দশটার খবরের পরে মাঝে মাঝে আমাকে জাগতে দেয়া হচ্ছে, ‘নর্থ অ্যান্ড সাউথ’ দেখছেন ছোটচাচা, উদ্‌গ্রীব আমি দেখছি মুভি অফ দ্য উইকে পল নিউম্যানকে, যাতনাময় সুন্দরকে। আর আমি মাত্র ক’টাদিন পরেই চিলডাকা দুপুরবেলার উত্তাল পাখার নিচে ‘মেঘ ও রৌদ্র’ পড়ে কান্নায় ভরে যাচ্ছি, ঐ যে কীর্তনীয়ারা মুহুর্মুহু গাইছে — এসো এসো হে, যে কিনা নিতিসুখ, সেই কিনা চিরদুখ, তাকেই আবার ফিরে চাই এ কেমন কথা। বাক্যহারা শশিভূষণ অশ্রুরুদ্ধ হয়ে রইলেন, তাঁর সামনে বিধবা গিরিবালা দাঁড়িয়ে রইলো, আর আমার ভিতরে বিমল দাসের সন্ধ্যার বেদানালাল আকাশে রাজহাঁসে চড়া শুদ্ধসুর-লাভপুরের শিবু-ঋভুর শ্রাবণমাসের ‘ঈষাণে উড়িল মেঘ সঘন চিকুর’ একাকার হয়ে যেতে থাকলো।

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

বিপন্ন বিস্ময়ের অন্তর্গত খেলায় ক্লান্ত।

৮ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.